আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

উল্কির সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক, হে ভগবান। বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ, পুর্ন হউক, পূর্ন হউক, পূর্ন হ্‌উক, হে ভগবান। রবীন্দ্রনাথ
উল্কি। উল্কি হল অমোচনীয় কালি দিয়ে মানব শরীরে বিচিত্র বর্ণের অলঙ্করণ। মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাসে এই পদ্ধতিটি বহু পুরনো এবং প্রত্যেক জাতিই কমবেশি উল্কির ব্যবহার করে থাকে।

অলঙ্করণের জন্য না-হলেও পশুর শরীরে উল্কি আঁকে না এমন কোনও জাত নেই। উল্কির ইংরেজি Tattoo; শব্দটি উদ্ভুত হয়েছে পলিনেশিয় (প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ) শব্দ tatau থেকে; কোথাও কোথাও এটি নিষিদ্ধ হলেও আজও এর জনপ্রিয়তা উর্ধ্বমূখিই বলা যায় ... মানুষ বরাবরই তার দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে ছিল সচেতন। আর একারণেই তার পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার-প্রসাধন নিয়ে সচেতনার শেষ নেই। কালক্রমে উল্কি মানুষের সৌন্দর্য চর্চার অঙ্গ হয়ে ওঠে। যদিও উল্কি কেবলই সৌন্দর্য চর্চা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু।

সৌন্দর্য চর্চার অঙ্গ হিসেবে উল্কি বিচিত্র ধরনের অলঙ্করণ, বিচিত্র হলেও এটি গ্রহনীয় ও জনপ্রিয় । মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ত্বক চ্ছেদ করে বর্ণিল নকশা আঁকার বিষয়টি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। মানুষ শরীরে উল্কি আঁকে কেন? উল্কি আঁকার পিছনে কতগুলি কারণ বিবেচনা করা যায় । প্রথমত, আগেই আমি বলেছি যে, অলঙ্করণ-তবে এর সঙ্গে আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যও রয়েছে, এবং এটিই মনে হয় অন্যতম একটি কারণ, কেননা, সব উল্কিই যে দেখতে সুন্দর - তা কিন্তু নয়। শরীরে তাবিজ-কবজ বেঁধে মানুষ স্বস্তি পায়, অস্বীকার করার উপায় নেই যে- পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আজও একুশ শতকে ‘ইভিল স্পিরিটে’ বিশ্বাস করে! কাজেই শরীরে তাবিজের নকশা অনুযায়ী উল্কি এঁকে নিলে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেল আবার সৌন্দর্যের চর্চাও হল।

তাছাড়া শরীরে উল্কি আঁকা ট্রাইবাল সমাজে সামাজিক পদমর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হত । এ ছাড়া কখনও প্রেমের নিদর্শন, কখনও শাস্তির চিহ্ন কখনও শোক, কখনও আবার উৎসর্গের চিহ্ন হিসেবেও উল্কি আঁকা হয়। উল্কি আঁকার রীতি মানবসমাজে কত পুরনো? এই প্রশ্নটি উঠতেই পারে। একটা সময় ছিল যখন মানবসমাজের প্রাচীন উল্কির নিদর্শন হিসেবে আজ থেকে ৪,০০০ বছরের পুরনো প্রাচীন মিশরের মমির উল্কির কথা বলা হত। তবে গত শতকের নব্বুয়ের দশকের শুরুতে জানা গেছে যে মানবদেহে উল্কি আঁকার রীতি আরও বহু বছরের পুরনো।

আল্পস পবর্তমালায় ওটৎ উপত্যকায় পাওয়া ৫,২০০ বছরের পুরনো নবপোলীয় যুগের ‘ওটৎ দি আইসম্যানে’-র যে ফসিলটি পাওয়া গেছে তার শরীরেও উল্কি আঁকা ছিল। ওটৎ দি আইসম্যান। এর মেরুদন্ডের নিচে, বাঁ হাঁটুর নিচে এবং ডান গোড়ালিতে ৫৭টি উল্কির চিহ্ন ছিল। উল্কিগুলি ছিল বিন্দু রেখার সমন্বয়ে তৈরি। প্রাচীন মিশরে উল্কির কথা উল্লেখ করেছি।

প্রাচীন মিশরীয় সমাজে মেয়েরা শরীরে উল্কি আঁকত। ৪০০০ থেকে ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বের মূর্তি থেকে এ তথ্য জানা যায়। ১৩০০ খ্রিস্টপূর্ব প্রাপ্ত এক নারীমূর্তির উরুতে উল্কি করা ছিল। বয়স্ক নারীরা উল্কি আঁকায় ছিল দক্ষ, তারাই কমবয়েসিদের শরীরের নানা স্থানে উল্কি আঁকত। প্রাচীন পারস্যের সমাজে উল্কি আঁকার চল ছিল।

গ্রিকরা পারস্যেরদের এই রীতিটি গ্রহন করেছিল- বিশেষ করে মেয়েরা; গ্রিক মেয়েরা নাকি উল্কির নকশায় পরম সৌন্দর্য আবিস্কার করেছিল। গ্রিকরা দাসদের শরীরে চিহ্ন বসাতে উল্কি আঁকত। গুপ্তচরেরা উল্কি ব্যবহার করত। খ্রিষ্টের জন্মের ২০০ বছর আগে গ্রিস রোমানদের অধিকারে গেল। রোমানরাও সৌন্দর্য চর্চায় গ্রিকদের কাছ থেকে উল্কি আঁকার রীতিটি গ্রহন করেছিল।

