সুখ চাহি নাই মহারাজ—জয়! জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ। ক্ষুদ্র সুখে ভরে নাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা কুরুপতি! দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা জয়রস, ঈর্ষাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত,সদ্য করিয়াছি পান—সুখী নহি তাত, অদ্য আমি জয়ী।
দৃশ্যঃ ১/দিন/রাস্ত (হাসনাইন)
গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে একটি রিকশা এগিয়ে আসতে দেখা যাবে। পথের দু’ধারে গাছের সারি। ক্যামেরা গাছের সারির ফাঁক দিয়ে রিকশাকে অনুসরণ করবে।
একসময় মিড ক্লোস শট্-এ রিকশার আরোহী সাংবাদিক হাসনাইনকে দেখা যাবে। হাসনাইন চারদিকের নিসর্গ উপভোগ করতে করতে রিকশায় করে এগিয়ে চলেছে। তার মুখে স্মিত হাসি।
কাট
দৃশ্যঃ ২/দিন/রাস্তা, গির্জার এনট্রেন্স (হাসনাইন)
মেঠোপথ ধরে রিকশা এগিয়ে চলেছে। বিপরীত দিক থেকে একজন গ্রাম্য পথচারীকে এগিয়ে আসতে দেখে হাসনাইন রিকশা থামিয়ে মিউট ভয়েসে পথচারীকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করে।
উত্তরে পথচারী হাত উঁচিয়ে সামনের দিকে দিক নির্দেশ করে। রিকশা আবার চলতে শুরু করে। কাট টু শট্-এ রিকশা এবার একটা গির্জার গেইটের সামনে এসে থামে। ক্লোস শট্-এ বড় সাইনবোর্ডে গির্জার নাম দেখা যাবে।
হাসনাইন রিকশার ভাড়া মিটিয়ে মেইন গেইট সংলগ্ন ছোট গেইটটা দিয়ে গির্জা কমপ্লেক্সের ভিতর প্রবেশ করে এগিয়ে যায়।
হাসনাইনের দৃষ্টি অনুসরণ করে দূরে একটি গির্জার অবয়ব ক্যামেরায় ফুটে উঠে। হাসনাইন এগিয়ে যেতে যেতে গির্জার ভিতর থেকে প্রার্থনার শব্দ ভেসে আসে। হাসনাইন কিছুক্ষণ ইতস্তত ভাব করার পর গির্জার দিকে এগিয়ে গিয়ে গির্জা স্থাপত্য ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। এই সময় প্রার্থনার শব্দ আরেকটু জোড়ালো ভাবে শুনা যাবে। এক সময় হাসনাইন গির্জার আশেপাশেই একটি সুবিধামত জায়গা দেখে সেখানে বসে পড়ে।
কিছু পরেই দূর থেকে সে দেখতে পায় যে গির্জা থেকে একে একে প্রার্থনাকারীরা বেরিয়ে আসছে। হাসনাইন এবার উঠে দাঁড়ায়।
কাট
দৃশ্যঃ ৩/দিন/গির্জার ভিতর (হাসনাইন, ফাদার রডরিগেজ)
ক্যামেরায় লং শট্-এ ফাদার রডরিগেজকে গির্জার মূল বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ফাদারের হাতে একটি প্রার্থনার বই। এবার ব্যাক টু ক্যামেরায় হাসনাইনকে দেখা যাবে গির্জার প্রবেশ দ্বারে এসে দাঁড়াতে।
ফাদার ঘুরে তাকাতেই হাসনাইন ফাদারের দিকে এগিয়ে যায়।
হাসনাইনঃ ফাদার রডরিগেজ?
ফাদারঃ আপনি নিশ্চয়ই হাসনাইন সাহেব? দৈনিক ডাকবার্তার সাংবাদিক?
(হাসনাইন মৃদু হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে)
ফাদারঃ পথ চিনে আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?
হাসনাইনঃ একদম না!
ফাদারঃ গুড। আপনি কি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চান, নাকি...
