প্রথম পর্বে লিংক: Click This Link
---------------------------------------------------------
আব্বু সবাই এখানে এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে কেনো?
জহির মেয়ের প্রশ্ন করে তাকে। অদ্ভুত প্রশ্ন নয় কিন্তু। শহরের থাকা মানুষগুলো এতো তাড়িতাড়ি ঘুমায় না। যেই সময়টায় গ্রামের মানুষ ঘুমাতে যায় সে সময়ে শহরে মাত্র রাত হওয়া শুরু করে। ঘরে ফেরা মানুষগুলোর কেউ কেউ বিনোদনে মেতে ওঠে।
কেউ কেউ পরিবারকে সময় দেয়। এভাবেই সময় যায় তাদের। ঘড়িতে যখন ১২টা। অধিকাংশ শহুরে মানুষের ঠিক তখনই চোখে ঘুম আসে। তাও কেউ কেউ বিছানায় যায় কেউ বা আরও রাত অবধি জেগে থাকে।
জহিরের তো রাত ৩টার আগে ঘুমই আসে না। কিসব ভেবে ভেবে সে সময় পার করে। কখনও কখনও তার স্ত্রীকে নিয়ে বারান্দায় সময় কাটায়। কখনও কখনও গল্পের বই পড়ে। অথবা টিভি দেখে।
তবে তার একমাত্র মেয়ে সুকন্যা রাত ১২টার মধ্যেই বিছানায় চলে যায়। শহরে রাত ১২ খুব একটা বেশী রাত নয়। তারপরও এইখানে স্বন্ধ্যা ৮ টার মধ্যে সকলের বিছানায় চলে যাওয়াটা সুকন্যাও মানতে পারছে না।
আর তাই তার এ প্রশ্ন। প্রশ্ন শুনে জহির খুব একটা বিভ্রান্ত হয় না।
উত্তরটা সে সাবলীলভাবেই দেয়, মামুনী, সবাই সারাদিন মাঠে কাজ করে। কত্ত পরিশ্রম করে। ঘরে ফিরে ওরা অনেক টায়ার্ড থাকে। আর তাছাড়া সকালে উঠেই খুব ভোরে ওদের আবার মাঠে কাজ করতে চলে যেতে হবে। তাই ওরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে।
আর তুমিতো দেখছই শহরের মতো ওদের কি এতো বিনোদনের কাজ আছে! নেই। তাই তো ঘুমিয়ে যায়।
সুকন্যা তার আহলাদি চেহারার কোনো পরিবর্তন করে না। জহিরের একমাত্র মেয়ে সুকন্যা। বিয়ের তিন বছর পর এই মেয়ে হয়েছিল।
ওর বয়স এখন ৯ বছর। গ্রামে ঘুরতে এসেছে বাবার সাথে। সারাদিন সে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ায়। সে কখনও গ্রাম দেখেনি। গ্রাম না দেখাটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা জহির বুঝতে পারে যখন সুকন্যা পুকুর দেখার পর জহিরকে প্রশ্ন করে, বাবা বাবা কত্ত বড় বাট্টাব।
জহির হেসে দেয়। কিছুক্ষণ পর তার হাসিও পায়। আহারে! আমার মেয়েটা পুকুরও বুঝি কখনও দেখেনি। ওকে যখন বলা হয়, মা এইটা তো পুকুর। তখন সে আরও অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, পুকুর! পুকুরে কি হয়?
