আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

চক্ষে আমার তৃষ্ণা (দ্বিতীয় পর্ব)

হাসন রাজায় কয়, আমি কিছু নয় রে আমি কিছু নয় !

চক্ষে আমার তৃষ্ণা: প্রথম পর্বের লিংক ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে যারা অল্প বিস্তর পড়াশুনা করেছেন তারা হয়তো জানেন যে সাতজন বিশেষ শয়তানের ক্ষমতার উপর সমস্ত কালো যাদু নির্ভর করে । কালো জাদু চর্চায় সাফল্য পেতে হলে এদের একজনকে পছন্দ করে উপাসনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হয় । এদের নাম যথাক্রমে লুসিফার, মেমোন, আসমোদিয়াস, শয়তান, বিলজিবাব, লেভিয়াথান, বেলফেগোর । এদের অস্তিত্বের অংশ এরা কিছু মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয় যারা মানুষের ভালো দেখলে ঈর্ষান্বিত বোধ করে, পাপ করতে মানুষকে প্রলুব্ধ করে । ভালো পথে যেতে বাধা দেয় ।

শুধুমাত্র তাদের চোখে পড়ার কারনে ভাল কিংবা সমৃদ্ধি সংক্রান্ত সবকিছু মুহূর্তে ধুলিস্মাৎ হয়ে যায় । বাংলায় যাকে বলে কু-নজর বা কু-দৃষ্টি । কুদৃষ্টি নিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মজার একটা গল্প আছে । এই লেখায় বলাটা মনে হয় ঠিক হবে না । লেখার মান হালকা হয়ে যাবে ।

আচ্ছা থাক্‌, বলেই ফেলি । কি আছে জীবনে ! মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একবার খবর পেলেন তার রাজ্যে একজন ‘ঊনপাঁজুরে’ বাস করে । অত্যন্ত মন্দ ভাগ্যের এই ব্যক্তির মুখ যে দিনে একবার দেখে ফেলতো তার নাকি সারা দিনটাই মাটি হয়ে যেতো । ঐদিন ঘরে কোন বেলায় হাড়ি পর্যন্ত চড়তো না এমনই অবস্থা । মহারাজ ভাবলেন এসব কুসংস্কার ।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখবেন । ঊনপাঁজুরে-কে পরদিন ঝড়-বাদলার দিনেও সকাল সকাল রাজসভায় ডাকা হল । রাজা বললেন, ‘দেখো হে ! আমি পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলাম যে তুমি কেমনতর ঊনপাঁজুরে ! তোমার কি মনে হয় আজ সকালে তোমার মুখ দেখে উঠেছি বলে আমারও ভাগ্যহানি হবে ?’ ঊনপাঁজুরে হাতজোড় করে বলল, ‘রাজামশাই আমি জানি না । ’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে । মুখ দেখা হয়েছে ।

আজ আমার দিন কেমন কাটবে তা দেখেই বোঝা যাবে তোমার মন্দভাগ্যের কথা সত্য নাকি গুজব । ’ রাজা রাজসভা শেষ করে দুপুরে খেতে গেলেন । তিনি হাত ধুয়ে পাত্রে খাবার নেবেন এমন সময়ে সিলিং থেকে একটা ছোটখাট কুৎসিত-দর্শন টিকটিকি খাবারসুদ্ধ গামলার ওপর এসে পড়লো । তার গা ঘিনঘিন করে উঠলো । তিনি খেতে পারলেন না ।

রাধুনিকে নতুন করে রান্নার আদেশ দেয়া হলো । বিকেলবেলায় খেতে বসে তরকারীতে একটি মরা তেলাপোকা খুঁজে পেলেন তিনি । ক্ষুদার্ত রাজা উঠে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে বাগানে গেলেন ফল পেরে খেতে । বাগানেও আর এক দূর্ভাগ্য । আচমকা বজ্রপাত হয়ে তার পাশের গাছসুদ্ধ জায়গাটা নিমেষেই পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে গেল ।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে আদেশ দিলেন, যেখান থেকে পারো ঐ বদমাশ ঊনপাঁজুড়ে’টাকে ধরে এনে শূলে চড়িয়ে দাও ! ঊনপাঁজুরে আর কোন উপায় না পেয়ে গোপাল ভাঁড়ের কাছে ছুটে গেল । গোপাল সব শুনে বলল, ‘চলো তোমাকে মহারাজের কাছে নিয়ে যাই !’ ‘কিন্তু গোপাল উনি তো আমাকে শূলে চড়িয়ে দেবেন । ’ গোপাল বলল, ‘সেকথা আমি বুঝবো । চলো তো তুমি !’ গোপাল রাজার কাছে গিয়ে বলল, ‘মহারাজ একে ফাঁসি দেবার ইচ্ছা যদি আপনার থাকে তো দিন না, কে মানা করছে ? কিন্তু কেন ফাঁসি দেয়া হচ্ছে সেটা তো আমায় একবার বলতে পারেন । ’ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তার সমস্ত দিনের উপাখ্যান শুনিয়ে গোপালকে তীব্র স্বরে বললেন, ‘গোপাল এই ঊনপাঁজুড়েকে সকাল-সকাল দেখেছি বলেই আমি আজ সারাটা দিন অনাহারী ।

একে আমি ছাড়বো না । ’ গোপাল হাত কচলে বলল, ‘মহারাজ ঠান্ডা মাথায় একবার ভাবুন তো, কার কু-দৃষ্টি কার ওপর পড়েছে । ঊনপাঁজুড়ে আসলে এই লোক নাকি স্বয়ং আপনি ?’ মহারাজ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘মুখ সামলে কথা বল গোপাল ! তোমার মাথা ঠিক আছে তো ?’ ‘দেখুন মহারাজ । এই লোককে সকাল-সকাল দর্শন করেছেন বলে আজ সারাবেলা আপনার খাওয়া জোটেনি । আর এই লোক আপনাকে সকালে দর্শন করেছে বলে দিন শেষে এই বেচারার প্রানদন্ড মিলেছে ।