হাসনাইনঃ বিশ্রামের কিছু নেই। কাজ শেষ করে সন্ধ্যার আগেই ফিরতে চাই ঢাকায়।
ফাদারঃ ঠিক আছে, আমি তাহলে ডেকে পাঠাচ্ছি... (একটু ইতস্তত করে)... কিন্তু একটা কথা... আশা করি এমন কোন প্রশ্ন করবেন না, যাতে উনাকে কোন বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়।
শুধু আপনাদের পত্রিকার একটি মহতী উদ্যোগের কথা ভেবেই আমি উনাকে অনেক কষ্টে রাজী করিয়েছি... আশা করি...
হাসনাইনঃ আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন, ফাদার। আমি কথা দিচ্ছি।
ফাদারঃ ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। আপনি তাহলে একটু অপেক্ষা করুন। আমি উনাকে ডেকে পাঠাচ্ছি।
(হাসনাইন সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। ফাদার ফ্রেম আউট হয়। )
কাট
দৃশ্যঃ ৪/দিন/গির্জার ভিতর (হাসনাইন, রেবেকা)
হাসনাইন ঘুরে ঘুরে গির্জার ভিতরের বিভিন্ন অংশ দেখতে থাকে। এক সময় ব্যাক টু ক্যামেরায় রেবেকার প্রবেশ। হাসনাইন রেবেকার উপস্থিতি প্রথমে টের পায় না।
রেবেকা একটু অপেক্ষা করে আরেকটু এগিয়ে যায়।
রেবেকাঃ বলুন।
(হাসনাইন চমকে ফিরে তাকিয়ে রেবেকাকে দেখে। তার মুখে এবার এক চিলতে হাসি। )
হাসনাইনঃ আপনিই তাহলে...
রেবেকাঃ জ্বী, আমিই রেবেকা।
ফাদারের কাছ থেকে আপনার এখানে আসার উদ্দেশ্য আমি শুনেছি। আপনি মিঃ হাসনাইন, দৈনিক ডাকবার্তার সাংবাদিক। তাই তো?
হাসনাইনঃ ঠিক ধরেছেন। আমি বেশি সময় নেবো না। শুধু...
রেবেকাঃ আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না।
ফাদারের অনুরোধে আমি প্রথমে রাজী হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতার এতোটা বছর কেটে গেল...কত বছর যেন হবে?
হাসনাইনঃ একুশ বছর।
রেবেকাঃ হ্যাঁ, দীর্ঘ একুশটি বছর! এতোগুলো বছরে সেই দিনগুলোর কথা, সেইসব মানুষগুলোর কথা কতজনই বা আজ জানে, বলুন? আপনারা যখন একটা উদ্যোগ নিয়েছেন, আমার বলতেই বা তাহলে আর সংকোচের কি আছে!
হাসনাইনঃ এই জন্য আমরা, বিশেষ করে আমি নিজে আপনার কাছে বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ থাকবো।
(দু’জনের কিছুক্ষণের নিরবতা। রেবেকা এসে একটা বেঞ্চে বসে।
হাসনাইন তার পাশে এসে বসে। )
রেবেকাঃ কোথা থেকে শুরু করবো, ঠিক বুঝতে পারছি না।
হাসনাইনঃ স্মৃতি হাতরে যেখান থেকে শুরু করতে মন চায়...
রেবেকাঃ (কিছুক্ষণ নিরব থেকে, যেনবা স্মৃতি হাতরে বেরাচ্ছে তার মন) সেদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। পাক আর্মি ঢাকা শহরে তার আগের রাতে ক্র্যাক ডাউন করেছে। আমি আর মা ঘরেই ছিলাম।
এমন সময় দীপ্তি হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের বাসায় এলো...
কাট
Flash Back
দৃশ্যঃ ৫/দিন/রেবেকার বাড়ি (রেবেকা, মা, দীপ্তি)
মনিরা বেগম বিছানায় রাখা কাপড়গুলো একটা একটা করে ভাঁজ করছেন। রেবেকা পাশেই পড়ার টেবিলে বসে একটা বই পড়ছে আর খাতায় টুকটাক লিখছে। এই সময় দীপ্তি দ্রুতপায়ে ফ্রেইম ইন করে। দীপ্তির চোখে-মুখে উত্তেজনার আভাস। সে দ্রুত একবার মনিরা বেগমের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে রেবেকার দিকে তাকায়।
রেবেকা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দীপ্তির দিকে চোখ রাখে।
দীপ্তিঃ তুই কিছু শুনেছিস?
