আমার ভিতরে আমি স্বতন্ত্র জীবন যাপন করি।
১.
শহরের আজ বিশেষ দিন। দরবার হলে মিটিং বসেছে। হর্তাকর্তারা সব এক হয়েছেন জটিল সমস্যা সমাধান করতে। আশংখাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে শহরে অসুখী মানুষদের সংখ্যা।
এসব মানুষগুলো হতাশার চাদর পরে ঘুরে বেড়ায়। নেশায় মাতাল করে দেয় এক একটা সন্ধ্যা। তারা বলে থাকে, তাদের হারানোর কিছুই নেই, তাই নিজেদের জীবন হারিয়ে ফেলার পায়তারা করছে। এরকম মানুষ নিয়ে সুস্থ নাগরিকদের কোন ধরণের এলার্জি ছিলো না কোন কালেই। বরং এরা আরও শান্তি দেয়।
নিজেরা নেশা করে নিজেদের মধ্যে ঢুকে থাকে। এতে করে শহরে শান্তি বিরাজ করে, তারচে বড় কথা জীবনে যাদের চাওয়া পাওয়া নেই তাদের বেঁচে থাকার জন্য হাউকাউও নেই। বেঁচে থাকার হাউকাউ সামলাতে ব্যস্ত সরকার। প্রশ্ন এসে যায়, মাথা ব্যাথা না থাকলে দরবার হলে মিটিং বসেছে কেন? সুস্থ থাকাদের ব্যাথা না থাকলেও অসুখীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের দেখা দেখি উঠতি তরুণ প্রজন্ম হতাশাবাদী হয়ে যাচ্ছে। তারা ভাবছে হতাশাবাদী আচরণ এক ধরণের ফ্যাশন।
ড্যাম কেয়ার লাইফটাকে তারা তাই আপন ভেবে নিয়েছে। এতে করে একটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে সবার ধারণা।
: ওরা কী করে?
: নেশা করে, হতাশা করে, ঘুমায় আবার ঘুমায় না
: আর কী করে?
: দুঃখ করে, কষ্ট করে, কান্না করে না।
: তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? কিছু জানো?
: কোন ভবিষ্যত পরিকল্পনা নেই।
: ওদের পরিবার, ভালোবাসার মানুষ নেই?
: তারা সেসব ব্যাপারে শিউর না, তাদের মা-বাবা-প্রেমিক-প্রেমিকাদের খবর তারা রাখে না!
‘সব আলোচনা শেষে আমি যা মনে করি, তা হল এসব অসুখী হতাশাবাদী মানুষদের শহর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত’ –প্রৌঢ় ভদ্রলোকের কথার সাথে অনেককেই দেখা গেল মাথা ঝাঁকিয়ে সহমত জ্ঞাপন করতে।
কেউ কেউ অতি উৎসাহে গালি দিয়ে বসলেন। প্রৌঢ় ব্যাক্তিটি শুনেও না শোনার ভান করে আরও কিছু কথা বলে গেলেন। যার সার কথা, অসুখী এবং হতাশাবাদীদের জায়গায় এই শহর না। তারা নেশা করুক, মরুক, বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলুক, অন্য কোথাও গিয়ে করুক।
২.
শহরের এক দল দুঃখ বিক্রেতা হঠাৎ করে উধাও!
