আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

‌'ভালবাসাঃ শুধুই রসায়ন?' - সাপ্তাহিক ২০০০

ভুল করেও যদি মনে পড়ে...ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতি.. ঘুমহারা রাতে..নীরবে তুমি কেঁদে নিও কিছুক্ষণ...একদিন মুছে যাবে সব আয়োজন...

সাপ্তাহিক ২০০০, ভালবাসা দিবস সংখ্যা, ২০১০ এ প্রকাশিত ফিচারের অ- (পরি/সং)শোধিত ও অ-(পরি)মার্জিত সংস্করণ..... ওর মুখোমুখি হলেই আমার জগৎটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। খুব দূর থেকে যদি ওর ছায়াটাও চোখে পড়ে, বুকের ভেতরটায় কেমন যেন অদ্ভূত এক আবেশ ছড়ায়। কখনো শূন্যতা জাগে, কখনো মনে হয় যেন বেড়াল খামচে ধরেছে ভেতরটা, ধড়ফড় করে বুক- আমি নিজ কানেই শুনতে পাই সেই ধুকপুকানি। পেটের ভেতরের প্রত্যঙ্গগুলো যেন জীবন্ত হয়ে নড়তে শুরু করে। জিহ্বা শুকিয়ে আসে, গলার ভেতরটায় হাজার বছরের না-মেটা তৃষ্ণা।

হাত-পা ঝিম ঝিম করে, হঠাৎ করে যেন শক্তিহীন শরীরটা। তবু ভাল লাগে সেই অনুভব। কাছে থাকে না যখন, ওর চিন্তাই ঘিরে থাকে মন। অন্য কিছুই ভাবতে পারি না। ভাবতে চাই, দৈনন্দিন কাজগুলোয় মনোযোগ দিতে চাই- কিন্তু কোত্থেকে যেন ওর ভাবনাটাই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে মগজের কোষে কোষে।

ঘুম-কাতুরে এই আমার ঘুম যেন কোথায় হারিয়ে যায়। ওর সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা বলে কাটে বিনিদ্র রজনী - কিন্তু ক্লান্তি জাগে না তারপরও। কি হয়েছে আমার? প্রেমে পড়েছি? গভীর ভালবাসায় জড়িয়েছি? জগতের তাবৎ রোমান্টিক মানুষ, কবি-সাহিত্যিকরা তা-ই বলবেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দিচ্ছেন অন্য উত্তর। নন-রোমান্টিক বিজ্ঞানীদের কাছে এই অনুভব, এই উত্তেজনা, দেহের-মনের এই বিস্ময়কর নতুন আলোড়ন শুধুই কিছু রাসায়নিক পদার্থের বিক্রিয়া মাত্র! এবং এই অনুভূতি বুকের বাঁ পাশের এই হৃৎপিন্ড থেকে উৎসারিত নয়, বরং তা কেবলই মস্তিষ্ক-জাত! ভাবনায় বা বাস্তবে ‘ও’র উপস্থিতি আমার মস্তিষ্কের ভেতর কিছু রাসায়নিকের পরিমাণের তারতম্য ঘটায়, তাদের কর্মতৎপরতা বাড়ে-কমে।

তার ফলাফল এই অনুভূতি। নিউজার্সির রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী হেলেন ফিশার বলেন - ভালবাসা আসলে কোন আবেগ নয়, বরং ক্ষুধা-তৃষ্ণার মতো এক ধরণের প্রবৃত্তি বা তাড়না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন মানুষ অপর কারো প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, তখন তার মস্তিষ্ক ক্রমাগত এবং প্রচুর পরিমাণে কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করতে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ডোপামিন, নরএপিনেফ্রিন, ফিনাইলইথাইলঅ্যামাইন (পিইএ) ইত্যাদি। ভালবাসার প্রথম ধাপ ইনফ্যাচুয়েশন বা মোহগ্রস্ততার জন্য দায়ী করা হয় মূলত এই তিনটি রাসায়নিককে।

নরএপিনেফ্রিন, যার অপর নাম নরঅ্যাড্রিনালিন, থেকে তৈরী হয় অ্যাড্রিনালিন - যার অধিক উপস্থিতির কারণে হৃৎপিন্ডের কাজের গতি বাড়ে, হাত-পা ঘেমে ওঠে। নরএপিনেফ্রিনের উচ্চ মাত্রা সুখের অনুভূতিও বাড়ায়, অন্যদিকে খাওয়ার রুচি কমে যায়। আমাদের মস্তিষ্কে যেখানে মোট স্নায়ুকোষ ১০০ বিলিয়নেরও বেশী, সেখানে নরঅ্যাড্রিনালিনের সাথে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুকোষ প্রায় ৩০০০ মাত্র। তবুও যখন নরঅ্যাড্রিনালিন নিঃসরণ শুরু হয়, মস্তিষ্কসহ সারা দেহে ব্যাপক প্রভাব পড়ে এর। ডোপামিনের উপস্থিতি আনন্দের অনুভূতি জাগায়।