রেবেকাঃ কি ব্যাপারে?
মনিরাঃ কি ব্যাপার, মা? তুই হঠাৎ?
দীপ্তিঃ খালামনি... ইয়ে মানে... ঢাকাতে নাকি গতরাত থেকে ভীষণ গন্ডগোল শুরু হয়েছে!
রেবেকাঃ গন্ডগোল? কিসের?
দীপ্তিঃ বড়মামা ঢাকা থেকে আজ দুপুরেই মামী আর বাচ্চাদের নিয়ে ফিরলেন। ওর মুখেই শুনলাম কথাটা। ঢাকাতে নাকি পাকিস্তান আর্মি সমানে লোকজনের উপর গুলি চালিয়েছে।
মনিরাঃ (উদ্বিগ্ন কন্ঠে) কস কী! কেন্? আমার রাবিদ ঠিক আছে তো?
রেবেকাঃ (স্বগতঃ)...গুলি চালিয়েছে... ভাইয়া তো ইকবাল হলে থাকে...
দীপ্তিঃ রাবিদ ভাই এখনও যোগাযোগ করেনি কোন?
মনিরাঃ কই, না তো! ... হে আল্লাহ্, এখন কী হইবো! কতো কইরা পোলাটারে কইলাম দিনকাল ভালো যাইতেসে না, তুই বরং কিছুদিন গ্রামে আইসা থাক।
কিন্তু গোঁয়ারটা আমার কথা শুনলে তো!
রেবেকাঃ মা, তুমি আগেই না মরে ভুত হয়ো না তো! (দীপ্তিকে)... তোর বড়মামা আর কিছু বলেনি?
দীপ্তিঃ খুব ডিটেইল কিছু বলতে পারলো না। ওরা ওয়ারীতে থাকে তো... মূল গোলাগুলিটা নাকি শাহবাগ আর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের দিকেই হয়েছে। আর্মিরা নাকি হলের মধ্যেও...
মনিরাঃ হলের মধ্যে... কি?
(দীপ্তির নিরবতা)
মনিরাঃ কি হইলো? চুপ কইরা আছস কেন?
দীপ্তিঃ আমি সত্যি এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না, খালামনি। মামা যতটুকু বললো... ঢাকার অবস্থা নাকি খুব একটা ভালো না। সবাই ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে।
রেবেকাঃ মা, এক কাজ করলে হয় না? জুলকারনাইন চাচা তো রাজনীতি-টাজনীতি করেন। উনি হয়তো পাকা খবরটা দিতে পারবেন। আমি বরং একবার উনার কাছে যেয়ে...
মনিরাঃ তোর যাওনের কাম নাই। আমি নিজেই যাইতেসি। (স্বগতঃ)...আমার কিস্সু ভাল্লাগতেসে না...
(মনিরা পড়নের বিস্রস্ত শাড়িটা ঠিকঠাক করতে শুরু করে।
)
রেবেকাঃ অন্ততঃ ভাতটা খেয়ে যাও...
মনিরা রেবেকার দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে নিয়ে ফ্রেইম আউট হয়। দীপ্তি ও রেবেকার রিএ্যাকশান।
কাট
দৃশ্যঃ ৬/দিন/গ্রামের রাস্তা (মনিরা, জুলকারনাইন)
মনিরা হনহন করে গ্রামের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ দূর থেকে জুলকারনাইনকে পান চিবাতে চিবাতে সেই পথ দিয়েই এগিয়ে আসতে দেখে মনিরা। মনিরা জুলকারনাইনকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ায়, তারপর এগিয়ে যায়।
মনিরাকে দেখে জুলকারনাইন একটি আকর্ণবিস্তৃত হাসি হাসে।
জুলকারনাইনঃ (টেনে টেনে) আস্...সালামু...আলাইকুম, ভাবীসাব।
মনিরাঃ ওয়ালাইকুমাস্সালাম, ভাইজান।
জুলকারনাইনঃ হেঃ হেঃ... হঠাৎ এই ভরদুপুরে এই পথ দিয়া... তা কই যান?
