আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হুমায়ূন স্মৃতি

কাঁদো, যখনি কাঁদতে ইচ্ছে করবে। কান্না শুদ্ধতম আবেগ প্রকাশের একমাত্র উতকৃষ্ট মাধ্যম। অতি সুখের সংবাদ এ মানুষ শুদ্ধতা খুজে পায়, অতি দু:খের সংবাদ এ মানুষ শুদ্ধতা খুজে পায়। কাজেই কাঁদো, কেঁদেই তোমার জীবনকে তুমি শুদ্ধতা দান করো। - তুর্কী মরমী কবি দাদায়েম ঈমাস স্মৃতি সবসময়ই বেদনাদায়ক।

কষ্টের বা খারাপ স্মৃতি হলে তো কথাই নেই। ভালো স্মৃতিও মানুষের জন্য যে অনুভূতির জন্ম দেয় তার নাম “দীর্ঘশ্বাস”। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মানুষকে ভাবতে হয়, আহা! এমন দিন কি আর আসবে? তাই আমি স্মৃতিতে বাঁচিনা। স্মৃতি আমাকে আবেগপ্রবন করে তুলে। ভালো-মন্দ যে কোন আবেগই আমার চোখে অশ্রুর জন্ম দেয়।

আর মানুষ ভাবে আমি ছিচকাঁদুনে। তাই আবেগকে সবসময় দূরে রাখি। লেখকেরা এমন প্রকৃতির মানুষ যে তাঁদের কাছাকাছি আসতে গেলে ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। লিখিত গ্রন্হই তাঁদের জীবনের অবারিত দ্বার পাঠকদের সামনে খুলে দেয়। ব্যক্তিগত সুখ-দু:খ, জীবন-দর্শন, রাজনৈতিক মতামত, ধর্মীয় অনুভূতি, সমাজ সম্পর্কিত ধারনা সবই উঠে আসে একজন লেখকের লেখার মাধ্যমে।

আমি কোন লেখককেই ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না। যতটুকু আলাপ-পরিচয় হলে ব্যক্তিগত ভাবে চেনার সীমারেখাটা পাড়ি দেয়া যায় ওরকমটা এখনও পর্যন্ত আমার কারো সাথে হয়ে উঠেনি। কিছু মানুষ নিজেদের এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে তাদের আর ব্যক্তিগত বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তাদের সবকিছু সবাই জানে। আর যে কোন লেখক যদি কন্যাসম কাউকে ভালোবেসে এমনভাবে বিয়ে করতেন তা মুখরোচক খবর হতোনা।

হুমায়ূন আহমেদ করতেই তা ট্যাবলয়েডের খবর হয়ে গেলো। ঘটনার আদ্যপান্ত বিশ্লেষিত হলো নানা দিক থেকে নানা ভন্গিমায়। হুমায়ূন আহমেদ হলেন সে রকম একজন মানুষ যিনি খবর হতে না চাইলেও তাকে খবর হয়ে যেতে হয়। তিনি জাতীয় পর্যায়ের একজন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের সাথে কবে আমার প্রথম পরিচয় তা আজ আমি বিস্মৃত।

তবে খুব সম্ভব বোতল ভুত এর মাধ্যমে ৯০ দশকের গোড়ার দিকে। সে সময় (খুব সম্ভব ৯১ সালে) সিলেটের ইনডোর স্ট্যাডিয়ামে ১০ দিন ব্যাপী এক বইমেলা আয়োজিত হয়। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন সহ আরো বেশ কয়েকজন নামী লেখক সিলেটে গিয়েছিলেন এই বইমেলাকে উদ্দেশ্য করে। সেই বইমেলা আমার ১১ বছরের জীবনে সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ছিলো। প্রতিদিন বিকেলে বাবার সাথে বইমেলায় যাওয়া ছিলো তখনকার জীবনের সর্বোচ্চ উত্তেজনাকর মুহুর্ত।

কত যে বই কিনেছিলাম তার ইয়ত্তা নেই। সেই বইমেলা থেকেই হাতে আসে হুমায়ূন আহমেদের কিশোর সমগ্র বইটি। বোতল ভূত, সূর্যের দিন সহ আরো কয়েকটি গল্প ছিলো এতে। সেই বইটিতে অটোগ্রাফ নেবার স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বল করছে। যদিও আমার কোনই কষ্ট করতে হয়নি।

