আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হাওয়াই জাহাজ

যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার বন্ধ রহে গো কভু দ্বার ভেঙে তুমি এসো মোর প্রাণে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু।
জেবুন্নেসা এই প্রথম হাওয়াই জাহাজে চড়েছেন। তিনি খুবই বিচলিত বোধ করছেন। যদিও তার সঙ্গে তার স্বামী হেলালুর রহমান আছেন। তাতে কি? তিনি ভাবতেই পারছেন না, তিনি শূন্যে কি ভাবে চলবেন? মনে মনে জানা যত দোয়া দরুদ ছিল সবই পড়ছেন।

তিনি অবশ্য তার আমেরিকা শহরে যাবার সব কিছু ঠিকঠাক হবার পর থেকেই, মুরগী ছদকা দিয়েছেন। মসজিদে কুর'আন খতম করিয়েছেন। দুই দিন হাওয়াই জাহাজে থাকা তো আর কম বিপদ্দজনক নয়! হাওয়াই জাহাজ চালু হবার পর এখন পর্যন্ত তিনি কোন ড্রাইভার দেখতে পেলেন না। সেটা নিয়ে সামান্য চিন্তায় আছেন। তিনি জীবনে যে কয়বার বাসে চড়েছেন, ড্রাইভারকে তিনি সামনেই বসতে দেখেছেন।

লজ্জায় স্বামীকে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারছেন না। তিনি ভেবেছিলেন, জাহাজটা যেহেতু এত বড়, বসার জায়গা গুলোও নিশ্চই অনেক সুন্দর আর বড় বড় হবে। কিন্তু না। বয়সের ভারে নূব্জ্য তার শরীর নিয়ে বসতে একটু কষ্টই হচ্ছে। সেটাও তিনি তার স্বামীকে বলেননি।

এম্নিতেই মানুষটা নানান চিন্তায় জর্জরিত, তার উপর আবার এসব ছোটখাটো সমস্যার কথা বল্লে নিশ্চই বিরক্ত হবেন। বয়স হলে মেজাজা সামান্যতেই চড়ে যায়। জাহাজ আকাশে ওঠবার কিছু ক্ষণের মধ্যেই হেলালুর রহমান ঘুমিয়ে পড়েছেন। এখন তিনি গুর গুর করে নাক ডাকছেন। জেবুন্নেসার ঘুম আসছে না।

তার কান মাথা ভোঁ ভোঁ করছে জাহাজের শব্দে। তিনি মনে মনে আল্লাহকে বেশী করে ডাকছেন। অনেক ছোটবেলায় মাঝে মাঝে তাদের গ্রামের উপর দিয়ে হাওয়াই জাহাজ গেলে, তিনি তার ছোটভাইটিকে কোলে নিয়ে আরও কিছু সঙ্গী সাথী জুটিয়ে ছুটতেন মাদ্রসার মাঠে সেই জাহাজ দেখবেন বলে। আর দেখেছেন যে বছর গন্ডোগোল হল, সেই বছর। কোন কোন জাহাজ থেকে আবার আগুনও ফেলা হতো।

এ কথা তিনি শুনেছেন। তবে তাদের গ্রামে কখনও আগুন ফেলা হয়নি। তাদের গ্রামে আগুন ফেলার কোন দরকার ছিল না। এম্নিতেই মিলিটারীরা সব পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল। এ এমন এক স্মৃতি তার যতবার মনে হয়, তিনি ততবারই চোখ মুছতে থাকেন।

তিনি পড়াশুনা করেছেন, পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে যেতেন পাল্কিতে চড়ে। পাল্কিতে চড়লেও তার মনে হত, তিনি শূন্যে ভাসছেন। আর বেহারাদের হুম হুম শব্দের সাথে আজ হাওয়াই জাহাজের বেশ মিল পাচ্ছেন। বেহারারা সব কাবুলি ছিল।