ওকে পুরো ব্যাপারটা বোঝানো হয়।
গ্রামে এসেই সে গোয়াল ঘর, পুকুর, ধান ক্ষেতে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ওকে ঘোরানো দায়িত্বটা নিয়েছে রবি কাকুর ছোট মেয়ে রিতা। রিতার বয়স ১৯ বছর। কলেজে পড়ে। গ্রামে থাকে দেখলে বোঝাই যায় না।
একদম পরিপাটি মেয়েটি। যথেষ্ট স্মার্ট। এগুলো বলতে হয় শিক্ষিত পরিবারের শিক্ষার ব্যপার। রবিউল গ্রামে থাকলেও সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাস করা ছেলে। সে ইতিহাস বিষয়ে পড়াশুনা করেছে।
রবিউলের স্ত্রীও শিক্ষিত একজন মহিলা। রবিউলের স্ত্রীর গ্রামে থাকা নিয়ে জহির একটু অবাক হয়। কারণটা হলো, রবিউল ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করে খুব একটা উন্নতি করা যায় কিনা সে বিষয়ে জহিরের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে, রবিউলের স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে মাষ্টার্স করা।
তাও আবার ফার্স্ট ক্লাস করা শিক্ষার্থী। সেই মেধাবী একজন মহিলা কি করে গ্রামে বাস করছে তাই নিয়ে জহিরের আগ্রহের শেষ নেই। তারপরও দুইজনই তো শিক্ষিত। সেই শিক্ষিত মানুষ দুইটি গ্রামের কলেজে শিক্ষকতা করছেন। এবং খুব সাধারণ জীবন-যাপন করছেন ব্যাপারটা একদিক থেকে ভালো হলেও মনে অনেক প্রশ্নও জাগে।
জহিরকে আজ তার রবি কাকু এসব বিষয় খোলাসা করে বলেছে। ভেতরকার অনেক অজানা তথ্য আজ জহির জেনেছে। সব জেনেছে। কেনো তিনি গ্রামেই থাকেন। কেনো তিনি শহুরে জীবন ছেড়ে এই গ্রামকে বেছে নিয়েছেন থাকবার জন্য।
বাপ-দাদার ভিটায় কেনো তিনি পাহারাদার হয়ে বসে আছেন। এই সব কিছু আজ জহিরকে খোলাসা করেছে। এবং খোলাসা করেই রবিউল তার হাতে একটি বন্দুক তুলে দেয়। অসম্ভব ধরনের বন্দুক। অত্যন্ত পুরণো এ বন্দুক সে তুলে দেয় জহিরের হাতে।
জহিরের তখন হাত কাঁপতে থাকে।
জহির তখন থেকেই মগ্ন সেসব ভাবনায়। রবিউলের সেই সব কথা। তাকে আতংকগ্রস্থ করে তুলছে। যখন ভয়টা তাকে জাবড়ে ধরেছে ঠিক তখনই তার মেয়ে সুকন্যা তাকে প্রশ্ন করেছে, আব্বু সবাই এখানে এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে কেনো?
সাথে সাথেই জহিরের বুকটা ধক্ করে ওঠে।
তার মেয়ে। একমাত্র মেয়ের না জানি কোনো ক্ষতি হয়। এ গ্রামের অভিশাপ না জানি তার মেয়ে ছুতে আসে।
যাহোক। তার আগে রবিউলের বক্তব্যগুলো তুলে ধরা উচিত।
রবিউলের বক্তব্য ও তাদের কথোপকথন:
তোমাকে এর চেয়ে আর বেশী প্রমাণ দেখাতে পারবো না বাবা। এই গ্রামে জমিদার ছিল আমাদেরই পূর্বসূরি। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এখন তোমাকে কিছু বিষয় তুলে ধরলেই কিন্তু তুমি বুঝতে পারবে। বলতে হবে, তুমি তোমার হিসাবটা মেলাতে পারবে।
প্রথমেই বলো, তোমার বাবা তোমাদের কয়বার গ্রামে এনেছিল।
জহির- বাবা এর আগে মাত্র একবার এনেছিল। তাও দাদার মৃত্যুর পর। আর আমরা এসেছিলাম বাবা মারা যাওয়ার পর। বাবাকে মাটি দিতে।
রবি- তোমার বাবাকে তো ঢাকাতেই মাটি দেওয়াটা উচিত ছিল। কারণ তোমার মা যখন মারা যান তখন তোমরা গ্রামেই মাটি দিতে চেয়েছিলে কিন্তু তিনি দেননি। তাই তোমার মায়ের পাশেই তোমার বাবার মাটি দেওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তুমি দাওনি কেনো?
