আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

চীনাদের বাঘের খামার

ডিজি টাল (ডিরেক্টর জেনারেল অব টাল)

আহমেদ জুয়েল বাঘ বনেই থাকে। খিদে পেলে শিকার করে খায়। আর ঘন বনের মধ্যে রাজকীয় ভঙ্গিতে আয়েশ করে ঘুমায়। নেহায়েৎ বাধ্য না হলে ওরা কখনো বনের বাইরে আসে না। কিন্তু মানুষ যদি তাদের সামনে যায় তাহলে আর রক্ষা নেই।

একেবারে হালুম বলে আক্রমণ করে ঘাড় মটকে খেয়ে ফেলে। ছোটবেলা থেকে এমনটাই জেনে এসেছি। তারপর জেনেছি খাঁচার মধ্যেও বাঘ থাকে। চিড়িয়াখানায়। মানুষই বনের বাঘকে কৌশলে ধরে এনে চিড়িয়াখানার খাঁচার মধ্যে বন্দি করে রাখে।

অন্য মানুষরা তা দেখে আনন্দ পায়। কারণ বনের মধ্যে গিয়ে তো আর বাঘ দেখা যায় না। আর দেখলেও তা যে সে মানুষের কম্মো নয়। তাই মানুষ নিজেদের বিনোদনের জন্য বনের বাঘকে খাঁচার মধ্যে বন্দি করে রাখে। আরও পরে জেনেছি ভয়ঙ্কর সুন্দর এই প্রাণীকে হত্যা করে শিকারিরা।

কারণ বাঘের চামড়া, হাড়, চোখ সবই খুব মূল্যবান। মানুষই এগুলোকে মূল্যবান বানিয়েছে। আর তাই সুযোগ বুঝে এ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে সুযোগসন্ধানী মানুষ। বেড়েছে বাঘ হত্যা। আর এক্ষেত্রে চীনের মানুষ সবচেয়ে এগিয়ে।

শুধু বনের বাঘ হত্যা করেই চুপচাপ বসে থাকেনি চীনের মানুষ। তারা গড়ে তুলেছে বাঘের খামার। আমাদের দেশে যেমন হাঁস-মুরগি আর গরু-ছাগলের খামার আছে, ঠিক তেমনি চীনে আছে বাঘের খামার। আমাদের সুন্দরবনে যা বাঘ আছে, তার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বাঘ আছে শুধু চীনের জিয়ংসেন টাইগার অ্যান্ড বিয়ার পার্কেই। এই পার্ককে পার্ক না বলে খামার বলাই ভালো।

কারণ সেখানে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বাঘ উৎপাদন করা হয় আর সেগুলোকে হত্যা করা হয়। ন্যাচারাল পার্কের নামে সেখানে রীতিমতো বাঘের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবসা চলে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, বনের বাঘকে চায়নিজরা খাঁচার পোষা প্রাণীতে পরিণত করেছে। বিশ শতকের মাঝামাঝি দেশটির বনে কয়েক হাজার বাঘ থাকলেও এখন সেখানে অবশিষ্ট আছে মাত্র ৫০টি। অন্যদিকে তারা শুধু জিয়ংসেনেই আটকে রেখেছে ১৩০০ বাঘ।

এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। চোরা শিকারিদের বন্দুকের মুখে হারিয়ে গেছে সেখানকার বনের বাঘ। ধারণা করা হয়, চীনে বাঘের চাহিদার কারণে এমন চোরা শিকারিরা সুন্দরবনেও বাঘ হত্যার সঙ্গে জড়িত। ১৯৯৩ সালের আগ পর্যন্ত চীনে বাঘের হাড়, মাংস, চামড়ার ব্যবসা হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে চীন ১৯৯৩ সাল থেকে বাঘের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনা-বেচা নিষিদ্ধ করেছে।

সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার আন্তরিকতা নিয়েও সন্দেহ আছে। কারণ বসে নেই পার্ক আর খামারিরা। তারা বাঘের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। বাঘ হত্যা করছে আর ধুমছে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত বাঘের মাংস, হাড়, চোখ, শিশ্ন, চামড়া সবই তারা হিমাগারে রেখে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ব্যবসার জন্য।

সরকার সেখানে কিছুই করছে না। চীনের বিশ্বাস চীনের মানুষ বিশ্বাস করে বাঘের অঙ্গ থেকে তৈরি ওষুধ সবচেয়ে মূল্যবান এবং কার্যকর। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে থেকেই সেখানে চিকিৎসার কাজে বাঘের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার হতো। খামার থেকে তাই একটি বাঘ ১ কোটি টাকারও বেশি দামে বিক্রি হয়। বাঘের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গ হাড়।

হাড় থেকে মদ সরকারের নমনীয় নিষেধাজ্ঞার কারণেই চীনে এখনও বাঘের হাড় দিয়ে মদ তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। চীনের বন্যপ্রাণী পার্কগুলোই এ কাজ করে থাকে। তারা চালের তৈরি মদের মধ্যে বাঘের মৃতদেহ ও হাড় ভিজিয়ে রাখে। চীনারা বিশ্বাস করে, ওই মদ খেলে আর্থাইটিস ও রিউম্যাটিজম ভালো হয়। আর এই কাজটা বিজ্ঞাপন দিয়েই করা হয়।

মাত্র ২৫ কেজি হাড়ের দাম প্রায় ৬০ লাখ টাকা। শিশ্নের সুরুয়া বাঘের শিশ্নের সুরুয়া বা স্যুপ খুবই দামী পানীয়। চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসামতে এই স্যুপ খেলে মর্দামি শক্তি বাড়ে। চীন, সাউথ কোরিয়া এবং তাইওয়ানে এর বাজার সবচেয়ে বেশি। আর পর্যটকরাও চীনে গেলে এই স্যুপের খোঁজ করেন।

চামড়া চীনে বাঘের চামড়া মানুষ ঘর সাজানোর জন্য কেনে। এটা সেখানে অভিজাত্যের বিষয় (তবে ব্যাপারটি আমাদের দেশেও আছে)। আর সেখানে প্রতিটি বাঘের চামড়া বিক্রি হয় ২০ হাজার মার্কিন ডলারে। বাঘপণ্যের বাজার চীন, সাউথ কোরিয়া, নেপাল, ভিয়েতনাম, রাশিয়া এবং তাইওয়ানে বাঘের পণ্যের বাজার সবচেয়ে বেশি। বাঘের পণ্যের এই বিশাল আর কোটি কোটি ডলারের বাজারের জন্য চীনারা গড়ে তুলেছে বাঘের খামার।

যদিও তারা বিষয়টি স্বীকার করে না। পরিবেশবাদীদের ধারণা, চীনে বড় খামারের পাশাপাশি ছোট ছোট অনেক খামার আছে যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে বাইরের কেউ জানে না।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.