তাকে আম্মিজান বলে ডাকতো। কিন্তু তাদের চেহারা কখনই তিনি ভালো করে দেখেন নি। আজ এত দিন বাদে অবশ্য এসব মনেও করতে পারেন না। ছোট ছোট জামা কাপড় পরা একটা সুন্দরী মেয়ে তাদের জন্য খাবার দিয়ে গেল। এত সুন্দর করে সাজানো, সব অচেনা খাবার।

তার খেতে খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু হালাল না হারাম বুঝতে পারছেন না। হেলালুর রহমান কে ডাকতেও ইচ্ছা করছে না। জেবুন্নেসা আমেরিকা শহরে চলেছেন বিশেষ একজন কে দেখতে। এটা নিয়ে তিনি এবং তার স্বামী খুবই চিন্তিত। তাদের দুজনের কারোই মন ভালো নেই।

এটা মনে হতেই তিনি আবার ঘন ঘন চোখ মুছতে শুরু করলেন। কেঁদে তার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। গত ৩৫ বছর ধরে তারা শুধু কেঁদেই চলেছেন। সেই যে গন্ডোগোলের বছর হেলালুর রহমান যোগ দিলেন মুক্তিদের সাথে।

জেবুন্নেসা রইলেন তার একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে স্বামীর ভিটে আঁকড়ে ধরে। গোপনে গোপনে মাঝে মাঝেই হেলালুর রহমান জেবু কে খবর পাঠিয়েছেন যে, তিনি যেন কন্যাসহ অন্য কোথাও পালিয়ে যান। কিন্তু স্বামী যদি দেখা করতে এসে তাকে না পায়, সেই ভেবে জেবুন্নেসা জীবনে একবারই স্বামী আদেশ অমান্য করেছিলেন। আর স্বামীর এই আদেশ অমান্য করার শাস্তি তিনি তার বাকী জীবন দিয়ে দিচ্ছেন। তার বিএ পাশ স্বামী তখন পাঁচমাইল দূরের স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

অনেক লোকের সাথে তার ওঠা বসা। জেবুন্নেসা এসবের কোথাওই ছিলেন না। খুব সাধারণ জেবুন্নেসা তার একমাত্র মেয়েকে নিয়েই কাটেয়ে দিতেন সবসময়। মেয়েকে তিনি নামায শিক্ষা দিয়েছিলেন। কুরআ'ন মজিদ পড়তে শিখিয়েছিলেন।

মেয়েটা তার বড়ই লক্ষী ছিল। মুক্তিতে যোগ দেবার পর একদিন রাতে গোপনে হেলালুর রহমান কিছু সঙ্গী সাথী নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। তিন রাত ছিলেন। সে সময় তিনি তার এক প্রিয় ছাত্রের সাথে তার ১৪ বছরের একমাত্র কন্যার বিবাহ দেন। তার আদরের মেয়ে টিয়া মাত্র তিনদিন সংসার করেছিল।

হেলালুর রহমান রা যে তিন দিন ছিলেন, শুধুই কি সব আলাপ আলোচনা করেছেন,তারপর বড় একটা অপারেশনে চলে যান। সেই অপারেশনে সফল হয়েছিল হেলালুর রহমানের দল। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ তার একমাত্র মেয়ে জামাই সহ দুই তিনজন মিলিটারীদের হাতে ধরা পড়ে। অত্যাচারে তাদের মৃত্যু হয়। এর দুদিন পরেই কোথা থেকে ট্রাকে ট্রাকে মিলিটারী এসে তাদের সমস্ত গ্রাম পুড়িয়ে দেয়।

পুড়িয়ে দেয় তার বাড়িঘরও। আর তুলে নিয়ে যায় তার একমাত্র কন্যাকে। এদিকে যুদ্ধ শেষ হয়। একদিন হেলালুর রহমানও ফিরে আসেন। টিয়ার কোন খবর পাওয়া যায় না।

