আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কমিউনিষ্ট চীনের পুঁজিতন্ত্র ও মেলামাইন



বন্ধু সুমন রহমান মেলামাইন নিয়ে আমার এক ব্লগ Click This Link পড়ে একটা মন্তব্য দিয়েছিলেন। ঐ মন্তব্যের অংশ বিশেষ ছিল এরকম: "- পত্রপত্রিকা পড়ে যতটুকু জানলাম, চীন শুধু মেলামাইনের উৎপাদনই বাড়ায় নি, মেলামাইনকে দুধে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিষয়টা উদ্বেগজনক, চীনের মুনাফা হোক সেটা চাওয়া যায়, কিন্তু মুনাফালিপ্সা পুঁজিবাদী দেশগুলোর চেয়ে বেড়ে যাবে এটা ভাবা যায় না"। এতে আমার প্রতিক্রিয়া থেকে নিচের লেখার সূত্রপাত। পড়ুন সেই প্রতিক্রিয়া: চীনের উপর এত আশা ভরসা রাখা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না।

বরং এসব অতীতে অবাস্তব আশা ভরসা রাখাই আমাদের অনেক দুঃখের কারণ। আর চীন যে পুঁজিতান্ত্রিক পথ গ্রহণ করেছে শুরু থেকেই তা পশ্চিমের পুঁজিতান্ত্রিক পথ থেকে ভিন্ন কিছু বলে কোন ধারণা আমরা পাইনি। পশ্চিমের পুঁজিতান্ত্রিক পথ থেকে কোন অভিজ্ঞতা তাদের সঞ্চয়ে নিয়েছে বলে আমরা জানি না। বলা যায়, পশ্চিমের পুঁজিতন্ত্রের প্রতি কোন পর্যালোচক (Critical) অবস্হান বা মূল্যায়ন নিয়ে চীন এই পথে চলা শুরু করেনি। অন্য আর দিক থেকে দেখুন, পশ্চিমের পুঁজিতন্ত্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের একটা বড় মিলের দিক হলো উভয়ের শিল্প বিপ্লবই পরিবেশ বা প্রাণবৈচিত্র রক্ষার বিবেচনায় জ্ঞানকানা।

প্রকৃতির উপর তথাকথিত বিজ্ঞানের বিজয় বা মানুষের Predatory দৃষ্টিভঙ্গির জয়জয়কারকেই বিজয়গৌরব জ্ঞান করা হয়ে এসেছে ওখানে। পুঁজিতণ্ত্রিক সম্পর্কে উৎপাদন সংগঠনের ক্লাবে late-comer হওয়ায় পুরানো সদস্যদের খারাপ দিক বা খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে কোন শিক্ষা নেবার সুবিধা নিবার যে সুযোগ ছিল - সে সম্পর্কে নয়াচীনের কোন আগ্রহ বা প্রয়োজন জ্ঞানও ছিল না। ফলে শুরু থেকেই আমরা জানতে পারছিলাম চীন এমন কোন নতুন পুঁজিতণ্ত্রিক সম্পর্ক বা রূপ আমাদের সামনে আনতে পারবে না? ওর জন্য এমন কোন রাজনৈতিক দার্শনিক প্রস্তুতি চীনের মধ্যে আমার দেখিনি। এই চীনের কাছে তাই চর্বিতচর্বন ছাড়া আমরা কীইবা আশা করতে পারি। এমনকি বোধহয় তা চর্বিতচর্বনও নয়।

আমেরিকান রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট ও অর্জনও সে বুঝতে অক্ষম। আমাদের BSTI এর কথা বাদ দেন; আমেরিকার FDA (Food & Drug Administration) এর মত প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কেন গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এটাই তো চীনা বিপ্লবীরা এখনও বুঝতে অক্ষম। FDA এর পূর্বানুমতি ছাড়া কোন খাদ্য বা ড্রাগ জাতীয় পণ্য কোন উৎপাদক কোম্পানী বাজারজাত করতে পারে না শুধু নয়, এটা ফৌজদারি অপরাধ। অথচ চীনে এধরণের নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিষ্ঠান না গড়েই যে পুঁজিতন্ত্রে হাত লাগিয়েছে তা তো আজ প্রমাণিত। শিশু মৃত্যু ও ব্যাপক মহামারি অসুস্হতা ও বিপর্যয় ঘটে যাবার পর দুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের প্রধান একজিকিউটিভদের মাজায় দড়ি বেধে ধরে এনে জেলে পুরে দেওয়াটা রাষ্ট্রের ক্ষমতার বাহাদুরি দেখানো বা ক্যারিকেচার ছাড়া আর কী? মেলামাইনযুক্ত দুধ পণ্যের মর্যাদা পেয়ে বাজারে আসতে পারলো কেন? আবার দেখুন কী ধরণের উঠতি মধ্যবিত্ত ভোক্তা চীন নিজের জনগণকে তৈরী করেছে।