শূলে চড়ে মরতে হচ্ছে । এখন ভেবে বলুন কে বেশি ঊনপাঁজুড়ে !’ মহারাজ গোপালের যুক্তিতে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলেন এবং শেষটায় তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে গোপাল এবং ঊনপাঁজুড়েকে কিছু উপহারসমেত বাড়ি পাঠালেন । কু-দৃষ্টি নিয়ে সব গল্প রূপকথার মতন এমন আনন্দের নয় । কিছু তীব্র কষ্টের গল্পও আছে । বাংলা সাহিত্যে তারাশংকর বন্ধোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ তার মধ্যে একটি ।

গল্পের নায়িকা স্বর্ন-ডাইনীর কথা লেখক বলেছেন এভাবেঃ “... মর্মান্তিক বেদনা ছিল তার । নিজেও সে বিশ্বাস করত- সে ডাইনী । কাউকে স্নেহ করে সে মনে মনে শিউরে উঠত । কাউকে চোখে দেখে ভাল লাগলে চোখ বন্ধ করত । তার আশংকা হ’ত, সে বুঝি তাকে খেয়ে ফেলবে ; হয়তবা খেয়ে ফেলেছে বলে শিউরেও উঠত ।

মনে হ’ত ডাইনী-মন্ত্র – বিষাক্ত তার ভালবাসা – লোভ হয়ে তীরের মত গিয়ে তাকে বিঁধে ফেলেছে তার হৃৎপিন্ডে । ... ” এইসব ডাইনী-বিশ্বাসের ব্যাপকতা আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এতোটাই বেশি ছিল যে এখানে এদের তাড়ানোটা একটা পেশার সৃষ্টি করে । পেশার নাম ওঝা-বৃত্তি । এই ওঝারা আঠারো-উনিশ শতকে বেশ প্রভাবশালী ছিল । এরা শুধু ডাইনী তাড়ানোর কাজই করতো না ।

বৃষ্টি নিয়ে আসা, নক্ষত্রবিচার করে ফসল ফলবে কিনা তা নির্ণয়, কু-দৃষ্টি তাড়ানো, এমনকি সাপে কাটা মানুষের চিকিৎসা পর্যন্ত করতো ! এরা কাঁধে সবসময় একটা কাপড়ের পুটুলি নিয়ে ঘুরতো । তাতে সরিষা, শুকনা মরিচ, চাল, বালি ইত্যাদি নানান রকম উদ্ভট জিনিসপত্র থাকতো । ডাইনী বা ভুত তাড়ানোর পদ্ধতিটাও অদ্ভুত । প্রথম ধাপে তারা ভুত-আক্রান্ত বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধুলা নিয়ে অদ্ভুত সব মন্ত্র পড়তো । তারপর মন্ত্রপূত ধুলি চারদিকে ছিটিয়ে দিয়ে তাদের কার্য আরম্ভ করতো ।

সব ওঝাদের কর্মকান্ড এক না হলেও কার্যপদ্ধতিতে কিছু সাধারন মিল ছিল । যেমনঃ ১। মোরগের মুন্ডু ছিঁড়ে মাটিতে রক্ত ছিটিয়ে দেয়া । ২। সরিষা, শুকনা মরিচ, ধূপ-ধুনো, ঝাড়ু, আগুন ইত্যাদির ব্যবহার ।

৩। ভুত আক্রান্ত ব্যক্তিকে বেঁধে ঝাঁটার সাহায্যে ক্রমাগত অমানুষিক নির্যাতন ( এরা আক্রান্তের পরিবারকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে- এই প্রহার ব্যক্তির শরীরে না বরং ব্যক্তিটির উপর ভর করা ভুতের গায়ে লাগছে ) । ৪। মরিচ পোড়া দিয়ে মন্ত্রপাঠ । মাটিতে ঝাড়ুর বাড়ি ।

৫। ভুতের সঙ্গে কথোপকথন । ইত্যাদি । আমরা যখন ওঝা-নির্ভর সমাজব্যবস্থায় মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম তখন বাইরের পৃথিবীতে কি ঘটছিলো একটু দেখে নেই । গ্রীকরা ‘জেমাটিয়াজ্‌মা’ নামের এক ধরনের আচারের মাধ্যমে কু-দৃষ্টি দূর করার চেষ্টা চালাতো ( এখনও কোথাও কোথাও এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী কিছু গোষ্ঠী পাওয়া যায় ) ।

যিনি এই প্রক্রিয়ায় কু-দৃষ্টি দূর করতেন তাকে একটা গোপন প্রার্থনা চালাতে হতো । প্রার্থনার ভাষা কিছুটা এই ধরনেরঃ “ হে পবিত্র কুমারী দেবী ! যদি ‘___’ [ আক্রান্ত ব্যক্তির নাম ] সত্যি সত্যি কু-দৃষ্টিতে আবিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে তাকে মুক্তিদান করো । ” এটি আক্রান্ত ব্যক্তির সামনে নিঃশব্দে তিনবার আবৃত্তি করলে একটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটতো । ঐ ব্যক্তি এবং প্রার্থনাকারী দুজনেই তড়পাতে তড়পাতে মুমূর্ষু রোগীর মত কাতর চিৎকার করতে থাকতো । তাদের বিশ্বাসে এসব ঘটনা একমাত্র তখনই ঘটে যখন সত্যি সত্যি কারও উপর কু-দৃষ্টির প্রভাব থাকে ।

নয়তো প্রার্থনার পরপর কোন প্রতিফলন দেখা যেতো না । অবশেষে এক পর্যায়ে প্রার্থনাকারী উঠে বুকে তিনবার ক্রুশ এঁকে বাতাসে তিনবার থুতু ছিটিয়ে দিতো । সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তি কু-দৃষ্টির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়েছে বলে ধারনা করা হতো । আধুনিক সমাজেও কু-দৃষ্টি ঠেকাতে অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয় । আসিরীয়’রা তাদের গলার হার বা নেকলেসে নীলকান্ত বা বৈদূর্যমনির পাথর রাখে ।

তাদের বিশ্বাস এই পাথর তাদেরকে কু-দৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করবে । আরমেনিয়ানরা কু-দৃষ্টির সন্দেহে নিতম্বে চিমটি কাটে । ইহুদীরা কু-দৃষ্টি কাটাতে তাবিজ ব্যবহার করে যার ভেতরে থাকা কাগজে/ চামড়ার ওপর হামসার হাতের ছবি আঁকা থাকে । কিছু মুসলিমরা এই হাতের সদৃশ একটু ভিন্ন রকম হাত এঁকেও তাবিজে ব্যবহার করে । তারা এটিকে বলে ‘ফাতিমার হাত’ ।

