আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ফেসবুকে কার্টুন বিতর্কঃ সচেতন হবার এখনই সময়

অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়, অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!

ফেসবুকে মহানবীকে নিয়ে কার্টুন আঁকার প্রতিযোগীতা সারা মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডেনমার্কের পত্রিকায় মহানবীকে নিয়ে কার্টুন প্রকাশের ঘটনা মুসলিমদের মানসপটে যে ঘায়ের সৃষ্টি করেছিল ফেসবুক যেন সেই পুরোনো গায়ে আবার নুন ছিটিয়ে দিল। এজন মুসলিম হিসাবে আমিও ক্ষুব্দ হয়েছি, কিন্তু প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সহিংসতায় মোড় না নেয়ায় সাথে সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি । পাঁচ বছর আগে ডেনিশ কার্টুনের প্রতিবাদ করতে যেয়ে বিশ্বব্যাপী দাঙ্গা হাঙ্গামা ও পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় অনেক প্রানহানি ঘটে। এই সুযোগে মহানবীকে নিয়ে আঁকা কুর্ট ওয়েষ্টারগার্র্ডের কার্টুনের মূল্য আকাশ ছুঁয়ে যায়।

কার্টুনের মূল কপি বিক্রি হয় প্রায় দুই লক্ষ ডলারে ! কিন্তু এবার পাকিস্তানে বিক্ষোভ হলেও কোনো প্রানহানি ঘটেনি। তবে পাকিস্তান সরকার হাইকোর্টের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে ফেসবুক ৩১শে মে পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। প্রতিবাদের ভাষা যদি সঠিক না হয় সেটা কখনো বুমেরাং হয়ে নিজের কাছেও ফিরে আসতে পারে। ডেনিশ কার্টুন সংকটের সময় অনেক মুসলিম দেশ ডেনমার্কের তৈরী পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। দেখা গেছে এতে কিছু ডেনিশ কোম্পানীর আর্থিক ক্ষতি হলেও ডেনমার্কের মূল অর্থনীতি মোটামুটি অক্ষতঃ থেকে যায়।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জের হিসেবে পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল মিসরে স্কেন্ডিনাভিয়েন দেশগুলিতে থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা ৩০শতাংশ কমে যায়। ফলে মিসরের অর্থনীতি ক্ষতির সন্মুখীন হয়। পশ্চিমা পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার জন্য মিসরকে মরিয়া হয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হয়। ফেসবুক নীতিমালায় জাতি, ব্যক্তি বিদ্বেষী কোন পোষ্টিং করা যাবেনা বলে উল্লেখ রয়েছে। দেখা যাক ফেসবুক নীতিমালা কি বলেঃ Article 3. Safety Clause 6 - You will not bully, intimidate, or harass any user. Clause 7 - You will not post content that: is hateful, threatening, or pornographic; incites violence; or contains nudity or graphic or gratuitous violence. এছাড়া আর্টিকেল ৫ এ মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলা থাকলেও দুই বিলিয়ন মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার জন্য ফেসবুকে যে পাতা খোলা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বাকস্বাধীনতার সাফাই গেয়ে বরং আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে।

বিশেষতঃ মুসলিমদের ক্ষেত্রে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ডেনিশ সংকটের সময় স্পষ্ট ধরা পড়ে। । ২০০৫ সালে ডেনমার্কের যে পত্রিকা মহানবীর কার্টুন ছাপে ২০০৩ সালে সেই একই পত্রিকা যিশুকে নিয়ে আঁকা কার্টুন ছাপাতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০০৬ সালে ভিয়েনার রাস্তার বিলবোর্ডে রানী এলিজাবেথ, জর্জ বুশ সহ একটি নগ্ন নারীর পোষ্টার টাঙানো হয়। প্রতিবাদের মুখে ওই পোষ্টারগুলি কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে সরিয়ে ফেলে।

