কবে যাবো পাহাড়ে... কবে শাল মহুয়া কণকচাঁপার মালা দেব তাহারে....
১ম পর্ব: Click This Link
কোন লেখা continue করার ব্যাপারে আমি খুবই অপটু। অনেক কিছু লিখেছি জীবনে। কিন্তু, দুই-তিন পাতা লেখার পরে উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। আবার নতুন কিছু শুরু করি। কোনটাই শেষ হয়না।
দেখা যাক- এইটার কি অবস্থা দাঁড়ায়।
---------------------------------------------------------
এখানে আসার কিছুদিন পরেই আমি বাংলাভাষী লোক খুঁজতে শুরু করি। বাংলা বলার জন্য প্রাণ আঁকুপাকু করে, কিন্তু কথা বলার মানুষ পাই না। আইওয়া হচ্ছে একটা মিডওয়েস্টার্ন স্টেট। কোন এক আমেরিকান ছাত্র উপহাস করে আইওয়াকে ‘ডাইভার্সিটি ক্যাপিটাল ওফ ইউনাইটেড স্টেটস’ আখ্যা দিয়েছিল।
আসলেই, এর চেয়ে বড় ঠাট্টা বোধ হয় আইওয়াকে নিয়ে করা সম্ভব নয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী ছাত্র শতকরা ৬ ভাগ। তাও, গত বছরের তুলনায় এটা তিন গুণ বেশি! ওআইএসএস (Organization for International Students and Scholars) তো রীতিমত ঢোল বাজিয়ে তাদের সাফল্যের কথা জাহির করে বেড়াচ্ছে! এক বছরে বিদেশী ছাত্রের সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি করা- চাট্টিখানি কথা নয়!
ব্যাংকে যখন একাউন্ট খুলতে গেলাম, Andy নামে একজন ব্যাংক রিপ্রেজেন্টেটিভ আমার কাজগুলো করল। তারপর আমাকে নিয়ে গেল দেয়ালে গাঁথা বিশাল বড় একটা ম্যাপের কাছে। পুরো পৃথিবীর ম্যাপ।
ও বলল, এ ব্যাংকে যারাই একাউন্ট খোলে, এই ম্যাপে নিজের দেশের গায়ে একটা করে পিন গেঁথে দেয়। আমি হলাম প্রথম ব্যাক্তি, যে বাংলাদেশের গায়ে একটা পিন ফোঁটাল। এমনকি, আমার ডিপার্টমেন্টেও আমি ইতিহাসের প্রথম বাংলাদেশী ছাত্র! কাজেই, বাংলাদেশী খুঁজে পাওয়ার আশা মোটামুটি ছেড়ে দিলাম।
কি মনে করে যেন একদিন ফেসবুকে ‘Dhaka, Iowa City’ লিখে সার্চ দিলাম। অম্রিতা নামে একটা মেয়ের প্রোফাইল উঠে আসল।
পরম উৎসাহের সাথে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। তার সাথে মেসেজ। যাই হোক, অম্রিতাদের পরিবারের সাথে পরিচিত হতে পেরে আমি খুবই ভাগ্যবান। অন্তত, এ বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজের দেশের লোক তো পাওয়া গেল!
এর মধ্যে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেলো। ‘pleasant surprise’ বলে একটা জিনিস আছে, কিন্তু, আমার সাথে যে ঘটনাটা ঘটল, সেটাকে বরং আমি ‘pleasant shock’ বলতেই পছন্দ করব।
ঘটনাটা হল একটা ফেসবুক মেসেজ; প্রেরক- আনিসুল হক। সাহিত্যিক এবং কলামিস্ট আনিসুল হক! আমি প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মেসেজের সারমর্ম হচ্ছে যে তিনি ১০ সপ্তাহের জন্য আইওয়া আসছেন ইন্টারন্যাশনাল রাইটারস ওয়ার্কসপ এ যোগ দিতে। তাই তিনি এখানকার বাংলাদেশীদের সাথে যোগাযোগ করতে চান। তিনি এখানে আসার পরে তাঁর সাথে বেশ কয়েকবার দেখা হয়।
একবার অম্রিতাদের বাসায়ও দাওয়াত পাই আমরা। অনেক আড্ডাও হয়। কিন্তু, আমি তাঁকে এত কাছে পেয়েও বেশি সময় কাটাতে পারিনি ওঁর সাথে। কারণ, তখন আমি হোমওয়ার্ক আর মিডটার্মের অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি।
এখানে আমার বেশ একটা বন্ধুমহল তৈরি হয়ে গেছে।
কিছু ভারতীয় বাঙালী এবং অবাঙালী (অবাঙালীরা মূলত তেলেগু), শ্রীলংকান, রাশান এবং চাইনিজ। স্বভাবে আমি মোটেই নিরীহ নই, অন্তত আমার জিহ্বাটা একেবারে শান দেয়া। মুখে আমার বলতে বাধে- এমন কথা বোধ হয় মানবজাতি এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি ইংরেজীর ভাষার ওপর কিছুটা দখল এনে বাংলা সমস্ত গালি, অশ্লীল জোক- সব একে একে ছাড়তে থাকি বন্ধু মহলে। ভদ্রতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে ওদেরও সময় লাগেনা।
কিছুদিনের মধ্যেই দেখি, আমি যা বলছি, তাতে তালে তাল মিলিয়ে ওরাও যা মুখে আসছে বলে চলেছে! এখন আমরা হোহো করে উচ্চৈস্বরে হাসি, ক্লাসের মধ্যে ঝগড়া করি, মারামারি করি, একে অপরকে টিটকারি মেরে, অপদস্ত করে,… ক্লাসরুমটাকে একেবারে দোজখ বানিয়ে ছেড়ে দেই প্রায়ই।
