আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গণমাধ্যমের গণবিরোধী চরিত্রের স্বরূপঃ প্রয়োজন কাউন্টার গণমাধ্যম

যদি ঠাঁই দিলে তবে কেন আজ হৃদয়ে দিলে না প্রেমের নৈবদ্য

যে কোন শাসকশ্রেণী শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই তার শোষণ-নিপীড়ন টিকিয়ে রাখে না, এর জন্য তার প্রয়োজন হয় মতাদর্শগত আধিপত্যও যা বিদ্যমান সমস্ত আধিপত্যবাদী এবং বৈষম্যমূলক কাঠামোকে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দান করে। গণমাধ্যম এই মতাদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। “হেজিমনির সাধারণ চর্চাকে বলপ্রয়োগ এবং সম্মতির সম্মিলন হিসেবে দেখা হয় যেখানে বলপ্রয়োগ ছাড়াই সম্মতির উপর ভিত্তি করে শক্তি ও সম্মতির মধ্যে পারস্পরিক ভারসাম্য তৈরি করা হয়। বাস্তবিকই এমন প্রচেষ্টা নেয়া হয় যাতে করে অধিকাংশের সম্মতির ভিত্তিতে বল প্রয়োগ কার্যকর হয়, যে সম্মতি তৈরি হয় জনমতের প্রতিভূ সংবাদপত্র ও সংঘের মাধ্যমে”। ইতালীয় বুদ্ধিজীবী আন্টোনিও গ্রামসির উক্তির মাঝেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চরিত্রের প্রকৃতির স্বরূপ।

“সম্মতি উৎপাদন’ প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম নির্ধারণ করে দেয় নাগরিকদের মতাদর্শ, রুচি অভিরুচি, বোধ বিশ্বাস, যে আরোপিত মতাদর্শ সমাজে তৈরি করে রাজনৈতিক ও কালচারাল ফ্যাসিজম। গণমাধ্যম যে সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার প্রসারে ভূমিকা রাখে তার সাথে সমাজের সাধারণ বোধ বিশ্বাস চেতনা ও জীবন যাপনের তেমন কোন সংযোগ নেই, ফলে গণমাধ্যম যে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্য বিত্তের কালচার প্রমোট করে তার সাথে দ্বন্দ্ব সংঘাত দেখা দেয় প্রান্তিক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর কালচার ও বিশ্বাসের। গণমাধ্যমের এই শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত গণবিরোধী হয়ে উঠে যা গণমানুষের উপর সমাজের এলিট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বৈধতা দেয়। গণমাধ্যমের এই ভূমিকার ভিত্তিমূল প্রচলিত গণতন্ত্রের ধারণায় নিহিত আছে বলে মনে করেন নোয়াম চমস্কি। চমস্কির মতে গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদ কিংবা তথ্যের মাধ্যম খোলাখুলি ও স্বাধীন হওয়ার কথা থাকলেও যে গণতান্ত্রিক চর্চা বর্তমানে পরিলক্ষিত হয় তাতে দেখা যাচ্ছে শাসকগোষ্ঠী শাসনকার্যে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে নাকচ করার জন্য সংবাদ মাধ্যমকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যেন শাসক শ্রেণীর ডেমোক্রেটিক ডমিনেশনের ব্যাপারে একটা সম্মতি আদায় করে নেয়া যায়।

চমস্কি এই গণতন্ত্রকে “দর্শকের গণতন্ত্র” বলে অভিহিত করেন যেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব কৌশলে অস্বীকার করে তাদের দর্শকের ভূমিকায় ঠেলে দেয়া হয়। এই গণতন্ত্রের ধারণা অনুসারে সমাজের এলিটবর্গই রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনিক কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে আর সাধারণ মানুষের কাজ হচ্ছে শুধু দর্শক হয়ে রাষ্ট্রের সমস্ত কাজে সম্মতি জ্ঞাপন করা- অংশ নেয়া নয়। তবে এই শাসন পদ্ধতিকে যেহেতু একনায়কতান্ত্রিক বলতে লজ্জা পান তাঁরা, তাই সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচনে ভোট দানের কাজে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয় যেন তারা বেছে নিতে পারেন তাদের শাসকবর্গকে। এই সাধারণ জনগণের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ এই একবারই , তারপর আবার পুরো শাসকাল ব্যাপী শাসনকর্ম থেকে শুরু করে জনগণের সাথে জড়িত সমস্ত সিদ্ধান্তঃ অর্থনীতি , রাজনীতি এমনকি তাদের কালচার সবই তৈরি করে দিতে চায় শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুগত মিডিয়া। ফলে এই গণতন্ত্রে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণকে সুকৌশলে নাকচ করে দেয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠীর কার্যকলাপকে ন্যায্য ও বৈধ করে নিতে হয়।