ভীড়ের মাঝে গুতোগুতি করে বাবাই বইটিতে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছিলেন আমার জন্য। পরবর্তীতে সেটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কোন এক বন্ধু বইটি পড়তে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। হয়তো তার কাছে এখনও আছে হুমায়ূন আহমেদের অটোগ্রাফ সম্বলিত আমার কিশোর সমগ্র। সেই বোতল ভূত এর বগা ভাই চরিত্রটির কথা জীবনেও ভুলবোনা।

স্কুলে নাম টা নিয়ে বন্ধুদের মাঝে হাসাহাসি এবং কাউকে খ্যাপানোর জন্য তাকে বগা ভাই ডাকা’র রীতি শুরু হয় বোতল ভূত হাতে পাবার পরই। কিশোর সমগ্রে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প ছিলো বোতল ভূত। আমার ছোট্ট জীবনে বোতল ভূত যে আনন্দের সন্চার করে তা আর কিছু থেকেই আমি তখন পাইনি। চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিন্কি, টিনটিন, বাটুল, ফ্যান্টম, নন্টে-ফন্টে, হাদা-ভোদা, তিন গোয়েন্দা, রাজু গোয়েন্দা, কিশোর ক্লাসিক, ওয়েস্টার্ন সব ছাপিয়ে আমার প্রানের বই হয়ে উঠেছিলো বোতল ভূত। মনে পড়ে অনেকদিন আমি বোতল ভূতে আচ্ছন্ন ছিলাম।

সিলেটে মুসলিম সাহিত্য সংসদ নামে একটি পাঠাগার আছে। আমার স্কুল জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে এই মুসলিম সাহিত্য সংসদে গিয় বই পড়ে। বই বাড়ীতে নিয়ে আসারও সুযোগ ছিলো। কিছুদিন আগে সিলেটে গিয়ে দেখলাম পুরোন দালানকোঠা ভেন্গে আবার নতুন করে কাজ করা হচ্ছে। যদিও আমার কাছে পুরোন ব্রিটিশ আমলের দালানটাকেই অনেক আকর্ষনীয় মনে হতো।

এই মুসলিম সাহিত্য সংসদেই আমি হুমায়ূন আহমেদের মধ্যবিত্ত শ্রেনীর সুখ-দু:খের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। তখন আমি নিতান্তই বালক। নন্দিত নরকে ও শন্খনীল কারাগার নামক দু’টো বই আমি সেখান থেকেই এনে পড়েছিলাম। যদিও সেই অল্প বয়সে মধ্যবিত্ত সুখ-দু:খ সম্পর্কে আমার অনুভূতি বা ধারনা ছিলো না বললেই চলে। সমাজের স্তরভেদ তখনও আমার মনকে বিষিয়ে দেয়নি।

আমি শুধু আনন্দের জন্যই পড়ে শেষ করেছিলাম বই দু’টি। সেই বালক বয়সেও মুগ্ধ হয়েছিলাম মধ্যবিত্ত টানাপোড়েনের আখ্যান পড়ে। সাধারণ একটি পরিবারের রাবেয়া, আনিস, রানু চরিত্রগুলো খুব সাবলীল ও আপন মনে হয়েছিলো। সিলেটের সেই বইমেলায় ইমদাদুল হক মিলনের অটোগ্রাফ নিতে গিয়ে আমি তার একটি বই কিনেছিলাম। মিলনের লেখা কেন জানি আমাকে কাছে টানেনি কোনদিনই।

শুধু অটোগ্রাফের কারনেই বইটি কেনা হয়েছিলো। গল্পের বই। নাম – লোকটি রাজাকার ছিলো। এই বইটি কিনছি দেখে বাবা “রাজাকার” শব্দটির অর্থ আমি জানি কিনা তা জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তখন সেই শব্দের অর্থ জানতাম না।

তবে আমার কাছে রাজাকার একটা গালি হিসেবে গন্য হয়েছিলো বহুব্রীহির কল্যানে। বহুব্রীহি নাটকে “তুই রাজাকার” গালিটি তখন সবার মুখে মুখে ফিরতো। টিয়া পাখির কন্ঠে “তুই রাজাকার” হয়তো আমাকে “লোকটি রাজাকার ছিলো” নামক গল্পের বই কিনতে উদ্ভুদ্ধ করেছিলো। অনুভূতির কথাটি আর মনে নেই। বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার এসব নাটক দেখে যাদের ছেলেবেলা কেটেছে তারা নিজেদের কতটুকু ভাগ্যবান মনে করে তা নিজেকে দিয়েই আমি বুঝতে পারি।

হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই অন্য কিছু্। কিছুটা হাস্যরস, কিছুটা সিরিয়াসের মিশেলে পুরোপুরি এক আখ্যান মন্জুরী। তাই যখন বাবার মুখে শুনতাম আসাদুজ্জামান নূর তার প্রিয় অভিনেতা, খুব একটা অবাক হতাম না। অয়োময়ের ছোট মির্জা বা কোথাও কেউ নেই এর বাকের ভাই বা হিমু যে কোন চরিত্রেই তিনি সাবলীল। আর এ সকল চরিত্রের সৃষ্ঠি তো হুমায়ূন আহমেদেরই হাতে।

কোথাও কেউ নেই নাটকটি সম্প্রচারিত হয় খুব সম্ভব ৯৩ সালের দিকে। এই নাটকটি দেশজুড়ে দর্শকদের মাঝে যেমন চান্চল্যের সৃষ্টি করে, আমার জীবনে দেখা আর কোন টিভি নাটক এমন করতে পারেনি। শেষ পর্ব প্রচারিত হবার আগেই দেশ জুড়ে মানুষের আবেগের ঘনঘটা দেখা দেয়। কি হয়নি তখন? বাকের ভাইয়ের ফাঁসি স্তগিতের দাবীতে মিটিং, মিছিল, প্রতিবাদ, আন্দোলন, দেয়াল লিখন, এমন কি লেখক হুমায়ূন আহমেদের কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়। লেখক এতে মিটিমিটি হেসে স্বস্তিই পেয়েছিলেন হয়তো।

এমনটা হয় ক’জনের ভাগ্যে? সামান্য টিভি নাটকের একটি চরিত্র ক’জন মানুষের মনে এমন দাগ কাটতে পারে? আমি সে বছরই আমার জীবনের প্রথম ভিডিও গেমসের সন্ধান পেয়েছিলাম। Nintendo Gameboy। রাতদিন ভিডিও গেমস নিয়ে পড়ে থাকা সেই বালক মন্গলবার ৯টার সময় ঠিকই পরিবারের সবার সাথে বসে যেত বাকের ভাই এর কোথাও কেউ নেই দেখার জন্য। ভিডিও গেমসের আকর্ষন থেকে এই নাটকের আকর্ষন তার কাছে অনেক বেশী ছিলো। বাকের ভাইয়ের স্টাইলে পোশাক পরিধান, সেই কালো চশমা, ডান হাতের তর্জনীতে চেইন ঘুরানো তখনকার আমলের ফ্যাশানে পরিনত হয়েছিলো।

বাকের ভাই চরিত্রটি দর্শক যেভাবে গ্রহন করেছিলো সেভাবে মনে হয় আর কোন নাটক চরিত্র গৃহিত হয়নি। মেট্রিক পরীক্ষার পর প্রথম ভারতীয় কিছু লেখকের সাথে পরিচয় হলো। সমরেশ মজুমদার, সমরেশ বসু, সুনীল, শির্ষেন্দু এদের দ্বারা মন রীতিমতো আচ্ছন্ন। দূরবীন’র ধ্রুব কিংবা কালবেলা’র অনিমেষ আমার কৈশরিক হিরো। কিশোর মনে সমাজ পরিবর্তনের স্পৃহা।

হুমায়ূনের বই তখন তেমন আর পছন্দ হয়না। পড়ে থাকি ভারতীয় লেখকদের নিয়ে। পরীক্ষার পর নানা বাড়ীতে গেলাম বেড়াতে। খালাত ভাই হুমায়ূন আহমেদের বিশাল ভক্ত। হুমায়ূন বিরোধী কিছুই সে সহ্য করতে পারেনা।

আমি যখন আঁতেলের মতো তার সাথে হুমায়ূন বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছিলাম সে একটা যুক্তিই দিয়েছিলো। Reading for Pleasure। বই পড়তে হবে আনন্দের জন্য। যে যা পড়ে আনন্দ পায় তাকে তাই পড়তে হবে। এখানে সমালোচনার কিছু নেই।

কেউ তিন গোয়েন্দা পড়ে আনন্দ পায়, কেউ কমিক্স, কেউ মাসুদ রানা, কেউ হুমায়ূন আহমেদ, কেউ বা ভারতীয় লেখকদের বই পড়ে আনন্দ পায়। যার যার রুচী দিয়ে তার পাঠাভ্যাস গড়ে উঠে। এই যুক্তিটি আমি এখনও মেনে চলি। আনন্দের জন্য পড়ি। তাই আমার পাঠক জীবনের একটি বড়ো অংশ কাটছে হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে।

এ বই পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়। হুমায়ূন আহমেদের বইতে থাকে নির্মল, নির্দোশ আনন্দ। প্রত্যেক বইমেলায় তার একগাঁদা বই বের হয়। বইমেলা চলাকালীন সময়ে সেই বইগুলো খুব একটা কেনা হয়না। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যায় প্রায় সব বইই পড়া হয়ে যায় বিভিন্ন ভাবে।

