সবুজের বুকে লাল, সেতো উড়বেই চিরকাল
দাওয়াত, নিমন্ত্রণ যে নামেই ডাকা হোক, উপলক্ষ্যটা আমার খুবই প্রিয়। ইয়ে তবে সালামির দাওয়াত হলে, মানে মানে এড়িয়ে যাই।
বোঝেনই তো। বেতন মাত্র ১৪, ৭০০ টাকা। উপহার কেনার মত সামর্থ্য থাকে না।
তবে ভোজের রেসিপি পছন্দ হলে, যা-তা কিনে সুন্দর প্যাকেটে করে নিয়ে যাই বটে ! তবে উপহার দায়কের কার্ডটা ফাক বুঝে অদল বদল করে দেই বলে, কোনদিন দুর্নামের ভাগি হতে হয়নি
যাই হোক। যে ভোজের কথা শোনাবো, সে, যে সে ভোজ নয়। একেবারে রাস্ট্রিয় ভোজ। স্বয়ং বুবুর ডাকা। আর হবে বাঁ নাই কেন? মাসে কয়েক লক্ষ টাকা যখন বাজেট তখন সমস্যা তো কিছু নেই।
আমাকে দেখেই বুবু আবেগি হয়ে পড়লেন।
- আয় ভাই, আমার কাছে আইসা বস। আহা রে, কতদিন দেখিনাই তোরে। আর তুই ওতো খোজ নিতে পারতি? মুখ চোখ কেমন শুকাইয়া গেছে !
আমি গলে গেলাম। কাদতে কাদতে বললাম,
- তোমার শত্রুতা যা শুরু করছে, তাতে ঘর থেইকা বাইর হওয়াই তো মুশকিল হইয়া গেছে।
ওই একদিন বাইর হইছিলাম, আমারে পিটায়া ছাতু কইরা দিছিলো।
আমার কান্না শুনে দেখি আশে পাশ থেকেও কান্নার রোল পড়লো।
এ এ এয়া উ উ উউ মাআআআআআ গেছিরে মাইরালাইছে রে ।
কি জ্বালা? গোবদা গোবদা হুমদামুখা গাট্টা গোট্টারাও দেখি বাচ্চা ছেলেদের মত কান্না শুরু করে দিয়েছে।
= বুবু এরা কান্দে ক্যান?
- আর কইস না, ফটিকছড়ি পার্টি এগুলি।
কোন কামের না।
তাই তো বলি ! আহা রে, আমাকে তো তাও কাঠালা পাকানো পিটানি দিয়েছিল। এগুলির অবস্থা দেখি আলুভর্তা করে দিয়েছে।
বুবুর পাশেই বসার ব্যাবস্থা আমার। আহা ! খাদ্যের তালিকায় কি নেই !
পয়লাই ইলিশের আইটেম।
মাছের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় আমার। কিন্ত ১০০০ টাকা কেজির ইলিশ কেনা আমার সাধ্যের বাইরে। দাওয়াতের যখন এসেছি, গোটা ইলিশই পেটে না চালান করলে, আমার নামও বাচ্চু না।
কিন্তু একি ? ডিমভরা ইলিশ এলো কোত্থেকে? এই সময় ইলিশের গর্ভধারণ তো স্বাভাবিক নিয়মে সম্ভব না। তবে কি ছাত্রলিগের লালসার শিকারের লিস্টিতে এখন ইলিশও যুক্ত হয়েছে?
ধুর ! তোবা তোবা।
কি সব আকথা কুকথা চিন্তা করছি। তাছাড়া মেয়ে মানুষ নিয়ে কি সব ধর্ষন না ফস্টিনস্টি করে। তাই বলে মাছকেও ছাড়বে না তাই কি হয়।
ভর্তা ভাজির আইটেমও নেহায়েৎ কম না। কিন্ত ওই যে ! ভর্তাভাজি তো প্রতিদিন খেতে হয়।
মানে দারিদ্রতার কারণেই। তাই ওগুলি একপাশে থাক।
মুরগির হরেক রকম। আহা, দেশি মুরগি কিন্ত কি রিস্টপুস্ট। মনে হয় ফার্মের মুরগির বাপ।
তাও সন্দেহ মোচনে বুবুকে জিজ্ঞেস করলাম,
- এইগুলি কি ফার্মের মুরগি বুবু?
দূরে বসা ছিলেন শাঃ কবির। লাফ দিয়ে একদম সামনে এসে পড়লেন।
- কি কইলেন আপনি? আমার সাপ্লাই দেওয়া মুরগিতে ভেজাল? আরে মিয়া, আমার সাপ্লাই দেয়া মুরগিতে পাকিস্থানি আর্মি কোনদিন কোন ভেজাল পায় নাই, আর আপনি আইছেন মিয়া ভেজাল খুজতে?
