আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অপরাধীর কী নির্মম দায়মুক্তি!

bangladesh

কাঁটাতারে ঝুলে ছিল ফেলানী নয়, পুরো বাংলাদেশ। আর সেটাকে ‘জায়েজ’ করে নিলো ভারত। বলল, সীমান্তরক্ষী বিএসএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ ‘নির্দোষ’। কী পরিহাস। কী তামাশা।

কী দায়মুক্তি! এ নির্মম দায়মুক্তির বিরুদ্ধে গোটা বাংলাদেশের মানুষ নিঃসন্দেহে একাট্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিনথিয়া বললেন, ‘সীমান্তে হত্যার বৈধতা দিলো ভারত সরকার। জানান দিলো, বাংলাদেশের মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। ’ ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ফেলানীকে হত্যা করে বিএসএফ সদস্যরা। ফেলানীকে হত্যার পর ক্ষতিপূরণও দিয়েছিল দেশটি।

সেটি ফলাও করে প্রচারের আয়োজন করে দেশী-বিদেশি মিডিয়া। আমাদের সীমান্তরক্ষী বিজিবির কর্মকর্তারা হাসি হাসি মুখ করে ভারতের দেয়া অনুদান তুলে দিয়েছিলেন, সেই নুরুল ইসলামের হাতে, যার কিশোরী কন্যাকে বিএসএফ হত্যা করে ঝুলিয়েছিল কাঁটাতারে। যার লাশ কাঁটাতার থেকে নামিয়ে বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বিএসএফ নামের একবিংশ শতাব্দীর দু’পায়ের জন্তুরা। এ নিয়ে দেশে কত রকমের আলোচনা। সেই আলোচনার ইতি ঘটলো ‘নির্দোষ’ রায়ের মাধ্যমে।

বৃহস্পতিবার এ রায় দিয়েছিল ভারতের কোচবিহারের ১৮১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সদর দফতরের জেনারেল সিকিউরিটি কোর্টের বিশেষ আদালত। অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দিয়ে বিএসএফের মহাপরিচালকের দফতরে পাঠানো হয়েছে রায়। মহাপরিচালক রায় চূড়ান্ত করবেন জানিয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মুখপাত্র বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে বলেছেন। সেই সাথে ধৈর্য ধারণের কথাও বলেছেন। কিন্তু আর কত ধৈর্য ধরলে ওরা মানুষ হবে! জানতে চাইলেন বেসরকারি চাকুরে আমিরুল ইসলাম।

কী ঘটেছিল সেই দিন : কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বর উপজেলা সীমান্ত। মধ্যরাত। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। বিএসএফের গুলি খেয়ে যে কিশোরী মেয়েটা ঝুলে থাকল কাঁটাতারে নাম তার ফেলানী। হবু স্বামীর জন্য ভালোবাসার কথা লিখেছিল সে।

সুঁই সুতোয় সেটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাও চলছিল। সাথে একটি ফুল। হাত রুমালে নকশা করে নিজের মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা আবেগটা জানাতে চেয়েছে সে। সেটি আর হয়ে ওঠেনি। কুড়িগ্রামের ঘন কুয়াশায় ঢাকা রাতের আঁধারে কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে গেলো তার স্বপ্ন।

সেই সাথে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের গুলিতে গেলো জীবন। ডান বুকে বিঁধে যাওয়া গুলির সাথে বেরিয়ে আসা রক্তের দাগটা স্পষ্ট ছিল। সাদা কাফনে জড়ানো কচি মুখের দিকে তাকিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বর উপজেলা দণি রামখানার মানুষ। এমন বর্বরতা তারা আগে দেখেনি। তাই অনেকেই ছিলেন বিস্ময়ে বিমূঢ়।

দেশে ফেরার দু’দিন পর ৯ জানুয়ারি স্বামীর ঘরে যাওয়ার কথা ছিল ফেলানীর। নানী হাজেরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলায় দুই বোনের ছেলে মেয়েতে বিয়ের পাকা কথা। তার দুই ছেলে ও চার মেয়ের সংসারে ফেলানীর মা তৃতীয়। বড় মেয়ে আনজুমা বেগমের ছেলে আমজাদের কাছে ফেলানীর বিয়ের কথা ছিল। বাড়িতে সে মতে সব প্রস্তুতি চলছিল।

ফেলানী এলেই বিয়ে। যে দিন তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা সে দিন তাকে অন্তিম শয়ানে শুইয়ে দেয়া হলো দাদার পাশেই। রামখানায়, গাছের ছায়ায়। সে সময় ফেলানীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল ফোলানীদের ভাঙাচোরা ঘর। চারপাশে বাঁশের বেড়া।