ভাই-বোনদের কাছ থেকে ধার করে বা নিজে কিনেও পড়া হয়ে যায় সব ক’টা বই। এবং পড়ে একটা স্বস্তি পাওয়া যায়। পড়া না হলেই কেন জানি অস্বস্তিতে ভুগতে হয়। হুমায়ূন আহমেদের “কবি” উপন্যাসটি যে আমি কতবার পড়েছি তার কোন হিসেব নেই। যখনই আমার মন খারাপ হতো আমি কবি বইটি নিয়ে তার বিশেষ বিশেষ অংশ পড়তাম।

এই বইটি একাধারে আমাকে নানা অনুভূতির সম্মুখিন করে। আতাহারের বাবার মৃত্যু সংবাদ আমার চোখকে অশ্রুসিক্ত করে, কবিতা প্রকাশের জন্য তিন বন্ধুর কর্মকান্ড আমাকে দেয় নির্মল আনন্দ, সাজ্জাদের ভেন্গে পড়া আমাকে হতাশায় ডুবিয়ে দেয়, আতাহারের কবিতা আমাকে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখিন করে। আমি নিজেকে মনে করি আতাহারের মতো একজন কবি যে সিদ্ধার্থের মতো গৃহত্যাগী জোছনার রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অজানার উদ্দ্যেশ্যে। মেট্রিক পরীক্ষার পর থেকে এই বইটি নানা ভাবে আমার নিঃসন্গ জীবনের সাথী হয়েছে। ইদানিংকালে অবশ্য হুমায়ূন আহমেদের বই প্রসন্গে একটি ফ্যাশান চালু হয়েছে।

সবাই চুপি চুপি হুমায়ূনের বই পড়বে কিন্তু প্রকাশ্যে তার বদনাম করবে। দেখাবে যে সে বা তারা এসব অখ্যাদ্য পড়ে না। নাক উঁচু করে সমালোচনা করবে এবং বাসায় গিয়ে সেই হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে বসবে এবং একমনে হেসে যাবে। অদ্ভুত মানুষের চরিত্র। আমি হুমায়ূন আহমেদের বই গোগ্রাসে গিলেছি।

হিমু, মিসির আলী, শুভ্র এসব চরিত্রকে বোঝার চেষ্টা করেছি চরম মমতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একবার একটি হলুদ পান্জাবী বানিয়েছিলাম। সিলেটে বন্ধুদের আড্ডায় সে পান্জাবী পরে যেতেই শুরু হয়েছিলো আলোচনার ঝড়। আমার মাথা কতটুকু খারাপ তা নিয়ে শুরু হয়েছিলো গবেষনা। সেই হলুদ পান্জাবী এখনও আছে, কিন্তু পারিপার্শিক নানা কারনে আর পরা হয়ে উঠেনা।

এই পান্জাবী শেষবারের মতো আর একবার পরবো। হুমায়ূন আহমেদ’র দাফনের পর তার কবরে গিয়ে ফুল দিয়ে আসবো। মানুষের চলে যাওয়া অতি স্বাভাবিক ঘটনা। ধর্মীয় বা বস্তুবাদী যে কোন দর্শন দিয়ে আপনি একে বিচার করুন না কেন, এটা অবশ্যম্ভাবী। এই নিয়তি থেকে কারও নিস্তার নেই।

তবু এই স্বাভাবিক ঘটনা আমরা কেউ মেনে নিতে পারিনা। প্রিয়জন চলে গেলে আমাদের অন্তর বিষাদে ভরে যায়, থেকে থেকে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। হুমায়ূন আহমেদ আমার কাছের কেউ ছিলেন না। মানুষ হিসেবে তাঁর নানা কর্মকান্ডে আমি তার উপর বেশ বিরক্তই ছিলাম। তারপরও একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবন ছাপিয়ে তার লেখক জীবনই সবার কাছে বড়ো হয়ে উঠে।

পাঠক হিসেবে আমার কাছে একজন লেখক তার জীবনে লেখক হিসেবে কতটুকু কি পেলেন সেটাই মূল কথা। একজনের ব্যক্তিগত জীবন তার লেখক জীবনের অন্তরায় হতে পারেনা, প্রভাবও ফেলতে পারে না। আমি হুমায়ূন আহমেদ কে একজন লেখক হিসেবেই চিনি। তিনি আমার চাচা নন, নন খালু, মামা, ফুপা অথবা তালুই। তিনি আমার কাছে শুধুই লেখক, একজন শিল্পকর্মী।

