আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অক্ষম সরকারঃ সরকারী অক্ষমেরা

mostafizripon@gmail.com

১৯৭৫ কি '৭৬ সালের কোন এক শীতের সকালে আমার বড় ফুপাতো ভাই- অচেনা একটি শিশুকে কাঁধে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে এলো এবং আমার মায়ের নানান জেরায় শিশুটি সম্পর্কে যা যা বলল সেগুলোকে সংক্ষিপ্ত করলে এই দাঁড়ায়- এই বোবা ছেলেটিকে কে বা কারা রাস্তার পাশে ফেলে রেখে গেছে; যতদিন তার বাবা-মাকে খুঁজে না পাওয়া যাচ্ছে ছেলেটি তার সাথেই থাকবে; ছেলেটির আপাততঃ নাম রাখা হয়েছে পেটুক; কারন সে সারাদিন খায়। আমরা শিশুরা পেটুককে নিয়ে উৎসাহিত হয়ে উঠি। আমার বড় বোন চট করে এক প্লেট ভাত এনে ছেলেটির সামনে রাখে এবং ছেলেটি, যার আপাতত নাম পেটুক- সে খেতে শুরু করে। পেটুকের খাওয়া দেখে আমরা হতাশ হই। সে অনেক সময় নিয়ে একটা একটা করে খুটে খুটে ভাত খাচ্ছে, যেন কাজটি অনেক কষ্টের।

দুই এই মূহুর্তে বাংলাদেশে নিরব দুর্ভিক্ষ, নাকি হিডেন হাঙ্গার চলছে এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে- তবে আমরা যে একটি দুঃসময় অতিক্রম করছি তার বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ না হলেও চলে। ২০০৭-এর শুরু থেকেই দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়তি বাংলাদেশে। তখন সকলে বিষয়টিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। একই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আরেক দফা জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যে ঘি ঢেলে ছিল। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, জ্বালানি তেলের মূল্য অতি সামন্যই বৃদ্ধি করা হয়েছে-মাইল প্রতি মাত্র সতের পয়সা, আর কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকি দেয়া হলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশংকাটা হবে অমুলক।

কিন্তু বাস্তবে সরকারের যুক্তিটাকে অমুলক প্রমান করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘোষনার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দ্রব্যমূল্য আরেক দফা বেড়েছিল। এরপর বাজার নিয়ন্ত্রনে সেনা বাহিনী নেমেছে; বাজারে মূল্য তালিকা টাঙ্গানোর ব্যবস্থা হয়েছে; অবৈধ আড়তগুলোতে সেনা বাহিনী হানা দিয়েছে, অনেক গুদামে সিলগালা পড়েছে; বিডিআর-এর মাধ্যমে চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রয় শুরু হয়েছে; ব্যবসায়ীদের সাথে ঘনঘন মিটিং করছে সরকার- কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। সাধারন মানুষের ক্রয়-সীমা অতিক্রম করে গেছে মূল্যস্ফিতি; বাংলাদেশ সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গত এক বছরে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে নানান তত্ত্ব তৈরী হয়েছে দেশে। শুরুতে এটি ছিল দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের চক্রান্ত; হালে এটি আন্তর্জাতিক উৎপাদন ঘাটতিতে এসে ঠেকেছে।

যখন যে তত্ত্ব এসেছে তার সপক্ষে তথ্যের ঘাটতি হয়নি। মানুষ সে সব বিশ্বাস করেছে কি করেনি তা কোন গুরুত্ব বহন করেনা, কারন সে সব বিশাল আলোচনার উপসংহার টানার আগেই আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। শেষে হতভাগা, সরকার খেদানো খাদ্য-উপদেষ্টা বলেই দিয়েছিলেন, সরকারের আর কিছু করার নেই। এ বছর বোরোর বাম্পার ফলন আশা করছে সরকার। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা থেকে জানানো হয়েছে, গতবারের তুলনায় এটি চার শতাংশ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যানটি আমরা পাইনি। মাস খানেক আগে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে, খাদ্য মজুদ আর ঘাটতি প্রসংঙ্গে জানানো হয়েছিল- এ বিষয়ে তাদের সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। আসলে আমাদের মূল সমস্যা এখানেই- সঠিক তথ্য না থাকা। এ বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকে বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতির খবরগুলো আসতে শুরু করে। বাংলাদেশের পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দুই রাষ্ট্র- ভারত আর মিয়ানমার কবে জেনেছিল এই সম্ভাব্য উৎপাদন ঘাটতির কথা? সেটি কমপক্ষে গতবছরের জুন-জুলাইয়ে।

আমাদের পত্রিকাগুলো যখন ভারতীয় চাল নিয়ে চালবাজি করছিলো, অন্যান্য দেশ তখন নিজেদের মজুদ মজবুত করে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের রপ্তানি মূল্য নিয়ে দর কষাকষি করছিলো। যদি একটি রাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা অপারগ হয় দেশের সত্যিকার চাহিদা আর মজুদের মতো সাধারন বিষয়ে- সে দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে থাকবে কি করে আমরা আশা করি! অভাবী মানুষ যখন দুই কেজি চাল কেনার জন্য ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ঘরে ফিরছে তখনকার তাজা খবর, টেস্ট রিলিফ, আর কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর বরাদ্দকৃত কয়েক হাজার টন চাল সরকারী গুদামে পড়ে আছে। বাজারে বাজারে খোলা ট্রাকে চাল বিক্রি করেও যখন চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না, তখন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদ এটিকে মানুষের মজুদ করার মানসিকতাকে দায়ী করেছেন। এই হাস্যকর বক্তব্যটি তিনি দিয়েছেন, কারন তিনি দারিদ্রের অর্থনীতি জানেন না এবং এটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায়- মানুষ কি পরিমান চাল মজুদ রাখছে তা তিনি কোন প্রকার পরিসংখ্যান না নিয়েই বলছেন। আজ বিডিআর পরিচালিত অপারেশন ডাল-ভাত টাস্কফোর্স কমাণ্ডার কর্নেল মুজিবুল হক মন্তব্য করেছেন, বোরোর ভালো ফলন হলেও চালের দাম তেমন কমবে না।

এই মন্তব্যটি কোন তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে কেউ উত্তর জানেন না। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতা, অযোগ্যতা, দুর্নীতি আর অদক্ষ মাথাভারী প্রশাসন দেশটির করুণদশাকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। সিডর আর বন্যার দোহাই দিয়ে আর যাকে ভুলানো যাক, গরীবের পাকস্থলিকে নয়। তিন শুরু করেছিলাম কুড়িয়ে পাওয়া একটি শিশুর গল্প দিয়ে, শেষটি তাকে দিয়েই হোক। ছেলেটি, যার নাম দেয়া হয়েছিল পেটুক- খুব বেশী দিন আমাদের যন্ত্রনা দেয়নি।

মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগা ছেলেটি কয়েক সপ্তাহ পরেই মারা যায়।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।