মনিরাঃ ইয়ে মানে... আপনার কাছেই যাইবার নিয়ত করসিলাম।
জুলকারনাইনঃ (অবাক হবার ভান করে) আমার কাছে? কোন কামের কথা বুঝি? ভাইসাব মারা যাওনের পর আমরাই তো আপনার আপনজন... হেঃ হেঃ হেঃ... কিন্তু রাস্তায় কেন? চলেন বাড়িত চলেন, আপনার ভাবীর হাতের এক খিলি পান খাইতে খাইতে কথা বলা যাবেনে...
মনিরাঃ না ভাইজান, বাসায় রেবেকারে একা রাইখা আইসি।
আপনি কিসু শুনছেন?
জুলকারনাইনঃ শুনছি...মানে? কি ব্যাপারে?
মনিরাঃ ঢাকাতে নাকি কি সব গোলাগুলি হইতেসে? পাক আর্মিরা নাকি গতকাইল রাতে...
(জুলকারনাইন মনিরার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠে। মনিরা তার হাসিতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। )
জুলকারনাইনঃ ও কিছু না, ভাবীসাব। কিছু উলাঙ্গা-লাফাঙ্গা দালাল অনেকদিন ধইরাই তো আমাগো দেশটার পিসনে লাগসে। আপনি তো এই সব খবরই জানেন।
ব্যাটাগো রক্ত গরম, দেশের মইধ্যে শান্তি নষ্ট করতেসে... তাই সরকার বাহাদুর হেগোরে টাইট দেওয়নের লাইগা গত রাইতে আর্মি নামাইয়া একটু ভয়ডড় দেখাইসে আর কী। ঘাবরানের কোন কারণ নাই।
মনিরাঃ কিন্তু আমাগো দীপ্তির মামা নাকি ঢাকা থেইকা আজই আসছে, উনি কইলেন কি নাকি সব গোলাগুলি কইরা মানুষ মারা হইসে?
জুলকারনাইনঃ (রাগত স্বরে) এই মিয়ারা বেশী বুঝে! আমি সাত গেরামের মইধ্যে পলিটিক্স করি, আর আমি জানি না? আরে... দেশের শান্তি নষ্ট করলে সরকার তো এদের একটু টাইট দিবই, না কী!
মনিরাঃ রাবিদ তো হলে থাকে। ওরে নিয়াই আমার যত চিন্তা, ভাইজান। তাই আপনার কাছে আসছিলাম পাকা খবরটা শুনতে।
জুলকারনাইনঃ আপনি কিস্সু চিন্তা কইরেন না, ভাবীসাব। গুজবে যত মাতবেন, তত দিলের মইধ্যে পেরেশানী বাড়বো। ঢাকায় তেমন কিছুই হয় নাই। রাবিদ বাবাজীও ভালই আসে ইনশাল্লাহ্। আপনি নিশ্চিন্তে বাড়িত যান।
তেমন তেমন কিছু হইলে আমি নিজে গিয়া বাবাজীর খোঁজ নিয়া আইতাম, না কী!
মনিরাঃ (সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে)... ঠিক আছে, আমি তাইলে আসি... ওদিকে চুলায় আবার ভাত চড়াইয়া আইসি...
জুলকারনাইনঃ হাঁ, হাঁ... কোন চিন্তা কইরেন না। আমি তো আছিই!
মনিরা ফিরতি পথে হাঁটা ধরে। জুলকারনাইনের রিএ্যাকশান।
কাট
দৃশ্যঃ ৭/রাত/রেবেকার বাড়ি (রেবেকা, মনিরা, রাবিদ)
মনিরা বিষন্ন মুখে বিছানার এক কোণে একটা হাত ঠেকিয়ে বসে আছে। রেবেকার প্রবেশ।
রেবেকাঃ ভাত বেড়েছি মা। এসো খেয়ে নেই।
(মনিরার নিরবতা। )
রেবেকাঃ দুপুরেও তো তেমন কিছু খেলে না। এভাবে বসে থাকলে চলবে?
