আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অন্য দিগন্ত ভিন্ন সুর ২ : কার্ল স্যুখমায়ার

গল্পের রাজত্বে বসবাস করছি আপাতত

কোন না কোন সূত্রে বিশ্বের সব কবি সাহিত্যিকই এক এবং একই সঙ্গে আলাদা। দুই দেশের লেখক কবিকে আমার মনে হয় নদী বা সমুদ্রের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সত্তা। যাদের দিগন্ত আলাদা, সুরটি ভিন্ন কিন্তু তার বাস করেন এক বৃহৎ আকাশ আর নীলের নীচে। এক আকাশের নীচে অন্য দিগন্তের মানুষগুলোর ভিন্ন সুর শোনার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ ভাগ করার একটা চেষ্টা এই লেখনী গুচ্ছ।

বলা দরকার, এখানে বিশ্বের ভিন্ন ভাষা ও অন্য দেশের কবি সাহিত্যিকদের জীবন ও কর্মকে তুলে ধরা হবে খুবই সীমিত আকারে। মূল উদ্দেশ্যটি ভিন্নতার স্বাদ আর অন্যের সঙ্গে পরিচয়। এই পর্বে থাকছে জার্মান নাট্যকার কার্ল স্যুখমায়ারের কথা।
‘‘জীবনের অর্ধেকটা হলো ভাগ্য, বাকী অর্ধেকটা হলো শৃঙ্খলা Ñ এবং সেইটুকুই গুরুত্বপূর্ণ অর্ধাংশ, কারণ শৃঙ্খলা ছাড়া তুমি জানতেও পারবে না ভাগ্য দিয়ে কী করবে। ’’ জীবন লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকেই এমন কথা বলেছেন নাট্যকার, উপন্যাসিক, কবি, চিত্রনাট্যকার ও প্রাবন্ধিক কার্ল স্যুখমায়ার (২৭ ডিসেম্বর ১৮৯৬- ১৮ জানুয়ারি ১৯৭৭)।

দুই শতাব্দীর মধ্যখানে পার করেছেন নিজের জীবন। কার্ল স্যুখমায়ার ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের শেষটা জুড়ে এক জীবনে দুইটা বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট হিসাবে যোগ দেন। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। উল্লেখ্য যে স্যুখমায়ারের সমগ্র রচনাতেই দুই বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

হাস্য-রসের মধ্য দিয়েই জীবন, সমাজ তথা বৈশ্বিক সংকটকে তুলে ধরেন সূক্ষè দক্ষতায়।
যুদ্ধচলাকালেই ১৯১৭ সালে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯১৮ সালে যুদ্ধ পরবর্তীকালে তিনি সেকেন্ড অফিসার পদবী পান। এ সময় তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার পড়া শুরু করেন। ১৯২০ সালে তিনি ছেলেবেলার বান্ধবী এনিম্যারিকে বিয়ে করেন।

কিন্তু এই বিয়ে মাত্র এক বছর টিকেছিলো। এরপর তিনি অস্ট্রীয় অভিনেত্রী এলিস হার্ডানকে বিয়ে করেন।
১৯২০ সালে তিনি প্রথম নাটক ক্রুজভেগ (চতুষ্পথ) লেখেন। এ নাটকের মাত্র তিনটি প্রদর্শনী হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় নাটক পানক্রাজ এরভাক্ট ওডা ডেয়া হিন্টাভালডার (পানক্রাজের জেগে ওঠা অথবা অমার্জিত)ও চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

কিন্তু তৃতীয় নাটক ডেয়া ফ্রসিলেখ ভাইনইয়ার্ড (মেরি’র আঙুর বাগান) তাকে সাফল্য এনে দেয়। এই নাটকের জন্য তিনি ক্লিয়েস্ট পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯২৫ সালে লেখা এই নাটকটি নিয়ে ১৯৫২ সালে পশ্চিম জার্মানিতে এরিখ এঙ্গেলের পরিচালনায় দ্য গ্রেপস আর রাইপ (পাকা আঙুরগুলো) নামে চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯২৪ সালে তিনি ও ব্রেটোল্ট ব্রেখট নাট্যকার হিসাবে বার্লিনে ডয়েচ থিয়েটারে চাকরী নেন। পরবর্তীতে এপিক থিয়েটারের প্রবক্তা ব্রেটোল্ট ব্রেখটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গভীর হয়।

ব্রেখট এবং স্যুখমায়ার দুজনই তখন সহনাট্যযোদ্ধা, তারা কাজ করছেন জার্মানির আরেক প্রবাদ তুল্য নাট্য নির্দেশক ম্যান রেইনহার্ডের সঙ্গে ডয়েসেন থিয়েটারে।
এরপর তিনি লেখেন ডেয়া ব্লাউ আঙ্গেল (নীল দেবদূত) নাটকটি। এটি আগের নাটক থেকে আরও বেশি সফল হয়। ১৯৩০ সালেই এই নাটক অবলম্বনে জোসেফ ভন স্টানবার্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার প্রতিটি নাটকই চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হতে থাকে এবং বিশ্বব্যাপী সমালোচক দর্শকদের নজর কাড়তে থাকে।

