আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাংলা কবিতার মহাপুরুষ

'ঝকঝকাঝক ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ঐ, ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই...' কিংবা 'স্বাধীনতা তুমি' অথবা 'উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ'_ সব বয়সীদের জন্য এমন অসংখ্য কালজয়ী রচনা রেখে গেছেন আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান। আজ তার জন্মদিন। ১৯২৯ সালের আজকের দিনে পুরান ঢাকার ৪৬ নম্বর মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন কবি। সেই বাড়িটি কোনো রাজভবন ছিল না! ছিল না কোনো রাজকীয় আয়োজন। কিন্তু কে জানত আটপৌরে এক মাটির ঘরেই জন্ম নিতে যাচ্ছেন বাংলা কবিতার মহাপুরুষ! নিজের অসামান্য প্রতিভা আর ভালোবাসা দিয়ে সারা বাংলার মানুষকে বেঁধে ফেলেছিলেন একই গ্রন্থিতে।

কবিতা কত আপন, কত সরল আর সাবলীল হতে পারে শামসুর রাহমানের কবিতা না পড়লে সেটা জানা যাবে না কখনোই। ১৭ আগস্ট কবির প্রয়াণ দিবস। এই দিনে সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তাদের প্রিয় কবিকে।

কবির ডাক নাম ছিল বাচ্চু। পুরান ঢাকার মাহুতটুলীর নানার কোঠাবাড়িতে জন্ম নেওয়া কবির পৈতৃক নিবাস ছিল সাবেক ঢাকা জেলার রায়পুরা থানার অন্তর্গত মেঘনা তীরবর্তী পাড়াতলী গ্রাম।

নিবিড় সবুজে অাঁকা চরাঞ্চলে অন্তত কিছুটা পথ হলেও পাড়ি দিতে হয় নৌকায়। শামসুর রাহমানের বাবা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী ছিলেন তার দাদার চতুর্থ ছেলে। ব্রিটিশ আমলে কিছুদিন তিনি সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ ছিলেন। পুলিশের চাকরি ছেড়ে ব্যাংকের চাকরি, ঠিকাদারি এবং সিনেমা হল ব্যবসায় টাকা খাটিয়েছেন। আর তার মা ছিলেন মোসাম্মেত আমেনা খাতুন।

আস্তে আস্তে কবি মনের বিকাশ ঘটলেও শামসুর রাহমানের শৈশব কেটেছে সাহিত্যছুট পরিবেশে। সংগীত ও চিত্রকলা সম্পর্কে পরিবারের কারও মধ্যেই কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে শৈশবে তিনি পুরান ঢাকার কিছু সংস্কৃতির ছোঁয়া পেয়েছিলেন। তার মহল্লায় কাওয়ালি ছাড়াও বাড়িতে মেরাসীনদের গান বলে এক ধরনের মেয়েলি গীতের চল ছিল। স্কুলের পাঠ্যপুস্তক ও কোরআন শরিফ ছাড়া বাড়িতে বই বলতে ছিল সবেধন নীলমণি এক কপি 'বিষাদ সিন্ধু'।

মীর মশাররফ হোসেনের ওই বইটি নানিকে পড়ে শোনাতে শোনাতে বালক শামসুর রাহমানের মনে সাহিত্যের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে কবির বিভিন্ন গদ্যে এবং সাক্ষাৎকারে বিষাদ সিন্ধুর কথা এসেছে।

১৯৩৬ সালে ৭ বছর বয়সে ঐতিহ্যবাহী পোগোজ স্কুলে সরাসরি ক্লাস টুতে ভর্তি হন তিনি। স্কুলের পথে ছিল রামমোহন লাইব্রেরি। তার সদস্য হয়েছিলেন।

শামসুর রাহমানের শৈশবে জ্ঞানের এক বিশাল দরজা খুলে দিয়েছিল ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত ওই লাইব্রেরিটি। বঙ্গদর্শন, প্রবাসী, ভারতবর্ষ ও বসুমতীর মতো বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যপত্রগুলোর সঙ্গে তার সেখানেই প্রথম পরিচয়। ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সৈনিকদের আস্তানায় পরিণত হলে ঢাকা কলেজ ওই সময় রমনা থেকে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্স কোর্সে ভর্তি হন।

তিন বছর পড়াশোনা করেও অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেননি। কিছুকাল বিরতি দিয়ে ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে বিএ পাস করে আবার ইংরেজিতেই এমএ করার ইচ্ছায় ভর্তি হন। দ্বিতীয় শ্রেণীতে দ্বিতীয় হয়ে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্বের পরীক্ষা না দিয়েই একাডেমিক শিক্ষার ইতি টানেন। এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই জোহরা বেগমকে বিয়ে করেন। ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে_ সুমায়রা রাহমান, ফাইয়াজ রাহমান, ফাওজিয়া সাবরিন, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন ও সেবা রাহমান।

