আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গল্প - জোনাক পোকা

আত্মহত্যা গাধারা করে । আমি গাধার চেয়েও নিচু প্রজাতির । তাই আত্মহত্যা করার চিন্তা বা সাহস কোনোটাই আসবে না আমার মধ্যে । যার কারণে আত্মহত্যা করা হবে না আমার.....

আমি সবাইকে 'অভ্র' নামে পরিচয় দিই । যদিও এই নাম আমার বাবা-মার দেওয়া না ।

তাই বলে এটা নকল নাম আর তাঁদের দেওয়াটা আসল নাম, তা না । দুইটাই আসল । শুধু পার্থক্য হল, ওইটা বাবা-মা রাখছে আর এইটা আমি রাখছি । তাঁরা ওইটা রাখার সময় গরু-ছাগল জবাই করে আকিকা দিছেন আর আমি একটা পাখিও না । পাখি বেশ বড় হয়ে যাচ্ছে ।

বলা যায় একটা মশা-মাছিও না । আচ্ছা নাম নিয়ে প্যাঁচাল করার কি দরকার? থাক না যেটা আছে সেটা । মানে 'অভ্র' আরকি... এবার আমার মনের অবস্থা বলি । সত্যি কথা বলতে সেটার অবস্থা অত্যধিক খারাপ । অধিকতর খারাপ ।

পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেছে । কারণ সে চলে গেছে আমাকে ছেড়ে । দুষ্টামি করে আগেও কয়েকবার গিয়েছিল । ফিরেও এসেছে । তবে এবার বেশ সিরিয়াস ভাবে গেছে ।

আমিও বুঝতে পারছি কতটা সিরিয়াস । সেজন্যেই মনের অবস্থা এতটা খারাপ । তাকে এবার আর ফেরানোর চেষ্টাও করিনি । সে আর এডজাস্ট করতে পারছেনা আমার সাথে । আমাকে সহ্য করতে পারছেনা ।

অবশ্য তাকেও দোষ দিতে পারছি না । আমি হয়ত আসলেই এমন অসহ্য । নিজেকে নিয়ে বেশ কনফিউজড আমি । এই মুহূর্তে আমি বেশ বিরক্ত । বিরক্তির মূল কারণ আমার পাশে হাঁটতে থাকা মেয়েটা ।

একই ভার্সিটিতে পড়ি । তবে মেয়েটা আমার জুনিয়র । মেয়েটাকে চিনি আগে থেকে । কিন্তু তেমন একটা কথা হয়নি । একটু আগে ভার্সিটি থেকে বের হওয়ার সময় দেখা হয়ে যায় মেয়েটার সাথে ।

সেও নাকি বাসায় যাবে । কিছুদুর একসাথে যাওয়া যাবে । তারপর দুজন দুদিকে । দেখা হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত একটা কাজ মেয়েটা ননস্টপ করে যাচ্ছে । সেটা হল কথা বলা ।

একটা সেকেন্ডের জন্যও মেয়েটার কথা বন্ধ হয়নি । মাথা ধরে গেছে আমার । তারপরও কিছু বলতে পারছিনা । আসলে কথা বলতেই ইচ্ছা হচ্ছে না । আর মেয়েটার থামার কোন লক্ষণই নেই ।

মেয়েটার গায়ের রং কালো । তবে চেহারায় একটা মায়া আছে । ভালো লাগার মত এই একটা জিনিসই আছে । যদিও আমার এখন ওইটাও ভালো লাগছে না । মেয়েটার কথার মধ্যে সব ধরনের কথা আছে ।

গতকাল কিভাবে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে সেটা থেকে শুরু করে আজকে সকালে তার বাবা তার সামনে তার মাকে চোখ টিপ মারা পর্যন্ত সব । তার বাবা মায়ের রোমান্টিক লাইফ আর রোমাঞ্চ নিয়ে সে খুব এক্সাইটেড । সে নিজেও এমন একটা রোমান্টিক লাইফ চায়, এটা পর্যন্ত বলে দিল । মেয়েটার সাথে আমার আজই প্রথম কথা হচ্ছে । আগে যা হয়েছে সব হাই হ্যালো কেমন আছো টাইপের ।