বোকা বনে গেলাম। ঠিকই তো ! স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শত্রু পাকিরা যখন মুরগি নিয়ে কোন ভেজাল পায়নি, তখন আমি কোন ছাড়?
কোনমতে মাফ টাফ চেয়ে খাবারে মনযোগি হলাম। এইজন্য মুরুব্বিরা বলে খাবার সময় কথা না বলতে।
এই সময় দেখি একটা না দুটা না তিন তিনটা বান্দর নিয়ে একজন হাজির। খুব সুন্দর হাসি দিয়ে সবার কুশল জিজ্ঞেস করছেন।
- উনি কে বুবু?
- ও উনি হইলেন ব্লগের মালিক।
- বান্দর নিয়া ঘুরে ক্যান?
- আরে এই গুলি ট্রেনিং নেয়া বান্দর। লেখাপড়া না জানলেও ব্লগিং করতে পারে।
- অ্যা কি কও বুবু?
- তো আর কি কই ! এরা বাংলায় কয়েকটা লাইন এমনভাবে শিখছে, যে ব্লগে বসাইয়া দিলেই, স্বাধীনতার চেতনা, যুদ্ধাপরাধী, ধর্মনিরপেক্ষতা, রাজাকার, ছাগু, রিপোর্ট করলাম, এই সব কথা দিন নাই রাইত নাই বইসা লিখতে থাকে।
- ওরে বাবা ! মহা কামেল বান্দর দেখি। তো দাওয়াতে আইসাও এইগুলিরে সাথে আনলো ক্যান?
- মনে হয় দিন রাইত ওগো লগে থাকতে থাকতে, ওগো ছাড়া কিছুই করতে পারে না। আনছে তো কি হইছে? তোর খাওয়ার তুই খা।
আচ্ছা এই রকম হলে আরাম করে খাওয়া চলে? হাজার কামেল হোক, মানুষের সভায় বাদরের আগমন মেনে নেয়া যায়? কখন কোথায় কি করে ফেলে? তাছাড়া হিসু পিসু করে দিলে এতগুলি লোকের তো খাবার ১২টা বাজবে।
আমার মনের কথা কি করে যেন বুবু টের পেলেন। হাজার হোক, আমি তার অনেক আদরের ছোট ভাই।
উনি ব্লগ মালিককে ডেকে বললেন
- আরে বইন, এক কাম করো, বান্দরগুলিতে উঠানে ছাইড়া দিয়া আসো, আমি কইয়া দিতেছি, এক কাদি কলা দিয়া আসবোনে। তুমি আরাম কইরা বইসা খাও।
কথাটা শুনে মনে হয় ব্লগ মালিকের বেশ রাগ হলো।
হ্যা হতেই পারে। এত প্রিয় প্রাণীদের শখ করে নিয়ে এসে এই আচরণ? বিড়বিড় করে যা বললেন, সেটা বুবুর কানে না গেলেও, আমার অতি পাকা কান এড়িয়ে গেলো না।
" নাহ, জাতিয়তাবাদিরা তো দেখি ঠিকই বলতো। এই মহিলা ভালো না। খামাখা এতদিন ওদের দুর ছাই করেছি।
"
আমার উলটো দিকে এক হুজুর বসা। নাম মাসউদ না কি যেন ! তিনি দেখলাম বিসমিল্লার ধারে কাছেও নাই। গবগব করে খাচ্ছেন।
আমি নীচু স্বরে বললাম,
- হুজুর, বিসমিল্লাহ তো পড়েন আগে।
তিনি মহা বিলা হয়ে গেলেন।
- আরে মিয়া, এইটা কি সংবাদ সম্মেলন পাইছেন যে, ধর্মের নাম নিতে হইবো? চুপ কইরা আপনা কাম করেন। আমারে ধর্ম চিনাইয়েন না।
হ্যা ঠিকই তো ! উনারা কত্ত বড় আলেম। আর আমি সাধারণ ছাপোষা মানুষ।
আসলেও বিরোধী দল বড়ই বজ্জাত।
এই আলেমের নামে আগে নাকি কি সব কেস টেস ছিল। এইগুলি কি ইসলামের বিরোধীতা না? খামাখা পুরানো কথা টেনে এনে জল ঘোলা করার মানে কি?
গোটা আটেক ইলিশের টুকরা আর পুরো অর্ধেক মুরগির ভোজন করার পর মনে হলো, কিছুক্ষন বিরতিতে যাওয়া ভালো। তাহলে আরো খাওয়া যাবে।
- আরে কই যাস? খাওয়া শেষ?