পাড়াতলীর পারিবারিক পুকুরে ডুবে ছোট ছেলে মতিনের মৃত্যু হয়। সেখানেই তার কবর। মতিনকে নিয়ে 'তোর কাছ থেকে দূরে' শিরোনামে একটি করুণরসের কবিতা আছে শামসুর রাহমানের। কবিতাটি তার প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে বইয়ে সূচিবদ্ধ হয়েছে।

১৯৫৭ সালে অধুনালুপ্ত ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সহ-সম্পাদক পদে কাজ করার মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের শুরু।

মর্নিং নিউজের কাজে ইস্তফা দিয়ে কিছুদিন (১৯৫৭-৫৯) তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান-এ (বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক বাংলা হিসেবে আত্দপ্রকাশ) সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। টানা ১৩ বছর ওই পদে কাজ করার পর ১৯৭৭ সালে দৈনিকটির সম্পাদক হন। ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা নেন।

মাহুতটুলী ও ইস্কাটন ছাড়াও পুরান ঢাকার আশেক লেনে শামসুর রাহমানের শৈশব, কৈশোর ও যৌবন কাটে। এরপর সপরিবারে কিছু দিন তল্লাবাগে থেকেছেন। বিশ শতকের আশির দশকের শেষভাগে শ্যামলীর বাড়িতে আসেন। স্ত্রী জোহরা রাহমান, পুত্র ফাইয়াজ রাহমান, পুত্রবধূ টিয়া রাহমান এবং দুই নাতনি নয়না ও দীপিতাকে নিয়ে এখানেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটান। উল্লেখ্য, শৈশবে পুরনো ঢাকা ছেড়ে কিছুদিনের জন্য ঢাকার ইস্কাটনেও থেকেছেন।

শামসুর রাহমানের কাব্যচর্চা শুরু হয় মূলত ১৯৪৮ সালে। তখন তার বয়স ১৯ বছর। প্রথম কবিতা প্রকাশ নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সাপ্তাহিক সোনার বাংলায়। কবিতাটির শিরোনাম ছিল 'উনিশ শ ঊনপঞ্চাশ'। তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে।

বইটির নাম_ 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে'। এরপর কেবলই পথচলা। একে একে কবি লিখে ফেলেন 'রৌদ্র করোটিতে', 'বিধ্বস্ত নীলিমা', 'বন্দী শিবির থেকে', 'ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা', 'আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি', 'আমি অনাহারী', 'শূন্যতায় তুমি শোকসভা', 'বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে', 'প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে', 'কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি', 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ', 'এক ফোঁটা কেমন অনল', 'টেবিলে আপেলগুলো হেসে ওঠে', 'দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে', 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়'সহ অসংখ্য কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ। শিশুসাহিত্য নিয়ে শামসুর রাহমান যতটুকু কাজ করেছেন ততটুকুতেই তিনি ইতিহাস হয়ে আছেন। তার শিশুসাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে_ 'এলাটিং বেলাটিং', 'ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো' ইত্যাদি।

শামসুর রাহমানের লেখা তিনটি উপন্যাস হচ্ছে_ 'অক্টোপাস', 'অদ্ভুত অাঁধার এক', 'নিয়ত মন্তাজ'। শামসুর রাহমান তার সাংবাদিকতার পেশা ছাড়াও জড়িত ছিলেন ছোটকাগজ সম্পাদনার সঙ্গেও। শামসুর রাহমানের কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজিতেও। শামসুর রাহমান তার সাহিত্যকর্মের জন্য দেশ-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে_ আদমজী পুরস্কার (১৯৬৩), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৯), জীবনানন্দ পুরস্কার (১৯৭৩), একুশে পদক (১৯৭৭), আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮১), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, ভাসানী পুরস্কার (১৯৮২), মিতসুবিসি পুরস্কার, জাপান (১৯৮২), আনন্দ পুরস্কার, ভারত, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধি (১৯৯৪), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধি (১৯৯৪), বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব প্রদত্ত কবিশ্রেষ্ঠ পদক (২০০০), আমাদের সময় সম্মাননা (২০০৬), দি সার্ক পোয়েট সম্মাননা, দিলি্ল (২০০৬)।

 

সোর্স: http://www.bd-pratidin.com/     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।