আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গল্প : চড়ুই



আমাদের ঘরে টিভি নেই। বউ টিভি দেখছে। বাড়ীওয়ালার টিভি। বাড়ীওলার টিভিটা একটু দুরে হলেও আমাদের ঘর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। সে ওভাবেই টিভি দেখছে।

এই সময় বউকে দেখতে আমার ভালো লাগে। এক মনে টিভি দেখে সে। টিভির লোকগুলো হাসলে সে হাসে। টিভির লোকগুলো কাঁদলে সেও দেখি চোখ মোছে। তবে ক'দিন হলো তার নাকি টিভি দেখতে আগের মতো ভালো লাগছে না।

জিজ্ঞেস করলাম, কী কারণ? আর বলো না। বাড়ীওয়ালার বাসায় ডিশের লাইন নিয়েছে। ভাষা বুঝি না। কি সব বলে! কি সব আজব করে কথা বলে। তার উপর যা দেখে তাও ভালো লাগেনা।

এতোদিন বাংলা নাটক দেখতো, সেসব একটু দেখা যেত। তবে বাড়ীওলার এই পরিবর্তনে একটা লাভ হয়েছে, বউ এখন আর বেশি রাতে ঘুমাতে আসে না। বেশ আগেই এসে পড়ে। আমি বউয়ের মন রাখার জন্য উপরে উপরে ডিশের লাইনের প্রতি বিরক্তী দেখালেও ভেতরে প্রচন্ড খুশি। ভাবতে ভাবতে আমার খুশি আরেক দফা বেড়ে গেল।

বউ টিভি দেখা রেখে আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ল। শোয়ার আগে আমাদের মাঝখানে থাকা মেয়েটার উপর কাথাটা টেনে দিল। তারপর কপালে নিবিড় ভালোবাসায় একটা চুমু দিয়ে নিল। আমি ক্ষীণভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, আমারটা কই? বউ একরকম ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করলো, কী? আমি ভড়কে গেলাম। বললাম, কাথা।

২. বউ শুয়ে পড়তেই তার কাছে ঘেষবার চেষ্টা করছি। বউ কড়া চোখে তাকায়। আমিও চরম আকুলতা নিয়ে বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। সে মিনমিন করে বলছে, মেয়েটা যে মাঝে শুয়ে আছে দেখোনা। আমি সাহস নিয়ে একটু ফিসফিস করে বললাম, মেয়েটাকে একপাশে শুইয়ে দেই? বউ বলল, বাড়িওলার লাইটটা এখনো কিন্তু জ্বলছে।

আমি বললাম, তুমি আমার বউ। লাইট জ্বললেই কী আর না জ্বললেই কী? ওহ! তারপরও একটা লজ্জার বিষয় আছে না? আমরা তো আর বাড়ীওলার মতো না। আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো। বললাম, ওই শালার কথা আমার সামনে বলো না। শালা, চরিত্রহীণ।

বউয়ের চেহারায় একটু অপরাধী ভাব চলে এলো। মিনমিন করে বলল, সরি। বললাম, আমার আর ভালো লাগেনা, বুঝলা। একটা ভাল বাসা পেলে এখান থেকে চলে যাবো। মেয়েটা বড় হচ্ছে।

এই জায়গায় থাকাটা ঠিক হবে না। হঠাৎ লাইটটা নিভে গেল। বাড়ীওলা লাইটটা নিভিয়ে দিয়েছে। তার অন্ধকার, আমাদের ঘরও ছুঁয়ে গেছে। অন্ধকারে টের পেলাম বউ মেয়েটাকে পাশে রেখে আমার শরীর ঘেষে শুয়ে পড়লো।

৩. বউ সকালে আমাকে প্রচন্ডভাবে ধাক্কাতে লাগলো। এ্যাই, ওঠ। ওঠ। আমি হুড়মুর করে উঠে বসলাম। কী হয়েছে? সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল, বাড়ীওলার ঘর উঁকি মেরে দেখো।

আমি তাকালাম। তাকাতেই মনটা খরাপ হয়ে গেলো। আরেকটা মেয়ে! ওই কুত্তারবাচ্চাকে একটা শিক্ষা দেয়া গেলে ভালো হতো। কিন্তু কিছু করার নেই। খুব কষ্ট হচ্ছে।

মেয়েটা খুবই সুন্দর। বেশ ভদ্র ঘরেরও মনে হচ্ছে। এই মেয়েগুলো কেন যে এতো ভুল করে? বাড়ীওলার অনেক গুণ মেয়েদের ভুলে ফেলবার জন্য। সে দেখতে সুদর্শন। টাকা আছে।