বিশ্বাস করুন আর নাই করুন।
তখন শহরে সব সুখী মানুষ। সেবারের বই মেলায় বেরুয়নি কোন বিরহী কবিতা গল্প কিংবা উপন্যাস। একটি গানও আসেনি বিরহ কিংবা অসুখ বিষয়ক। বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো সব মদের দোকান। তাদের ভাষ্য সুখী মানুষরা মদ খেতে জানেনা, তারা কেবল বিলাস করে।
অথচ মদ এক প্রকার তপস্যার জিনিস। সুখী মানুষরা তপস্যা করতে পারে না। রাস্তায় কোন ভিক্ষুক নেই, কন্যার বিবাহের টাকা যোগাড় করতে কেউ আর লোকাল বাসে চড়ছিলো না। চলচ্চিত্রে কোন মারামারি নেই, রক্ত নেই, বিরহ নেই, নায়িকার কাছে হোচট খেয়ে কোন নায়ক রাস্তায় হেঁটে মদ খেতে খেতে গাইতো না। পুরো শহরে কেবল ফুটফুটে ফুল ফুটে আছে।
প্রজাপতি উড়ছে, সে শহরে কোন কাক ছিলো না।
মানুষ দুঃখজীবী প্রাণী, বেশীদিন সুখে থাকতে পারে না। শহরের মানুষগুলো একদিন বোর ফিল করতে লাগলো, দৈনিক সকালে উঠে কি যেন একটা কিছু নেই দিয়ে ভাবনা শুরু হয়। শহরের মানুষগুলো এদিক ওদিক কি যেন একটা খুঁজে, কিন্তু সবাই কনফিউজড। আসলে তারা কি খুঁজে সেটাই খুঁজে পায় না।
তারা চুপিচুপি অসুখ খুঁজে, বিরহ খুঁজে, একটু কান্না খুঁজে, বাগানের একটি মরা ফুল খুঁজে। মরা ফুল দেখলে আহ! ফুলটা মরে গেলো বলে একটা শব্দ করা যায়। মানুষ করুণা করতে ভালোবাসে। করুণা করার সুযোগ না পেলে মানুষ অসুখী হয়ে যায়। শহরের একদল দুঃখ বিক্রেতার উধাও -এ শহরের মানুষ দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অসুখী হয়ে পড়ে।
ঠিক সন্ধ্যা! মদের দোকানগুলেঅ জমে উঠেছে। গাঁজার আসর বসেছে অলিগলিতে। কোকেন হিরোইন আফিমও চালু হয়েছে নিজ নিজ আওতাধীন অঞ্চলে। গতকাল দুটি বিরহের কবিতা লিখে চমকে দিয়েছে সদ্য প্রেমিকা হারানো এক কবি। কেউ একজন নাকি বেদনার উপন্যাস লেখা শুরু করেছেন।
শহর ক্রমশই অসুখী হয়ে যাচ্ছে। অথচ একদল দুঃখ বিক্রেতা তখনও উধাও। সন্ধ্যা তখন ঘোরে চলে গেছে, কে যেন রব তুললো, শহরে আগন্তুক ঢুকেছে।
-ওরা কী চায়?
-ওরা চায় শহর সুখে থাকুক, শহর শান্তিতে থাকুক
-শহরটা কী তার বাবার বিয়ে করে পাতানো সংসার, চাইলেই দিতে হবে। যত্তসব।
খেদিয়ে দাও
-ওরা আমাদের শহরেরই, নাম পরিচয় জানা গেছে
-কারা ওরা?
-পালিয়ে যাওয়া দুঃখ বিক্রেতারা, ফিরে এসেছে।
৩.
চারজনের একটি দল, ওরা এগিয়ে যাচ্ছে সোডিয়াম আলোর ছায়া হয়ে। রঙীন ছায়া দেয়া সোডিয়াম ছায়া আঁটকাতে পারে না। আপাতত তাদের পরিচয় তারা অসুখীদের প্রতিনিধি। দূরে এক জানালায় আলো জ্বলছে।
সুখে থাকা জানালাগুলো রাতের বেলা বন্ধ থাকে, কেবল দুখী জানলাগুলো খোলা থাকে। জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায় রকমফের অনুভূতি। শহরে আবার অসুখী মানুষ বেড়ে গেছে। আজ অনেক অসুখী মানুষকে উধাও করে দেয়া হবে। অসুখী মানুষ হচ্ছে দুর্বাঘাসের মত, যত্নআত্তি ছাড়াই গজিয়ে উঠে হরহামেশাই!
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।