তারা থাকত না বলে হয়তো সেভাবে মেরামত করা হয়নি। ফেলানীর ব্যবহৃত সালোয়ার কামিজ, জুতো, পারফিউম জড়ো করে রাখা ছিল মাটিতে পাতা বিছানার এক কোনায়। এসব কিছুর মধ্যে প্রিয়তম হবু স্বামীর জন্য নিজ হাতে তৈরি করা একটি হালকা গোলাপী রঙের সুতি রুমাল। রুমালের মাঝখানে ফুল আঁকা হয়েছে নীল রঙের কলমে। সুঁই সুতোয় তার অর্ধেক তুলেছিল ফেলানী।

হৃদয় চিহ্ন আঁকা হয়েছে। তার মধ্যে কোনাকুনি করে দেয়া তীর। উপরের অংশে লেখা ইংরেজিতে ‘লাভ’ ভালোবাসা। অকপটে ভালোবাসার সেই বার্তা চিরতরে অসম্পন্নই থেকে গেলÑ ফেলানীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে। ভারতের আসামে ুদ্র ব্যবসা করতেন ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম।

সেখানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। ফেলানীর বাবা বলেছিলেন ভারতীয় দালালের সহায়তায় কিতাবের কুঠ- অনন্ততপুর সীমান্তের ৯৪৭ নম্বর মূল পিলারের কাছে ৩ ও ৪ এস পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে তারা দেশে ফিরছিলেন। সে জন্য মই দিয়ে ভোরের দিকে তাদের পার করার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় তিনি পার হতে পারলেও মেয়ের জামা আটকে যায়। ফেলানী ভয়ে চিৎকার করায় টহলরত বিএসএফ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে।

এরপর সে ইন্তেকাল করে। ফেলানীর মামা মোহাম্মদ হানিফ আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, সকাল ৭টার দিকে তাকে বোন জামাই নুরুল ইসলাম জানান, বর্ডারে ভাগনীর লাশ ঝুলছে। বর্ডারের লোকজন তাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির সদস্যদের কাছে না গিয়ে লাইনম্যানদের বলতে বললো। লাইনম্যান হলো বিজিবির সহযোগী সাধারণ মানুষ। তাদের সাথে আলাপ করে তিনি তাদের ইউনিয়নের গত নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী আলীম এবং মেম্বার রশিদকে নিয়ে বিজিবির সাথে আলাপ করেন।

সে দিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় বিএসএফ লাশ ফেরত দিলো না। পরের দিন লাশ হস্তান্তর এবং ৯ জানুয়ারি তারা লাশ পান এবং দাফন করেন। তিনি বলেন, বোন জামাই মেয়ের গায়ে গুলি লেগেছিল কি না বলতে পারেননি। আমি গিয়ে ঝুলানো লাশ দেখলাম। সেখানকার লোকজন আমাকে বলল, ফেলানীকে মেরে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে বিএসএফ।

গুলি হতে শুনেছেন পশ্চিম রামখানা মিস্ত্রিটারির বাসিন্দা মো: জমির হোসেন। তার বাড়ি থেকে সীমান্ত ৫০ গজের মতো হবে। তিনি বলেন, ভোরেই গুলির শব্দ পাই। চিল্লাচিল্লি শুনলাম। বেরিয়ে কিছু দেখিনি।

কুয়াশার কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সকালে ৯টার দিকেও দেখলাম লাশ ঝুলে আছে। যেখানে ফেলানীর লাশ ঝুলে ছিল তার ঠিক পাশেই বাড়ি আজিরনের। তিনি বলেন, ফজরের একটু আগে গুলির শব্দ শুনলাম। সকালে দেখি লাশ ঝুলছে।

১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে দেখলাম বিএসএফ লাশ নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফেলানীর বড় চাচী লাইলী বেগম বলেন, ফেলানীর মতো কেউ যেন এ ভাবে মারা না যায়। ওরা (বিএসএফ) তাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। ফেলানী নেই। এটা ভাবতেই খুব খারাপ লাগে।

তিনি বলেন, ভারত সরকার এটা কী বিচার করলো! আমরা এর সঠিক বিচার ও দোষীদের শাস্তি চাই। তার অভিযোগ ‘অত্যাচার করে’ হত্যা করা হয়েছে ফেলানীকে। একই রকম মনে করেন এলাকার অনেকে। যেমনটা বলেছেন, কাশীপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সেক্রেটারি আবদুল জলিল। তিনি বলেন, তাকে ‘নির্যাতন’ করে হত্যা করা হয়েছে।

তবে ‘নির্যাতন’ নয় গুলিতেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন, ফেলানীর লাশের ময়নাতদন্তের তিন সদস্যের অন্যতম ডা: অজয় কুমার রায়।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.