বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন অন্যতম আত্মগর্বী, ক্ষমতালিপ্সু ও হঠকারী সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন জেনারেল মইন উ আহমেদ–যিনি ব্যক্তিস্বার্থে নিজের অবস্থান, ক্ষমতা ও সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছেন যথেচ্ছভাবে। ১/১১-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় তাঁর ভূমিকা পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়েছে।
এক ধরনের 'হিরো সিন্ড্রোমে' আক্রান্ত জেনারেল মইন বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিজেকে দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভাবতে শুরু করেছিলেন। তিনি দৃশ্যত সরকারপ্রধানের সমকক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যা তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন, দেশে বিদেশে সরকারপ্রধানের সমপর্যায়ের প্রটোকল ভোগ করা, গণমাধ্যমে সরকারপ্রধানের সমান গুরুত্ব দিয়ে তার কর্মকাণ্ডের সংবাদ প্রচারের ব্যবস্থা করা, সিডর-দূর্গতদের সাহায্যার্থে সরকারপ্রধানের মতো ত্রাণ তহবিল গঠন করে ত্রাণ গ্রহণ করা, ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছিল।
একই সাথে তিনি সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত, পক্ষপাতদুষ্ট, অবিবেচনাপ্রসূত ও অদূরপ্রসারী বিভিন্ন অসামরিক কর্মকাণ্ড যেমন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, অবৈধ দখল মুক্তকরণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদিতে সম্পৃক্ত করেছিলেন।
একজন সেনা কর্মকর্তা তথা সরকারী চাকুরীজীবী হয়েও তিনি সেনা আচরণবিধি ও প্রজাতন্ত্রের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন অবৈধ কার্যকলাপ যেমন, সভা-সেমিনারে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান, একদিকে জরুরী অবস্থার দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিজিএফআই ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে 'মাইনাস টু' ফর্মুলার বাস্তবায়ন ও বিরাজনীতিকরণের অপপ্রয়াস, ইত্যাদিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এমনকি একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সরকারী চাকুরিতে থাকা অবস্থায় তিনি আচরণবিধি লংঘন করে স্বরচিত 'শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ' নামের বই প্রকাশ করেছেন।
তার এসব এখতিয়ার-বহির্ভূত, অপরিণামদর্শী ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে গোটা সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালে তার এসব অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরূদ্ধে প্রশ্ন করার সাহস বা সুযোগ সেনাবাহিনীর ভেতরে বা বাইরে কারো ছিল না (অবশ্য সেনাবাহিনী্তে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার আদেশ নির্দেশ অমান্য কিংবা সমালোচনা করার কোন সুযোগ নেই)। অথচ এর দায়ভার বহন করতে হচ্ছে সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সাধারণ কর্মকর্তা ও জওয়ানদের।
অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ এই সাবেক সেনাপ্রধানের সর্বশেষ কীর্তি ছিল–সেনাবাহিনীর দক্ষ ও চৌকষ সাতজন কর্মকর্তার চাকুরিচ্যুতি। তাদের অপরাধ¬–তারা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনাকুঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর দরবারে 'কথা' বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী, যিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর অভিভাবকও বটে–তাঁর কাছে সেদিন শত শত সেনা কর্মকর্তা হৃদয়বিদারক পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তাদের কষ্টের কথা, তাদের ক্ষোভ ও অভিযোগের কথা জানিয়েছিলেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার এবং শহীদ পরিবারসমূহের জন্য বিভিন্ন ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছিলেন।
সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মন্তুদ ও নৃশংস এই ঘটনায় প্রায় চোখের সামনে ৫৭ জন প্রিয় সহকর্মীর অসহায় ও করূণ মৃত্যু, তাঁদেরকে রক্ষা করতে না পারার বেদনা ও হতাশা এবং নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পত্নীদের সম্ভ্রম হারানোর কষ্ট ও লজ্জার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সেদিন সেনাকুঞ্জে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