মনিরাঃ রাবিদ তো এখনও যোগাযোগ করলো না।
পোলাটা কই আছে, কি করতেসে...
রেবেকাঃ ভাইয়া কচি খোকা নয়, মা! মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে আছে। এখন ও যথেষ্ঠ বড়। আর ঢাকাতে তেমন কোন সিরিয়াস গন্ডগোল হলে নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বাড়ি চলে আসতো। ওকে তো তুমি চেনই, যা ভীতুর ডিম একটা! হাঃ হাঃ হাঃ... তাছাড়া জুলকারনাইন চাচা তো বললেনই... ঘটনা তেমন সিরিয়াস কিছু নয়।
মনিরাঃ সবই তো বুঝলাম।
তবু মায়ের মন... ও তুই বুঝবি না।
রেবেকাঃ থাক, এতো রাতে বুঝতেও চাই না। খিদা পেয়েছে...এসো তো মা!
(মনিরা উঠে দাঁড়াতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। মনিরা ও রেবেকা পরষ্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। )
রেবেকাঃ কে?
রাবিদঃ (অফ ভয়েস) দরজা খোল।
মনিরাঃ (স্বগতঃ) রাবিদ!
(রেবেকা ছুটে যেয়ে দরজা খুলে। রাবিদ প্রবেশ করে। রাবিদের কাঁধে একটা ব্যাগ, চুল উস্কখুস্ক, চোখে মুখে একটা বিধ্বস্ত ভাব। রাবিদ ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ধপাস করে বসে পড়ে। মনিরা ও রেবেকা হতভম্ব হয়ে রাবিদকে দেখে।
)
রাবিদঃ (রেবেকাকে) পানি খাবো।
(রেবেকা দ্রুত ফ্রেইম আউট হয়। )
মনিরাঃ (রাবিদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে) রাবিদ... বাপধন আমার... তুই ঠিক আছস তো? তোরে এমন ম্যারা ম্যারা দেখায় কেন?
রাবিদঃ আমি ঠিক আছি মা। কোন চিন্তা করো না।
মনিরাঃ শুনলাম ঢাকায় নাকি...
(এই সময় রেবেকা এক গ্লাস পানি হাতে ফ্রেইম ইন ক’রে রাবিদের হাতে দেয়।
রাবিদ এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু খেয়ে গ্লাসটা রেবেকাকে ফিরিয়ে দেয়। )
রাবিদঃ আমি পালিয়ে এসেছি মা, কোন মতে জানটা হাতে নিয়ে পালিয়ে এসেছি।
রেবেকাঃ এসব তুমি কী বলছো, ভাইয়া!
রাবিদঃ ঠিকই বলছি, রেবেকা! রাতের অন্ধকারে ওরা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। আমাদের ইকবাল হল, জগন্নাথ হল সহ অন্যান্য হলে ঢুকেও পাখি শিকারের মতো ছাত্রদের উপর গুলি করলো।
মনিরাঃ (ফুঁপিয়ে উঠে) তুই ঠিক আছস তো, বাপধন?
রাবিদঃ (জোর করে হেসে) দেখতেই তো পাচ্ছো, ঠিক আছি কি না।
রেবেকাঃ তুমি কিভাবে পালিয়ে এলে ভাইয়া?
রাবিদঃ ভাগ্যিস আমি গতকাল রাতে হলে ছিলাম না! কাঠালবাগানে আমার এক বন্ধুর বাসায় গ্রুপ স্টাডি করতে যেয়ে দেরী হয়ে গেল বলে রাতটা ওখানেই ছিলাম। মাঝরাত থেকে শুরু হলো গুলির শব্দ। সকালে শুনি সারা শহরে কারফিউ জারী করেছে। চারদিক থেকে আর্মিদের মানুষ মারার খবর আসতে লাগলো। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঢাকা ছেড়ে পালাতে হবে।
মনিরাঃ (কাঁদতে কাঁদতে) একদম ঠিক কাজটা করছোস, বাবা!