জহির- কারণ বাবা মৃত্যুর ঠিক আগে আমাকে বলেছিল, আমাকে গ্রামে মাটি দিস। গ্রামের মাটির সাথে মিশতে চাই।
রবি- নাও ইউ আর ইন রাইট পয়েন্ট। তোমার বাবা গ্রামের মাটিতে কেনো হঠাৎ মিশতে চাইলো। যে গ্রামে সে সহজে আসতই না সে গ্রামে কেনো সে মিশতে চাইলো? কারণটা খুব সিম্পল। তোমার বাবা সব কিছু জানতো।
যাইহোক।
এবার আসি আসল কথাটাতে। জমিদাররা অনেক অত্যাচার করতো তা তো আর নতুন করে কিছু বলার নাই। তো সেই যে তোমাকে বললাম কিছুক্ষণ আগে, অত্যাচারগুলো কি বিলীন হয়ে গেছে। হাজার মানুষের কান্না হাজার মানুষের রক্ত কি একদম হারিয়ে গেছে? নাহ। হারায়নি।
এখনও কান পাতলে তাদের আর্তনাদ শোনা যায়। এখনও তাদের অভিশাপ আমাদের বংশটাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আমাদের বংশের প্রতিটি পরিবারের একটি করে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়। অন্তত একটি শিশুর ক্ষতি হয়। এগুলো হচ্ছে প্রকৃতীর প্রতিবাদ।
আমার কোনো দোষ নেই। আমার সন্তানের কোনো দোষ নেই। তারপরও সেই অভিশাপ থেকে আমার কোনো রক্ষা নেই। কারণ, জমিদাররা নির্দোষ মানুষের উপর অত্যাচার করেছে। আর এখন আমাদের মতো নির্দোষ মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করে প্রকৃতি।
আমাদের প্রতিটি পরিবারের মধ্যে সেই অভিশাপ ঢুকে গেছে। তোমার দাদা যখন মারা যায় তখন কিন্তু তুমি খুব ছোট। তোমার কিন্তু একটা বোন ছিল তা কি তোমার মনে আছে।
জহির তখন মাথা নাড়ায়।
তোমার সেই বোন কিন্তু তখন মারা যায়।
হঠাৎ পুকুরে তোমার বোনের লাশ পাওয়া যায়। ঠিক সেদিনই তোমার মা তোমাকে নিয়ে ঢাকা চলে যায়। তাই তোমার পরিবারটাও কিন্তু অভিশাপের বাইরে নয়। আমি তোমার বাবার চাচাতো ভাই। আমাদের কিন্তু আর কেউ অবশিষ্ট নেই।
আমারও একটা বোন ছিল। তার যখন ২১ বছর তখন তার বিয়ে ঠিক হয়। সেও কিন্তু ঢাকাতেই পড়াশুনা করতো। তোমার চাচির বন্ধু ছিল। তোমার চাচি আর আমার বোন রাশিদা একই হলে থাকতো।
ঈদের ছুটিতে আমরা সবাই গ্রামে আসলাম ঈদ করতে। তোমার চাচিও তখন রাশিদার বান্ধবি হওয়ার সুবাদে আমাদের সাথে গ্রামে আসলো। তোমার বাবা যেমন ভয়ে তোমাকে গ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আমার বাবা কিন্তু আবার তেমন নয়। তিনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন।
তুমি জানো কিনা জানি না। আমার বাবা কিন্তু অনেক শিক্ষিত একজন মানুষ ছিলেন। ঢাকায় তিনি একটি বিদেশী কোম্পানীতে গবেষক ছিলেন। অভিশাপ ব্যপারটা ওনার কাছে একদম কুসংস্কার মনে হতো। তাই আমরা গ্রামে দেদারসে ঘুরতে পারতাম।
যাইহোক, রাশিদা ঈদে আসলো ওর বান্ধবীকে নিয়ে। আমিও আসলাম। ঈদের রাতে আকাশে অসাধারণ পূর্ণিমা ছিল। সেই রাতেই আমি তোমার চাচিকে বলেছিলাম, আমাকে বিয়ে করবে? অসাধারণ মায়াময় সে রাতে আমি রাশিদা আর তোমার চাচি মিতু পুকুর ঘাটে বসে গল্প করছিলাম। রাশিদা তখন একটি গান গাচ্ছিল।
গান যখন শেষ হলো রাশিদা বলল, ভাইয়া, এতো সুন্দর একটা দৃশ্য। এতো সুন্দর। দেখ। দেখ চাঁদের আলোটা পুকুরে পড়েছে। সারা পুকুরটা কি অসাধারণ হয়ে গেছে।
পুকুর থেকে আলোটা রিফ্লেক্ট করে চারিপাশকে আরো আলোকিত করে তুলেছে। প্রকৃতি এতো সুন্দর কেনো রে ভাইয়া। এতো সুন্দর একটা দৃশ্য দেখে মরে যাওয়াটাই ভালো। আবার শহরে সেই ধোয়াটে দৃশ্য দেখার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।
ব্যস।
রাশেদার কথা প্রকৃতি শুনে ফেলল। অশ্চর্য হলেও সত্য সাথে সাথে রাশিদা নিশ্চুপ হয়ে গেলো। আমি আর মিতু ভেবেছিলাম রাশিদা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য অভিনয় করছে। কিন্তু না। অভিনয় নয়।
মৃত্যু। সত্যিই ওর মৃত্যু হলো। এতো সুন্দর একটা দৃশ্যের মাঝখানেই ও মরতে চেয়েছে। প্রকৃতি ওর আবেদনে সাড়া দিয়েছে। চাঁদের অপরুপ দৃশ্যের মাঝে মৃত্যু হলো আমার অদুরে বোনটার।
ঠিক সেদিন থেকেই আমি সব বিশ্বাস করি। ঠিক সেদিন থেকেই আমার বাবা আর এটাকে কুসংস্কার ভাবে না। তবে তিনি ভিতু নন। তিনি এর পর থেকে আর গ্রামের বাইরে বের হননি। আর মিতু?
