আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মুভি রিভিউ : ২২ শে শ্রাবণ – কবিতা ভালোবাসা সিরিয়াল কিলার ও ভেতরের কিছু গল্প

© এই ব্লগের সকল পোষ্ট,ছবি,থিম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কোথাও বিনা অনুমতিতে প্রকাশ করা নিষেধ । শ্রীজিৎ মুখার্জীর ২২শে শ্রাবণ মুভি টা দেখার পর বেশ ঝামেলায় পড়ে যাই আমি। ঠিক কোন জেনারে মুভি টাকে ফেলবো, সেটা নিয়ে বেশ একটা মানসিক দ্বন্ধ চলতে থাকে নিজের মাঝে। যদিও মুভি ডেসক্রিপশনে মুভির জেনার লেখা ছিল : ক্রাইম,ড্রামা,থ্রিলার। কিন্তু দেখার পর মনে হলো “Its beyond to its range.”তাহলে কি ২২ শে শ্রাবণ কে বলব সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার?নাকি বলব, অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোন প্রেসিডেন্ট পদক পাওয়া উচ্চ পদস্থ পুলিশ অফিসারের গল্প,যে কিনা যীশুর মতো পুনরুত্থানের মাধ্যমে নতুন একটা জীবন শুরু করতে ব্যাকুল।

নাকি এটা একটি প্রেমের গল্প? অথবা এটা একটা ফ্লিম যেটা কিনা উদ্বুদ্ধ করে পাপের বিরুদ্ধে পাপকে প্রশ্রয় দেওয়ার! এই সব কিছুই কি ২২শে শ্রাবণে আছে,নাকি আরো বেশী কিছু ও আছে। তবে আর যাই হোক,মুভিটাতে এত স্তর থাকলেও এখানে সুস্পষ্ট যেটার আভাস পাওয়া যায় তা হলো,এটা একটা মাকড়শার জালের মত রহস্য মোড়ানো এক বিভ্রান্তিকর “স্টোনম্যান”সিরিয়াল কিলারের গল্প। এই মুভিটাতে আমরা সাসপেন্স দেখতে পাব,তার পাশাপাশি প্রত্যাহিক জীবনের সম্পর্কের টানাপড়েন,সংঘাত,ভয়,স্বার্থ ও দেখতে পাব। আর এই ঘাত-প্রতিঘাতের বিষয়টা পরিচালক তুলে আনতে পেরেছেন বলে তাঁকে ধন্যবাদ। প্রথমে আমরা নজর দেই চরিত্রগুলোর দিকে : নিবারণ চক্রবর্তী (গৌতম ঘোষ) একজন খ্যাপাটে,কলকাতার ব্যর্থ হাঙ্গরিয়েলিস্ট মুভমেন্টের(১৯৬০) আঁতুড়ঘরে পালিত এক ব্যর্থ কবি,যে কিনা ১৯৯৭ সালে কলকাতা বইমেলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দায়েও অভিযুক্ত।

যিনি কিনা,নির্জন রাতে মৃত শহরে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে নিজের কবিতা আবৃতি করে যান আপন মনে। অন্যদিকে অভদ্র, অহংকারী, মলিন, বিবর্ণ, ধূমপায়ী , মদ্যপ পুলিশ থেকে বহিষ্কৃত এক অফিসার হচ্ছেন প্রবীর রায় চৌধুরী (প্রসেনজিত)। তার আরেকটি সমস্যা যেটা ছিল তিনি ছিলেন মানসিক ভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত। তিনি কিছুটা ক্ষমতা আসক্ত ছিলেন,মনে করতেন সব অপরাধীই অভিযুক্ত। আর এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি সকল আসামীকেই অত্যাচার করতেন অভিযোগ প্রমাণের ধার না ধেরেই।

তবে এত নেগেটিভটি থাকলে ও তিনি ছিলেন চৌকস এক পুলিশ অফিসার। সিরিয়াল কিলিং এর মোটিভ ও ক্লু গুলো তিনিই বের করে আনেন প্রথমে। আর এতে তার সহযোগী ছিল অভিজিৎ (পরমব্রত চ্যাটার্জী) এবার বলছি কেন এটাকে প্রেমের গল্প বললাম,অভিজিৎ আর অমৃতা মুখার্জী (রাইমা সেন) ভালোবাসে একে অপরকে। তারা লিভ টুগেদার ও করে। অমৃতা আবার কাজ করে টেলিভিশনে।

সেখানে আছে তার শৈশব বন্ধু এবং বর্তমান সহকর্মী (আবির চ্যাটার্জী)। আবির ও ভালোবাসে অমৃতাকে,যেটায় আবার সায় আছে অমৃতার মায়ের। আর তাই অভিজিৎ এর ভয়,অমৃতার সাথে তার বোঝা পরায় সমস্যা,এবং তাদের রিলেশনশিপের গ্যাপে আবির এর ঢুকে পড়া সম্পর্কের টানাপড়েনে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। সৃষ্টি কররে ত্রিভুজ প্রেম। এবার আমরা যেতে পারি মূল গল্পে : কলকাতা শহরে খুন হয়ে চলেছে একটার পর একটা।