আর আমি তার সৃষ্টির একজন নগন্য সমঝদার। লেখক হিসেবে হুমায়ূন পেয়েছিলেন অসংখ্য পাঠক, ভক্ত পাঠক। তাদের কেউ হিমু হতে চাইতো, কেউ হতে চাইতো মিসির আলী, কেউ শুভ্র, কেউ মীরা, কেউ রূপা, কেউ নবনী, কেউ রাবেয়া, কেউ বা বাকের ভাই হতে চাইতো। সবচেয়ে বড়ো কথা তিনি আমাদের পড়তে শিখিয়েছিলেন। তাঁর সহজ-সরল-সাবলীল গদ্যের বই পড়ে পড়েই আমরা পাঠক হয়ে উঠেছি।

তাঁর সহজ-সরল গদ্য আমাদের ভেতর পাঠের ভিত গড়ে দিয়েছিলো, প্রস্তুত করেছিলো পাঠক হিসেবে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি এতো অল্প কথায় লিখে শেষ করা যায় না। লেখার মাধ্যমে হুমায়ূন নানা দিক দিয়ে আমার জীবনে প্রেরণা দিয়েছেন। তাঁর লেখা দ্বারা আমার জীবন প্রভাবিত হয়েছে নিদারুন ভাবে। তাঁর এতো এতো বই পড়েছি সেই ছোটবেলা থেকে যে সেসব বই নিয়ে লিখতে গেলে কয়েকটি পর্বে লিখতে হবে।

লেখকের মৃত্যু সংবাদ শুনে তাঁরই লিখিত “কৃষ্ঞপক্ষ” বইটি খুব পড়তে ইচ্ছে করছিলো। সে বইয়ে মুহিব নামক এক যুবক বিয়ের পরদিনই সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়। মুহিবের স্ত্রী হাসপাতালে মৃত স্বামী’র হাত ধরে বসে থাকে। নির্বাক অশ্রু পড়তে থাকে তার চোখ দিয়ে। সে হাত ধরে স্বামীকে মিনতি করে ফিরে আসার জন্য।

কিন্তু তার স্বামী আর ফিরে আসেনা সেই না ফেরার জগত থেকে। হুমায়ূন আহমেদকেও আর মিনতি করে ফিরে পাবনা আমরা। তিনি আর লিখবেন না। এই পৃথিবীতে হুমায়ূন আহমেদ আর লিখছেন না এটাই সবচেয়ে বড়ো দীর্ঘশ্বাস। আর সৃষ্টি হবে না কোন হিমু, কোন মিসির আলী অথবা শুভ্রের গল্প।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আর কেউ রবীন্দ্রসন্গীত শুনবে না, আর কোন যুবক খালিপায়ে চৈত্রের প্রখর সূর্যতাপকে মাথায় নিয়ে উন্মাদের মতো হাটবেনা ঢাকার রাস্তায়, রূপার মতো তরুনীরা আর বসে থাকবেনা টেলিফোনের পাশে, প্রতীক্ষা করবেনা প্রেমিকের ফোন কলের, নীল রং এর শাড়ী পরে আসবেনা বারান্দায় প্রেমিককে এক ঝলক দেখার জন্য, উচ্ছল কিশোরীর অশ্রু বের হতে হতে চোখে শুকিয়ে যাবার মতো সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হবে না আর, মিসির আলী তার যুক্তির সিড়ি বেয়ে বেয়ে সমাধান করবেন না কোন কঠিন রহস্যের, আর কোন আতাহার, সাজ্জাদ কিংবা মজিদ কবি হবার আশায় নির্বাসিত হবে না গৃহত্যাগী জোছনার রাতে, সৃষ্টি হবে না তোমাদের জন্য ভালোবাসা বা শূন্য অথবা চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক, হোটেল গ্রেভারইন, মে ফ্লাওয়ার, কে কথা কয়, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, কোথায় কেউ নেই অথবা দরজার ওপাশে, বৃহন্নলা, দেবী অথবা নিশিথীনি। সৃষ্টি হবে না কোন “জোছনা ও জননীর গল্প” এর মতো এক মহাকাব্যিক উপাখ্যানের, আমাদের হাসি কান্নার আধার। সৃষ্টি হবে না সহজ-সরল গদ্যে মধ্যবিত্ত জীবনের টানা-পোড়েন, হাসি-কান্না-বেদনার মহাকাব্য। দ্রষ্টব্য: অনেকদিন পর ব্লগে লিখলাম। অগোছালো লেখার জন্য আন্তরিকভাবে দু:খিত।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.