মিতু অত্যন্ত শক্ত মনের মেয়ে।
ও চলে গেলো পড়াশুনা শেষ করতে। এবং যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেলো, আমি আসবো। এখানে আসবো। বউ হয়ে। যে প্রকৃতি তোমাদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে সে প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ করবো।
আমিও তোমাদের সাথে লড়বো। এই অভিশাপ নামক হাওয়াকে আমিও দেখতে চাই। আমি সরাসরি তাদের সাথে কথা বলতে চাই।
মিতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে মাষ্টার্স করা মেয়ে। সেই মেয়ে আমার সাথে এই গ্রামে পড়ে আছে।
তার ঘনিষ্ট বান্ধবীর হত্যার বিদ্রোহ করার জন্য। আমাকে কতটুকু ভালোবাসে তা জানি না। তবে আমরা সংসার করছি। আমরা অপেক্ষা করছি আরেকটি হত্যার। প্রকৃতি আমাদের পরিবারে ঢুকবে হত্যা করতে।
সেই অপেক্ষায় আছি। এখনও আমাদের ঘায়েল করতে পারেনি। আমাদের মেয়ে যথেষ্ঠ সাহসী। তাকে আমরা সেভাবেই বড় করে তুলেছি।
আরেকটা ব্যাপারকি।
আমাদের বংশে অভিশাপটা এসে পড়ে মেয়েদের উপর। হয়তো মেয়েদের উপর অত্যাচারটা বেশী আকারে হয়েছিল। প্রকৃতি শুধু বেছে বেছে মেয়েদেরই নিয়ে যায়। আমার বোন। তোমার বোন।
এমনকি তোমার একজন ফুফুও কিন্তু ছিলেন। তাকেও প্রকৃতির নির্মমতার শিকার হতে হয়েছিল। তোমার ফুফু চলে যাওয়াটা আরও হৃদয়বিদাড়ক। বলতে হবে আরও ভয়ানক।
তোমার ফুফুর নাম ছিল কোহিনুর।
কোহিনুরের যখন ১৭ বছর তখন হঠাৎ তার ঘুমের মধ্যে হাটাচলার রোগ দেখা দিলো। তাকে নিয়ে ডাক্তার দেখানো হলো। তখনতো আর ডাক্তার এতো অত্যাধুনিক ছিল না। তিনি বার বার বলতেন ঘুমের সমস্যা। আবার বলতেন কোনো বিষয় নিয়ে হয়তো তিনি টেনশান করেন।
গ্রামের সবাই বলতো, নিশি ডাকে। আমরা এসব বিশ্বাস করতাম না। তুমি তো এতোটুকু বোঝ আমরা কিন্তু যথেষ্ট শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে উঠেছি। যুগ যুগ থেকেই আমাদের পরিবার শিক্ষিত। সংস্কারমনা।
যাইহোক। একদিন হঠাৎ কোহিনুরকে পুকুরঘাটে ভোর বেলা আবিষ্কার করা হলো তাও আবার উলঙ্গ অবস্থায়। তারপর থেকে তাকে রাতে বেধে রাখা হলো। রাত হলেই তাকে বেধে রাখা হয়। দুইদিন এভাবেই পার হলো।
তৃতীয়দিন সে গম্ভীর হয়ে বলল, আমাকে বেধে রাখছো? আজকে বুঝবা ঠেলা। পরদিন সকালে দেখা গেলো, যেই রশি দিয়ে তাকে বেধে রাখা হয়েছিল সেই রশিতে সে ফাস দিয়ে মরে রয়েছে।
এই হলো ঘটনা। এর চেয়ে বেশী আর কি বা প্রমাণ থাকতে পারে আমার জানা নাই জহির। ভয়ানক সব ঘটনায় আমি আটকে আছি।