নিউইয়র্কের অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজের নিউরোলজি ও নিউরোসায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ লুসি ব্রাউন প্রেমে পড়া ছাত্রছাত্রীদের উপর এক গবেষণা চালান। তিনি প্রেমিক-প্রেমিকাদের সামনে তাদের ভালবাসার মানুষটির ছবি রাখেন। এবং এ অবস্থায় তাদের মস্তিষ্কের এমআরআই করেন, সহজে বলতে গেলে, ছবি তোলেন। দেখা যায়, এ সময় তাদের মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এবং কডেট অংশ উজ্জীবিত হয়, যেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটে। নন-রোমান্টিক অন্যান্য কারণেও ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়তে পারে।

ভাল কোন খাবার খেলে বা অসাধারণ কোন বই পড়লে আমাদের মনে যে তৃপ্তি জাগে, তা কিন্তু এ সময় ডোপামিনের অধিক নিঃসরণের ফলেই ঘটে। এছাড়া ডোপামিন মানুষকে উত্তেজিত ও ‘বাচাল’ করে তোলে, যার ফলাফল রাত জেগে ঘন্টার পর ঘন্টা বিরামহীন কথা বলে যাওয়া - নিজের ক্যাশ খসিয়ে মোবাইল কোম্পানীগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সমৃদ্ধ করা। এই ডোপামিন থেকেই তৈরী হয় নরএপিনেফ্রিন। সুতরাং ডোপামিন বেশী নিঃসরণ না হলে অ্যাড্রিনালিনও বাড়বে না, কারো উপস্থিতিতে বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডটাও লাফাবে না, ঘেমে উঠবে না হাতের তালু - অর্থাৎ ভালবাসা জাগবে না। ডোপামিন তৈরী হতে দরকার ‘টাইরোসিন’ নামের এক ধরণের অ্যামাইনো অ্যাসিড।

এই অ্যামাইনো অ্যাসিড আসে আবার খাদ্যের প্রোটিনের পরিপাকের মাধ্যমে - বিশেষত মাংস, ডিমের কুসুম প্রভৃতির খাদ্য উপাদান থেকে। তাহলে কি দাঁড়ালো? প্রেমে পড়তে চাইলে ‘পিওর ভেজিটারিয়ান’ হওয়া চলবে না? বিজ্ঞানীরা কি তা-ই বলতে চান? ফিনাইলইথাইলঅ্যামাইন বা পিইএ নরএপিনেফ্রিন এবং ডোপামিন উভয়েরই নিঃস রণে সহায়তা করে। রোমান্টিক ভালবাসার সেই ঝিম ঝিম করা, অপার্থিব জগতে ভেসে বেড়ানোর সুখানুভূতি পিইএ-এর অবদান। এক বিজ্ঞানী রসিকতা করে বলেছিলেন, কিউপিডের তীরের কোন কার্যকারিতা নেই, যদি না তীরের মাথায় কিছুটা পিইএ মাখানো থাকে। এই পিইএ থাকে চকলেটেও।

তাই কি প্রেমিক - প্রেমিকাদের কাছে পরস্পরকে উপহার দেয়ার জন্য চকলেট এত প্রিয়? ভালবাসার মানুষটির স্পর্শ বা একটুখানি চোখের দেখা, এমনকি ভাবনায় তার উপস্থিতিই নিঃসরণ ঘটাতে পারে এইসব রাসায়নিকের। কিন্তু ভালবাসার মানুষটি কে হবে, তার কোন নির্দিষ্ট ফর্মূলা কি আছে? হয়তো আমি আগে থেকে ভেবে রাখছি, অমুকের মতো সুন্দরী, তমুকের মতো লম্বা, মেধাবী, একই ধর্মের, একই সামাজিক পরিবেশ-জাত কাউকে ভালবাসবো। আদতে দেখা যাচ্ছে, সেইসব বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীত কারো প্রেমেই আত্মহারা আমি। সেই ভালবাসার তোড়ে ভুলে যাচ্ছি সামাজিক বিধি-নিষেধ, পারিবারিক বন্ধন, নৈতিকতা - সবকিছু। এইখানে বিজ্ঞানীদের বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের বাড়ন্ত সময়ের, শৈশব-কৈশোরের অপ্রাপ্তি-অপূর্ণতাকে যার মাঝে সম্পূর্ণতার আবরণে দেখতে পায় আমাদের অবচেতন, তার উপস্থিতিই এইসব রাসায়নিকের নিঃসরণ বাড়ায়, আমরা তাকেই ‘ভালবাসি’ বলে অনুভব করি।