যদিও রাসূল ( সা ) এগুলিকে পৌত্তলিকতার চিন্হ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্পষ্টভাবে বলে গেছেন, আল্লাহই কেবলমাত্র ইসাবাতাল আঈন থেকে বান্দাদের রক্ষা করতে পারেন । এজন্যে তিনি মুসলমানদের কোন বিষয়ে প্রশংসা করার শেষে মাশাল্লাহ্‌ (ما شاء الله) বা তাবারাকাল্লাহ্‌ (تبارك الله) বলার ঐতিহ্য চালু করে গেছেন । অনেকের মতে, সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস আবৃত্তি করলে মানুষের খারাপ নজর থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । অনেকের দৃষ্টি আবার এই কুদৃষ্টির চেয়েও ভয়ংকর । আমি যখন জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন একজন ভয়ংকর রাগী ধরনের ম্যাডাম আমাদের বাংলা পড়াতেন ।

রেগে গেলে মাঝে মধ্যে তার মুখ থেকে সাধু ভাষায় কঠিন-কঠিন কথা বের হতো । এবং একসময় তিনি বিড়বিড় করে বলতেন, “বালকেরা ! ভস্ম করিয়া দিবো !” ‘ভস্ম করা’ ব্যাপারটা তখন আসলে ঠিক পরিষ্কার ভাবে বুঝতাম না । শিবের বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে বলা আছে, তিনি রেগে গেলে প্রলয়-নৃত্য শুরু করেন এবং এসময় তার তৃতীয় চোখটি খুলে যায় । ঐ চোখ থেকে ক্রমাগত আগুন বর্ষিত হতে থাকে । সেই আগুনে আশেপাশের সবকিছু ভস্ম বা ‘ছাই’ এ পরিণত হয় ।

প্রাচীন পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু মুনি-ঋষি ছিলেন যারা রেগে গেলে তাদের চোখ থেকে আগুন নিক্ষেপ করে মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলতো । এরকম দুইজন ঋষির কথা বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবিতায় এসেছে এভাবেঃ আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র শিষ্য আমি দাবানল দাহ- দাহন করিব বিশ্ব... খুব ছোটবেলায় একটা রূপকথার গল্প শুনেছিলাম । ডাইনী বুড়ির গল্প । গল্পে ডাইনীটা মন্ত্র পড়ে রাজপুত্রকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিল । রূপকথার গল্প সাধারনতঃ মিলনাত্মক হয়, শেষটা হয় এরকমঃ ‘অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বাস করিতে লাগিল ।

’ কিন্তু এই গল্পটা ছিল খুব বিষাদমাখা । আমাকে ছেলেবেলায় ভীষন মুগ্ধ করেছিল যে’কটা গল্প তার মধ্যে এটি অন্যতম । ডাইনীর শাপে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা গল্পে শোনা যায়- বাস্তবে হয় না । অথচ সাউথ ডাকোটায় এমন একটা অরন্য আছে যা কিনা পুরোপুরি পাথর হয়ে আছে । পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ! কিভাবে এই জিনিস ঘটল কে জানে ! মিথলোজীতে পাথর হয়ে যাবার ব্যাপারটা ঘুরেফিরে অনেকভাবে এসেছে ।

গ্রীক মিথলোজীতে ‘মিডৌসা’ নামের নারী-দৈত্যের নাম পাওয়া যায় । এর এক-একটি চুল বস্তুতঃ এক-একটি সাপ । মিডৌসা যার দিকে তাকাতো সে নাকি পাথর হয়ে যেতো । ক্ল্যাশ অফ দ্য টাইটানস ছবিটিতে নাতালিয়া ভোদিয়ানোভাকে মিডৌসা চরিত্রে অসাধারন লেগেছিল । নাতালিয়াকে দেখে আমার মনে হয়েছিল রোমান কবি ওভিদের কথাই সত্যি ।

মিডৌসা হয়তো আসলেই অসাধারন রূপবতী অনূঢ়া ছিল ! (নাতালিয়া ভোদিয়ানোভা) মুভিটি আমি মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম । নায়ক দেবপুত্র পারসিয়াস ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে পাতালপুরীর মন্দিরে মিডৌসার আস্তানায় । মিডৌসার মাথা কেটে নিয়ে এলেই সে দানব ক্রাকেনকে ঐ মাথার ভয়ংকর চোখদুটো দেখিয়ে পাথর বানিয়ে ফেলতে পারবে । একটু অসতর্ক হলেই সর্বনাশ । কোনভাবেই মিডৌসার চোখে চোখ মেলানো যাবে না ।

চোখে চোখ পড়লেই পেট্রিফায়েড ! হ্যারি পটার কম বেশি সবাই পড়েছে । ‘চেম্বার অফ সিক্রেট’ এর বাসিলিস্কের কথা মনে আছে ? “Of the many fearsome beasts and monsters that roam our land, there is none more curious or more deadly than the Basilisk, known also as the King of Serpents. This snake, which may reach gigantic size, and live many hundreds of years, is born from a chicken's egg, hatched beneath a toad. Its methods of killing are most wondrous, for aside from its deadly and venomous fangs, the Basilisk has a murderous stare, and all who are fixed with the beam of its eye shall suffer instant death.” বাসিলিস্ক নামের এই সাপের চোখ’ও মিডৌসার মতই শক্তিধর । দৃষ্টি পাথর করা চোখ তার । নিজের বিশাল শরীরের নিয়ন্ত্রন এটি কেবল ‘পারসেলমাউথ’দের কাছেই সমর্পন করে । বেশ ভারিক্কি টাইপ কথা-বার্তা হয়ে যাচ্ছে ।

এরচে একটা জোক বলি । ভারী ভাবটা হাল্কা হোক । জোকটা দুই বন্ধুকে নিয়ে । দুই বন্ধু মোটরসাইকেলে চড়ে রাতের বেলা বাড়ি ফিরছে । বাড়ি ফেরার সময় তাড়াটা একটু বেশিই থাকে ।

