আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অনুভূতিরা.. ২

কখনো সুরের ছন্দ মেলেনা,তো কখনো তাল তবু গেয়ে যেতে হয় মিলিয়ে সাথে সময়ের সুর-তাল!

'তুমি কি এখানকার স্টুডেন্ট?' প্রশ্নটা শুনে ঘাড় ফেরালাম। উনি কখন এসে আমার পাশের চেয়ারে বসেছেন টের পাইনি,প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমি আরেকবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম,উনার মতো আরো দু'জন আন্টি বসে আছেন একই সারিতে। এতক্ষন মাথা নিচু করে চিন্তামগ্ন থাকার কারণে আমি তাদের কাউকেই খেয়াল করিনি,আর কানে হেডফোন থাকার কারণে,তাদের কথাবার্তাও খেয়াল করিনি। খেয়াল করে দেখলাম তিন জনের পোষাকে এক ধরণের কম্বিনেশন আছে! আমার ঠিক পাশের আন্টিটা পড়েছেন,ব্ল্যাক-রেড শাড়ি,তার পরের আন্টিটা পড়ে আছেন ব্ল্যাক-অফহোয়াইট শাড়ি,আর সব শেষের আন্টিটা পড়েছেন,ব্ল্যাক-গ্রীন সালোয়ার-কামিজ!ব্যাপারটা অবশ্যই ইন্টারেস্টিং! আমি মুখের ভাব খানিকটা স্বভাবিক করার চেষ্টা করে বললাম,
-নাহ,আমি এখানকার স্টুডেন্ট না।
আন্টি আরেকবার আমার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষন করে বললেন,
-তাহলে এখানে বসে আছো যে?
আমি একই ভঙ্গিতে বললাম,
-আমার বান্ধবী এখানকার স্টুডেন্ট,ওর জন্য অপেক্ষা করছি।


-কোন ইয়ারে পড়ে?ফার্স্ট ইয়ার?
আমি মাথা নাড়লাম। উনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
-কোন ইয়ার তাহলে?
আমি ভেতরে ভেতরে বিরক্ত!কোন ইয়ার সেটা জেনে কি কাজ!
-জ্বী ফিফথ ইয়ার।
-ওহ আচ্ছা,আমার মেয়েটাও এখানে পড়ছে,ফার্স্ট ইয়ার,আর এই আপাদের মেয়েরাও। আজকে ওদের অনেক দেরিতে ক্লাস শেষ হবে এই দেখে নিতে আসলাম,এমনিতেই দিন-কাল ভালো না!তোমার বান্ধবীরও কি রোজই দেরি হয়?
আমি খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বললাম,
-ওর তো এখন ওয়ার্ড থাকে তাই দেরি হয়।
-ওহ,আচ্ছা।


আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। ৪টা বাজেনি এখনো!এ আর তাহলে কেমন দেরি?ভার্সিটি-মেডিকেলে পড়ুয়া স্টুডেন্টদের জন্য বিকেল ৪টা কি খুব বেশি সময়!মনে তো হয় না!যাইহোক,বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে দেখে উঠে দাঁড়ালাম। খেয়াল করলাম,যথারীতি আন্টিদের গল্প তাদের নির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে ফিরে গেছে!
-মেয়েটা না মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দিন কে দিন কিভাবে যে শুকাচ্ছে!উফ,আপা!আপনি যদি ওর স্কুল লাইফের ছবি,আর এখনকার ছবি দেখেন,চিনতেই পারবেন না!
-আর বইলেন না গো,আমারটার ও একই অবস্থা!সময়ই পায় না,খাবে আর কখন?
-আমি তো বলতে গেলে,এখন সব খাবার মেয়ের পছন্দেই রান্না করি,যাতে একটু খায়!
আমার মুখে মৃদু হাসি ফুঁটে উঠলো! আহারে...এই হলো মা! কি অদ্ভুদ একটা ব্যাপার,উনারাও একটা সময় আমাদের বয়সে ছিলেন,আমাদের মতোই বান্ধবীরা মিলে আড্ডা দিতেন,মায়েদের শাসন-বারণ নিয়ে আক্ষেপ-বিরক্তি প্রকাশ করতেন!
আর আজ? এখন মনে হয় না,ওরকম কোন চিন্তা উনাদের মাথায় কাজ করে! ঘুরে ফিরে শুধু ঐ ছেলে-মেয়ে,সংসার নিয়েই গল্প!
লিফটের শব্দে ফিরে তাকালাম,কয়েকটা মেয়ে এদিকেই আসছে। যে আন্টিটা আমার সাথে কথা বলছিলো,তার মেয়েটা এসে বইয়ের ব্যাগটা মায়ের পাশে রাখল ধাম করে!
-আম্মু তুমি আবার কেন আসছো?কোন দরকার ছিলো?কি ই বা এমন দেরি হয়েছে আজকে!
-দিন কাল কি যে খারাপ বুঝিস?তোর আব্বু এর মধ্যে ৩/৪বার ফোন দিয়েছে,মেয়ে ফিরেছে কি না জানার জন্য!
-আর এজন্য তুমি চলে আসবা?কি যে আহ্লাদ দেখাও না!উফফ!
মেয়েটা মুখ গোমরা করেই বলল,
-তুমি একটু বসো,আমি ক'টা শীট ফটোকপি করিয়ে নিয়ে আসছি।
বলেই দৌড়ে চলে গেলো মেয়েটা।