রাবিদঃ দুপুরে এক ঘন্টার জন্য কারফিউ ছাড়লো। তখনই আমরা ক’বন্ধু মিলে অনেক কষ্টে একটা রিকশা ম্যানেজ করে সোজা বছিলায়। ওখান থেকে নৌকা করে আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে বড় রাস্তায় উঠে একটা বাস পেলাম। বাসে প্রচন্ড ভীড়... সবাই পালাচ্ছে ঢাকা ছেড়ে, মা!
মনিরাঃ কিন্তু তোর জুলকারনাইন চাচা যে কইলো ঢাকায় নাকি তেমন কিসুই হয় নাই?
রাবিদঃ জুলকারনাইন চাচা যে রাজনীতি করে, তাতে উনি এই কথাই বলবে, মা।
রেবেকাঃ দীপ্তির মামা তাহলে ঠিকই বলেছিল।
রাবিদঃ দীপ্তির মামা?
রেবেকাঃ আজ দুপুরে উনি ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছেন। উনার মুখেই ঢাকার গোলাগুলির কথা দীপ্তিরা জানতে পারে। দুপুরেই ও আমাদের এসে খবরটা জানিয়ে গেল।
মনিরাঃ সেই থেইকাই তো তোরে নিয়া আমার দুঃশ্চিন্তার শেষ নাই!
রাবিদঃ দুঃশ্চিন্তার আর কিছু নেই, মা। আমি তো এসেই পড়েছি।
পলিটিকাল স্ট্যাবিলিটি ফিরে না আসা পর্যন্ত আর ঢাকায় ফিরছি না। ইউনিভার্সিটিও আবার কবে খুলবে, কে জানে।
মনিরাঃ হইসে, তোরে আর কোত্থাও যাইতে দিতেসি না। আমি যাই, তোর ভাত বারি গিয়া। তুই ততক্ষণে গোসলটা সাইরা ফালা।
(মনিরা ফ্রেইম আউট হবে। )
রেবেকাঃ ঢাকার অবস্থা তাহলে এতোটাই খারাপ, ভাইয়া?
রাবিদ দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠে। রেবেকার রিএ্যাকশান।
কাট
দৃশ্যঃ ৮/রাত/রেবেকার বাড়ি (মনিরা, রাবিদ)
বিছানায় টানটান করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে রাবিদ। মাথার পাশেই একটা টুলে হারিকেন রাখা আছে।
হারিকেনের আলোয় সারা ঘরে একটা আলো-ছায়া খেলা করছে। রাবিদ হারিকেনের আলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই সময় মনিরা ফ্রেইম ইন করে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়।
মনিরাঃ ওখনো জাইগা আছস যে?
রাবিদঃ ঘুম আসছে না, মা।
(মনিরা বিছানায় রাবিদের পাশে বসে ওর কপালে হাত রাখে।
)
মনিরাঃ জ্বর-টর আসে নাই তো?
রাবিদঃ (হেসে) তুমি মা অহেতুক আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করো। বাড়ি ফিরে এখন আমি একদম নিশ্চিন্ত আছি।
মনিরাঃ দুঃশ্চিন্তা কি আর সাধে করি, বাবা! তোর বাপ মরনের পর রেবেকা আর তুই ছাড়া আমার আর কে আছে, বল? ভাগ্যিস উনি বিঘা দুই জমি রাইখা গেসিলেন। না হইলে...
রাবিদঃ থাকনা ওসব কথা!
মনিরাঃ তোর চাচা ফুফুরাও তো আর ফিইরা দেখে না। উপরে আল্লা আসে, উনি সব দেখতেসেন।
রাবিদঃ মা!
মনিরাঃ কি, বাবা?
রাবিদঃ তুমি হয়তো বুঝতে পারছো না, কিন্তু... কিন্তু দেশে এখন ঘোর বিপদ! শুনেছি গতরাতে নাকি হাজার হাজার মানুষকে আর্মিরা গুলি করে মেরেছে... তারমধ্যে প্রচুর ছাত্রও নাকি আছে। বাঙালীরা নাকি এরই মধ্যে ফুঁসে উঠছে।
মনিরাঃ রাবিদ!