আজই প্রথম, আর আজই মেয়েটা এসব বলে দিচ্ছে । কি মনে করে বলছে ? কে আমি ? কিছুটা অবাকই হলাম । তবে সেটা প্রকাশ করলাম না । আর কিছুদুর হাঁটার পর দুজন দুদিকে যাওয়ার সময় এসে গেল । আমি ভদ্রতা দেখাতে বললাম -একা যেতে পারবে ? বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিব ? -অনেক ধন্যবাদ ।

খুব পারব একা যেতে । এত সহজে আমার বাসার ঠিকানা জানতে দিচ্ছি না আপনাকে । মেয়েটার জবাব শুনে আমি বেকুব হয়ে গেলাম । কি বলে এই মেয়ে ?? -আমি কি বলেছি আমি তোমার ঠিকানা জানতে চাই ? -জানতে যে চান না সেটাও তো বলেননি । আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে গেলাম ।

এই মেয়ের মাথায় নিশ্চিত প্রবলেম আছে । -আচ্ছা যাও তাইলে । তোমার ঠিকানা ভালো থাকুক, সুখে থাকুক, যত্নে থাকুক । বিদায়... -এমন ভাবে বলতেছেন যেন আর কখনো দেখা হবে না । -বলা যায় না... মেয়েটা চলে যাচ্ছে ।

আমারও আর দাঁড়িয়ে থাকার ইচ্ছা নাই । ঘুরে পা বাড়াতে যাব এমন সময় মেয়েটা পিছন থেকে ডাক দিল । অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরলাম । -আমার নাম তো জানেন না মনে হয় । আমার নাম সুবহা ।

-আমি কি বলছি আমি তোমার নাম জানতে চাই ? -জানতে চান না সেটাও তো বলেননি । বলেই মেয়েটা হেসে ফেলল । চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ স্পষ্ট মেয়েটার । আমার আর কিছু বলার নাই তখন । আমি অবাক হয়ে সুবহা নামের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।

মেয়েটার হাসিটা বেশ সুন্দর । দেখতে অনেক ভালো লাগছে । আমাকে ওইভাবে রেখেই মেয়েটা চলে গেল হেঁটে হেঁটে । পরদিন ভার্সিটিতে ক্লাসের পর দাঁড়িয়ে ছিলাম ফ্রেন্ডসদের সাথে । এমন সময় দেখলাম সুবহা নামের মেয়েটা আমাকে ডাকছে ।

ফ্রেন্ডসদের ঈঙ্গিতপূর্ণ চোখের চাহনি উপেক্ষা করে গেলাম ওর কাছে । -যাবেন না ? -কোথায় ? -কোথায় আবার ? বাসায় ? -হুম যাব তো । -চলেন একসাথে যাই । আমার মোটেই ইচ্ছা নাই একসাথে যাওয়ার । তাই মিথ্যে বললাম ।

-আমার যেতে একটু দেরী হবে । তুমি চলে যাও । -ও... মেয়েটা চিন্তা করছে । চোখমুখ অন্ধকার হয়ে গেছে । ভেবেছিল একসাথে যাবে ।

মন খারাপ হয়ে গেছে হয়ত । আমি নিজের চোখের সামনে সফলতা দেখতে পেয়ে মনে মনে খুশি । যাক একসাথে যেতে হবে না । বাঁচা গেছে । কিন্তু হঠাত মেয়েটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠাতে শংকিত হয়ে পড়লাম ।

-আচ্ছা আমি ওই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি । আপনার যাওয়ার সময় হলে বলবেন । আমি ওই পাশটায় আছি । ঠিকাছে ? আমি মনমরা অবস্থায় বললাম, আচ্ছা । মেয়েটা একটু দূরে দাঁড়ানো আরেকটা মেয়ের সাথে কথা বলা শুরু করল ।

আমি আবার বন্ধুদের কাছে ফিরে গেলাম । সবাই জানতে চাইছে মেয়েটা কে ? আমার সাথে কি ওর ? আমার তখন কিছু বলার মুড নাই । মেজাজটা খারাপ হয়ে গেছে, নিজের উপর । জানি না কেন হয়েছে । বেশীক্ষণ দাঁড়ালাম না আর ।