আর যারা খুন হচ্ছে তারা সমাজের একদম নীচের শ্রেণীর মানুষ। মিলছে না কোন ক্লু বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট। ক্লু বলতে শুধু লাশের পাশে প্রত্যেকবার পাওয়া একটা করে কবিতার ছত্র যার সঙ্গে খুনের পদ্ধতির মিল রয়েছে। আর খুন গুলো হচ্ছে স্টোনম্যান স্টাইলে। একই কায়দায়, একই ভাবে,বলতে গেলে সিরিয়াল কিলিং।

আর এই সিরিয়াল কিলিং উদ্দেশ্য বা মোটিভ খুঁজে বের করতে গিয়ে কলকাতা পুলিশের প্রায় ল্যাজে-গোবোরে অবস্থা। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেড অমিত শ্রীবাস্তব (রাজেশ শর্মা) দ্বারস্থ হন প্রবীর রায় চৌধুরীর কাছে। এক সময়ের অফিসের বদমেজাজি, খামখেয়ালি প্রবীরকে পুলিশ ফোর্স থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল জেলের ভেতর অত্যাচার চালানোর জন্য। কিন্তু কোন কিছুর কূল না পায়ে তাই আবার আসা এই প্রবীরের কাছেই। প্রবীর রায় চৌধুরীর ডেপুটি হিসেবে রাখা হয় অভিজিতকে।

প্রবীরের খিস্তি-খিউর প্রলাপ,আর অমৃতার সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন প্রভাব ফেলতে শুরু করে অভিজিতের জীবনে। ওদিক দিয়ে কূল কিনারা হচ্ছে না খুনের । আর তার মাঝেই হয়ে গেলো আর একটি খুন। মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলার পর্যায়ে প্রায় ওদিকে অমৃতার অফিস সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে প্রোগ্রাম তৈরিতে ব্যস্ত। অমৃতা খোঁজ পায় হারিং আন্দোলনকারী কবি নিবারণকে।

নিবারণ কে আবির আর অমৃতা খুঁজে পায় কোন এক কিলারের সাথে সম্পৃক্ত থাকার ইতিহাসে। নিবারণের নিশি ভ্রমণ,প্রলাপ আবৃতি.”রবীন্দ্রনাথের”সাথে মুঠো ফোনে রহস্য জড়ানো আলাপন,কবিতার বই ছাপানোর জন্য তার পাগলামি আবার তার প্রিয় কবিতা পুড়িয়ে ফেলা,তার বাসার কাজের লোককে করে তুলে সন্দেহাতীত। প্রবীর খুঁজে পায় খুনের লিংক আর নিবারণের চাকরের বয়ানে মিল। সন্দেহ গিয়ে পড়ে নিবারণের উপর। হাতে নাতে ধরার জন্য তারা পাতে জাল।

কিন্তু না তারা বিফল হয়। মধুসূদনের মৃত্যু দিনে মৃত্যু হয় নিবারণের। সবাই ধরে নেয় কেইস্ সলভ। কিন্তু না ২২ শে শ্রাবণ,রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু দিনে খুন হয় আরেকটি। তাহলে কি নিবারণ সিরিয়াল কিলার নয়?তাহলে সিরিয়াল কিলার কে?আর বলছিনা বাকীটা আশা করি দেখে নিবেন।

এই মুভিতে দীর্ঘ ২৯ বছর পর আবার ক্যামেরার সামনে আসেন গৌতম ঘোষ। তাঁর সংলাপ আর অভিনয় নিয়ে কথা বলা আমার মানায় না। তবে প্রসেনজিত এর ব্যাপারে বলছি,যাদের প্রসেনজিতে এলার্জি আছে তাদের,এই মুভিতে তাঁর বাচাল, বদমেজাজি ক্যারেক্টার, চোখা চোখা ডায়লগ, চুরুট খাওয়ার অভ্যাস মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিবে স্কারফেস বা সেন্ট অফ আ ওম্যান-এর অ্যালো পাচিনোকে। পরমব্রত আর রাইমা বেশ ভাল,খানিকটা ডায়ালগের গুণেও। ছোট্ট রোলে আবির যেন দমবন্ধ করা উত্তেজনের মধ্যে এক ঝলক দমকা বাতাস।

সবশেষে বলব,এক ব্যর্থ হারিং কবির যন্ত্রণা,উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারের কাঠিন্যের আড়ালে অনুশোচনা, নাগরিক প্রেমের দুষ্টু-মিষ্টি ত্রিভুজ, ক্রাইম ব্রাঞ্চের অল্পবয়সী অফিসারের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত ফ্রাস্ট্রেশন, বিনয় মজুমদার থেকে সুকুমার রায়, অবলীলায় খিস্তির বন্যা, অসাধারণ ক্যামেরার কাজ,এডিটিং,অনুপম রায়ের জীবন মুখি গান মুভিটাকে করে হলিউডি স্টাইলে তৈরি বাংলা ফ্লেবারড মুভি। যে কথাটা অপ্রাসঙ্গিক,এই রকম বাজেটে আমাদের পরিচালকরা তৈরি করতে পারে মুভি। আশা করি তাদের ও বোধোদয় হবে,তারা বুঝবে দর্শকদের রুচি। আমরাও তখন আরোও জোড় গলায় বলতে পারবো হিন্দি ছবি আমদানির বিরুদ্ধে। আশা করি তারা সেই সুযোগ দিবেন।

ছবিটি তে আমার রেটিং ৭.৫/১০ ডাউনলোড লিংক পোষ্ট বড় হওয়ার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.