রাবিদঃ একটা কিছু ঘটতে চলেছে, মা! ভয়ঙ্কর একটা কিছু ঘটতে চলেছে!
মনিরাঃ চুপ কর! চুপ কর! এইসব অলক্ষুণে কথা কইতে নাই!
রাবিদঃ ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম, মা! ঢাকা যেন এখন একটা ভুতের শহর। এই প্রেতপুরী থেকে যে যেভাবে পারছে, ছুটে পালাচ্ছে। পাক আর্মিরা কাউকে রেহাই দেবে না।
মনিরাঃ হে আল্লাহ্! এইসব তুই কী কস্!... শোন বাবা, অবস্থা একদম ভালো না হওয়া পর্যন্ত তুই আর কোত্থাও যাইতে পারবি না!
রাবিদঃ (হেসে) যাচ্ছি না, মা। আমি বাড়িতেই থাকবো। এবার যাওতো, ঘুমাতে যাও। আমি ভীষণ টায়ার্ড।
মনিরা রাবিদের মাথায় আরেকবার হাত বুলিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে প্রস্থান করে।
রাবিদ হারিকেনের আলোর দিকে তাকিয়ে সলতেটা একবার বাড়াতে থাকে, একবার কমাতে থাকে, বাড়াতে থাকে, কমাতে থাকে।
কাট
দৃশ্যঃ ৯/দিন/পুকুর পাড় (রাবিদ, দীপ্তি)
পুকুর পারে শূণ্য দৃষ্টি মেলে ধরে দীপ্তি বসে আছে। অফ ভয়েসে রাবিদের কন্ঠ শুনা যাচ্ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে থেকে থেকেই পানিতে কিছু একটা পড়ার টুপটাপ শব্দ শুনা যাবে।
রাবিদঃ (অফ ভয়েস) আচ্ছা, আমি বাড়িতে এসেছি কতদিন হয়ে গেল, বলো তো?
দীপ্তিঃ তুমিই বলো।
রাবিদঃ (অফ ভয়েস) তা প্রায় দেড় মাস! এই দেড় মাসে তোমার সাথে আমার কয়বার দেখা হয়েছে, বলতে পারো?
দীপ্তিঃ গুনে তো দেখিনি। তবে আমি তো প্রায়ই যাই তোমাদের বাসায়। তুমিও তো বাবা মা কে সালাম জানাবার অজুহাতে বেশ ক’বার এলে আমাদের বাড়ি।
(এবার রাবিদকে ক্যামেরায় দেখা যাবে ইটের চারা হাতে নিয়ে পুকুরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে বেঙাচী খেলা খেলছে। রাবিদ শেষ চারাটি পানিতে ছুঁড়ে মেরে হাত ঝেরে দীপ্তির পাশে এসে বসে।
)
রাবিদঃ হায় রে বালিকা! আমি সেই দেখার কথা বলছি বুঝি?
দীপ্তিঃ আমার আর রেবেকার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাটা এবার আর দেওয়া হবে না বলে মনে হচ্ছে।
রাবিদঃ (হতাশ কন্ঠে) কিসের মধ্যে কী! আরে বাবা, আমারও তো মাস্টার্স ফাইনাল কবে হয়, তার ঠিক নেই। তাই বলে কি একটু প্রেম-টেমও করা বারন? হাঃ হাঃ হাঃ...
দীপ্তিঃ তুমি এমন একটা সময়ও হাসতে পারো?
রাবিদঃ কেন পারবো না? আমি হচ্ছি আলবেয়ার কামু’র সেই এবস্ট্র্যাক্ট হিরো... জীবনটা যেভাবে সামনে এসে দাঁড়াবে, তাৎক্ষণিক ভাবে সেভাবেই সেটাকে উপভোগ করা... হাঃ হাঃ হাঃ...
দীপ্তিঃ আলবেয়ার... সেটা আবার কে?
রাবিদঃ ও তুমি বুঝবে না। (আবৃত্তি)... “ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা, সকলই বোঝে, শুধু কবিতা বুঝে না”... হাঃ হাঃ হাঃ...