এই বৈধতা আদায় করে নিতে হয় দুই ভাবে- ১) সাধারণ জনগণকে বশে আনার জন্য সম্মিলিত যে বোধ বিশ্বাস চেতনা ও সংস্কৃতি তাকে নিষ্ক্রিয় করে তাদের মতাদর্শ এমনভাবে নির্মাণ করতে হয় যেন এই মতাদর্শ রাষ্ট্রীয় শাসকবর্গ ও গ্লোবাল পাওয়ারের শাসন প্রণালীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এজন্য শাসকবর্গ গণমাধ্যমসহ অনেকগুলো মতাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র (Ideological State apparatus) ব্যাবহার করে যাদের অনুসৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হচ্ছে, “ সম্মতি তৈরি করে নাও, আদায় করে নাও”; ২) সাধারণ জনগণের যে সচেতন অংশ এই সম্মতি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নতজানু হয় না এবং শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক ও গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্রিয়তা প্রদর্শন করে তাদের যে কোন তৎপরতাকে গণমাধ্যমে প্রচারিত মতাদর্শের নিরিখে বিচার করে তাকে সমাজের জন্য ক্ষতিকর, পশ্চাৎপদ, রাষ্ট্র বিরোধী, আইন বিরোধী বলে চিহ্নিত করে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। মিডিয়ার এই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসের উপর ভিত্তি করে শাসক গোষ্ঠী সমাজ বিপ্লবের যে কোন কণ্ঠস্বরকে অবদমনের জন্য বলপ্রয়োগের ন্যায্যতা পায়। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রথমে বলপ্রয়োগ ছাড়াই জনগোষ্ঠীর মতাদর্শ নির্মাণ করে সম্মতি আদায়ের চেষ্টা চালায় এবং তাতেও কাজ না হলে গণমাধ্যম পরিবর্তনকামী শ্রেণীর উপর বলপ্রয়োগের মতাদর্শিক বৈধতা দান করে, ফলে সমাজে জারি হয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির। গণমাধ্যম বলপ্রয়োগ ছাড়াই সম্মতি উৎপাদন করে চলেছে দুই ধরনের শ্রেণীর ভূমিকার মধ্য দিয়ে- ১) বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণী যারা জনগণের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে সম্মতি উৎপাদন করে এবং ২) সাংস্কৃতিক শিল্পী গোষ্ঠী যারা সাংস্কৃতিক আধিপত্য স্থাপন করে সম্মতি উৎপাদন করে।

বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্রের নামে যে অপ্রতিনিধিত্বশীল “দর্শকের গণতন্ত্র” অর্থাৎ দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র চালু আছে তাকে আলাপ -আলোচনা -লেখনী -টকশোর মাধ্যমে আরও প্রতিষ্ঠিত করা , আরও মহিমান্বিত করা। এই শ্রেণী বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ বলি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বলি এসব মতাদর্শকে আদর্শমান বলে প্রচার করে শাসক গোষ্ঠীর যে কোন অগণতান্ত্রিক ও আধিপত্যকামী কার্যকলাপকেও বৈধতা দেয়। এরা সমাজে ডেভেলপমেন্টাল ডেমোক্রেসির পক্ষাবলম্বন করে প্রাণ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধনকেও জায়েজ করে নেয় উন্নয়নের নামে। এরা গ্লোবাল লুণ্ঠনের দেশিয় এজেন্সির সমস্ত কাজকে জাস্টিফাই করে তথাকথিত উন্নয়ন দর্শনের নামে। এরা নিওলিবারেল পলিসিকে যৌক্তিক প্রমাণ করে যার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে বহুজাতিক কর্পোরেশনের লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়।