আমি মনে মনে আরেক দফা হাসলাম! আন্টির এই মেয়ের যদি না খেয়ে শুকাতে শুকাতে স্বাস্থ্যের এই অবস্থা হয়,তাহলে আমার মায়ের উচিত তার মেয়ের স্বাস্থ্য দেখে,হার্ট এট্যাক করা!!যদিও এখন হয়তো আন্টির চোখে মেয়েকে শুকনোই মনে হচ্ছে,কিন্তু ক'দিন পর বিয়ের আলাপ উঠলে মেয়েকে আর শুকনো মনে হবে না!
ম্যাসেজ টোন বেজে উঠলো মোবাইলে,হাতে নিয়ে দেখলাম,'দোস্ত আর ৫মি,আসতেছি'! অপেক্ষা জিনিসটা মনে হয় সব এনার্জি খেয়ে ফেলার মতো ভাইরাস!!
আমার এতক্ষনে মনে পড়লো,আমি দুপুরে কিছু খাইনি,সকালেও তেমন কিছু খাইনি!সকালে খাওয়ার মতো অবস্থাও ছিলো না,বলা যায় এক প্রকার রাগ করেই বাসা থেকে বের হয়েছি!যেইসেই রাগ না,প্রচন্ড রাগ তার সাথে অপমানও মিক্সড আছে! > আম্মু আমাকে ইনডাইরেক্টলি খোঁচা মেরে অপমান করেছে,তাও আবার কোন এক আন্টির কথা শুনে!
আমি কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না,যে আমি যেমনই হই দেখতে,আমার কি কেমন,কোনটা কি এসব নিয়ে বাইরের মানুষ কি বলল না বলল,সেটা শুনে কেন আম্মু আমাকে এটা-সেটা শোধরানোর কথা বলবে? মানলাম তার কষ্ট লেগেছে,সব মায়ের কাছেই তার সন্তান দুনিয়ার সবার থেকে সেরা,অন্যের মুখে নিজের সন্তানের ত্রুটি শুনতে কোন মায়েরই ভালো লাগে না কিন্তু কে কি বলল,সেটা এতো গায়ে মাখাতে হবে কেন?দোষ কি আমার?আমি কেন কথা শুনবো? আমি যথারীতি চুপচাপ সব কথা শুনে,নিজের রুমে দরজা আটকে বসে ছিলাম,একটা সময় কান্নার শক্তিটাও আর অনুভব করছিলাম না,তখনই রাগের মাথায় বের হয়ে এসেছি,মোবাইলের সিম টাও খুলে রেখেছি! বের হওয়ার সময় চিন্তা করেছি,আর বাসায় যাবোই না!থাকুক আম্মু তার ওমুক-তমুক আপাদের মন্তব্য নিয়ে!
আমি জানি আম্মু ঐ আন্টিকে মুখের উপর জবাব তখনই দিয়ে এসেছেন,তারপরেও আমাকে কথা শোনালেন!আবার আমি এটাও জানি,আমি চলে আসার পরক্ষনেই সে তার ভুল বুঝতে পেরেছেন,যথারীতি বুয়ার সাথে কিংবা নানুকে ফোন করে দুনিয়ার অনুভূতি শেয়ার করছে! এবং আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু তারপরেও ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড অভিমান কাজ করছে,চোখ বন্ধ করলে এখনো রাগ অনুভব হচ্ছে! ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে বান্ধবীর ফোন পেলাম,অনেক দিন বিকেলে একসাথে চা খাওয়া হয় না,তাই আসলাম দেখা করতে।
ভাবনায় ছেদ পড়লো,সেই আন্টির কথায়!
-দেখেছেন আপা?আমার মেয়ের ব্যাগটা কতোটা ভারী?!আমিই কাঁধে নিতে পারছি না,আর ও প্রতিদিন এই ব্যাগ নিয়ে আসে,সিঁড়ি বেয়ে সারাদিন উঠানামা করে!