প্রথম বন্ধু তাই বেশ জোরেশোরেই চালাচ্ছে । শোঁ-শোঁ করে বাতাস কেটে চলছে মোটর সাইকেল । পিছনের বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, একটু আস্তে চালা ! ভয় ভয় লাগছে !’ প্রথম বন্ধু বলল, ‘দূর বোকা ! বেশি ভয় লাগলে আমার মত চোখ বন্ধ করে থাক্‌ !’ পিছনের বন্ধু আঁৎকে উঠলো । আর সামনের বন্ধু নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে মহানন্দে মোটর সাইকেল চালিয়ে যেতে লাগলো । প্রথম বন্ধুর সাথে ফিলোসফারদের খানিকটা মিল আছে ।

দার্শনিকরা যে অপটিমিস্ট না তা নয় । তবু প্রথম বন্ধুর মত এদের চোখ থাকতেও এরা সজ্ঞানে চোখ বন্ধ করে থাকতেই বেশি ভালবাসে ( বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারাও এর বিরাট বড় উদাহরন ) । সব ব্যাপারেই এরা বিশদ চিন্তা-ভাবনা করে বলে, ‘সবটাই ভাগ্য !’ দার্শনিক ইমাম গাজ্জালির একটি উক্তি ছিলঃ ‘দর্শন হচ্ছে একটি অপ্রয়োজনীয় এবং ভুল শাস্ত্র । ’ কুরআনে অবশ্যি আল্লাহ বলেছেন, ‘আমিই ভাগ্য !’ অনেক মিথলোজীতে ভাগ্য হিসেবে তিনটি বুড়িকেও ভাবা হয় (?) যারা যথাক্রমে বধির, বোবা এবং অন্ধ । এদের একজন অতীত, একজন বর্তমান, আরেকজন ভবিষ্যৎ ।

এরা কোন এক অজ্ঞাত গুহার মধ্যে বসে ইচ্ছেমত নিজেদের হাতে সুতা প্যাঁচায় এবং ইচ্ছেমতো কেটেও ফেলে । এই সুতাই আমাদের ভাগ্য । পুরাতন জার্মান বা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান মিথলোজীতে এই তিনটি বুড়িকে নিয়ে আরেক ধরনের কাহিনী বলা আছে । বুড়িদের নাম যথাক্রমে দিনো, ইনো এবং পেম্‌ফ্রেডো । এদেরকে একসঙ্গে ‘গ্রাইয়াই’ নামে ডাকা হয় ।

সেখানে এদের তিনজনকেই অন্ধ দেখানো হয়েছে । তিনজনই দন্তহীন । তবে এদের একটি বিস্ময়কর চোখ আর আলাদা একপাটি দাঁত আছে । এরা এগুলিকে নিজেদের মধ্যে পালা করে ব্যবহার করে । (গ্রাইয়াই) এদের কাছ থেকেই পারসিয়াস মিডৌসাকে হত্যার কৌশল জানতে পেরেছিল ।

গ্রীক জনপ্রিয় ট্রাজেডী নাট্যে এদের দেখা মেলে । বিশেষ করে প্রমিথিউস বাউন্ড-এঃ Near them their sisters three, the Gorgons, winged With snakes for hair— hated of mortal man— গ্রাইয়াই ভাগ্যের সৃষ্টিকর্তা নয়, তবে এরা ভাগ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে । ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে । ভবিষ্যৎ বলার জন্য তারা ব্যবহার করে তাদের ঐ একটিমাত্র চোখকেই । শেক্সপীয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ হচ্ছে আমার সবচে পছন্দের চরিত্র ।

শুধু বোধহয় আমি না, পাঠক যারা শেক্সপীয়ার পড়েছেন তাদের সবার কাছেই হয়তো এটি সবচে' পছন্দের । রবীন্দ্রনাথও এই মুগ্ধ পাঠকদের তালিকা থেকে বাদ পড়েন নি । তিনি এতোটাই মুগ্ধ ছিলেন যে ম্যাকবেথের অনুবাদ পর্যন্ত করে রেখে গেছেনঃ দৃশ্য / এক প্রান্তর / বজ্র তিনজন ডাকিনী ১ম ডাকিনী । । এতোক্ষণ বোন কোথায় ছিলি ? ২য় ডাকিনী ।

। মারতেছিলুম শুয়োরগুলি । ৩য় ডাকিনী । । দেখ্‌ একটা মাসীর মেয়ে গোটাকতক বাদাম নিয়ে খাচ্ছিল সে কচমচিয়ে কচমচিয়ে কচমচিয়ে চাইলুম তার কাছে গিয়ে, পোড়ার মুখী বোল্লে রেগে ‘ডাইনী মাগী যা তুই ভেগে ।

’ ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / ভারতী / আশ্বিন ১২৮৭) ম্যাকবেথের শুরুর অধ্যায়টাতে তিন ডাইনীর কথা বলা আছে । এরাও নিখুঁতভাবে ভবিষ্যৎ বলতে পারতো । গল্পের মধ্যভাগে নিজের মৃত্যু কিভাবে হবে জানতে চাইলে ম্যাকবেথকে তিন বুড়ি দুইটি আশার বানী শুনিয়েছিলঃ ১। নারীশ্রেনীর জন্ম দেয়া কোন সন্তানের হাতে ম্যাকবেথের মৃত্যু হবে না । ২।

বার্নামের অরন্যের গাছগুলো যতদিন না সৈনিকদের মত মার্চ করে ডানসিনেন পাহাড় পর্যন্ত চলে আসবে, ততদিন পর্যন্ত কেউ ম্যাকবেথকে হত্যা করতে পারবে না । দুটিই অসম্ভব । ম্যাকবেথ তাই নিজেকে অমর ভেবে শান্তি পাচ্ছিল । তবু কাহিনীর শেষে তাকে মৃত্যুর হাতে ধরা পড়তেই হলো । ডাইনীদের ভবিষ্যদ্বানী দুটি কিন্তু মিথ্যে ছিল না ।

