আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তলস্তয়ের স্মৃতি।। কাউন্ট ইলিয়া তলস্তয়। (প্রথম পর্ব)



( REMINISCENCES OF TOLSTOY) -বইটার নাম। লিখেছেন তলস্তয়ের ৩য় পুত্র কাউন্ট ইলিয়া তলস্তয়। আমাদের জগতে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখলে, বাবার নাম ধরে সম্ভবত কেউ লিখবেনা। আমরা হয়তো লিখব আমার বাবার স্মৃতি অথবা আমার দেখা বাবা ইত্যাদি। বইটা পড়ে ভাল লাগল।

তলস্তয়কে নিয়ে লেখা স্মৃতি কথা তলস্তয়ের সমস্ত লেখার চাইতেও বেশি। তবুও তার সন্তানের লেখা এই স্মৃতিকথা তলস্তয়কে বুঝতে সহায়ক বলে মনে হয়। নিজের ভাল লাগা ভাগাভাগি করার জন্য এই অনুবাদ। অনুবাদ যারা করেন তারা জানেন কতটুকু স্বাধীনতা অনুবাদকের দরকার। বইটা যদি কেউ পড়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে উপকৃত করবেন আশা করি।

) নিজের ছেলেমেয়েদের বর্ণনা দিয়ে আমার বাবা তার বিখ্যাত খালা আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা তলস্তয়াকে একবার পত্র লিখেছিলেন। ’ বড় ছেলে সের্গেই সুদর্শন, উজ্জল চুল তার। কিন্তু তার প্রকাশ ভঙ্গি দুর্বল রোগীদের মতো। খুবই ভদ্র। তার হাসি মোটেই আকর্ষণীয় নয়।

কিন্তু তার কান্না ভয়াবহ। সে যখন কাঁদে, আমার মতো কঠিন মানুষেরও কান্ন সংবরণ করতে কষ্ট হয়। সবাই বলে সে দেখতে নাকি আমার বড়ভাইয়ের মতো। সর্বনাশ। খোদা না করুক।

এটা না সত্যি হয়ে যায়। কেননা সে এতো ভাল ছিল! পৃথিবীতে চলার পক্ষে অযোগ্য বলা যায়। দাদার চারিত্রিক বৈশিষ্টর মধ্যে না ছিল আত্মম্ভরিতা না ছিল ব্যক্তিগত কোনো সুখের বাসনা। এই দুই ব্যপারে সে ছিল একেবারে আপোষহীন। সে অন্যর কথা ছাড়া নিজের জন্য কখনো ভাবেনি।

সে শুধো অন্যকে আঘাত করা থেকেই বিরত থাকতোনা। অধিকন্তু অন্যর খবর নিয়ে বেড়াত সারাক্ষণ। নিজের কষ্টের মধ্যে ডুবে থেকেও সে নিজেকে সুখী মনে করতো। ৩য় ইলিয়া। সে জীবনে কখনো অসুস্থ হয়নি।

সার্থক জন্ম কাকে বলে। একেবারে দুধে আলতা গায়ের রঙ। লেখাপড়ায় খারাপ। সে সবসময় কি যেন ভাবে, চিন্তা করে কথা কয় কম। সে নিজে নিজেই খেলে।

বদমেজাজী উগ্র ধরণের। সবসময় মারামারি করার তালে থাকে। আবার তার মনটা খুব অনুভূতিশীল ও নরম। প্রচুর খায় আর ভয়ানক ঘুমায়। তানিয়ার (তাতিয়ানা) বয়স আট বছর।

সবাই বলে সে সোনিয়ার (তলস্তয়ের স্ত্রী) মতো। তাদের কথা আমি মানি আর আমি জানি আসলেই সে দেখতে সোনিয়ার মতো। তানিয়া বাবা আদমের কন্যা হলে তিনি আর কোনো পোলাপাইনের জন্ম দিতেন না। যদিও সে তার দুখী বাল্যকাল অতিক্রম করেছে। তবে এটা আনন্দের বিষয় যে সে অন্য ছেলেমেয়েদের দেখভাল করে।