ভালো করে কথা বলতে পারে। সব মিলিয়ে মেয়েদের এ জাল ছেড়ে বের হবার উপায় থাকে না। আমি বউকে বললাম, থাক ওদিকে তাকানোর দরকার নেই। যেখানে আমাদের কিছুই করার নেই। শুধু শুধু কষ্ট বাড়িয়ে কী লাভ? বউ বলল, মানুষগুলো দিনদিন এমন হয়ে যাচ্ছে কেন? আগের বাড়ীওলার কথা ধরো।

কী ভালো লোক ছিল। হঠাৎ উচ্চস্বরে মেয়েটার কথা শোনা গেল। আমার কান গরম হতে শুরু করলো। এরপর কী হবে সেটা আমার জানা আছে। সেটা জানা আছে আমার বউয়েরও।

মেয়েটার শতবার 'না' শোনা যাবে আর বাড়ীওয়ালার কাছ থেকে শোনা যাবে শত অনুনয় আর বোঝানোর চেষ্টা। আমাদের দুজনের এও জানা, একটা সময় মেয়েটার না গুলো সব ম্লাণ হয়ে যাবে। কারণ, যে মেয়েটা আজ এই ঘর পর্যন্ত এসেছে, তার পেছনে বাড়ীওলাটার শ্রম আছে কমপক্ষে তিন চার মাসের। তিন চার মাস আগেও এমন দৃশ্য আমাদের দেখা। পরিচিত দৃশ্য।

বাড়ীওলার ওদিক থেকে আর কোনো শব্দও পাওয়া যাচ্ছেনা। আমরা অনেকটা সময় কথা না বলে নিশ্চুপ থেকেই কাটিয়ে দিলাম। বিকেলের দিকে বউকে বললাম, আমার ভালো লাগছে না। চলো, বাইরে থেকে ঘুরে আসি। বঊ রাজি হলো।

বলল, আমাদের বাবুটাকে নেবো না? বললাম, সে ঘুমাক। তুমি জলদি রেডি হয়ে নাও। ৪. বাইরে বের হতে মন কিছুটা ভালো হলো। এতো সুন্দর পৃথিবীর মানুষগুলো এতো খারাপ কেন? সবাইকে অবশ্য খারাপ বলা যায় না। এই যে, লেকের পারে যে ছেলে আর মেয়েটা বসে আছে, কী পবিত্রই না লাগছে তাদের।

অবশ্য বাহির দেখে বলাও কষ্ট। ভেতরে ভেতরে কে কেমন তা তো আর জানিনা। যে একজনের ভেতরটা দেখেছি, তাকেই খারাপ পেয়েছি। তাই মানুষকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। বাইরে এসে বউয়ের দিকে তাকিয়ে অসম্ভব ভালো লাগছে।

বিশাল পার্কে তার ছোটাছুটি দেখলে কেমন ভালো যে লাগে, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমিও তার পেছনে পেছনে ছুটি। এই পার্কের গাছগুলো এতো বড় বড়, সে এখানে এসে মাঝে মাঝে এমন গাছের আড়ালে লুকায় আমার খুঁজে বের করতে কষ্ট হয়। তবে আমি তাকে এই কাজটা করতে নিষেধ করি সবসময়। একদিন তার এই লুকানো তে ভয়-ই পেয়ে গিয়েছিলাম।

সে লুকিয়েছিল। অনেকক্ষণ খুঁজেও তাকে পাচ্ছিলাম না। ডাকলাম। কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলাম।

তখনো কোনো শব্দ পেলাম না। একটা সময় ভেতরে যেন কেমন করে ওঠলো। কোনো সমস্যা হলো নাকি? এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো। আমি পাগলের মতো ডাকতে লাগলাম।

কোনো সাড়া নেই। অনেকক্ষণ পর হাসিহাসি মুখ করে বেরিয়ে এলো সে। ততক্ষণে আমার চোখে পানি চলে এসেছে। পুরুষের চোখে পানি চলে আসা খারাপ। তাও আমি কোনো প্রকার লুকানোর চেষ্টা করলাম না।

কারন, আমাদের এক অপরের ভালোবাসার গভীরতাটা দুজনেরই জানা। লুকিয়ে লাভ নেই। সে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। অনেকক্ষণ জড়িয়ে রইলো। মজার ব্যাপার, ওইসময় একটা লোক আমাদের ছবি তুলে ফেলল।