শেক্সপীয়ার ছাড়া এমন ক্লাইমেক্স গল্পে আর কে’ই জুড়ে দিতে পারে ? তিন বুড়ির জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে তিন বাঁদরকেও কল্পনা করা হয় । রবীন্দ্রনাথের ‘হিং টিং ছট’ কবিতার কথা মনে আছে ?- “স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ — অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ। শিয়রে বসিয়ে যেন তিনটে বাদঁরে উঁকুন বাছিতেছিল পরম আদরে — একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড় , চোখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড় । ...” তিনটি বাঁদরের ব্যাখ্যা কবিতার শেষ দিকে আছে । পড়লে চিপার শক্ত দাঁতও নড়বড় করতে বাধ্য ।

একটুখানি মনে করিয়ে দেইঃ “...ত্র্যম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুন শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ। বিবর্তন আবর্তন সম্বর্তন আদি জীবশক্তি শিবশক্তি করে বিসম্বাদী। ...” [ ব্যাখ্যাটাই কি বেশি কঠিন মনে হচ্ছে না ? এরচে বাঁদরের চড় খাওয়াটাই তো ঢের ভালো ! ] দেবী দূর্গা ত্রি-নয়না বলে তাঁকে ‘ত্রৈম্বক্যে’ বলা হয়। তাঁর বাম চোখ হলো বাসনা (চন্দ্র), ডান চোখ কর্ম (সূর্য) ও কেন্দ্রীয় চোখ হলো জ্ঞান (অগ্নি) । যদিও এখানে সম্ভবত তাঁকে না বুঝিয়ে শিবকে বোঝানো হয়েছে ।

বাঁদর থেকে মনে পড়ে গেল, শুধুমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে যে জন্মান্ধতা আছে তা কিন্তু নয় ! এমন অনেক প্রানীই আছে যারা কিনা জন্মান্ধ । স্প্যালাক্স গণভুক্ত ধূসর রঙের ছুঁচোজাতীয় এক ধরনের ইঁদুর আছে যারা জন্মান্ধ । সারা জীবন এই হতভাগাদের অন্ধ হয়েই কাটাতে হয় ! এরা পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবী দেখতে পায় না । স্রষ্টা এদের চোখ দিয়ে পাঠিয়েছেন, অথচ দৃষ্টিশক্তি দিতে ভুলে গেছেন । ভাগ্যিস ছুঁচো হয়ে জন্মাতে হয় নি ! নয়ত অন্ধত্বের অভিশাপ মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হতো ।

যদিও কেউ কেউ শাপ মোচন করে বেড়িয়ে আসতে পারে । কিছু কিছু স্তন্যপায়ী প্রানী আছে যারা অন্ধ হয়ে জন্মালেও ধীরে ধীরে চোখে দেখতে পায় । খরগোশের কথাই ধরা যাক । এরা যখন জন্মায় তখন এদের চোখ পুরোপুরি বন্ধ অবস্থায় থাকে । এই চোখের পাতা খুলতে বেশ ক’দিন সময় লাগে ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, কিছু কিছু প্রিমেচিউর মানব সন্তানকেও খরগোশের মত এভাবে জন্মাতে দেখা যায় । জন্মের কয়েকদিন পরে এরা চোখ খুলে তাকাতে পারে । জন্মের অনেকটা সময় বাদে তারা দেখতে পারে সুন্দর এই পৃথিবীটাকে । আসলে সব মানবশিশুদের চোখ গর্ভাবস্থায় খরগোশের মতই বন্ধ থাকে, সাধারন বার্থ টাইমের আগে আগে প্রকৃতিগতভাবে এদের চোখ খুলে যায় । এটা সব মানুষের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক সত্য ।

প্রকৃতিগত নিয়মে, ঠিক জন্মের মুহূর্তেই এরা চোখ খুলে তাকাবে । উদাহরন আরও আছে । শ্বেতভল্লুকের বাচ্চারা জন্মানোর সময় অন্ধ হয়েই জন্মায় । চোখের জায়গাতে কিছু ছোট ছোট মোটা লোম থাকে । জাগুয়ারের শাবকরা তো জন্মানোর প্রায় দুই সপ্তাহ পরে চোখে দেখতে পায় ।

(চলবে) ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে যারা অল্প বিস্তর পড়াশুনা করেছেন তারা হয়তো জানেন যে সাতজন বিশেষ শয়তানের ক্ষমতার উপর সমস্ত কালো যাদু নির্ভর করে । কালো জাদু চর্চায় সাফল্য পেতে হলে এদের একজনকে পছন্দ করে উপাসনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হয় । এদের নাম যথাক্রমে লুসিফার, মেমোন, আসমোদিয়াস, শয়তান, বিলজিবাব, লেভিয়াথান, বেলফেগোর । এদের অস্তিত্বের অংশ এরা কিছু মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয় যারা মানুষের ভালো দেখলে ঈর্ষান্বিত বোধ করে, পাপ করতে মানুষকে প্রলুব্ধ করে । ভালো পথে যেতে বাধা দেয় ।

শুধুমাত্র তাদের চোখে পড়ার কারনে ভাল কিংবা সমৃদ্ধি সংক্রান্ত সবকিছু মুহূর্তে ধুলিস্মাৎ হয়ে যায় । বাংলায় যাকে বলে কু-নজর বা কু-দৃষ্টি । কুদৃষ্টি নিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মজার একটা গল্প আছে । এই লেখায় বলাটা মনে হয় ঠিক হবে না । লেখার মান হালকা হয়ে যাবে ।

আচ্ছা থাক্‌, বলেই ফেলি । কি আছে জীবনে ! মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একবার খবর পেলেন তার রাজ্যে একজন ‘ঊনপাঁজুরে’ বাস করে । অত্যন্ত মন্দ ভাগ্যের এই ব্যক্তির মুখ যে দিনে একবার দেখে ফেলতো তার নাকি সারা দিনটাই মাটি হয়ে যেতো । ঐদিন ঘরে কোন বেলায় হাড়ি পর্যন্ত চড়তো না এমনই অবস্থা । মহারাজ ভাবলেন এসব কুসংস্কার ।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখবেন । ঊনপাঁজুরে-কে পরদিন ঝড়-বাদলার দিনেও সকাল সকাল রাজসভায় ডাকা হল । রাজা বললেন, ‘দেখো হে ! আমি পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলাম যে তুমি কেমনতর ঊনপাঁজুরে ! তোমার কি মনে হয় আজ সকালে তোমার মুখ দেখে উঠেছি বলে আমারও ভাগ্যহানি হবে ?’ ঊনপাঁজুরে হাতজোড় করে বলল, ‘রাজামশাই আমি জানি না । ’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে । মুখ দেখা হয়েছে ।