ধর্মবিদ্বেষী ও উষ্কানীমূলক কাজ ইউরোপে নিষিদ্ধ। অথচ যে কার্টুন বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ মানুষকে সন্ত্রাশী বলে কটাক্ষ করল তা ডেনমার্কের আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়নি। ইসলামফোবিয়া ও দ্বিমুখী নীতি মুসলিমদের মনে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছে, এটা আমি স্বীকার করি। কিন্তু তাই বলে আবেগের বশবর্তী হয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামার পথ বেছে নিয়ে মুসলিমরা ইসলামী বিদ্বেষীদের পাতা ফাঁদেই পা দিচ্ছে বারবার। এই ধরণের আচরণ ইসলামী চেতনার পরিপন্থী, এটা কোনভাবেই মুসলিমদের জন্য সুফল বয়ে আনবেনা।

যার কিছু নমুনা ইউরোপে ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি যেমন হিজাব ও মসজিদের মিনারেট নিষিদ্ধকরণ। ভবিষ্যতে আরো যে কি হবে কে জানে? মনে রাখতে হবে ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমানের দায় দায়িত্ব কিন্তু মুসলিমদের, খৃষ্টান কিংবা ইহুদীদের নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য মুসলিম বিদ্বেষীদের গায়ে পড়া উস্কানীর মোকাবেলা করার জন্য যে ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন তা মুসলিম বিশ্বে অনুপস্থিত। ফলে বারবার বিজয় হচ্ছে ইসলামী বিদ্বেষীদের, তারা আঙ্গুল তুলে বলছে ইসলামে সহনশীলতা বলে কিছু নেই। ইন্টারনেটের যুগে কোন রকম নিষেধাজ্ঞায় কাজ হয়না।

যে কোন তথ্য কিংবা বই পিডিএফ করে অর্ন্তজালে ছেড়ে দিলেই হল । কিছু কার্টুন দেখে, রুশদীর বই পড়ে যারা ইসলাম ছেড়ে চলে যেতে চান তাদের যেতে দেয়াই ভাল। এমন ঠুনকো বিশ্বাসীদের ইসলামে প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা। আর তাই যদি হত ৯/১১ পর আমেরিকা ও ইউরোপে মুসলিম হবার ঘটনা শোনা যেতনা। অথচ বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো।

ফেসবুকের পর মুসলিম বিদ্বেষীরা আরো সংঘবদ্ধ হয়ে উস্কানীমূলক কান্ড ঘটিয়ে যাবে এটা নিশ্চিত । এইতো গত কালের খবর। নিউ ইয়র্কের কিছু বাসের গায়ে একটি বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে তা হল - - Leaving Islam? Fatwa on your head? Is your family threatening you? মুসলিমদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা আরেকটি দুঃসংবাদ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিমের প্রতিক্রিয়া কি হওয়া উচিত? উত্তর হবে আমদের মহানবী এমন পরিস্থিতিতে কি করতেন তা সবার আগে অনুসন্ধান করে দেখা। সাথে সাথে কুরান ও হাদিসে কি নির্দেশনা রয়েছে তা ঘেটে দেখা।

একটু ভেবে দেখুন, কার্টুন দিয়ে ব্যঙ্গ করে মহানবীর সত্যিকারের কোন ক্ষতি করা কি সম্ভব ? সৌদি স্কলার আল-গাইনের মতে যারা এসব করছে তারা যেন সূর্যের দিকে কিছু বালি ছুড়ে মারছে যা আবার তাদের মুখের উপর এসেই পড়বে। মহানবী ইসলাম প্রচারের সময় মক্কায় চরম আবমাননা ও বিদ্বেষের মুখোমুখী হয়েও কখনো সংঘাতের পথ বেছে নেননি। এ পর্যায়ে তিনি মাতৃভ’মি মক্কা ছেড়ে মদিনা হিজরত করেন। তা’ইফের ঘটনা আমরা জনি। তা’ইফবাসীদের হাতে চরম লাঞ্ছিত হবার পরও তিনি তাদের অজ্ঞতার কথা ভেবে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহর রোষানল থেকে তাইফবাসীদের রক্ষা করার জন্য প্রার্থনা করেছেন।

মক্কা বিজয়ের পর শত্রুদের নতজানু পেয়েও সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। নবীকে অসন্মান করা হলে কি করা উচিত তার নির্দেশনা কুরানের বেশ কিছু আয়াতে পাওয়া যায়, সেগুলি হল - সুরা আ’রাফ (৭ঃ১৯৯), সূরা নাহল (১৬ঃ১২৫), ও সূরা কাসাস্ (২৮ঃ৫৪-৫৬)। আল্লাহর নির্দেশ হল মুর্খদের অসার কর্মকান্ড উপেক্ষা করে চলা আর ভাল দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করা। বোখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীসে মহানবীর একই ধরনের নির্দেশনা পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের পূঞ্জিভুত কুসংস্কার ও ভুল ধারণাই খৃষ্টান অধ্যুষিত পশ্চিম বিশ্বের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবের মূল কারণ।