পরদিন ভালোবাসা দিবস না কি থাকায় একটা পত্রিকায়ও আমাদের ওই ছবি ছাপা হয়েছিল। সন্ধ্যার আজান পড়ে যাচ্ছে। আমি বউকে ডাকলাম, চলো বাসায় যাই। মেয়েটা একা। বউ বললো, চলো।

দুজনেই সাধ্যমত খাবার নিয়ে নিলাম, মেয়েটাকে খাওয়াতে হবে। ৫. রাতে বাড়ীওলার বাসায় বেশ ভীড়। উচ্চস্বরে গান বাজছে। তার বন্ধুরা এসেছে। বাইরে থেকে খাবার দাবার কিনে এনেছে।

আজ রাতটা আমাদের জন্য বেশ কষ্টের হবে। সারারাত শব্দে ঘুমানো যাবে না। কথাবার্তা, হাসাহাসিতে ঘরটাকে এখনই যন্ত্রণাময় লাগছে। আমরা জানি, এরকম চলবে আরো ঘন্টা দুয়েক। এই লোকগুলো আগেও এসেছিল।

আমি একটু উঁকিঝুকি মেরে তাদের দেখার চেষ্টা করলাম। অনেক কথাবার্তা ভেসে আসছে। তাহলে কী পরশুদিন পামু? হ। পাবি। কালকের মধ্যেই সব হয়ে যাবে? দেখিস, আবার মিস করিস না।

বাজারে নতুন কিছু নাই। আরে, দুর চিন্তা করিস নাতো। হয়ে যাবে। হঠাৎ আরেকজন মাঝখান থেকে বলল, এইবার রিপন ভাইয়ের চেহারাটা দেখাইয়া দিতে হইবো। সঙ্গে সঙ্গে ঘর জুড়ে হাসাহাসির রোল পড়ে গেল।

মানুষের মুখের হাসি দেখতে সবসময়ই ভালো লাগে। এগুলোর হাসিটা এতো বিভৎস লাগছে কেন বুঝতে পারছি না। আমি গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ৬. গতকালের মেয়েটা আজও এসেছে। আজ বেশ স্বতস্ফূর্ত।

কিছুক্ষণ তার কথাবার্তা শোনা গেলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে না। আজ যেন সে নিজ থেকেই সব কিছুর জন্যই তৈরি। তার কোনো জড়তা নেই আজ। কোনো না সূচক কথাও নেই মুখে। কারন তার তো আর আজকের ভয়াবহ ব্যাপারটা তো জানা নেই।

শুধু আমরা জানি। আজ তার জীবনের জন্য কতটা ভয়াবহ দিন সে জানবেও না হয়তো। যখন জানতে পারবে তখন আর কিছু করার থাকবে না। খুব ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে সব বলে দেই। কিন্তু আমাদের কথা কী সে বিশ্বাস করবে? করবে না।

উল্টো বাড়ীওয়ালা, ওই খারাপ লোকটা, ওই বদ লোকটার কাছে আমাদের প্রাণ হারাতে হবে। অনেকক্ষণ ধরে কোনো শব্দ নেই। আমি একটু বাঁকা হয়ে একটা জিনিস দেখার চেষ্টা করলাম। চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। চারমাস আগেও একবার হয়েছিল।

ওই কর্নারে একটা ছোট লাল লাইট জ্বলছে। একটা যন্ত্রের লাল লাইট। এই লাল লাইট জ্বললে কী হয়, প্রথমবার না বুঝলেও এখন বুঝি। ঘরে যা যা হবে সব রেকর্ড হবে। পরে টিভিতে সেসব দেখা যাবে।

আমার খুব ইচ্ছে করছে ওই লাইটটা নিভিয়ে দিতে। প্রচন্ড ইচ্ছে করছে। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। মেয়েটার জন্য। খুব ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দিই।

মেয়েটার পৃথিবীকে অন্ধকার থেকে রক্ষা করি। আমি দ্বিগবিদ্বিক না ভেবে বাড়ীওলার চোখ এড়িয়ে লাল লাইটটার দিকে গেলাম। সেটা কীভাবে বন্ধ করে হয়, আমি জানিনা। পরীর মতো মেয়েটা আর তার মা বাবার কথা ভেবে আমার চোখে পানি চলে আসছে। আমারও তো একটা মেয়ে আছে।

আমি কী করবো বুঝতে ওঠতে পারছিনা। হঠাৎ মনে হলো লাল লাইটের যন্ত্রটাকে ফেলে দেবো নাকি? ভাবতে ভাবতে দেরী হয়ে গেলো। বাড়ীওলা আমাকে দেখে ফেলল। আমাকে তাড়াতে সে প্রচন্ড হুংকার দিয়ে ওঠলো। হুশ...শ।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.