তারপর তারা তাদের ভাঙ্গা বাড়িঘর কিছুটা মেরামত করে সেই গ্রামেই থেকে যান। মেয়ের জন্য নয়, এম্নিতেই। কারণ ততদিনে তারা তাদের মেয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। হঠাৎ একদিন রাতে ঢাকা শহর থেকে দু তিনজন মহিলা আসেন হেলালুর রহমানের কাছে, তাদের সাথে বোরখা পরা একজনও ছিল। মেয়েটা অনেক অসুস্থ।

হেলালুর রহমান প্রথমে বুঝতে পারেননি। বোরখা পরা মেয়েটিকে ঘরে পাঠিয়ে অন্যদের সাথে তিনি বাহির ঘরে আলাপে বসেন। কথা শেষ না হতেই, হঠাৎ জেবুন্নেসার আর্তচিৎকারে তিনি অন্দরে যান। দেখেন, জেবুন্নেসা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন। আর তার সামনে স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে আছে তার আদরের একমাত্র কন্যা।

সাতমাসের অন্তঃসত্বা। চোখে মুখে সারা শরীরে অসংখ্য অত্যাচারের চিহ্ন। তার আদরের টিয়া। পুতুলের মত মেয়েটার এই দশা দেখে তিনি ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। মেয়েটাকে তিনি মাত্র দুদিন রেখেছিলেন।

এই দুদিন তিনি তার সঙ্গে একটা কথাও বলেননি। তারপর তাকে আবার ঢাকায় আগের ঠিকানায় দিয়ে এসেছেন। তিনি তার চোখের সামনে এই মেয়েকে রাখার সাহস করেননি। কিন্তু তিনি নিয়ম করে মেয়েকে দেখতে যেতেন। জেবুন্নেসাও গিয়েছিলেন দুবার।

মেয়ে দেখা করেছে মা'র সাথে কিন্তু কোনদিন তার বাবার সামনে আসেনি। মেয়েটার জেদ ছিল বাপের মতই। জেবুন্নেসা আবার চোখ মোছেন। জেবুন্নেসা যতক্ষণ মেয়েটাকে ছুঁয়ে থাকতেন, মেয়েটা শুধু চোখের পানি ফেলতো। কথা বলতো খুবই কম।

জেবুন্নেসাও সাহস পাননি, মেয়েকে জিজ্ঞাসা করতে- ওরা তাকে কি করেছিল? এই টুকু মেয়ের উপর কি ভাবে অত্যাচার করেছিল? তিনি কিছুতেই ভাবতে পারতেন না। টিয়াকে দেখে আসার পর তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকতেন। তাই হেলালুর রহমান আর তাকে কখনও নেননি। জেবুন্নেসা শুনেছিলেন, টিয়ার একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়েটার জন্ম দেবার সময় টিয়া তাদের মুক্তি দিয়ে চলে গেছে।

হেলালুর রহমান টিয়ার মেয়েটাকেও বার কয়েক দেখে এসেছেন। তবে স্পর্শ করেননি। এটা কত বড় একটা সংকট হেলালুর রহমান কাউকে বলে বোঝাতে পারেননি। তিনি সারাজীবন নামাজ রোজা করেছেন, আল্লাহকে ডেকেছেন। প্রতি ভোরে ফজরের ওয়াক্তে সুরা রাহমান আর ইয়াসীন তিলওয়াত করে, তবেই প্রাত্যহিক কাজ শুরু করেছেন।

তবুও এক মুসলমান আরেক মুসলমানের এত বড় ক্ষতি কিভাবে করেছে- তিনি হিসাব মেলাতে পারেননি। যুদ্ধের পরে ফেরৎ এসে তিনি শিক্ষকতা থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি কখনও মসজিদে নামাজ পড়তে যাননি। যাননি কোন বিয়ে বাড়িতে। সামাজিক অনুষ্ঠানে।

কোন সন্তানও নেননি। শুধু দীর্ঘক্ষণ জায়নামাজে বসে ফরিয়াদ করেছেন, "আল্লাহ তুমি এর বিচার করো। " তিনি এখনও সুবিচার পাননি। তার অপরাধ তিনি দেশ বাঁচাতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তার অপরাধ তিনি অন্যায়কে মেনে নেননি।