৪র্থ জন লেভ। হ্যন্ডসাম, দক্ষ স্মৃতিশক্তিময় প্রতিভাময় বালক। যে কোনো কাপড়ে তাকে মানায়। যে কোনো কাজ সে দ্রুত বুঝে নেয় আর দক্ষভাবে সম্পন্ন করতে পারে। যদিও সমস্ত বিষয় এখনো ভালভাবে বুঝতে পারেনা।

বয়স অল্প বলেই হয়তোবা। ৫ম মাশা (মেরি) দুই বছর বয়স। তার জন্মের সময় সোনিয়াকে বহুত কষ্ট পোহাতে হয়েছে। দুর্বল , অসুস্থ। সাদা গায়ের রঙ।

মাথায় কোকড়ানো সাদা চুল। অদ্ভুদ নীল চোখ। চোখদুটি অস্বাভাবিক রকমের গভীর ও ভীতিকর। খুবই স্পর্শকাতর কিন্তু বিশ্রী একটি শিশু। সে নিজেই নিজের কাছে মস্ত এক ধাধা।

বেচারি শরীর নিয়ে কষ্ট পাবে। তার চাহিদা প্রচুর কিন্তু এটা তার দূর্ভাগ্য যে কিছু পায়না। সে সবার সামান্যই মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। ৬ষ্ট জন পিটার। প্রকান্ড দৈত্য বিশেষ।

মুবক্যপ মাথায় উজ্জল শিশু। আমার স্ত্রী যখন তাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের মধ্যে তখন সে জগতের সবচাইতে সুখী মানুষ যেন। সে শারীরিক শক্তির জীবন্ত মজুদ। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনা। এই জন্য আমি তিন বছরের নীচের বাচ্চাদের যত্ন নিইনা।

তাদের আমি বুঝতে পারিনা। এই পত্র লেখা হয়েছিল ১৮৭২ সালে। আমার ছয় বছর বয়স থেকে আমি এ গুলো সংগ্রহ করি। সেই সময়ের কিছু স্মৃতি এখনো মনে করতে পারি। আমার এক্কেবারে শৈশব থেকে আমার পরিবার মস্কোতে ছিল।

সেটা ছিল ১৮৮১ সালের কথা। এরপর একটানা আমার জীবন কাটে ইয়াস্নায়া পলিয়ানায়। মা ছিল পরিবারের হরতাকরতা। সবকিছু ঠিকঠাক করার পেছনে সে ছিল কলকাটির নিয়ন্তা। সে বাবুরচি নিকোলাইয়ের কাছে রান্নাবান্নার খবর নিত আর রাতের খাবার দিতে বলত।

সে আমাদের বাইরে বেড়াতে পাঠাত, জামাকাপড় তৈরী করে দিত, মাকে দেখতাম সবসময় কোনো না কোনো বাচ্চাকে মাই দিচ্ছে। সারাদিন নিজেকে করমব্যস্ত রাখত। কেউ তার সাথে দুষ্টুমি করলে রেগে যেত, শাস্তি দিত। সব বিষয়ে সে সবার চাইতে ভাল বুঝতে পারত। সে সবসময় খোঁজ নিচ্ছে প্রত্যেকে প্রতিদিন গোসল করেছে কিনা, রাতের খাবারের সাথে সোপ খেয়েছে কিনা, ফেঞ্চ পড়েছে কিনা, পড়া ছেড়ে কেউ হামাগুড়ি খেলছে কিনা, টেবিলে বসে কেউ ঝিমুচ্ছে কিনা।

আর অদ্ভুদ, সে যখন বারণ করত বাইরে যেওনা, বৃষ্টি হবে আর সত্যি তখন তাই হতো। অবশ্য সবাই তার কথা মেনে চলতাম। বাবা জগতের সেরা বুদ্ধিমানদের একজন। সে সবসময় সত্যিকারের সবজান্তা। তার সাথে কেউ দুষ্টুমি করার সাহস পেতাম না।