- না বুবু, একটু পরেই আসতেছি। তুমি কিন্ত আমার প্লেট কেউরে নিতে দিবানা।
বলে খানিকটা হাটাচলা করতে বাইরে বের হলাম। এক কোণায় দেখি কি যেন জটলা !
হুম... বুবুর বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র না তো। বুবু আজকাল আবার বামদের বেশি বেইল দেয়। এরাই তো বঙ্গবন্ধুর ১২টা বাজিয়েছিল।
হ্যা, যা ভেবেছিলাম।
ফিসফিস করে শলা পরামর্শ চলছে।
- এই যে নুর ভাই, আপনার অভিনয়ের জারিজুরি তো সব শেষ। কে বাঁ কারা যেন ইউটিউবে ওবায়দুল কাদেরের জবানবন্দি আপলোড করে দিয়েছে।
- ওবায়দুল কাদেরের সাথে আমার জারিজুরি ফাসের কি সম্পর্ক?
আরেকজন বলছে
- আরে গোলাইম্মার পুত গোলাম, তুই যে হাসিনার জন্য চান্দা তুলতি, সেই কথা ফাস হইয়া গেছে। কতবার কইছি, চামে থাকবি।
আওয়ামি লিগের খাবি পড়বি, মাগার নিরপেক্ষতার ভং করবি। কিন্ত না, শুনলি না। এশিয়াটিকের বাহান্য অনেক ট্যাকা বানাইছিলি। তাইলে আগ বাড়াইয়া চান্দা তুলতে গেলি কোন দুঃখে? নিজেও মরবি, আমাগোও মারবি !
ছি ছি ! ভাষার কি ছিড়ি ! এই লোককে তথ্যমন্ত্রি করাটা বুবুর ঠিক হয়নি।
- আরে বাদ দেন তো ! ইউটিউব আবার কে দেখে? তাছাড়া আমাগো বিরুদ্ধে কথা কওয়ার লোক তো আর নাই।
যেইটা ছিল, ওইটা তো এখন ডিবির কবজায়। সব এখন আমাগো লোক।
বলেই বেশ অট্টহাসি দিলেন।
- এতো জোড়ে হাসিস না। তোরে যে কইছিলাম, লৌড়ানি খাইলে কেমনে কই পলাইবি ঠিক কইরা রাখতে? রাখছোস?
- হ্যা রেখেছি তো ! ওইপারে হাবড়া বলে যে যায়গা আছে, সেখানে নিরিবিলিতে ৪ টা ফ্লাট বুকিং দেয়াই আছে, খালি গিয়ে ঊঠার বাকি !
- আবে তোর ওইপার আর হাবড়ার গুস্টি কিলাই।
এত ট্যাকা কামাইছোস, আর নজর পইড়া রইছে ওই ফকিরন্নি গো দেশে? এর আগে ওই বুইড়া দামড়া হাসান ইমানের পাল্লায় পইড়া বর্ধমান গেছিলাম। এর চেয়ে আমাগো গোয়াইনঘাটও ভালা আছিলো।
ক্যান? আমেরিকা ইউরোপ দুবাই না হোক, অন্তত মালয়েশিয়ার বুকিং দিতি। শালা ফকির ফ্যামিলি, ফকিরই থাকলি !
নাহ, এর পর আর থাকা চলে না। আমার বুবুকে গাড্ডায় ফেলে, এরা দেখি দিব্যি পালিয়ে যাওয়ার প্লান করছে।
আমি যদি বুবুকে বলে না দিছি তো আমার নামও বাচ্চু না।
কিন্ত একি ! কোন গোলক ধাধায় পড়লাম? ঘরে ফিরে একই যায়গায় দেখি ঘুরপাক খাচ্ছি। অথচ আমাকে বুবুর কাছে ফিরে যেতেই হবে। দরদর করে ঘামছি। আশে পাশে কেউকেই দেখছি না।
এক সময় প্রচন্ড আতংকে জোড়ে চিৎকার করলাম
বুবুউউউউউউউউউউউউউউউউ
হঠাৎ মুখের মধ্যে টিকটিকি পড়াতে ঘুম ভাঙ্গলো। কোথায় দাওয়াত কোথায় কি? আমি ঘরেই।
আজ পয়লা বৈশাখ। সৌভাগ্যবানদের পান্তা খাবার দিন। যা আমার নিত্য খাদ্য।
ভর্তা আছে, ভাজি নেই। আর ইলিশ? সে অনেক দুরের স্বপ্ন।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।