এই অপ্রাপ্তি হতে পারে নিরাপত্তা, শ্রদ্ধা, আদর অথবা শুধুই অ্যাডভেঞ্চার। অবচেতনের অ্যাডভেঞ্চারের অতৃপ্ত আকাঙ্খাই অনেক সময় রক্ষণশীল, ভদ্র পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেয়েদের উড়নচন্ডী, ‘রাফ এন্ড টাফ’ ছেলেদের প্রেমে পড়তে বাধ্য করে। ভালবাসার এই তীব্রতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যৌনতা। বিজ্ঞানীরা বলেন, যৌন আকাঙ্খা বা মিলনের পেছনেও রয়েছে রাসায়নিকের খেলা। টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন, ডোপামিন বেড়ে যায় কামজ উদ্দীপনার সময়।

এছাড়াও এতে ভূমিকা আছে প্রোল্যাক্টিন, অক্সিটোসিনেরও। অক্সিটোসিনকে বলা হয় সংলগ্নতার হরমোন। এই রাসায়নিকের আধিক্যের কারণে আমরা শারীরিক নৈকট্যের তাগিদ অনুভব করি। এটি ভালবাসার একটি দিক মাত্র। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই সব রাসায়নিকের তৎপরতা চিরস্থায়ী নয়।

সময়ের সাথে সাথে এদের কার্যকারিতা হারায়। একই ব্যক্তির উপস্থিতি আর সেই পরিমাণ ডোপামিন, নরএপিনেফ্রিন বা পিইএ-এর নিঃসরণ ঘটায় না - ভাটা পড়ে ভালবাসার তীব্রতায়। ব্যক্তিভেদে এইসব রাসায়নিকের ক্রিয়াকালও ভিন্ন হয়। কেউ বলেন - ছয় মাস থেকে তিন বছর, আবার কেউ বলেন দেড় থেকে চার বছর থাকে এদের কার্যকারিতা। এরপর - ভালবাসা মরে যায়! ‘সেক্সি অরিজিন এন্ড ইনটিমেট থিংস’ বইয়ে লেখক চার্লস পানাটি বলেছেন, বিয়ের চতুর্থ বছরের মাথায় বিচ্ছেদের হার সর্বোচ্চ।

এই নির্দিষ্ট সময়ের পর অন্য কারো উপস্থিতি হয়তো আবার নতুন করে উজ্জীবিত করে রাসায়নিকের নিঃসরণের- মানুষ জড়ায় নতুন সম্পর্কে। অনেকের ক্ষেত্রে পুরো জীবনে বেশ কয়েকবার এই তিন-চার বছরের চক্রটির আবির্ভাব ঘটে। এই রাসায়নিক থিওরী অনুযায়ী, মানুষ একগামী নয়। প্রাণীজগতের যে মাত্র ৩% প্রজাতি একগামী, সামগ্রিকভাবে মনুষ্যপ্রজাতি তার মাঝে পড়ে না। একগামী প্রজাতির মস্তিষ্কে ‘ভেসোপ্রেসিন’ নামের আরেক ধরণের রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি থাকে প্রচুর পরিমাণে।

এই ভেসোপ্রেসিনকে বলা হয় একগামীতার রাসায়নিক। কিন্তু রাসায়নিক থিওরী অনুযায়ী বহুগামী মানুষের মাঝে অনেকেই আজীবন বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে। বিজ্ঞানীরা এর পেছনেও অন্য রাসায়নিকের প্রভাব দেখতে পান। মোহ বা ভালবাসার তীব্র আবেগের পর্যায়ের পর বন্ধনকে ধরে রাখে যেসব রাসায়নিক - তার একটি হচ্ছে এন্ডরফিন। এন্ডরফিনের নিঃসরণে সম্পর্ক সুস্থিত হয়; পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, নির্ভরশীলতা, উষ্ণতা, অন্তরঙ্গতা, সহযোগিতা বাড়ে।

এই রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণেই মানুষ এক ছাদের নিচে পাশাপাশি থেকে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে সচ্ছন্দে। এর কারণেই দীর্ঘদিনের সঙ্গীর অনুপস্থিতি বা মৃত্যু আমাদের হৃদয়ে বেদনা জাগায়। এছাড়াও অক্সিটোসিন, সেরোটোনিন ও ভেসোপ্রেসিন হরমোনের আধিক্যও সম্পর্কের স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করে। তাহলে কি দাঁড়ালো? সব দোষ (বা গুণ) রাসায়নিকের? ভালবাসা তাহলে শুধুই রসায়ন? বিজ্ঞানীরা তেমনটাই বলেন। সেই সূত্র ধরেই উঠে আসে ভালবাসা জাগানোর অব্যর্থ কোন ওষুধ আবিষ্কারের ভাবনার।

যে ওষুধ খেলেই বেড়ে যাবে এইসব রাসায়নিকের নিঃসরণ। ওষুধটি খেয়ে যার দিকে প্রথম তাকাবেন, তারই প্রেমে পড়ে যাবেন আপনি। অথবা ঘটাতে পারেন উল্টোটাও। ভাবুন তো একবার, ব্যাপারটা কেমন হবে? (সাপ্তাহিক ২০০০, বর্ষ ১২, সংখ্যা ৪০)

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ২০ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।