লাভ নেই কোন । আগে যাই বা পরে, মেয়েটার সাথেই যেতে হবে । শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার দরকার নাই কোন । ভার্সিটি থেকে বের হয়েই আমাকে সে হুকুমের সুরে বলল, একটা রিক্সা ঠিক করেন । মেজাজ এমনিতেও খারাপ ।

তার উপর এইরকম কথা শুনে সেটা আরো বাড়লো । সরাসরি বলে দিলাম, পারবোনা । তুমি কর । আমার যে মেজাজ খারাপ এটা সুবহা মনে হয় খেয়ালই করেনি । -বলেন কি ? আপনি একটা মেয়েকে এভাবে রিক্সা ঠিক করতে বলতেছেন ? -কেন ? মেয়েরা রিক্সা ঠিক করলে কোন সমস্যা আছে ? -নাহ ।

কিন্তু যখন সাথে কোন ছেলে থাকে তখন তো করে না । আমার তর্ক করতে ইচ্ছা করছে না । এই মেয়ের সাথে তর্ক করে ফায়দা নাই । ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের কথাটাই সত্য প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকবে । সব মেয়েই কি এমন ? শিওর না ।

রিক্সা ঠিক করলাম একটা । রিক্সাওয়ালার বয়স বেশি না । রিক্সায় উঠেই আমি বললাম, মামা হুডটা তুলে দেন তো । তখন সুবহা বাধা দিল । -রোদ নাই তো ।

হুড তোলার কি দরকার ? -না মানে.. -আমরা কি প্রেম করতেছি নাকি । এত ভয়ের কি আছে ? থাকুক এরকম । আমার এখন অধিক শোকে পাথরের মত অবস্থা । নিজেকে একটা পুতুল মনে হইতেছে । যাকে নিয়ে ইচ্ছামত যা খুশি করা যায় ।

ইচ্ছা হলে হাত একটা চাপ দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা যায় । আবার চাইলেই লাগিয়ে দেয়া যায় । বড়ই শোচনীয় অবস্থা । এরপর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে । সবকিছু পাল্টে গেছে এই কদিনে ।

যেই মেয়েটাকে বিরক্ত লাগত অনেক, সেই সুবহা নামের মেয়েটাকেই এখন অনেক ভালো লাগে । বেশ ভালো বন্ধু আমরা । অনেক কথা বলে সুবহা । এত কথা কোথা থেকে যে বের হয় কে জানে । তবে আমার এখন আর শুনতে খারাপ লাগে না ।

একবার ভালোবাসা নিয়ে ওর ইচ্ছার কথা বলেছিল । -জানো আমার খুব শখ কাউকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসবো । সেও মন প্রাণ দিয়ে আমাকে ভালোবাসবে । -তোমাকে ভালোবাসবে ? হাহ... -কেন ? আমাকে ভালোবাসা যায় না ? -তুমি যে কত কথা বল সেটা শুনলেই ভালোবাসার সাধ মিটে যাবে । পালাবার রাস্তা খুঁজবে তখন ।

-বলছে তোমাকে.. -বলতে হবে কেন ? আমি জানি । -হইছে । চুপ । আমি এখন রেগে গেছি । আমার সাথে তিন মিনিট কথা বলবা না ।

-আচ্ছা । বরাবর তিন মিনিট পর... -জানো আমি যাকে ভালোবাসবো তাকে বলে দেব যে সে আমাকে 'জোনাক পোকা' ডাকতে হবে । -মানে কি ? জোনাক পোকা ডাকতে হবে কেন ? -আমার ইচ্ছা । আমার ভালো লাগে । -বাহ ।

ইন্টারেস্টিং... আমি সুবহাকে নিয়ে কখনো ভালোবাসা সম্পর্কিত কিছু চিন্তা করিনি । ইচ্ছা হয়নি কখনো । এসবে তেমন আগ্রহ নাই । কিন্তু কিছুদিন পর থেকে যখন সুবহা কোন ছেলের সম্পর্কে ভালো কিছু বলত, তখন রাগ হত । ওরে কিছু বলতেও পারতাম না ।

