আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ভয়ঙ্কর ধর্ষক খুনি রসু খাঁ



চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি সমকাল ডেস্ক ১৮৮৮ সালের শেষদিককার ঘটনা। লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল ও সংলগ্ন এলাকায় একের পর এক খুন হচ্ছিলেন নারীরা। খুন হচ্ছিলেন মূলত সেসব নারী যারা পেশায় দেহজীবী। খুনি চিরে রেখে যাচ্ছিল তার শিকারদের গলা। লক্ষণ দেখে পুলিশও মেনে নিল খুনগুলো সব একই লোকের কাজ।

কিন্তু তাকে ধরা গেল না। জানা গেল না তার পরিচয়ও। শুধু লন্ডন সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিতে নিজেকে সিরিয়াল খুনি হিসেবে দাবি করে একটি চিঠি এলো যাতে খুনির নাম বলা হলো জ্যাক দ্য রিপার। সেই থেকে ইতিহাসে অবিস্মরণীয় সেই সিরিয়াল কিলার। জ্যাক দ্য রিপারের পর পৃথিবীতে আরও অন্তত শ'খানেক সিরিয়াল কিলারের পদচারণা দেখা গেছে।

সব সিরিয়াল কিলার অবশ্য জ্যাকের মতো পার পেয়ে যায়নি। এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৪৪টি দেশে শাস্তি পেয়েছে সিরিয়াল কিলাররা। এবার বাংলাদেশে ধরা পড়েছে এক ভয়ঙ্কর ধর্ষক খুনি, যে কি-না আসলে এক সিরিয়াল কিলার। তার নাম রসু খাঁ। তাকে শাস্তি দিয়ে বাংলাদেশ কি সেই শাস্তিদাতা দেশের তালিকার ৪৫ নম্বর দেশ হতে পারবে? ২০০৭ সালের শুরুর দিক থেকে ২০০৯ সালের জুলাই মাস।

এ সময়ের মধ্যে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ছয়টি লাশ উদ্ধার করল পুলিশ। লাশগুলোর সবই থেকে যাচ্ছিল অজ্ঞাতনামা। শ্রেণী-পেশায় মিল না থাকলেও একটি জায়গায় মিল আছে_ সব লাশই নারীর। ধর্ষণের পর কে বা কারা তাদের খুন করে ফেলে রাখছে খালে-বিলে-নদীতে তার কোনো হদিস বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। পুলিশ যখন খুনের আলামত খুঁজে পেতে দিশেহারা, তখন নিরাপদে আরও খুন করে বেড়াচ্ছিল সেই খুনি! চাঁদপুর থেকে আমাদের প্রতিনিধি ইকবাল হোসেন পাটোয়ারি ও নাছির উদ্দিন পাঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ফরিদগঞ্জের ছয় খুনই নয়; রোমাঞ্চকর গল্পের চরিত্রের মতো ১১ নারীকে খুন করে এতদিন নিরাপদে পালিয়ে ছিল চাঁদপুরের নরপিশাচ রসু খাঁ।

এই যখন অবস্থা তখন সামান্য একটি ফ্যান চুরির মামলা পুলিশের সামনে খুলে দিলো হত্যারহস্য উন্মোচনের পথ! ফ্যান চুরির ঘটনায় রসুর মোবাইলের কলতালিকা পরীক্ষা করে তাকে গত ৭ অক্টোবর রাতে টঙ্গীর নিরাশপাড়া এলাকার বাসা থেকে গ্রেফতার করলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মীর কাসেম। গ্রেফতারের পর নরপিশাচকে দেখানো হলো গত দু'বছরে ফরিদগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা নারী লাশের ছবি। দেখে দেখে শনাক্ত করল নরপিশাচ, সঙ্গে জানাল খুনের কাহিনী। নরপিশাচের মুখ দিয়েই বেরিয়ে এলো তার ১১ খুনের স্বীকৃতি, ফরিদগঞ্জের ছয় খুনের বর্ণনা এবং তার ১০১ নারীকে খুনের শপথের কথা। এ নরপিশাচের ১১ খুনের মামলার নথি নিয়ে শিগগিরই বসবেন চাঁদপুরের পুলিশ সুপার।

নথিগুলো তিনি দেখতে চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। পিশাচজীবনের কথা নানা কৌশলে মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তাদের নিয়ে অভিসারে যাওয়ার কথা বলে একের পর এক হত্যা করে সে। শুধু খুনেই অবশ্য নরপিশাচের প্রতিহিংসার সমাপ্তি ঘটেনি। খুনের আগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যের শিকার ওই নারীদের ধর্ষণও করে সে। এসব অপকর্মে সঙ্গী ছিল তার ভাগ্নে জহিরুল।

এই জহিরুলকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রসু খাঁর পিশাচজীবনের শুরু ২০০৭ সালের প্রথম দিকে শ্যালক মান্নানের স্ত্রী রীনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। রীনার বাড়ি হাতিয়ায়। তাকে মিথ্যা কথা বলে ফরিদগঞ্জের ভাটিয়ালপুরে এনে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর সে একে একে আরও ১০টি খুন করে।