কেউ তার কথা শোনবার নেই, কেউ তার পক্ষে কিছু বলবার নেই। তিনি এতটাকাল শুধু চুপচাপ চেয়ে দেখছেন-কেমন করে সব পাল্টে গেছে। সব সব সব। তাকে কেউ বলেনি, যুদ্ধ যাও। তিনি গিয়েছিলেন, প্রাণের তাগিদে।

প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে। আর আজকাল এত বড় একটা যুদ্ধে কি কি ঘটেছিল, কি নৃসংশতা! কি বর্বরতা সেটা অনেকে বিশ্বাসই করতে চায় না। প্রকাশ্যে ঘুর বেড়ায় সেই সব শয়তানের দোসররা। যারা মিলিটারীকে মদদ দিয়েছিল। টিয়াকে যে ধরিয়ে দিয়েছিল, সে এখন এই গ্রামের চেয়ারম্যান।

প্রতি রাতে তিনি কাঁদেন। কাঁদেন জেবুন্নেসা। কেউ তাদের কান্না শোনেনা। আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায়, হেলালুর রহমানের কাছে টিয়ার কোন ছবি নেই। আর ছবি তিনি কখনও তোলেনওনি।

টিয়ার মুখটাও আজকাল তার কাছে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। টিয়ার মুখ তিনি যতবারই মনে করতে গেছেন,ঠিক ততবারই তিনি দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। দেখেছেন, টিয়া তাকে থুতু দিচ্ছে আর বলছে, "বাপজান আমারে আপনি বাঁচাতে পারেননি। ঐ শয়তানগুলারে আপনি কিছু বলেননি। ওরা এখনও ঘুরে বেড়ায়।

আমি আপনারে ক্ষমা করবো না বাপজান। " টিয়ার ঘৃণা নিয়ে তারা দিন কাটিয়ে দিচ্ছিলেন দুই অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। এরকম চলতে চলতে জীবন সায়াহ্নে এসে তারা দুজন একটা সুযোগ পেয়েছেন। টিয়ার মেয়েটাকে যে পরিবার মানুষ করেছে, সেই বিদেশীদের খুব ইচ্ছা, টিয়ার মেয়েটার খুব ইচ্ছা--সে তার মাতামহ- মাতামহীকে দেখবে। টিয়ার মেয়েটা যুদ্ধশিশু।

তাকে তারা দেখবেন না ভেবেছিলেন, কিন্তু টিয়ার মেয়েটার পীড়াপীড়িতে এবং জেবুন্নেসার কান্নকাটিতে শেষ পর্যন্ত হেলালুর রহমান রাজী হয়েছেন। সব ব্যবস্থা টিয়ার মেয়েটাই করেছে। তিনি একবার চিঠি লিখেছিলেন, টিয়ার মেয়েকে এই দেশে আসতে, সে রাজী হয়নি। অগত্যা তারাই যাচ্ছেন। আসলে শুধু জেবুন্নেসাই নয়, তার ক্ষয়ে যাওয়া প্রায় অন্ধ দুচোখে তিনি শেষবারের মত যুদ্ধ শিশু মেয়েটার মুখে তার টিয়ার মুখটা দেখতে চান।

আহারে টিয়া! জেবুন্নেসা হাওয়াই জাহাজে বসে হঠাৎ টের পান, তিনি এতক্ষণ দোওয়া পড়েন নাই। তিনি বারবার টিয়ার নামই নিয়েছেন। জেবুন্নেসা ঘুমন্ত হেলালুর রহমানের একটা হাত শক্ত করে ধরে থাকেন। জেবুন্নেসার মাথাটা ঝিম ঝিম করতে থাকে। তিনি বুঝতে পারছেন, হাওয়াই জাহাজটা আবার আগুন ফেলতে ফেলতে তার বুকের শূন্যতার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে।

তার বুকের জমিন হয়ে গেছে শূন্য আকাশ।
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।