মানাও করতে পারতাম না । এসব শুনলে ও নিশ্চিত হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবে । আমার নিজেরই বা এমন হচ্ছে কেন ? ও কোন ছেলের সম্পর্কে ভালো কিছু বলতেই পারে, এতে আমার রাগ করার কি আছে ? নিজেকে নিজেই বুঝতে পারতেছি না । হতে পারে এতদিন একসাথে থাকার ফলে আমি চাই সুবহার সবকিছুই 'আমি' কেন্দ্রিক হোক । আমি চাই ওর সবকিছুতে শুধু আমি থাকতে ।

আরো কিছুদিন পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হল আমার কাছে । নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম । আমি ওই সুবহা নামের মেয়েটার প্রেমে প্রচন্ড জোরে আছড়ে পড়েছি । ওঠার শক্তি নেই । আমি এখন এ ব্যাপারে শিওর এবং আমার উচিত যত তাড়াতাড়ি পারি ওকে এসব বলে দেয়া ।

এসব ব্যাপারে দেরি করা ঠিক না । মাঝখানে অন্য কেউ এসে ঢুকে পড়তে পারে । দিন তারিখ ঠিক করে ফেললাম । মনে মনে প্রস্তুতি নিতে থাকলাম । নির্দিষ্ট দিনে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম ।

কোন ফুল-টুল কিচ্ছু আনি নাই । টেনশনে এতকিছু মনে ছিল না । এখন শুধু একটাই চিন্তা, ওরে জানাতে হবে সব । এই কয়দিন ওর সাথে তেমন যোগাযোগ হয়নি । তাই আমার উপর কিছুটা রেগে আছে ও ।

-সুবহা... এই সুবহা... -চিল্লাচ্ছ কেন ? বল.. -না মানে... আসলে... -কি মানে ? কি আসলে ? যা বলার ঠিকভাবে বল । এইভাবে একবার এদিকে একবার ওইদিকে দুলতেছ কেন ? সোজা হয়ে দাঁড়াও... এবার বল... -আসলে... আমি আসলে... তুমি... মানে... -আজব তো । এইভাবে আমি তুমি করতেছ কেন ? তুমি বলবা ? নাইলে আমি যাচ্ছি... বাই... -আরে দাঁড়াও না বলছি । -হুম... -আমি... তোমাকে... মানে তোমাকে আমার জোনাক পোকা করতে চাই । তুমি কি আমার জোনাক পোকা হবে ? প্লিজ... কথাগুলো বলেই আমি চোখ নিচের দিকে নামিয়ে ফেললাম ।

সুবহা কি করবে দেখার সাহস নাই । জানি না কি হবে । চুপ করে আছে ও । একবার কি ওর দিকে তাকাবো ? না থাক । রিস্ক নেওয়ার দরকার নাই ।

বেশ কিছুক্ষণ পর সুবহা স্বাভাবিক ভাবেই বলল, যাও রিক্সা ঠিক কর একটা । আমি বাধ্য ছেলের মত রিক্সা ডাকলাম । রিক্সায় উঠে পড়লাম আগেই । -তুমি বাম পাশে বসলে কেন ? বাম পাশে মেয়েরা বসে । যাও ডান পাশে যাও... গেলাম ডানপাশে ।

এখনো আমি ওর চোখের দিকে তাকাতে পারিনি । জানিনা কি না কি দেখব তাকালে । সুবহা রিক্সায় উঠে রিক্সাওয়ালাকে বলল, মামা হুডটা তুলে দেন তো । সুবহা হঠাত আমার হাতটা ধরতেই আমি ওর দিকে তাকাবার সাহস পেলাম । সামনের দিকে তাকিয়ে আছে ও ।

দৃশ্যপট পাল্টে গেছে । এখন ও আমার দিকে তাকাতে পারছে না । লজ্জা পাচ্ছে । আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরলাম । আমার এখন পাগলের মত চিত্‍কার করে গাইতে ইচ্ছা করতেছে, "আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে..." ##The enD##


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.