আমি এখানে পড়ে রয়েছি বিদ্রোহের জন্য। আমিও বলতে চাই, যারা অন্যায় করেছে তো করেছে....এখন আমরা কি করেছি.....আমরা কেনো এর ভাগিদার হবো.....আমার বংশের মানুষগুলোকে কেনো এভাবে ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে। আমি যে তোমাকে বললাম, যুগে যুগে অভিশাপের ধরন পাল্টাচ্ছে, একটা সময় ছিল যখন জমিদার বংশধরদের ভিক্ষুকে পরিণত হতে হয়েছে। তাদের অর্থ সংকটে পড়তে হয়েছে। তারপর কেউ হয়তো এর বিপক্ষে বিদ্রোহ করেছে।
আমাদের মতো কেউ। তাই আবার আমরা আমাদের সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছি। তারপর শুরু হয়েছিল বিকলাঙ্গ হওয়ার পালা। দেখা যেতো প্রতি পরিবারে একজন করে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম নিচ্ছে। যেমন, আমার দাদার ছোট বোন মানসিকভাবে প্রতিবন্দি ছিলেন।
তার একটি পাও ছিল না। জন্মই হয়েছিল পা বিহীন।
এরপর শুরু হলো অকষ্মাত মৃত্যু। অজানা কারণে হত্যা। তাই ঐ অজানা মৃত্যুর বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ করেছি।
এভাবে একের পর এক আক্রমণের বিরুদ্ধে আমরা লড়তে থাকবো। হয়তো একদিন প্রকৃতি ক্ষান্ত হবে। হয়তো একদিন প্রকৃতির হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অবশিষ্ট আর কিছুই থাকবে না। সেই স্বপ্নই দেখছি।
আর তুমি বলেছিলে না, জমিদারের অবশিষ্ট আর কিছুই কি নেই! আছে।
একটা জিনিস অবশিষ্ট আছে। সেটা যুগ যুগ ধরে বহন করছি আমরা। তোমার বাবা বয়সের দিক থেকে সবার বড় ছিল। তাই তিনি তা পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সে জিনিসটি রাখেননি।
তার ধারণা ছিল, এই জিনিসটি দিয়েই প্রকৃতি আমাদের পয়েন্ট করতে পারে। জিনিসটি হচ্ছে, একটি বন্দুক। এই বন্দুক যুগ যুগ ধরে আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের শেষ স্মৃতি হিসেবে রেখে দিচ্ছি। আজ আমি তা তোমাকে দিয়ে দেবো। তুমি আমার মেয়ের চাইতে বড়।
সুতরাং বয়সের দিক থেকে তুমি তা রক্ষার দ্বায়িত্ব পাবে। কিন্তু তুমিও যদি তোমার বাবার মতো ভয়ে এটাকে রাখতে না চাও তাহলে নিও না। আমার মেয়ে যদি বেচে থাকে তাহলে সেই সেটা ধারণ করবে। তবে হয়তো হবে না। তাকে মরতে হবে।
কারণ, মেয়েদের উপর অভিশাপটা এসে পড়ে। তাদেরই হামলা করে। তাই আমি অপেক্ষা করছি আমার মেয়ের মৃত্যু দেখার জন্য। তবে দেখার বিষয়, আমি তো বিদ্রোহ করেছি অজানা কারণে মৃত্যুর বিরুদ্ধে। তাই এখন প্রকৃতি কি তার ধরন পরিবর্তন করবে নাকি! সেটাই দেখার বিষয়।
জহির ও বন্দুক:
গল্পের শুরুটা করেছিলাম এই বন্দুক দিয়ে। বলেছিলাম, একটি বন্দুক। তার ভিতর তিনটি বুলেট। চকচকে কালচে রঙের বন্দুক। পুরণ সেকেলে টাইপ।
সেই বন্দুক হাতে নিয়ে জহির কতকি ভেবে যায়। রাত হয়েছে। মেয়ে তাকে একটি প্রশ্ন করেছিল। বলেছিল, আব্বু সবাই এখানে এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে কেনো?