নীল দেবদূত নাটকেই আমরা স্যুখমায়ারের শৃঙ্খলা ও নীতিবোধ লক্ষ্য করি। এক বৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আবিস্কার করেন তার ছাত্ররা স্থানীয় ব্লু এঞ্জেল নামের নৈশ ক্লাবে যায়। তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত করতেই তিনি এই ক্লাবে যান, কিন্তু ক্লাবের মূল আকর্ষন নর্তকী লোলাকে তার ভাল লেগে যায়। ছাত্রদের সঠিক পথে অনুপ্রাণিত করার মানসিকতা নিয়ে যিনি নৈশ ক্লাবে গিয়েছিলেন তিনিই কিনা আসক্ত হয়ে পড়েন। তার এই তীব্র আসক্তি ক্রমশ তাকে সামাজিকভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবেই নি¤œগামী করতে থাকে।

নীল দেবদূত নাটকের জন্য তিনি জার্মানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার জর্জ বুখনার পুরস্কার অর্জন করেন।
১৯৩০ সালে তিনি তার সবচেয়ে সফল, আলোচিত ও বিখ্যাত নাটক ডেয়া হাউপ্টমান ভন কোপেনিক (কোর্পেনিকাসের ক্যাপ্টেন) নাটকটি লেখেন। এই নাটক তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। ১৯২৬ সালে লেখা তারই একটি উপন্যাসের নাট্যরূপ এটি। এই নাটক দেশের পরিম-ল ছাড়িয়ে বিশ্বে একাধিক মঞ্চে মঞ্চস্থ হতে থাকে।

এমনকি লন্ডন জাতীয় নাট্যশালাতেও এটি মঞ্চস্থ হয়। আমাদের দেশেও এটি মঞ্চস্থ হয়েছে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের প্রযোজনায়। সামান্য কিছু টাকা চুরির অপরাধে এক তরুণ মুচির জেল হয়ে যায়। ২৫ বছর পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চায়, একটি চাকরী পেতে চায়, সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি অনুমোদিত ছাড়পত্র চায়। কিন্তু চাকরী না হলে ছাড়পত্র পাবে না, ছাড়পত্র না হলে চাকরী হবে না, এমন সমস্যায় সে ভূগতে থাকে।

ঠিক তখনই পুরনো এক দোকানে ক্যাপ্টেনের পোশাক পেয়ে যায় সে। এই পোশাকটি যেন তার মাপেই, তার জন্যই তৈরি। এই পোশাকই বদলে দেয় তার জীবন। এই নাটকের মাধ্যমে আবারও লক্ষ্য করি স্যুখমায়ার তার প্রচলিত প্রহসন আর ঠাট্টার ভঙ্গিতেই জীবনের গুঢ় কথা বলতে পারেন অনায়াসে।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নাৎসী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতেই সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যান।

জার্মানীতে তার নাটক প্রযোজনা নিষিদ্ধ করা হয়। যাহোক পরবর্তীতে তিনি এক বন্ধু সাংবাদিকের সহায়তায় সুইজারল্যান্ড থেকে প্রথমে কিউবা পরে আমেরিকাতে তিনি অভিবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত তিনি হলিউডে চিত্রনাট্যকার হিসাবে কাজ করেন। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল নাগাদ তিনি ভেরমন্টে বসবাস করেন। ১৯৪৬ সালেই তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব পান।

মার্কিন নাগরিক হওয়ার পর আবার তিনি সুইজারল্যান্ড ফিরে আসেন। এ বছরই জুরিখে মঞ্চস্থ হয় ডাস টুয়েফেলস জেনারেল (শয়তানের জেনারেল)। কোপার্নিকাসের ক্যাপ্টেনের পর এটি তার উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্ম। শয়তানের জেনারেল নাটক সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প নিয়ে রচিত। বিখ্যাত জার্মান চলচ্চিত্রকার হ্যালমুট ক্যুটনারের পরিচালনায় যথাক্রমে ১৯৫৫ সালে দ্য ডেভিল’স জেনারেল এবং ১৯৫৬ সালে দ্য ক্যাপ্টেন ফ্রম কোপার্নিকাস মুক্তি পায়।

তিনি মার্কিন সরকারের যুদ্ধ পরবর্তী জার্মানীর সাংস্কৃতিক দূত হিসাবে তিনি কাজ করেন। ইউরোপ আর আমেরিকার মধ্যে তার যাতায়ত ও কার্যক্রম চলতে থাকে। অবশেষে ১৯৫৮ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডে স্থায়ী হন এবং সুইস নাগরিকত্ব পান। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তার বহুল আলোচিত আত্মজীবনী ‘অল ভিয়া’সিয়েন আইন স্টুক ভন মির’ (যেন আমারই জীবনের একটি টুকরো) প্রকাশিত হয়। তার সর্বশেষ নাটক ডেয়া রাটেনফানগার (বংশীবাদক) ১৯৭৫ সালে জুরিখে মঞ্চস্থ হয়।


যথার্থই বর্ণিল জীবন যাপন করেছেন কার্ল স্যুখমায়ার। ইউরোপের প্রায় সবগুলো উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পুরস্কার যেমন পেয়েছেন তেমনি চলচ্চিত্র ও নাটকের ক্ষেত্রে পেয়েছেন আর্থিক সাফল্য। সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, জার্মানির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। এরমধ্যে অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পদক, জার্মানির গ্যেটে ও রিলকে পুরস্কার, বন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননামূলক ডক্টরেট, অস্ট্রিয়ার ডক্টরেট ডিগ্রী। জার্মানীতে বর্তমানে কার্ল স্যুখমায়ার মেডেল নামে সাহিত্য পুরস্কার প্রচলিত আছে।

১৮ জানুয়ারী তার মৃত্যু দিবসে প্রতিবছর এ পুরস্কার দেয়া হয়। উল্লেখ্য ১৯৭৭ সালে সুইজারল্যান্ডেই তার মৃত্যু হয়।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।