মেলামাইন কেলেঙ্কারি নিউজের কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, এসব উঠতি মধ্যবিত্ত এই কেলেঙ্কারির পরও সুপার মার্কেটে হামলে পড়ছে মেলামাইনহীন দুধের খোঁজে। কেন? বাচ্চা শিশুকে কৌটার দুধ খাওয়ানো পশ্চিমের পরিত্যাক্ত এই আধুনিকতা, নয়া পুঁজিতান্ত্রিক চীনের উঠতি মধ্যবিত্ত ভোক্তার কাছে এখনও আধুনিক নতুন শহুরে সহজ জীবনযাপনের কালচার। এর মানে নয়া পুঁজিতান্ত্রিক চীনে কী ধরণের নতুন ভোক্তাসমাজ গড়ে উঠতে পারে, এর বিপদ কী - সে সম্পর্কে চীনা সরকার শুরু থেকেই একদম বেখবর ছিল। অথচ পুরানো শক্তিশালী কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র হবার সুবিধাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে সরকার মটিভেশন ও প্রচারনা চালিয়ে শক্ত জনমতের সচেতন ভোক্তাসমাজ দাঁড় করাতে পারত। কারণ ভোক্তা ও উৎপাদক মানে একই বিষয় কে দুই দিক থেকে দেখা।

পুঁজিতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণহীন উৎপাদক নিজের কেবল যেনতেন প্রকারে মুনাফার মোটিভ থেকে নিজেই উঠতি মধ্যবিত্ত ভোক্তা ও এর মানসিক গঠনের উপর কর্তৃত্ত্ব নিয়ে নেবেই এটাতো আমরা সবখানে দেখেছি। লাক্স সাবান মেখে ফর্সা হওয়া যায়, বিখ্যাত নায়িকা হওয়া যায়, ফেয়ার এ্যান্ড লাভলি মেখে সাত দিনে কালো ত্মক ফর্সা করা যায়, কৌটার দুধে বা সেরিলাকের পুষ্টিগান, হরলিক্সে বাড়ন্ততার প্রমাণ - এরকম নির্জলা মিথ্যা, প্রলোভন দিয়ে ভোক্তা জনগোষ্ঠির ভাবনার উপর কর্তৃত্ত্ব নিয়ে নেয়া -এটা ঘটবেই তা জানার জন্য মহাজ্ঞানী হবার দরকার পরে না। অথচ চীনা রাষ্ট্র, সচেতন ভোক্তা জনগণের পক্ষ নিয়ে, এ্যডভেটাইজমেন্টের নীতিমালা, FDA ইত্যাদির মাধ্যমে সহজেই মুনাফাসর্বস্ব উৎপাদককে উৎখাত করে কোনটা পণ্য আর কোনটা পণ্য নয় এর সীমারেখা টানতে পারত। অর্থাৎ উল্টা ভোক্তা উৎপাদকের উপর সহজেই নিয়ন্ত্রণ আনতে পারত। এগুলো কোন বিপ্লবী দেশের কর্মসূচি নয়।

পশ্চিমের দেশের এসব অভিজ্ঞতা তো আজ সবার সামনেই হাজির। চীনের কাছাখোলা পুঁজিতন্ত্র কেবল চীনের জন্যই নয় আমাদের সমাজকেও কেমন নড়বড়ে ও হুমকির মুখে ফেলেছে তাই আজ চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখাচ্ছে। অতএব এটা কমিউনিষ্ট চীন বলে কিছু আশা করার চক্কর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.