দীপ্তিঃ এখন বুঝি কবিতা বুঝবার সময়? তুমি দেখতে পাচ্ছো না, চারদিকে কি ঘটছে?
রাবিদঃ পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি।
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু হয়েছে। একদল নিরস্ত্র মানুষ একটা সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার রোমান্টিক উন্মাদনায় মেতে উঠছে। রাবিশ!
দীপ্তিঃ তুমি এটাকে রাবিশ বলছো? বাঙালীদের এতোদিনের জমে থাকা ক্রোধ, প্রতিবাদ- এসবের কোন মূল্য নেই?
(রাবিদ এই সময় হঠাৎ হাত দিয়ে দূরের কোথাও ইঙ্গিত করে। )
রাবিদঃ দেখ দেখ... ওটা ইস্টিকুটুম পাখি না?
দীপ্তির রিএ্যাকশান।
কাট
দৃশ্যঃ ১০/রাত/রেবেকার বাড়ি (রেবেকা, রাবিদ, মনিরা)
মেঝেতে পাটি বিছিয়ে রাবিদ, রেবেকা ও মনিরা ভাত খাচ্ছে।
মনিরাঃ (রাবিদকে) আরেকটু মাংস নে না! (রেবেকাকে) ওই রেবু, তোর ভাইরে বাটিটা আগায়া দে!
রাবিদঃ না মা, আর না। ... উম্ম্... ডালটা জব্বর হইছে!
মনিরাঃ ভালো কইরা খা। হোস্টেলে কী সব ছাইপাশ খাস, আমি তো চিন্তায় মরি।
রাবিদঃ হোস্টেলের ডাল একটা দেখার মতো জিনিস, মা! এতই পাতলা যে অনায়াসে তুমি দুইবার ডুবসাঁতার দিয়ে ভেসে উঠতে পারবে...হাঃ হাঃ হাঃ...
রেবেকাঃ মোল্লা বাড়ির রুদ্র ছেলেটা যুদ্ধে গেছে।
(রেবেকার হঠাৎ এই উক্তিতে কিছুক্ষণ নিরবতা নেমে আসে।
)
রাবিদঃ মানে?
রেবেকাঃ রুদ্রকে মনে নেই? তোমাদের ফুটবল টীমের ক্যাপ্টেন ছিল যে।
রাবিদঃ তোকে কে বললো কথাটা?
রেবেকাঃ ভাইয়া, কথাটা তুমিও জানো। এই অঞ্চলের আরো অনেক ছেলেই যে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে গ্রামছাড়া হচ্ছে, এটা তো সবাই দেখছে।
(রাবিদ নিরবে ভাত খেতে থাকে। )
মনিরাঃ হাতিরদীঘি গ্রামে... ওই যে... আমাগো দুই গ্রাম পরে... ওইখানে নাকি মিলিটারি ক্যাম্প ফেলসে?
রাবিদঃ মা, এসব নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেই কি চলে না?
মনিরাঃ আমি কি আর সাধে এইসব শুনতে যাই,বাবা? বাতাসের আগে এইসব কথা সারা গ্রামে চাউর হইয়া যায়।
(কিছুক্ষণ নিরবতা। )
রাবিদঃ রুদ্র তো ওর মায়ের একটাই সন্তান বলে জানি। মাকে একা ফেলে এভাবে দেশোদ্ধার করতে যাবার কোন মানে হয়?
রেবেকাঃ এইটা হয়তো সময়ের দাবী, ভাইয়া।
রাবিদঃ হবে হয়তো। আমি বাবা এসবের মধ্যে নেই।
রাইফেল, রক্ত, খুনাখুনি- এসব আমি সহ্য করতে পারি না!
মনিরাঃ (হাত ধুতে ধুতে) এই, তোরা খা তো! সময় ভালো না। অযথা এইসব নিয়া আলাপ করা আমার ভালো লাগে না।
মনিরা প্লেট নিয়ে উঠে ফ্রেইম আউট হয়। যেন কিছুই হয়নি- এই ভাব করে রাবিদ খেয়ে চলে। রেবেকার রিএ্যাকশান দেখানো হবে।
কাট
(চলবে)
নাটকটির লিঙ্ক এখানে
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।