এই পলিসি যে সমাজের গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির বিরোধী এ ব্যাপারে এদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। গণমাধ্যম বৈশ্বিক পুঁজিবাদী শোষণের কর্পোরেট মিডিয়া হিসেবেই কাজ করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যে আগ্রাসন তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম মোটেই সোচ্চার নয় উল্টো লিবারেল ডেমোক্রেসি, ডেভেলপমেন্টাল পলিসি, মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ বাজার ব্যবস্থা এসবের পক্ষে মতামত প্রকাশ করে তারা আন্তর্জাতিক এসব সংগঠনের আগ্রাসী তৎপরতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়। একদিকে গণমাধ্যম বৈশ্বিক পুঁজির সেবাদাস হিসেবে গ্লোবাল লুণ্ঠনের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অর্থনীতির পক্ষে সম্মতি তৈরি করে নেয় অপরদিকে এই গণমাধ্যম দেশের ভিতরে রাজনৈতিক দমন পীড়নের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি হাজির করে সমাজে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। এটা বাংলাদেশের সব সরকারের সময়েই সত্য যে গণমাধ্যমকে মিডিয়া হিসবে ভূমিকা পালন করতে না দিয়ে তাকে শাসক শ্রেণীর প্রচারযন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে, ফলে এই প্রচাযন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নকেও অনেক সময় জায়েজ করার জন্য শ্রেণী ঘৃণা ও গোষ্ঠী ঘৃণার জন্ম দেয়।

গণমাধ্যমের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম শাসক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থেকে জনগণের চিন্তা, বিশ্বাস , আর মতাদর্শকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন এক সাংস্কৃতিক আদর্শমান তুলে ধরে তা এক কথায় গণবিরোধী। গণমাধ্যমের এই ভূমিকার জন্য দায়ী উন্নয়নের আধুনিকীকরণ তত্ত্ব “ (Modernization theory of development)। বাংলাদেশের মূল ধারার মিডিয়া এ ধারণাই প্রচার করে যে আমাদের সমাজের উন্নয়নের জন্য আধুনিকীকরণ অপরিহার্য এবং এই আধুনিকীকরণ হতে হবে পশ্চিমা সমাজ-সভ্যতার অন্ধ অনুকরণের মধ্য দিয়েই। অর্থাৎ পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইনব্যবস্থা, পশ্চিমা ধ্যান- ধারণা, বিশ্বাস, জীবনপদ্ধতি এই সবকিছুকেই আত্মস্থ করে প্রাচ্যকে পশ্চিমের কাছে আত্মিক ভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে, তবেই সে আধুনিক হতে পারবে এবং প্রাচ্যের এই পশ্চিম হয়ে উঠার মাধ্যমেই তাদের উন্নয়ন সম্ভব।

উপনিবেশবাদ ও উত্তর উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ উভয়ের প্রভাবে বাংলাদেশের কর্পোরেট গণমাধ্যমে পশ্চিমা আধুনিক ধ্যানধারণা ও জীবনবোধ চর্চাই জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গণমাধ্যম কর্তৃক প্রচারিত এই সংস্কৃতির অনুষঙ্গগুলো হচ্ছে অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, উদারতাবাদ এবং কনজুমারিজম যা নাগরিকদের মাঝে এমন এক ধরণের জীবনবোধের উন্মেষ ঘটায় যা সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই গণমাধ্যম প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর মন মানসিকতা এমনভাবে পশ্চিমা সমাজ সভ্যতা দর্শন অনুযায়ী পরিগঠন করছে যে পশ্চিমা আধুনিকতার ধারণাবর্জিত লোকায়ত, জাতীয় ও এথিক্যাল যে কোন সংস্কৃতি ও জীবন চর্চাকে আজ পশ্চাৎপদতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিপূরক বলে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। আধুনিকতাই যেহেতু কর্পোরেট গণমাধ্যমের কাছে ধর্মের নামান্তর সেহেতু এই মিডিয়া আধুনিকতা বর্জিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূর্খ/অশিক্ষিত/অর্ধ শিক্ষিত ও পশ্চাৎপদ মধ্যযুগীয় বলে তাদের চিন্তা চেতনাকে বিনাশ করে দিতে উদ্ধত। যৌক্তিক আচরণ, নগরায়ন, শিল্পায়ন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বয়ান নিয়ে আধুনিকতার বিকাশ হলেও এই আধুনিকতাই পরবর্তীতে পশ্চিমা মুল্লুকে অবাধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Over individualism), অনিয়ন্ত্রিত উদারতাবাদ (Liberalism), রি-ইফিকেশন (Reification) ও ডিসাবলিমেশন (Desublimation) এর জন্ম দেয় যার ফলে ক্রমেই তৈরি হয় মুক্তবাজার সংস্কৃতি ও ভোগবাদী কনজুমার কালচার যা পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোকেই বিকশিত ও শক্তিশালী করে।