সেই উত্তরটাও দেয়া হয়েছিল। তারপর মেয়ে বাবার নিস্তব্ধতা দেখে চলে গেছে।
হয়তো সুকন্যা জহিরকে আরও প্রশ্ন করেছিল। হয়তো সুকন্যা তার বাবার হাতে বন্দুকটি দেখে প্রশ্নও করেছিল, বাবা এটা কি?
কিন্তু জহির শোনে নি। সে শুধু ভাবছে তার রবি কাকুর কথাগুলো। রবি কাকু বিদ্রোহ করেছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
পুর্বসূরিদের অপরাধের শাস্তি যখন তাদের উপর পড়ছে তখন রবি কাকু একাই লড়ছেন। জহিরের বাবা লড়েনি। তিনি ভিতু। অথচ সাহসের সাথে এই গ্রামের মাটিতে তিনি শুয়েছেন। কান পেতে শুনছেন মানুষের কান্না।
হয়তো তাই হবে। হয়তো সেই অভিশাপটা তিনি মাথা নত করে নিয়েছেন। হয়তো বা ভয়টাকে মৃত্যুর পর পেয়ে কি হবে তাই তিনি গ্রামেই ঘুমাতে চেয়েছেন।
এইসবই জহির ভেবে যায়। তবে জহিরের মনটা আতংকে ডুকরে ওঠে।
যখন তার মনে পড়ে রবি কাকুর সেই কথা। মেয়েদের উপরই আক্রমণ হচ্ছে। মেয়েদেরই ক্ষতি হচ্ছে। মেয়েরাই অভিশাপের শিকার হচ্ছে। দৌড়ে যায় জহির।
মেয়ের পাশে যায়। মেয়েকে পাশে সে চুপ করে শুয়ে থাকে। আর মনে মনে বলে, আমরা কালকেই ঢাকা চলে যাবো মামুনি। তোমার কিচ্ছুই আমি হতে দিবো না।
পরদিন সকালে:
সকল গুজগাজ শেষ।
কিছুক্ষণ পরই তারা ঢাকায় রওনা হবে। রবি কাকুও এসেছে। তিনিও সাজেস করেছেন, চলে যাওয়ার। এই অতংকের মধ্যে থাকার কোনো মানে হয় না।
জহিরকে বলেছেন, তুমি চাইলে বন্দুকটাও আমাকে দিয়ে যেতে পারো।
জহির দেয় নি। তবে রবি কাকুকে সে বলেছে, আপনার সাথে আমিও যুদ্ধে নামবো। তবে তার আগে আমাকে আগে একটু গুছিয়ে উঠতে দিন।
রবিউল সাথে সাথে জহিরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে, আই এম টায়ার্ড মাই সান।
আই এম টায়ার্ড। বিভৎস কিছুর আপেক্ষা আর ভালো লাগছে না। আর না........
জহির এবার কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যায়। তারপর রবিউলকে বলে, কাকু, বন্দুকের গুলিগুলা শেষ করে দেই? গুলি চালিয়ে বন্দুকটাকে ফাঁকা করি। যাতে কোনো বিপদ না ঘটে।
রবিউল নিজেই জহিরের হাত থেকে বন্দুকটা নেয়। তারপর আকাশের দিকে তাক করে তিনবার ট্রিগার চাপে। এতো পুরো বন্দুক অথচ মনে হচ্ছে না। সবলীলভাবে সে বন্দুক থেকে গুলি ছুটে গেলো। পাশেই সুকন্যা ছিল।
সুকন্যা কানে হাত দিয়ে দাড়িয়ে থাকলেও সে খুব মজা পেয়েছে। বার বার সে বলছে, আব্বু আবার গুলি করো। আবার গুলি করো। প্লিজ আব্বু...প্লিজ।
গ্রাম ছাড়ছে জহির ও তার পরিবার।
জহির বলেই গেছে, এ গ্রামে সে আবার ফিরে আসবে। রবি কাকুর সাথে বিদ্রোহে অংশ নেবে। তার উত্তরসূরিদের রক্ষা করতে সে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। যখন ট্রেনটা ছাড়লো তখন জহির মনে মনে বিড়বিড় করে বলছে, আমি আসছি বদরপুর। আমি আসছি তোমার কাছে আবার।
লড়বো। অভিশাপের বাতাসের সাথে লড়বো। আমি আসছি......