আজ আমার দিন কেমন কাটবে তা দেখেই বোঝা যাবে তোমার মন্দভাগ্যের কথা সত্য নাকি গুজব । ’ রাজা রাজসভা শেষ করে দুপুরে খেতে গেলেন । তিনি হাত ধুয়ে পাত্রে খাবার নেবেন এমন সময়ে সিলিং থেকে একটা ছোটখাট কুৎসিত-দর্শন টিকটিকি খাবারসুদ্ধ গামলার ওপর এসে পড়লো । তার গা ঘিনঘিন করে উঠলো । তিনি খেতে পারলেন না ।

রাধুনিকে নতুন করে রান্নার আদেশ দেয়া হলো । বিকেলবেলায় খেতে বসে তরকারীতে একটি মরা তেলাপোকা খুঁজে পেলেন তিনি । ক্ষুদার্ত রাজা উঠে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে বাগানে গেলেন ফল পেরে খেতে । বাগানেও আর এক দূর্ভাগ্য । আচমকা বজ্রপাত হয়ে তার পাশের গাছসুদ্ধ জায়গাটা নিমেষেই পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে গেল ।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে আদেশ দিলেন, যেখান থেকে পারো ঐ বদমাশ ঊনপাঁজুড়ে’টাকে ধরে এনে শূলে চড়িয়ে দাও ! ঊনপাঁজুরে আর কোন উপায় না পেয়ে গোপাল ভাঁড়ের কাছে ছুটে গেল । গোপাল সব শুনে বলল, ‘চলো তোমাকে মহারাজের কাছে নিয়ে যাই !’ ‘কিন্তু গোপাল উনি তো আমাকে শূলে চড়িয়ে দেবেন । ’ গোপাল বলল, ‘সেকথা আমি বুঝবো । চলো তো তুমি !’ গোপাল রাজার কাছে গিয়ে বলল, ‘মহারাজ একে ফাঁসি দেবার ইচ্ছা যদি আপনার থাকে তো দিন না, কে মানা করছে ? কিন্তু কেন ফাঁসি দেয়া হচ্ছে সেটা তো আমায় একবার বলতে পারেন । ’ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তার সমস্ত দিনের উপাখ্যান শুনিয়ে গোপালকে তীব্র স্বরে বললেন, ‘গোপাল এই ঊনপাঁজুড়েকে সকাল-সকাল দেখেছি বলেই আমি আজ সারাটা দিন অনাহারী ।

একে আমি ছাড়বো না । ’ গোপাল হাত কচলে বলল, ‘মহারাজ ঠান্ডা মাথায় একবার ভাবুন তো, কার কু-দৃষ্টি কার ওপর পড়েছে । ঊনপাঁজুড়ে আসলে এই লোক নাকি স্বয়ং আপনি ?’ মহারাজ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘মুখ সামলে কথা বল গোপাল ! তোমার মাথা ঠিক আছে তো ?’ ‘দেখুন মহারাজ । এই লোককে সকাল-সকাল দর্শন করেছেন বলে আজ সারাবেলা আপনার খাওয়া জোটেনি । আর এই লোক আপনাকে সকালে দর্শন করেছে বলে দিন শেষে এই বেচারার প্রানদন্ড মিলেছে ।

শূলে চড়ে মরতে হচ্ছে । এখন ভেবে বলুন কে বেশি ঊনপাঁজুড়ে !’ মহারাজ গোপালের যুক্তিতে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলেন এবং শেষটায় তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে গোপাল এবং ঊনপাঁজুড়েকে কিছু উপহারসমেত বাড়ি পাঠালেন । কু-দৃষ্টি নিয়ে সব গল্প রূপকথার মতন এমন আনন্দের নয় । কিছু তীব্র কষ্টের গল্পও আছে । বাংলা সাহিত্যে তারাশংকর বন্ধোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ তার মধ্যে একটি ।

গল্পের নায়িকা স্বর্ন-ডাইনীর কথা লেখক বলেছেন এভাবেঃ “... মর্মান্তিক বেদনা ছিল তার । নিজেও সে বিশ্বাস করত- সে ডাইনী । কাউকে স্নেহ করে সে মনে মনে শিউরে উঠত । কাউকে চোখে দেখে ভাল লাগলে চোখ বন্ধ করত । তার আশংকা হ’ত, সে বুঝি তাকে খেয়ে ফেলবে ; হয়তবা খেয়ে ফেলেছে বলে শিউরেও উঠত ।

মনে হ’ত ডাইনী-মন্ত্র – বিষাক্ত তার ভালবাসা – লোভ হয়ে তীরের মত গিয়ে তাকে বিঁধে ফেলেছে তার হৃৎপিন্ডে । ... ” এইসব ডাইনী-বিশ্বাসের ব্যাপকতা আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এতোটাই বেশি ছিল যে এখানে এদের তাড়ানোটা একটা পেশার সৃষ্টি করে । পেশার নাম ওঝা-বৃত্তি । এই ওঝারা আঠারো-উনিশ শতকে বেশ প্রভাবশালী ছিল । এরা শুধু ডাইনী তাড়ানোর কাজই করতো না ।

বৃষ্টি নিয়ে আসা, নক্ষত্রবিচার করে ফসল ফলবে কিনা তা নির্ণয়, কু-দৃষ্টি তাড়ানো, এমনকি সাপে কাটা মানুষের চিকিৎসা পর্যন্ত করতো ! এরা কাঁধে সবসময় একটা কাপড়ের পুটুলি নিয়ে ঘুরতো । তাতে সরিষা, শুকনা মরিচ, চাল, বালি ইত্যাদি নানান রকম উদ্ভট জিনিসপত্র থাকতো । ডাইনী বা ভুত তাড়ানোর পদ্ধতিটাও অদ্ভুত । প্রথম ধাপে তারা ভুত-আক্রান্ত বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধুলা নিয়ে অদ্ভুত সব মন্ত্র পড়তো । তারপর মন্ত্রপূত ধুলি চারদিকে ছিটিয়ে দিয়ে তাদের কার্য আরম্ভ করতো ।

