আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সকালের নাস্তা

জীবন গঠনে নিজেস্ব প্রতিক্রিয়ার দায় বেশি, ঘটে যাওয়া ঘটনার ভূমিকা সামান্য।

রোজা শেষ হলো, শুরু হলো নতুন যন্ত্রনা--সকালের নাস্তা। সেহরী খাওয়া হয় পেট ভরে, বাসার সবার সাথে। সেটা আমার কাছে অন্য রকম মজা লাগে, একটা উৎসব উৎসব ভাব আছে। ভীষণ ব্যস্ত জীবনে আমাদের এক সাথে কাটানোর সময়গুলো কমে আসছে।

সেহরীর সময় এক সাথে কিছু উষ্ণ সময় কাটানো হয়। কিন্তু রোজা না রাখা মানে, সেই সাত সকালে ক্লাসে যাওয়ার আগে শীতল, অন্ধকার রান্নাঘরে একা একা গিয়ে জানালার পর্দা খোলা। আমার মত এত আগে কারও বেরুতে হয় না, তখনও সবাই ঘুমিয়ে থাকে। অতএব, ফ্রীজ থেকে দুধের ক্যান বের করে, বিদঘুটে স্বাদের সিরিয়ালের সাথে একা একা গিলা। টেবিল বসতেই ইচ্ছা করে।

ব্রেক ফাস্ট বারের উপর উঠে বসে খেয়ে নেই। বেশির ভাগ সময়ই নাস্তার জন্য বরাদ্দ সময় থাকে তিন মিনিটে। যেই তিন মিনিটে সেই পিচ্ছিল বস্তুটাকে গলা দিয়ে নামাই, সেই তিন মিনিট আমার সারা দিনের সবচয়ে বিচ্ছিরি তিন মিনিট। সকালের নাস্তা না খেতে পারলে আমার মত সুখী কেউ থাকে না। কিন্তু না খেয়েও উপায় নেই, সারা রাত উপোসের পরে সকালের নাস্তাও না খেলে কি হতে পারে, হঠাৎ হঠাৎ দীর্ঘ সময় উপোসের পরে পেট ব্যাথা উঠলে টের পাই।

তাছাড়া আমাদের বাসার পুলিশটা তো আছেই। আমার মা। রেডি হয়ে মায়ের দরজায় নক করে তড়ি ঘড়ি করে বলে যাই, 'মা-আসি-আসস্লামুলাইকুম'। মা নিয়ম করে দু'টো প্রশ্ন করে, 'নাস্তা খাইসো? লাঞ্চ নিসো?' দু'টোর জবাবে 'হ্যা' আসলে তবেই 'আচ্ছা যাও, ওয়ালাইকুম সালাম'। 'না' আসলে যেই ঝড় শুরু হয়, সেটা থেকে বাঁচার জন্য হলেও নাস্তাটা গিলে নেই।

আমার সেই পিচ্চি কাল থেকেই সকালের নাস্তার ব্যাপারে তীব্র অনীহা। ছোটবেলা মায়ের নিয়ম ছিল আরও কড়া। ঠিক সোওয়া সাতটায় টেবিলে আসতে হবে। তারপরে কাজের মেয়ের আধা পোড়া, আধা কাঁচা আটার রুটি আর লবনে চুবানো আলু ভাজি গলায় ঢালা। কি যে কষ্ট হতো নাস্তাটুকু খেতে! কিন্তু, মুক্তি নেই।

নাস্তা না খেয়ে বাসা থেকে যাওয়া যাওয়ি নেই। বাসায় না খেতে পারলে টিফিন বক্সে ভরে নিয়ে যেতে হবে। ওই বিদঘুটে রুটি টিফিনে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে বাসায় খাওয়া অনেক ভালো। পানি দিয়ে শক্ত আটার দলা গলা দিয়ে নামাতে নামাতে এক এক দিন কান্না পেয়ে যেত। আস্তে আস্তে বুদ্ধিমতী হয়ে উঠলাম।

মুক্তির জন্য আমাদের বাসায় যেই মেয়েটা থাকতো, আফিয়া, ওর সাথে এক গোপন চুক্তি করলাম। আমাদের কাঠের ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে, টেবিলের নিচে হাত দিলে একটা কাঠের প্লাটফর্মে হাত ঠেকতো। টেবিলের আকৃতি আর মজবুতির জন্যই থেকে থাকবে ওখানে। আমি খাওয়ার সময় আস্তে করে রুটি রেখে দিতাম ওখানে। আফিয়া এসে পরে নিয়ে যেত, খেয়ে নিত।

সেভাবেই চলছিল আমাদের সুখের দিনগুলো। কিন্তু হায়, এত সুখ কপালে সইলো না! একদিন ঠিক ধরা পরে গেলাম! সে কি দু:স্বপ্ন! স্কুলে যাওয়ার আগে সবগুলো রুটির টুকরো আমাকে গিলতে হলো! চোখের পানি নাকের পানি এক হলো! এখনও মনে পড়লে হাসি পায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিদঘুটে খাবার থেকে বাঁচার জন্য কত্ত সংগ্রাম করেছি। সে সিদ্ধ ডিম হোক, বেলের সরবত হোক আর দুধ হোক। আফিয়া এখন কেমন আছে জানি না, আমাকে নানা সময়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিল মেয়েটা। সবচেয়ে বেশি বাঁচিয়েছিল সকালের নাস্তা থেকে।

এখন বাঁচানোর জন্য আফিয়াকে কই পাই? তার চেয়ে সারা বছর রোজা রাখলেই ভালো (

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।