-হুম,আপা,আমার মেয়েটাও তো!কাল বলতেছিলো ওর নাকি কাঁধে ব্যাথা করে!
-ইশ!কি কষ্ট!এমন ভারি ব্যাগটা প্রতিদিন আমার মেয়েটা আনা-নেয়া করে! স্কুল-কলেজে তো সাথে সাথে ছিলাম,বই অর্ধেক আমিও নিতাম,কিন্তু এখনো তো একাই আসা-যাওয়া করে,আর এই কষ্ট করে ভারী ব্যাগটা নেয়...তার উপর বাসায় খাওয়া-দাওয়াও করে না ঠিক মতো!''
বলতে বলতে আন্টির কন্ঠটা কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এলো!আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম,আন্টির চোখ ছল ছল করছে!
আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলাম!আন্টি এ জন্য কান্না আটকে রাখছে,যে তার মেয়েটা এতো ভারি ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসে প্রতিদিন!অথচ একটু আগেই মেয়েটা এসে সবার সামনে তাকে ঝাড়ি দিয়ে গেল,কেন মা তাকে নিতে এসেছে!
আমার মনে হলো,নিজের চোখ দুটোও ছল ছল করছে এখন! মা...তার কি কোন তুলনা হয়?কতো ধৈর্য্য আর ভালোবাসা থাকলে পড়ে মা এমন হতে পারেন! হায়রে মা,অযথাই বকা খায়,দোষারপের স্বীকার হয়,তারপরেও সন্তানের এতটুকু কষ্ট দেখলে চোখে পানি চলে আসে!ঘুরে ফিরে বারবার নিজের মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসতে লাগল!
আস্তে আস্তে ব্যাগের পকেট থেকে সীমটা বের করে মোবাইলে সেট করলাম। অন করতেই দেখি,আম্মুর ম্যাসেজ,
'খেয়েছো দুপুরে?বেশি দেরি করো না কিন্তু!'
আমার মনে হলো,এবার নাক ফুলতে শুরু করেছে,ঠোঁট দুটোও কাঁপছে! আমি দ্রুত উঠে ওয়াশ রুমের দিকে চলে আসলাম। মিনিট দশেক পর শান্ত হয়ে আম্মুর নাম্বারে কল দিলাম,
'আম্মু আমার আসতে একটু দেরি হবে,তুমি চিন্তা করো না'
-ঠিক আছে,সাবধানে আসিস,ফি আমানিল্লাহ।


আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসিমুখে বের হয়ে দেখলাম বান্ধবী এসে বসে আছে। আমাকে দেখে মুচকী হেসে বলল,
-কিরে?হাসিস নাকি কাঁদিস?চোখ তো কাজল-পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে!
আমি কিছু না বলে শুধু হাসলাম। দিন শেষে মনে হচ্ছে,এমন সুখানুভূতির চাইতে সেরা কিছু আর নেই,আল্লাহর শুকরিয়াহ সারাদিনে যা কিছুই হোক,এতটুকু অন্তত অনুভব করতে পেরেছি। চা এর কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে হলো,জীবনে কি কি নেই সারাদিন তাই ভেবেছি,কিন্তু এখন মনে হচ্ছে,সব কিছুই আছে শুধু সব না,অনেক অনেক কিছু আছে,এরচেয়ে বেশি কিছুর আর কি দরকার?থাকুক না বাদ অতো হিসেব-নিকেষ,থাকুক না হয় দূরে অতো নিয়ম-কানুন!

 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।