ইতপউস .....
তুমি কোন দল?
এই প্রশ্ন এতবার করা হয় যখন খেলা নিয়ে মেতে উঠে সবাই, বিশেষ করে বিশ্বকাপ শুরু হলে। সবাই দেখা হলেই জানতে চায়। কে কোন দল তা নিয়ে ছোট খাট তর্ক শুরু হয়ে যায় সবার মাঝে। ফ্রেন্ডদের আড্ডায় সবার আলোচনার বিষয় হয়ে যায়।
আমি নিজের কথা যদি বলি, তা হবে আমি খেলা দেখি না।
কোন টিম সাপোর্ট করি না। না ক্রিকেট না ফুটবল। শুধু ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন বলি। কারন আমি খেলা একদম বুঝি না আর কোন কোন দেশ খেলে সেটাও জানি না। কিন্তু তারপরও কিছু টক ঝাল মিষ্টি আর কিছু মন খারাপ করা স্মৃতি আছে এই খেলা নিয়ে।
পুরানো স্মৃতিতে ফিরে গেলে প্রথমেই যে দৃশ্য মনে পরে সেটা ছিল, ছোট কাকার হাত ধরে খেলা দেখতে যেতাম। আমি খুব ছোট্ট তখন। গ্রামের মাঝে ছিল ছোট্ট দোকান। খেলার সময় টিভি ভাড়া করে আনা হতো। কাকা আর কাকার বন্ধুরা সবাই মনে হয় ম্যারাডোনার ফ্যান ছিল।
কারন শুধু এই নামটাই আমি খুব ছোট থেকে জানি। আর মনে পরে নিল-সাদা রঙ। তখন মনে হয় আর্জেন্টিনার ড্রেসের রঙ ছিল সাদা-নিল! এছাড়া আর কোন দল বা কোন নাম কিছুই জানতাম না আমি। কি খেলা দেখতাম তাও মনে নেই।
ফুটবলে মনে হয় সব মানুষ দুই ভাগ হয়ে যায় আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এর জন্য।
আমার নিজের কোন ইন্টারেস্ট না থাকলে কি হবে আমার ভাই-বোন দের পাগলামির কোন কমতি নেই। দুই ভাই আর্জেন্টিনা আর দুই বোন ব্রাজিল । আর আমি হলাম তাদের মিষ্টি ঝগড়ার একমাত্র দর্শক ! আমি বসে বসে ওদের ঝগড়া দেখি!
এই দুই দলের মাঝে আর্জেন্টিনার সমর্থক দের খুব ইমোশনাল মনে হয়েছে আমার। দলের হার সমর্থকদেরকেও কাঁদায়। আমি দেখেছি মানুষকে কাঁদতে, মন খারাপ করে রেগে এন্টেনা, এমন কি টিভিও ভেঙ্গে ফেলতে দেখেছি।
কিন্তু অন্যদের বেলায় এমন দেখিনি কখন।
আমি ফুটবল পুরো সময় ধরে দেখেছি জীবনে একবারই। সেটা ছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনাল। আমার মনে পরে খেলাটা হয়েছিল ফ্রান্স আর ব্রাজিলের মাঝে। খেলাটা ছিল রাতে।
সারারাত খেলা হয়েছিল। আর আমার তার পরদিন বাংলা পরীক্ষা ছিল। কিন্তু সবার আগ্রহে বাসার সবাই আর তার সাথে একটা আন্টি তার মেয়ে সবাই মিলে বসলাম টিভির সামনে। খেলার শুরুতে অনেক কিছু দেখাল। সব শেষে যখন খেলা শুরু হয়েছে আমি আসে পাশে তাকিয়ে দেখি আমি ছাড়া সবাই ঘুম ! কখন ঘুমিয়ে গেছে আমি নিজেও টের পাইনি।
শেষে আমি একাই খেলা দেখেছিলাম।
এই খেলাটা দেখে আমার ব্রাজিল সম্পর্কে ভালো ধারনা হয়নি। আমি খেলা খুব কম বুঝলেও আমার ভালো লাগেনি তাদের খেলার ধরন। আর ভালো লেগেছে জিদানের খেলা। আমার ফুটবল খেলার জ্ঞানের ঝুড়িতে নতুন কিছু নাম যুক্ত হয় সেদিন।
খেলা শেষ হয় যখন সময় ভোর পাঁচটা প্রায়। তখন মনে পরে আমার পরীক্ষা আছে কিন্তু ঘুম ঘুম চোখ খুলে রাখতে না পেরে কখন যে ঘুমিয়ে পরি! সকাল নয়টার দিকে আম্মু ডেকে দেয়! আমার তো মাথায় হাত! আমার পরীক্ষা গেল! এই বার নির্ঘাত ডাব্বা! কোন রকম ভাবে দৌড় দিয়েছিলাম স্কুলে। ভাগ্য ভালো স্কুল কাছে ছিল, ভিড় কম ছিল আর সব টিচার আমাকে ভালো করে চিনতেন! তা না হলে আমার আর পরীক্ষা দিতে হতো না! কি লিখেছিলাম আমার কিছুই মনে নেই। তবে পাস করে গিয়েছিলাম। বড় বাঁচা বেঁচেছিলাম আর তার সাথে খেলা দেখার শখ চলে গিয়েছিল ভালো করে!