ইতিহাসের পাতা থেকে এই তত্ত্বের সমর্থন মেলে। হিটলার খৃষ্টান ধর্মান্ধ কিনা জানিনা, তবে খৃষ্টান সংস্কৃতিতে চরম ইহুদী বিদ্বেষ হিটলারকে ইহুদীনিধনে ইন্ধন যুগিয়েছে বলে অনকের ধারণা। ইসলামে যিশুর স্থান হল একজন নবী হিসাবে । পবিত্র কুরানে যিশুর নাম এসেছে ২৮ বারেরও বেশী অন্যদিকে মুসা নবীর কথা এসেছে ১৩৬ বারেরও বেশী। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (দঃ)কে খৃষ্টান ও ইহুদীরা কখনোই নবী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

ফলে ইসলামের শুরু থেকেই খৃষ্টান শাসক গোষ্টি ও চার্চ এস্টাব্লিশম্যান্ট ইসলাম ও মহানবীর নামে কুৎসা রটনা ও বিভিন্ন ধরনের প্রপাগান্ডা চালিয়ে এসেছে। ৭ম শতকে রোমন শাসিত আফ্রিকার বহু দেশ ও খোদ ইউরাপের স্পেন মুসলিমদের হাতে চলে আসলে খৃষ্টান সম্রাজ্যের নিরাপত্তার ভয়ে সেই প্রপাগান্ডা ও বিদ্বেষ আরো ভয়ংকর নেয় যা পরবর্তীতে ইউরোপের দ্বার গোড়ায় অবস্থিত তুরস্কে মুসলিম সুপার পাওয়ার ওতমান সম্রাজ্যের গোড়া পত্তনের পর থেকে খৃষ্টান সমাজের চিন্তা ও চেতনায় গেঁড়ে বসে। পশ্চিমা দেশের মূল ধারার ইতিহাসে ৮ম শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত ইসলামের যে স্বর্ণযুগ ছিল বলে আমারা জানি তার কোন উল্লেখই দেখা যায়না। ফলে ছোটবেলা থেকে মুসলিম সভ্যতা সম্পর্কে ওই সব দেশের নাগরিকদের কোন সম্যক ধারণা থাকেনা বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে মুসলিমদের নিয়ে যুগ যুগান্তরের লালিত জুজুর ভয় ওদের তাড়িয়ে বেড়ায়।

অষ্ট্রেলিয়ায় অনেক সহকর্মীদের সাথে আমার কথাবার্তায় এই অজ্ঞতা ও ভীতি আমি লক্ষ্য করেছি। ইসলামফোবিয়ার জন্য একতরফাভাবে পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী না করে কিভাবে এই ফোবিয়া দুর করা যায় সেটা নিয়ে মুসলিমদের ভাবতে হবে। ইসলামের মঙ্গলময় দিকটা তুলে ধরার জন্য মুসলিমদেরই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশে বসবাসরত মুসলিমদের দায়িত্ব অন্যান্য মুসলিমদের চাইতে অনেক বেশী বলে আমি মনে করি। মুসলিম সমাজ ও ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা ও জুজুর ভয় দুর করতে হলে মুসলিমদের নিজস্ব কম্যুনিটির চার দেয়ালের বাইরে এসে ওই সব দেশের আম জনতার সাথে মিশতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সম্প্রীতির সেতু বন্ধন, দেখিয়ে দিতে হবে মুসলিমরাও অন্য দশজনের মত শান্তিপ্রিয় মানুষ।

সহিংসতা নয়, ইসলাম বিদ্বেষীদের কর্মকান্ডকে উপেক্ষা করে তাদের কাছেই মহানবীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট, মহত্ব ও অন্যান্য গুনাবলী তুলে ধরাটাই হবে মহানবীকে ব্যঙ্গ করে আঁকা কার্টুনের সর্বোত্তম জবাব।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.