তবে অনেক দাস ও অপরাধীরও শরীরে উল্কি আঁকা হত। একালেও বন্দির শরীরে উল্কি আঁকা হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নাৎসী কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে এক বন্দির হাতে আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার । খ্রিস্টপূর্ব সময়ের জার্মানিক ও কেল্টিক জাতি উল্কির ব্যবহার করত । মধ্য ও উত্তর ইউরোপীয় ট্রাইবও উল্কির ব্যবহার করত ।

ট্রাইবাল কেল্টরা ১২০০ থেকে ৭০০ খ্রিস্টপূর্বর মধ্যবর্তী সময়কালে পশ্চিম ইউরোপে অভিপ্রয়ান করে। ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বে তারা ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছায়। ওদের সংস্কৃতির ওপরই গড়ে উঠেছে বর্তমান কালের আয়ারল্যান্ড, ওয়েলশ ও স্কটল্যান্ডের সংস্কৃতি। জনৈক ঐতিহাসিক এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “কেল্টিক কালচার ওয়াজ ফুল অভ বডি আর্ট। ” কেল্টিক বডি আর্ট ১৯৪৮ সালে রাশিয়া ও চিন সীমান্তের ১২০ মাইল উত্তরে রুশ প্রতœবিদদের খননকার্যের ফলে ২৪০০ বছর আগেকার মমিতে উল্কি চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে।

তারা শকদের সমাধিসৌধ (কুরগান) খনন করছিল। মৃত শকদের শরীরে পশুর ছবি আঁকা ছিল। উল্কি আঁকার উদ্দেশ্য ছিল মিশ্র। আধ্যাত্মিক ও অলঙ্করণ। শক গোত্রপ্রধানের শরীরে উল্কি চিন জাপান কোরিয়াতেও প্রাচীনকাল থেকেই উল্কির ব্যবহার ছিল।

জাপানি শব্দ irezumi অর্থ হল: কালির প্রবেশ বা ঢোকানো। তবে আজকের পশ্চিমা বিশ্বের যে উল্কির চল, তা মূলত এসেছে পলিনেশিয় সংস্কৃতি থেকে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের আদি অধিবাসী মাওরিদের কাছ থেকে। মাওরি গোত্রপ্রধান। উল্কি বা টাটু মাওরিসংস্কৃতির অন্যতম ভিজুয়াল বৈশিষ্ট্য।

মুখভরা টাট্টুকে বলা হয় মোকো। মেয়েরা অবশ্য মোকো করতে পারে না। তাদের অনুমতি নাক থুতনি আর ওপরের ঠোঁট অবধি। অষ্টাদশ শতকের নৌ অভিযাত্রীরা পলিনেশিয় সংস্কৃতি আবিস্কার করে। পলিনেশিয় সংস্কৃতির অন্যতম দিক উল্কি-তা অভিনব বৈশিষ্ট্যের কারণে রাতারাতি ইউরোপীয় নাবিকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

একটি সূত্র অনুযায়ী: পলেনিশিয় শব্দ tatao থেকেই ইংরেজি Tattoo শব্দের উদ্ভব- যার আক্ষরিক অর্থ হল টোকা বা বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন। ক্যাপ্টেন জেমস কুক ১৭৬৯ সালে শব্দটি প্রথম চয়ন করেন। আধুনিক উল্কি আঁকার যন্ত্রপাতি। আজকাল উল্কি আঁকা সহজ হলেও আগে পদ্ধতিটি ছিল নিষ্ঠুর ও যন্ত্রণাদায়ক । ধারালো তীক্ষ্ম চিরুনিতে কার্বনের গুঁড়ো মেখে আঁক কাটতে হত।

মেহেদি। বাঙালির সমাজে মেয়েদের (কোনও কোনও ক্ষেত্রে ছেলেদেরও) মেহেদি রাঙানো কি উল্কির পর্যায়ে পড়ে। শরীরের কোনওরুপ পরিবর্তন ইসলামে নিষিদ্ধ। কাজেই উল্কিও -তবে শিয়া ইসলামে নাকি উল্কির ব্যবহার করা যায়। বাঙালির সমাজে মেয়েদের (কোনও কোনও ক্ষেত্রে ছেলেদেরও) মেহেদি রাঙানো এক ধরনের উল্কির চর্চা বলেই মনে হয়।

কেননা, প্রথমেই বলেছি-কোথাও কোথাও এটি নিষিদ্ধ হলেও এর জনপ্রিয়তা বরাবরই উর্ধ্বমূখিই ছিল ...তবে বাঙালি মেয়েদের মেহেদি রাঙানোর বিষয়টি উল্কি হলে এর সৌন্দর্য যে উল্কি-জগতে বড়ই মনোরম এবং ব্যাতিক্রমী সে ব্যাপরে সন্দেহ কী। আধুনি ভারতীয় নারীর হাতে মেহেদি-উল্কি উল্কির সুঁই কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্ন উঠেছে। সুঁই বলেই হেপাটাইটিসের ঝুঁকি থাকে। যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও নিষিদ্ধ কোথাও বা ১৮ বছরের কম বয়েসে এর প্রয়োগ নিষিদ্ধ। এখন শরীরে ছুঁচ ঢোকানোর পরিবর্তে আঠালো ষ্টিকার পাওয়া যায়।

যা সহজে খুলে ফেলা যায়। যুগটা বিজ্ঞানের বলেই কোথাও কোথাও লেজার রশ্মিও ব্যবহৃত হচ্ছে। তথ্য ও ছবি: উইকিপিডিয়াসহ ইন্টারনেটে প্রাপ্ত নানা ওয়েভসাইট মাইক্রোসফট এনকার্টা
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.