এই একমাত্রিক মুক্তবাজার সংস্কৃতিতে বাক স্বাধীনতার নামে, ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ও উদারনৈতিকতাবাদের নামে মানুষের প্রবৃত্তি ও কামনা বাসনার বল্গাহীন বিকাশকে উৎসাহিত করে তাকে প্রবৃত্তির একান্ত দাসে পরিণত করা হয়। মানুষের প্রথাগত নৈতিকতা ও সামাজিক নীতিনৈতিকতার বলয় চূর্ণ বিচূর্ণ করে তাকে ভোগবাদী ও পণ্যপূজারী এক সত্ত্বায় রূপান্তরিত করা হয়। ইন্দ্রিয়ের চরম ও পরম সাধনাকেই সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ বলে চালিয়ে দেয়া হয়। আধুনিকতার ধারণা সারা দুনিয়ায় উপনিবেশবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তা বিশ্বব্যাপী যে একমাত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায় তার ভিত্তিতেই বর্তমানে আমরা এক ধরণের একমাত্রিক সমাজে প্রবেশ করেছি যেখানে সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ সাম্রাজ্যবাদের একটা বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। এই আধুনিকতার ধারণা ধারণ করে তাই পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়।

আধুনিকতার সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করার মত কাউন্টার কালচার প্রগতিশীলদের মাঝে পরিলক্ষিত হয় না। আধুনিকতার তত্ত্ব ধারণ করে তাদের পক্ষে তাই পুঁজিতান্ত্রিক একমাত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অসম্ভব। গণমাধ্যম বাংলাদেশে কালচারাল ফ্যাসিজমের জন্য সরাসরি দায়ী। এদেশের কর্পোরেট গণমাধ্যম গণমানুষের এথিক্যাল জীবনচর্চা ও আত্মিক শক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা জীবনবোধকে পশ্চাৎপদ, প্রতিক্রিয়াশীল বলে চিহ্নিত করে যে কালচারাল যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে তার অন্যতম দলিল হচ্ছে গণমাধ্যমে প্রান্তিক লোকদের কৃষ্টি-কালচারকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা। এক্ষেত্রে মিডিয়ার এই কালচারাল ফ্যাসিজমের লক্ষ্যই হচ্ছে এথিক্যাল সংস্কৃতির ধারক বাহকদের প্রতি এক ধরনের কালচারাল ঘৃণা পুনরুৎপাদন করা যেন তার সংস্কৃতির প্রতি মধ্যবিত্তের মাঝে এক ধরনের ভীতি, অবহেলা ও চূড়ান্ত পর্যায়ে বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়।

প্রান্তিক গণমানুষের এথিকস ও সংস্কৃতির প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়ার এই কালচারাল কনফ্লিক্ট অনেকটাই পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিজম প্রভাবিত। আবার গত দুই দশক ধরে আধুনিকতার নামে বাংলাদেশে পশ্চিমা ভোগবাদী ও বস্তুবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা সুস্পষ্টভাবেই আমাদের আবহমান সংস্কৃতিরও পরিপন্থি। বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ বলি কিংবা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বলি উভয়ের ধারক বাহকরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করলেও তারা আধুনিকতার নামে এই ধরণের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে প্রতিহত না করে উল্টো স্বাগত জানিয়েছেন এবং তা বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন তারা এখনও পর্যন্ত স্বতন্ত্র কোন সাংস্কৃতিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারেননি বলে হয় তারা এই পশ্চিমা সংস্কৃতিকেই মনে প্রাণে লালন করেছেন অথবা তার প্রতিরোধে বক্তব্য বিবৃতি দিলেও কাউন্টার কালচারের অভাবে অসহায়ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সমাজের মুখপাত্র দাবি করলেও প্রচলিত গণমাধ্যম যে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে তা গণবিরোধী।

নিয়ন্ত্রিত এই গণমাধ্যমের বিপরীতে দরকার গণমুখপাত্র যারা জনগণের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করার তাগিদ অনুভব করবে এবং পুঁজিতান্ত্রিক একমাত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কাউন্টার কালচারের প্রকাশকে মহিমান্বিত করবে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.