টেনটা ছাড়ার পর থেকে সুকন্যা জহিরকে পাগল করে তুলেছে। তার সেই বায়না শেষই হচ্ছে না। সে বার বার বলছে, আব্বু প্লিজ আবার গুলি করো.....আবার গুলি করো।
বন্দুকটার জন্য রবিউল একটা আলাদা বক্স দিয়েছে। সেই বক্সে বন্দুকটার সাথে কিছু কাগজ পত্রও আছে। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমমিনিষ্ট্রি থেকে কাগজগুলো নেয়া। এক কথায় বন্দুকে লাইসেন্স। রাস্তাঘাটে যাতে কোনো সমস্যা না হয় তাই কাগজগুলো দিয়ে দিয়েছে সে।
মেয়ের আবদারে অতিষ্ট হয়ে জহির বন্দুকটা বের করে। আর বলে, মা ভেতরে আর কোনো বুলেট নেই। এখন ট্রিগার চাপলেও গুলি বের হবে না। শুধু শুধু জালাতন করিস না।
সুকন্যা বিশ্বাস করতে চায় না।
ট্রেনের ঝিক ঝিক আওয়াজে সুকন্যা বলে ওঠে, মিথ্যা কথা। আছে। বুলেট আছে। তুমি বাইরে গুলি করো।
জহির মেয়ের কথা রাখে।
বাইরে বন্দুক তাক করে ট্রিগার চাপে।
তারপর বলে, দেখেছিস? বুলেট নেই।
সুকন্যার মনটা খারাপ হয়ে যায়। তারপর সে চুপ করে বসে থাকে। আবার সে তার বাবার কাছে আসে।
আব্বু গুলি কেনো নেই?
মেয়ের মনটাকে ভালো করার জন্য জহির তার মেয়ের সাথে একটা খেলা খেলবে বলে ঠিক করে। হাসতে হাসতে বলে, আবার কথা বলিস। আর এইটা নিয়ে কথা বলবি তো তোকে গুলি করবো।
সুকন্যা হাসে। হাসে আর বলে, কই কই করো করো।
এই ভাবে কিছুক্ষণ যায়। তারপর বন্দুকের নলটা সুকন্যার পেট বরাবর রেখে জহির বলে, করবো করবো গুলি?
সুকন্যা আরও মজা পায়। বন্দুকের নল নিজ হাতে ধরে বলে, করো করো।
ট্রিগারটা চাপও দেয় জহির।
ট্রেনের আওয়াজের সাথে আরেকটি আওয়াজ মিশে যায়।
লাফ দিয়ে ওঠে সুকন্যার মা। জহির একটা ধাক্কা অনুভব করে। তিনটি বুলেট ছিল। তিনবার গুলি চালানো হয়েছিল। তিনটি বুলেট ফাকা আকাশে ছোড়া হয়েছিল।
চতুর্থবার ট্রিগার চাপা হয়েছিল তখন বুলেট ছিল না। তবে এখন কেনো ধাক্কা খেলো জহির?
সুকন্যার মা চিৎকার দিয়ে ওঠে। জহির চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। বন্দুকের নলটা তখনও সুকন্যার দিকে।
সুকন্যার চোখ লাল হয়ে উঠেছে।
বাবার দিকে তাকিয়ে সুকন্যা আবার তার বাবাকে প্রশ্ন করলো, বাবা আমাকে সত্যি সত্যি গুলি করলে?
জহির উ™£ান্ত হয়ে যায়। এদিক সেদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। পাগল হয়ে ওঠে জহির। আমার মেয়েকে আমি গুলি করেছি? আমি?
জহিরকে শান্ত করা হয়। সুকন্যার মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে।
একটি ষ্টেশানে ট্রেন থামিয়ে তাদের সদর হাসপাতালে নেয়া হলো। জহির তখনও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। কি দেখছে? হয়তো কিছুই দেখছে না।
সুকন্যার মার জ্ঞান ফেরেনি। সুকন্যার রক্তাক্ত শরীর মর্গবিহীন হাসপাতালের ফ্লোরে পড়ে রয়েছে।
জহির মিনমিনিয়ে বলছে, রবি কাকু। তুমি জয়ী হয়েছো। তোমার বিদ্রোহ সফল হয়েছে। অভিশাপ আসার পেটার্ন পরিবর্তন হয়েছে। অজানা কারণে মৃত্যু বন্ধ হয়েছে।
এখন শুরু হয়েছে পিতার হাতে কন্যার মৃত্যু।
----------------------------------------------------------------------
গল্পটা মনে হয় অনেক বেশী বড় হয়ে গেলো। সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।