যখন সে তার স্টাডিতে বসে লেখালেখি করত তখন গোলমাল করা বারণ ছিল। কারোরই তার ঘরে যাবার অনুমতি ছিলনা। সে কি কাজ করত আমরা কেউ জানতাম না। অনেক পরে যখন আমি পড়তে শিখি, সবাইকে বলতাম আমার বাবা একজন লেখক। পড়তে জানার পর একদিন কয়েকটা কবিতার লাইন পড়ে খুব মজা পাই।

মাকে জিজ্ঞেস করি এগুলো কে লিখেছে। সে বলেছিল এগুলো পুশকিনের কবিতা। পুশকিন ছিলেন মহান কবি। আমি কোনো বিষয় নিয়ে বাবার সাথে কথা বলতাম না। মা বলেছিল বাবাও একজন প্রসিদ্ধ লেখক।

বাস্তবিক খুব খুশি হয়েছিলাম। রাতের খাবার টেবিলে বাবা মার উল্টাদিকে বসত তার বিখ্যাত গোল রূপার চামচ হাতে। যখন বুড়ি নাতালিয়া পেত্রোভনা যে আমার খালা তাতিয়ানা আলেক্সান্দ্রাবনার সাথে নীচ ঘরে থাকতো, নিজের জন্য গ্লাসে তরল মিশিয়ে ক্যবেজ বানাতো। ক্যবেজের গ্লাসটা ডান হাতে নিয়ে বলতো- ওহো আমি দূ;খিত নাতালিয়া পেত্রভনা আমি একটা ভূল করেছি। আমরা সবাই হেসে উঠতাম।

আর অবাক করা ব্যপার বাবা নাতালিয়া পেত্রভনাকে একটুও ভয় করতো না। যখন পুডিং এর জন্য জেলি তৈরী হত বাবা বলতো পেপার বক্সের জন্য এটা আটা হিসাবে ভাল হবে। আমরা দৌড়ে গিয়ে কাগজ নিয়ে আসতাম বাবা বাকসো বানিয়ে দিত। মা রেগে যেত কিন্ত বাবা তাকেও ভয় পেতনা। তার সাথে কাটানো অনেক আনন্দদায়ক মুহুরত আছে।

যে কোনো ভাল ঘোড়দৌড়ের চাইতেও ভাল ঘোড়ায় চড়ত সে। তার চাইতে শক্তিশালী কোনো মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। বাবা কদাচিৎ আমাদের শাস্তি দিত। কিন্তু যখন সে আমার চোখের দিকে তাকাত আমার সমস্ত জারিজুরি ধরে ফেলত। তুমি বরং মাকে যতখুশি গপ্পো মারগে, বাবাকে মারতে যেওনা কারণ তোমার দিকে তাকালেই সে তোমার সবকিছু নিমেষেই বুঝে ফেলবে আমাদের ধারণাটা ছিল এ রকম।

সুতরাং কেউ সে পথ মাড়াতোনা। বাবা মায়ের পাশের ঘরে থাকতো খালা তাতায়ানা আলেক্সান্দ্রভনা। তার ঘরে ছিল একটা রূপার পাহাড়ের মুরতি। সেটাকে আমরা ভয় পেতাম কেননা সেটা ছিল অনেক পুরানো আর কালো। তখন আমার বয়স ছয় বছর মনে পড়ে বাবা ক্লাসের ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছে।

তারা আলাদা একটা বাড়ীতে পড়াশুনা করতো। সেখানে পরিচারক আলেক্সেই স্পানিচ থাকতো। মাঝে মাঝে সেই ঘরের নীচতলায় আমরাও গিয়ে থাকতাম। সেখানে গ্রামের অনেক ছেলেমেয়েরা আসতো। তারা আসলেই হলঘরের উঠোন ভেড়ার জ্যাকেটের গন্ধে ভরে যেত।

তাদেরকে বাবা, সেরেওজা, তানিয়া আর কস্তিয়া চাচা পড়াতো। পড়ার সময়টা চমতকার প্রাণবন্ত ছিল। ক্রমশ..........

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।