সব ওঝাদের কর্মকান্ড এক না হলেও কার্যপদ্ধতিতে কিছু সাধারন মিল ছিল । যেমনঃ ১। মোরগের মুন্ডু ছিঁড়ে মাটিতে রক্ত ছিটিয়ে দেয়া । ২। সরিষা, শুকনা মরিচ, ধূপ-ধুনো, ঝাড়ু, আগুন ইত্যাদির ব্যবহার ।

৩। ভুত আক্রান্ত ব্যক্তিকে বেঁধে ঝাঁটার সাহায্যে ক্রমাগত অমানুষিক নির্যাতন ( এরা আক্রান্তের পরিবারকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে- এই প্রহার ব্যক্তির শরীরে না বরং ব্যক্তিটির উপর ভর করা ভুতের গায়ে লাগছে ) । ৪। মরিচ পোড়া দিয়ে মন্ত্রপাঠ । মাটিতে ঝাড়ুর বাড়ি ।

৫। ভুতের সঙ্গে কথোপকথন । ইত্যাদি । আমরা যখন ওঝা-নির্ভর সমাজব্যবস্থায় মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম তখন বাইরের পৃথিবীতে কি ঘটছিলো একটু দেখে নেই । গ্রীকরা ‘জেমাটিয়াজ্‌মা’ নামের এক ধরনের আচারের মাধ্যমে কু-দৃষ্টি দূর করার চেষ্টা চালাতো ( এখনও কোথাও কোথাও এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী কিছু গোষ্ঠী পাওয়া যায় ) ।

যিনি এই প্রক্রিয়ায় কু-দৃষ্টি দূর করতেন তাকে একটা গোপন প্রার্থনা চালাতে হতো । প্রার্থনার ভাষা কিছুটা এই ধরনেরঃ “ হে পবিত্র কুমারী দেবী ! যদি ‘___’ [ আক্রান্ত ব্যক্তির নাম ] সত্যি সত্যি কু-দৃষ্টিতে আবিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে তাকে মুক্তিদান করো । ” এটি আক্রান্ত ব্যক্তির সামনে নিঃশব্দে তিনবার আবৃত্তি করলে একটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটতো । ঐ ব্যক্তি এবং প্রার্থনাকারী দুজনেই তড়পাতে তড়পাতে মুমূর্ষু রোগীর মত কাতর চিৎকার করতে থাকতো । তাদের বিশ্বাসে এসব ঘটনা একমাত্র তখনই ঘটে যখন সত্যি সত্যি কারও উপর কু-দৃষ্টির প্রভাব থাকে ।

নয়তো প্রার্থনার পরপর কোন প্রতিফলন দেখা যেতো না । অবশেষে এক পর্যায়ে প্রার্থনাকারী উঠে বুকে তিনবার ক্রুশ এঁকে বাতাসে তিনবার থুতু ছিটিয়ে দিতো । সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তি কু-দৃষ্টির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়েছে বলে ধারনা করা হতো । আধুনিক সমাজেও কু-দৃষ্টি ঠেকাতে অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয় । আসিরীয়’রা তাদের গলার হার বা নেকলেসে নীলকান্ত বা বৈদূর্যমনির পাথর রাখে ।

তাদের বিশ্বাস এই পাথর তাদেরকে কু-দৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করবে । আরমেনিয়ানরা কু-দৃষ্টির সন্দেহে নিতম্বে চিমটি কাটে । ইহুদীরা কু-দৃষ্টি কাটাতে তাবিজ ব্যবহার করে যার ভেতরে থাকা কাগজে/ চামড়ার ওপর হামসার হাতের ছবি আঁকা থাকে । কিছু মুসলিমরা এই হাতের সদৃশ একটু ভিন্ন রকম হাত এঁকেও তাবিজে ব্যবহার করে । তারা এটিকে বলে ‘ফাতিমার হাত’ ।

যদিও রাসূল ( সা ) এগুলিকে পৌত্তলিকতার চিন্হ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্পষ্টভাবে বলে গেছেন, আল্লাহই কেবলমাত্র ইসাবাতাল আঈন থেকে বান্দাদের রক্ষা করতে পারেন । এজন্যে তিনি মুসলমানদের কোন বিষয়ে প্রশংসা করার শেষে মাশাল্লাহ্‌ (ما شاء الله) বা তাবারাকাল্লাহ্‌ (تبارك الله) বলার ঐতিহ্য চালু করে গেছেন । অনেকের মতে, সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস আবৃত্তি করলে মানুষের খারাপ নজর থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । অনেকের দৃষ্টি আবার এই কুদৃষ্টির চেয়েও ভয়ংকর । আমি যখন জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন একজন ভয়ংকর রাগী ধরনের ম্যাডাম আমাদের বাংলা পড়াতেন ।

রেগে গেলে মাঝে মধ্যে তার মুখ থেকে সাধু ভাষায় কঠিন-কঠিন কথা বের হতো । এবং একসময় তিনি বিড়বিড় করে বলতেন, “বালকেরা ! ভস্ম করিয়া দিবো !” ‘ভস্ম করা’ ব্যাপারটা তখন আসলে ঠিক পরিষ্কার ভাবে বুঝতাম না । শিবের বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে বলা আছে, তিনি রেগে গেলে প্রলয়-নৃত্য শুরু করেন এবং এসময় তার তৃতীয় চোখটি খুলে যায় । ঐ চোখ থেকে ক্রমাগত আগুন বর্ষিত হতে থাকে । সেই আগুনে আশেপাশের সবকিছু ভস্ম বা ‘ছাই’ এ পরিণত হয় ।