যাদের খুন করা হয় তাদের বয়স ১৭ থেকে ৩৫ বছরের ভেতর। হত্যার আগে শুধু পছন্দের নারীদের ধর্ষণ করত দাবি করে নরপিশাচ জানায়, সবাইকে সে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। চাঁদপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় গতকাল নরপিশাচ রসু জবানবন্দি দিয়েছে। এতে ফরিদগঞ্জে সংঘটিত সব খুনের বর্ণনা দেয় সে। সর্বশেষ গত ২০ জুলাই ফরিদগঞ্জের হাসা গ্রামের একটি খালপাড়ে রসু ও জহিরুল মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ শেষে খুন করে পারভীন বেগম নামের একজনকে।

এর আগে ২০০৭ সালে ফরিদগঞ্জের ভাটিয়ালপুরে শহীদা নামে আরেক নারীকে ধর্ষণ করে খুন করে রসু। একই বছর ফরিদগঞ্জের প্রত্যাশী এলাকায় বন্ধু মানিকের প্রেমিকা আঙ্কুর বেগম বন্ধুৃর সঙ্গে প্রতারণা করায় ফরিদগঞ্জে এনে তাকে খুন করে রসু। এ খুনে মানিক ও বসু নামে আরও দু'জন তাকে সহায়তা করে। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি টঙ্গীর বাড়িতে ভাড়া থাকার সময় ভাড়াটের ছোট ভাই শাহীনের সঙ্গে এক মেয়ে প্রতারণা করায় তাকেও ফরিদগঞ্জের হাসা গ্রামে এনে ধর্ষণের পর পানিতে ডুবিয়ে খুন করে রসু। ২০০৭ সালে এই গ্রামেই হোসনে আরা নামে একজন এবং সে বছরই বালিথুবায় বিআর খালে পলাশ নামে আরেক নারীকে নির্যাতন করে হত্যা করে সে।

২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফরিদগঞ্জের নানুপুর খাল পাড়ে এনে ধর্ষণ শেষে খুন করে ফরিদপুুরের সহিদা বেগমকে। একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ বালিয়া গ্রামে এনে খুন করে কুমিল্লার মেয়ে কহিনূরকে। চলতি বছরের ১৩ মার্চ উপজেলার দুর্গাদি গ্রামে এনে খুন করে রংপুরের মেয়ে মেহেদীকে। ৬ জানুয়ারি চাপিলা বিলে এনে খুন করে ফরিদপুরের মেয়ে সহিদাকে। যেভাবে আটক রসু যেসব খুনের কথা বলেছে, সেগুলোর সব ক্ষেত্রেই লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

কিন্তু এখনও তারা সবাই পুলিশের খাতায় অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। নরপিশাচ রসুকে গ্রেফতারের ফলে ওই নারীদের লাশগুলো অজ্ঞাত পরিচয়ের হাত থেকে মুক্তি পাবে বলে পুলিশ ধারণা করছে। জবানবন্দি দেওয়ার সময় উপস্থিত তদন্তকারী উপ-পরিদর্শক মীর আবুল কাশেম সমকালকে জানান, ফরিদগঞ্জের ৬ নারী খুনের মধ্যে দুটি মামলার একটি তদন্তাধীন এবং অন্য চারটি আলামত না পাওয়ায় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কিন্তু এ দুর্ধর্ষ খুনি যে খুনের বর্ণনা দিয়েছে এবং আলামত ও যে জায়গায় সে খুন করেছে সে জায়গাগুলোর সঙ্গে ওইসব খুনের মিল পাওয়া যাচ্ছে। তাই ওইসব খুনের মামলা আবারও পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফরিদগঞ্জ থানার ওসি রনজিত কুমার পালিত জানান, গত ৩ আগস্ট ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ স্থানীয় মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় রসুকে টঙ্গীর নিরাশপাড়া থেকে আটক করে। এরপর তার মোবাইলের সূত্র ধরে পুলিশের সন্দেহ হয়, সে স্থানীয় এক কিশোরী হত্যায় জড়িত থাকতে পারে। সে সময় রসু জামিনে মুক্ত ছিল। পরে ৭ অক্টোবর রাতে তাকে টঙ্গী থেকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে পারভিন আক্তারকে খুনের কথা স্বীকার করে।

তারপর তিন দিনের রিমান্ডে একে একে তার হাতে সংঘটিত খুনের কাহিনী বেরিয়ে আসতে থাকে। জানা গেছে, রসুর হাতে খুন হওয়া নারীদের লাশগুলো উদ্ধারের পর পুলিশ সেগুলোকে অজ্ঞাত বলে চিহ্নিত করলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে : ফরিদগঞ্জ থানায় ছয়টি, চাঁদপুর সদর থানায় চারটি এবং হাইমচর থানায় একটি। আরো নিউজ আরো নিউজ

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.