আমেরিকা সম্পর্কে আমার একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিলঃ এরা বার্গেনিং বা দামাদামি- জিনিসটা বোঝেনা। ওরা সব একদাম-এ কিনতে অভ্যস্ত। কথাটা অনেকাংশে সত্যি। কিন্তু সর্বাংশে নয়।
অন্তত, আমার ছোট খালুর ক্ষেত্রে তো মোটেই নয়। খালা-খালুরা আমার বাসায় বেড়াতে আসলেন। সবাই মিলে শপিং-এ গেলাম। ছোট ভাইটার একটা টুপি পছন্দ হল। দোকানী দাম হাঁকাল ২৫ ডলার।
খালু বলে উঠলেন, ‘দাম অনেক বেশি। তুমি দু’টো যদি ২৫ ডলারে দাও, তাহলে নিতে পারি’। আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, যে এই গাউসিয়া-নীলক্ষেত স্টাইলের দামাদামি দেখে দোকানীর চোয়াল ঝুলে পড়বে। কিন্তু, কিছুই হল না! সে অত্যন্ত স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠল, ‘দু’টো ৩০ ডলারে নিতে পারো। এর কম হবেনা!’ এবার আমার চোয়াল ঝুলে পড়ার পালা।
আমেরিকার একটা শপিং মলে এহেন বার্গেনিং হতে পারে- নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। শেষমেষ একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছালামঃ আসলে আমেরিকান ক্রেতারাই দামাদামি করতে জানেনা।
আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হল- একই ব্রান্ডের একই জিনিসের দাম পাঁচ দোকানে পাঁচ রকম হতে পারে। coral ridge mall এর scheels এ north face এর যে জ্যাকেটটার দাম ২৫০ ডলার, সেটাই kohls বিক্রি করছে ৩৩% ছাড় দিয়ে! তাও আবার scheels এর ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসে! শুধু তাই নয়, Kohls এর সদস্য হলে আরো ১৫% অতিরিক্ত ছাড় পাওয়া যাবে। আমি গত দু’মাস ধরে scheels কে ওই জ্যাকেট ২৫০ ডলারেই বিক্রি করতে দেখছি।
ওদের কোন ভ্রুক্ষেপই নেই! ব্যবসায় যে প্রতিযোগিতা বলে একটা জিনিস আছে- সেটা কি ওরা জানেনা নাকি! আরো অদ্ভুত ব্যাপার আছে। আপনি একটা জিনিস কিনে নিয়ে এক সপ্তাহ ব্যবহার করে ফেরত দিয়ে আসতে পারেন। ওরা পুরো টাকা আপনাকে ফেরত দিয়ে দেবে। আবার সেটা ব্যবহার করতে গিয়ে যদি ভেঙে যায়, বা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আপনি দাবি করতে পারেন যে পণ্যটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তাই এরকমটি হয়েছে।
ওটাও ওরা ফেরত নেবে!
আমার স্কুলের বন্ধু কর্ণেল। ………… রিল্যাক্স! ও কোন সেনাসদস্য নয়। কর্ণেল ওর নিক। যেমন আমার নিক ছিলো আমার নামেরই একটা বিকৃত রূপ। ‘অনীক’ থেকে ‘অনেক’, তারপর ‘ইকবাল’ এর ‘ইক’ ফেলে দিন! সে যাই হোক, কর্ণেল এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছে।
সে সবসময় একসাথে তিন ক্রেট (crate) পানীয় কেনে (কোকাকোলা, স্প্রাইট, ফান্টা, ইত্যাদি)। কারণ, দু’টো কিনলে একটা ফ্রি। কাজেই, তিনটা কিনলে Wal-Mart দু’টোর দাম চার্জ করে। এক রাতে ও কেনাকাটা শেষে দেখে, ওরা তিনটির দামই চার্জ করেছে। সে জিজ্ঞেস করল, দু’টো কিনলে একটা ফ্রি- এ অফারটা কি আর নেই নাকি? ওদের উত্তর: ‘না! এখন দু’টো কিনলে তিনটি ফ্রি।
কাজেই, তুমি যদি একসাথে পাঁচ ক্রেট নাও, তাহলে দু’টোর দাম রাখতে পারি। টাকা ফেরত পেতে চাইলে আরো দুই ক্রেট নিতে হবে!’ কর্ণেল বলল, আমি তো এতগুলো নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় যেতে পারব না। আমি তো দুটো কম নিলে তোমার দোকানেরই লাভ! কিন্তু, দোকানীও গাড়ল। কিছুতেই বুঝল না। অগত্যা ওকে পাঁচ ক্রেটই নিতে হয়েছিল।
একবার আমার এক বন্ধুকে ব্যাংক ৩৫ ডলার চার্জ করে ওভারড্রাফট ফি হিসেবে; অর্থাৎ, ওর একাউন্টে টাকা না থাকা সত্তেও সে কার্ড ব্যবহার করে টাকা খরচ করেছে। তাই তাকে এ সাজা দেয়া হয়েছে। সে বন্ধু তখন সোজা ব্যাংকে গিয়ে ৩৫ ডলার ফেরত চাইল! তার যুক্তি: আমি এ দেশে নতুন। আমি অতসব নিয়মকানুন জানতাম না। জানলে তো এমনটি করতাম না।
আমি একজন ছাত্র, খুব কম টাকা রোজগার করি। আমাকে এহেন অতিরিক্ত টাকা চার্জ করা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়! মজার ব্যাপার হল, ব্যাংক সাথে সাথে তার ওই টাকা ফেরত দিয়ে দেয়!
(to be continued)
৩য় পর্ব: Click This Link
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।