আর এই অপরাধে সাবেক সেনাপ্রধান শাস্তিস্বরূপ শত শত কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য আবশ্যক চলমান প্রশিক্ষণ কোর্সসমূহ স্থগিত করে তাদের ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছেন; অনেক কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে দ্রুতবদলি করেছেন এবং সর্বশেষ, অবসরে যাবার ঠিক পূর্বমূহুর্তে সাতজন কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার আগেই কী করে এই জঘন্যতম অপরাধের বিচার দাবিকারী সেনা কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল? অথচ সেদিন সেনাকুঞ্জে যে সব সেনা কর্মকর্তা কথা বলেছিলেন, তাদের বক্তব্য ছিল প্রায় প্রতিটি সেনাসদস্যের প্রাণের দাবিরই প্রতিধ্বনি। সেনা কর্মকর্তাদের এই চাকুরিচ্যুতি ও অন্যান্য শাস্তির ঘটনা সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের জন্ম দিলেও এর চেয়ে কঠোর শাস্তির ভয়ে তাদের মুখ খোলার উপায় নেই।
জেনারেল মইন চলে গেলেও সেনাবাহিনীতে তার অনুসারী, একই মানসিকতাসম্পন্ন, উচ্চাভিলাষী ও রাজনৈতিক সরকারের কাছে অন্যায্য সুবিধাপ্রত্যাশী অনেক পদস্থ ও প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা এখনও আছে। এর প্রমাণ–ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাসদস্যরা যাতে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, সেজন্য পরবর্তীতে আরও পাঁচজন অফিসারকে ব্যারিস্টার তাপসের ওপর বোমা-হামলার ঘটনায় ফাঁসিয়ে চাকুরিচ্যুত ও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’র ব্যবস্থা করা হয়।
তৎকালীন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মইন পিলখানা ঘটনার দায়ভার কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। দীর্ঘ ৩৩ ঘন্টা ধরে পিলখানার ভেতরে যখন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, গণধর্ষণ ও লুটতরাজ সংঘটিত হচ্ছিল, তখন সেনাবাহিনীর সেই ক্রান্তিলগ্নে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দানের জন্য জেনারেল মইনকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। এমনকি এই ঘটনার পর সেনাবাহিনীর মনোবল যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল–তখন বাহিনীর প্রধান হিসেবে তার কর্তব্য ছিল সেনাসদস্যদের মনোবল ও আস্থা পূনরূদ্ধার করা। কিন্তু তা না করে তিনি একটি বিশেষ মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তিনি পিলখানার ঘটনা তদন্তে গঠিত সেনা তদন্ত দলের সদস্যদের মুখ বন্ধ রাখার লিখিত শপথ করিয়েছিলেন? সেই তদন্ত প্রতিবেদনে কী আছে, তা এখনও কেন প্রকাশ করা হয়নি? পিলখানা হত্যকাণ্ডের ঘটনা ও পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম তো সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ইস্যু।
শেষ পর্যন্ত পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ, পূর্ণ তদন্ত ও প্রকৃত মদতদাতাদের সুষ্ঠু বিচার হবে কিনা–এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সিআইডি'র প্রধান তদন্ত কর্মকর্তার অতীত ইতিহাস, তদন্তকাজে দীর্ঘসূত্রিতা, তদন্তের শুরুতেই জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতা আবিষ্কারে তদন্ত সমন্বয়কারী মন্ত্রীর অতিউৎসাহ, তদন্তকাজের রাজনৈতিকায়ন, সেনাতদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির বিরূপ প্রতিক্রিয়া, বিডিআর বিদ্রোহের অনেক আগে থেকেই এর সাথে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির সংশ্লিষ্টতার কথা বার বার উঠে এলেও ‘এখতিয়ার-বহির্ভূত’ বলে তদন্তে বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, সরকারী তদন্ত দলের প্রতিবেদন নিয়ে নানা প্রহসন এবং সরকারী তদন্ত দলের সদস্য হিসেবে বিশেষ মহলের ইচ্ছানুযায়ী সাজানো ছকে তদন্ত করতে রাজি না হওয়ায় একজন উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তাকে পরবর্তীতে ‘সাইজ’ করা–এসব কারণে আশংকা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত এ বর্বরোচিত অপরাধের আসল ষড়যন্ত্রকারী ও মদতদাতারা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরেই।
পড়ুন:
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো
শুনুন:
সেনাকুঞ্জের সেই এক্সক্লুসিভ অডিও টেপ
চোখ রাখুন:
এক ক্যাপ্টেনের ব্লগ
বাংলাদেশ ২০৭৫
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।