"পসার বিকিয়ে চলি জগৎ ফুটপাতে, সন্ধ্যাকালে ফিরে আসি প্রিয়ার মালা হাতে"
প্রতীমা ও মানবী
এক পুরোহিত নিবিষ্ট চিত্তে মাটির প্রতীমা গড়ছিলেন। চোখে মুখে তাঁর বিশুদ্ধ মমতা। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সেই মাটির প্রতীমা যেন মনের অজান্তেই এক মানবী হয়ে গড়ে উঠছিলো। পুরোহিত তাঁর আপন মহিমায় সেই প্রতীমাকে অপরূপা করে সাজিয়ে তুললো। রঙে রঙে সেজে উঠলো মাটির প্রতীমা।
রঙ-তুলির নিপূণ টানে, কাতান-বেনারসীর মোহনীয় সাজে, স্বর্ণালঙ্কার আর মণিমুক্তায় অপরূপা হয়ে উঠলো সেই প্রতীমা। পুরোহিতের পর্ণকুটির যেন সহসাই এক মন্দির হয়ে উঠলো। আর প্রতীমা যেন হয়ে উঠলো কোন এক জীবন্ত মানবী। নিষ্পাপ পূজারিনী হয়ে সে বেদীতে ঠাঁই করে নিল।
অতঃপর পুরোহিতের পর্ণ কুটিরে বাজে কাসর ঘন্টা, বাজে ঢাক-ঢোল, জ্বলে মঙ্গলপ্রদীপ, জ্বলে সুবাসিত ধূপকাঠি।
চারিদিকে বর্ণিল আলোকসজ্জা। প্রতীমার ঝলমলে রূপে পুরোহিত মুগ্ধ। সহসাই প্রতীমা বন্দনায় মেতে ওঠেন পুরোহিত। ভুলে যান সেই প্রতীমার দেহে কোন প্রাণ নেই, নেই কোন মানবিকতার অস্তিত্ব। সেই প্রতীমা নিতান্তই অক্ষম, নির্বাক, নিষ্প্রাণ- শুধুই এক মাটির প্রতীমা।
পুরোহিতের পূজো-বন্দনা কিংবা মন্ত্রপাঠে সেই প্রতীমা কখনোই মানবী হয়ে ওঠেনা। মাটির তৈরী প্রতীমা কখনোই ঈশ্বরের সৃষ্টি মানবী হয়ে ওঠেনা। মাটি দিয়ে গড়া প্রতীমা আর মাটির সৃষ্টি মানবীর মধ্যে যে বিরাট ফারাক পুরোহিত তা বুঝতে পারেন। একজন প্রাণহীন আর একজন জীবন্ত। একজন তার নিজের হাতে গড়া আর একজন ঈশ্বরের সৃষ্টি।
একজনের দেহে মন আছে, আবেগ আছে, অনুভূতি আছে, স্পর্শে সে চঞ্চল হয়- আরেকজন সম্পূর্ণ নিষ্প্রাণ, পাথর দেহ, মূক ও বধির- কোন কিছুতেই সে সজীব বা জীবন্ত হয়ে ওঠেনা।
পুরোহিত সন্বিত ফিরে পান। প্রতীমাকে ঘিরে তার সকল পুজো-বন্দনা, মন্ত্র-প্রার্থনা বিফলে যায়। মিথ্যে হয়ে যায় তার সকল আকুতি-মিনতি। সে ঈশ্বরের কাছে কৃপা ভিক্ষা করেন তাঁর প্রতীমায় যেন প্রাণ ফিরে আসে।
অতঃপর একসময় নিথর, নির্বাক সেই প্রতীমাকে তিনি বিসর্জন দেন নদীর জলে। আবারো নতুন করে পূর্ণ মমতায় গড়ে তোলার চেষ্টা করেন আরেক প্রতীমা। অথচ মাটির প্রতীমা কখনোই জীবন্ত মানবী হয়ে ওঠেনা। পুরোহিত নিরন্তর সেই মাটির প্রতীমার মাঝেই প্রাণ খুঁজে পেতে চান আর বারংবার ঈশ্বরের কাছে কৃপা ভিক্ষা করেন। আর ঈশ্বর বরাবরের মতোই নিশ্চুপ থাকেন।
পুরোহিত বুঝতে পারেননা তিনি ধর্মাত্মা হলেও প্রাণ সৃষ্টির করার কোন ক্ষমতা তাঁর নেই।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।