প্রাচীন পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু মুনি-ঋষি ছিলেন যারা রেগে গেলে তাদের চোখ থেকে আগুন নিক্ষেপ করে মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলতো । এরকম দুইজন ঋষির কথা বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবিতায় এসেছে এভাবেঃ আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র শিষ্য আমি দাবানল দাহ- দাহন করিব বিশ্ব... খুব ছোটবেলায় একটা রূপকথার গল্প শুনেছিলাম । ডাইনী বুড়ির গল্প । গল্পে ডাইনীটা মন্ত্র পড়ে রাজপুত্রকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিল । রূপকথার গল্প সাধারনতঃ মিলনাত্মক হয়, শেষটা হয় এরকমঃ ‘অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বাস করিতে লাগিল ।

’ কিন্তু এই গল্পটা ছিল খুব বিষাদমাখা । আমাকে ছেলেবেলায় ভীষন মুগ্ধ করেছিল যে’কটা গল্প তার মধ্যে এটি অন্যতম । ডাইনীর শাপে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা গল্পে শোনা যায়- বাস্তবে হয় না । অথচ সাউথ ডাকোটায় এমন একটা অরন্য আছে যা কিনা পুরোপুরি পাথর হয়ে আছে । পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ! কিভাবে এই জিনিস ঘটল কে জানে ! মিথলোজীতে পাথর হয়ে যাবার ব্যাপারটা ঘুরেফিরে অনেকভাবে এসেছে ।

গ্রীক মিথলোজীতে ‘মিডৌসা’ নামের নারী-দৈত্যের নাম পাওয়া যায় । এর এক-একটি চুল বস্তুতঃ এক-একটি সাপ । মিডৌসা যার দিকে তাকাতো সে নাকি পাথর হয়ে যেতো । ক্ল্যাশ অফ দ্য টাইটানস ছবিটিতে নাতালিয়া ভোদিয়ানোভাকে মিডৌসা চরিত্রে অসাধারন লেগেছিল । নাতালিয়াকে দেখে আমার মনে হয়েছিল রোমান কবি ওভিদের কথাই সত্যি ।

মিডৌসা হয়তো আসলেই অসাধারন রূপবতী অনূঢ়া ছিল ! (নাতালিয়া ভোদিয়ানোভা) মুভিটি আমি মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম । নায়ক দেবপুত্র পারসিয়াস ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে পাতালপুরীর মন্দিরে মিডৌসার আস্তানায় । মিডৌসার মাথা কেটে নিয়ে এলেই সে দানব ক্রাকেনকে ঐ মাথার ভয়ংকর চোখদুটো দেখিয়ে পাথর বানিয়ে ফেলতে পারবে । একটু অসতর্ক হলেই সর্বনাশ । কোনভাবেই মিডৌসার চোখে চোখ মেলানো যাবে না ।

চোখে চোখ পড়লেই পেট্রিফায়েড ! হ্যারি পটার কম বেশি সবাই পড়েছে । ‘চেম্বার অফ সিক্রেট’ এর বাসিলিস্কের কথা মনে আছে ? “Of the many fearsome beasts and monsters that roam our land, there is none more curious or more deadly than the Basilisk, known also as the King of Serpents. This snake, which may reach gigantic size, and live many hundreds of years, is born from a chicken's egg, hatched beneath a toad. Its methods of killing are most wondrous, for aside from its deadly and venomous fangs, the Basilisk has a murderous stare, and all who are fixed with the beam of its eye shall suffer instant death.” বাসিলিস্ক নামের এই সাপের চোখ’ও মিডৌসার মতই শক্তিধর । দৃষ্টি পাথর করা চোখ তার । নিজের বিশাল শরীরের নিয়ন্ত্রন এটি কেবল ‘পারসেলমাউথ’দের কাছেই সমর্পন করে । বেশ ভারিক্কি টাইপ কথা-বার্তা হয়ে যাচ্ছে ।

এরচে একটা জোক বলি । ভারী ভাবটা হাল্কা হোক । জোকটা দুই বন্ধুকে নিয়ে । দুই বন্ধু মোটরসাইকেলে চড়ে রাতের বেলা বাড়ি ফিরছে । বাড়ি ফেরার সময় তাড়াটা একটু বেশিই থাকে ।

প্রথম বন্ধু তাই বেশ জোরেশোরেই চালাচ্ছে । শোঁ-শোঁ করে বাতাস কেটে চলছে মোটর সাইকেল । পিছনের বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, একটু আস্তে চালা ! ভয় ভয় লাগছে !’ প্রথম বন্ধু বলল, ‘দূর বোকা ! বেশি ভয় লাগলে আমার মত চোখ বন্ধ করে থাক্‌ !’ পিছনের বন্ধু আঁৎকে উঠলো । আর সামনের বন্ধু নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে মহানন্দে মোটর সাইকেল চালিয়ে যেতে লাগলো । প্রথম বন্ধুর সাথে ফিলোসফারদের খানিকটা মিল আছে ।

দার্শনিকরা যে অপটিমিস্ট না তা নয় । তবু প্রথম বন্ধুর মত এদের চোখ থাকতেও এরা সজ্ঞানে চোখ বন্ধ করে থাকতেই বেশি ভালবাসে ( বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারাও এর বিরাট বড় উদাহরন ) । সব ব্যাপারেই এরা বিশদ চিন্তা-ভাবনা করে বলে, ‘সবটাই ভাগ্য !’ দার্শনিক ইমাম গাজ্জালির একটি উক্তি ছিলঃ ‘দর্শন হচ্ছে একটি অপ্রয়োজনীয় এবং ভুল শাস্ত্র । ’ কুরআনে অবশ্যি আল্লাহ বলেছেন, ‘আমিই ভাগ্য !’ অনেক মিথলোজীতে ভাগ্য হিসেবে তিনটি বুড়িকেও ভাবা হয় (?) যারা যথাক্রমে বধির, বোবা এবং অন্ধ । এদের একজন অতীত, একজন বর্তমান, আরেকজন ভবিষ্যৎ ।

এরা কোন এক অজ্ঞাত গুহার মধ্যে বসে ইচ্ছেমত নিজেদের হাতে সুতা প্যাঁচায় এবং ইচ্ছেমতো কেটেও ফেলে । এই সুতাই আমাদের ভাগ্য । পুরাতন জার্মান বা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান মিথলোজীতে এই তিনটি বুড়িকে নিয়ে আরেক ধরনের কাহিনী বলা আছে । বুড়।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১৬ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.