শেষ বিশ্বকাপ ফুটবল যেবার হয়েছে, আমি সবার কাছে একটা প্রশ্ন শুনতে শুনতে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল প্রায়।
যার সাথেই দেখা হয়, যার সাথেই কথা হয়, সবাই জানতে চায় আমি কোন দল? আর আমিও যখন সবাইকে একই উত্তর দেই যে, আমি খেলা দেখি না, আর আমার কোন দল নেই! শুনে সবাই আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছিল যেন আমি মঙ্গলগ্রহ থেকে আসছি!
আমি খেলা দেখি না আর কাউকে জানি না। আমার খেলার জ্ঞান শূন্য। শুধু শুধু একটা নাম বলে দিলেও তো আমি ধরা পরে যাব যখন দেখবে আমি কিছুই জানিনা তাদের সম্পর্কে! তাই সবাইকে নেই বলে দিতাম।
আমার এই দল না থাকা শুনে আমার এক ফ্রেন্ড যে ইতালির সমর্থক আমাকে বলল, “এখন থেকে যদি কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করে কোন দল তাহলে বলবা যে তুমি ইতালি”। আমি তো কখনই না বলতে পারি না।
মনে মনে হেসে বললাম, ঠিক আছে তাই হবে । ভাবলাম নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। এর পর কেউ কোন দল জানতে চাইলে বলে দিতাম ‘ইতালি’ আর তার সাথে ইতালি বলার কারনটাও বলে দিতাম, যে আমার ফ্রেন্ড আমার কোন দল নেই শুনে বলেছে ইতালি বলতে!
আমি খেলা না দেখলেও আমাকে খেলার নিউজ জানিয়ে দিত সে।
আমার মনে পরে, ফাইনাল খেলা শেষে একজন আমাকে কল দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল ইতালি জিতেছে আর জিদান এর সাথে ঝামেলা হয়েছে। আমি ভীষন লজ্জায় পরে গেলাম ইতালি জিতে যাবার জন্য।
যদিও আমি বলার জন্য বলেছি কিন্তু আসলে তো আমি কোন দলের সমর্থক না। যে জানিয়েছিল সে ছিল ফ্রান্স। তাই খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল কেন ইতালি জিতেছে!
এর পর অনেক দিন পর একদিন ফ্রেন্ডদের সাথে গল্প হচ্ছিল। যার কথায় আমি ইতালি বলেছি, তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি কেন ইতালি সাপোর্ট করো? আমাকে পুরাই টাশকিত করে আমার বান্ধুবির জবাব ছিল এমনঃ ‘ ইতালির খেলোয়ার গুলো দেখতে অনেক সুন্দর হয়!’
আমি কিছুক্ষন হা করে তাকিয়েছিলাম! আমি মনে করেছিলাম হয়ত খুব ভালো খেলে তাই ইতালির সাপোর্ট করে বুঝি! আমার মাথা থেকে তার পর ইতালি ঝেড়ে ফেললাম।
আর কাউকে ইতালি বলতেও লজ্জা লাগবে এখন। আর ইচ্ছে রইল না খেলা নিয়ে এই পাগলামিতে থাকার। এবার আমি কারো সামনেই যাব না ঠিক করেছি যেন কেউ জিজ্ঞেস করতে না পারে আমি কোন দল!
ক্রিকেট এর বেলায় আমি বাংলাদেশ বলি। এর পর যদি কেউ জানতে চায় বাংলাদেশ ছাড়া আর কে, তাহলে আমার উত্তর ‘নেই’। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান নিয়ে মাতা-মাতি আমার কখনই ভালো লাগে না।
তার আরেকটা কারন আছে।
আমাদের বিল্ডিঙ্গে একটা ভাইয়া থাকতেন(নাম না বলি)। খুব ভাল ছাত্র ছিলেন ভাইয়াটা, তখনকার সময় এইচ এস সি তে ১২তম হয়েছিলেন । বাবা-মার একমাত্র ছেলে। আমাদের এখানে খেলা নিয়ে সবার মাঝে খুব উত্তেজনা কাজ করে।
সবাই কম বেশী পাগল। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল এসব নিয়ে পাগলামি খুব হয়।
সেবার এমনি ইন্ডিয়া-পাকিস্তান খেলা ছিল কোলকাতায়। ভাইয়াটা তার কিছু বন্ধু নিয়ে কোলকাতায় যাবে খেলা দেখতে আমরা শুনতে পাই। আমাদের পিচ্চিদের জন্য সেটা ছিল নতুন কিছু, অজানা কিছু।
না বুঝলেও আমরা তো মহা খুশি। খেলার আগেরদিন বাসে রওয়ানা দেয়। যেদিন খেলা ছিল তার পরদিন আমরা জানতে পারি, যে বাসে ভাইয়া যাচ্ছিল, সে বাসটা এক্সিডেন্ট করেছে। ভাইয়া সাথে সাথেই মারা গিয়েছেলেন। আর কারো কিছু হয়নি।
শুধু ভাইয়াটাই চলে গেলেন। আন্টি-আঙ্কেলের কথা না হয় নাই বললাম।
তারপর থেকে খেলা নিয়ে এমন পাগলামি আমার পছন্দ না। সব সময় এড়িয়ে যাই এসব থেকে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।