আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হ্যালো ঢাকা, আমার কথা শুনতে কি পাও তুমি? হ্যালো ঢাকা!

আসেন দুর্নীতি করি। আর এই দুনিয়াটাকেই খুচাই! ২০০৯ এর সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ। ঝোকের বশেই দেশটা ছাড়ি। শুভ্র দেশটা ছেড়েছিলো কারন ওর দরকার ছিলো, আমি দেশটা ছাড়লাম কারন আমি জানতাম না আমি কি চাই। কিছু একটা হারিয়ে জীবনে বেচে থাকার যে একটা মোহ থাকে সেটার খোজ হারিয়ে ফেলেছিলাম।

বেছে নিলাম একটা কষ্টময় জীবন। দেখতে দেখতে চলে গেলো ২ টা বছর। হিসাব করলে বিদেশে আসাটা আমার জন্য একটা লস প্রজেক্ট কিন্তু একটা জিনিস শেখা হলো বেশ ভালো ভাবেই, শূন্য থেকে শুরু করা। একটা জিনিস পেলাম অবশ্য সেটা হলো ভালোবাসে কিভাবে আপন করে নেয়া! হঠাৎ করে ডিশিসন নিলাম দেশে যাবো। মার্চের ১৬ তারিখ টিকিট কেটে ফেললাম ১৯ তারিখে কাতার এয়ারওয়েজে।

দেশে যাচ্ছি। দেশে কি আছে হিসাব করলে কিছুই পাই না শুধু কয়েকটা জিনিস বাদে, ভালোবাসার ফাট্টু (লতা) আর বাবা মা বোন আর অজস্র বন্ধু! যদিও এসব বন্ধু গুলো অজস্র বার রং পাল্টায়, দোষ দিবো না এদের, আমিও রং পাল্টিয়েছিলাম। রং পাল্টানো টা আমাদের কাছে অনেকটা ফান পর্যায়ে চলে গেছে বৈকি! টিকিটে কি লেখা ছিলো জানি না, তবে প্লেনে উঠে দেখলাম কাতার এয়ারপোর্টে ২৩ ঘন্টা ট্রানজিট। রুম মেট বললো হোটেল দিবে অবশ্যই, আমিও সে আশাতেই ছিলাম কিন্তু টিকিট কাউন্টারে জানতে পারলাম কোনো হোটেল রিজার্ভেশন নেই। তবু যেতে হবে।

সাথে ছিলো একটা ৩২ ইন্ঞ্চি এলসিডি টিভি। খুব পোক্ত করে প্যাক করা ছিলো। ২৩ কেজি পর্যন্ত লাগেজ এলাউন্স আর সাথে ৭ কেজি। ব্যাগে অনেক চকলেট ছিলো তাই কাধের ব্যাগ কাটায় কাটায় ৭ কেজি। নিজের লাগেজটা ১৯ কেজি, কিন্তু টিভিটা পুরোটাই ২৩ কেজি।

টিভিটা যে গার্বেজে ফেলে দেবো সেটাও খুজে পাওয়া মুশকিল কারন বিশাল এয়ারপোর্ট। নীচের ফ্লোরে গিয়ে দেখলাম একটা খুব সুন্দরী গর্ভবতী মেয়ে এগিয়ে এসে বললো কি করতে চাই। আমি শুধু বললাম ঝামেলা বিদেয় করবো! সে জিজ্ঞেস করলো চ্যারিটি দিলে হবে? আমি বললাম বাংলাদেশ আছে কিনা খুজে দেখতে। সে খুজে পেলো না। তবে বললো সোমালিয়া মুসলিম দেশ, ওখানে ওদের অনেক চ্যারিটি আছে।

চক্ষু বুজে বলে দিলাম ওদেরকে এই ঝামেলাটা দিয়ে দাও। বললো তিন মাসের মাথায় পেয়ে যাবে! খুশী মনে নাচতে নাচতে ইমিগ্রেশন পার হয়ে প্লেনে উঠে বসলাম। বুকের ভিতর ধুকফুক কতদিন পর দেশে যাচ্ছি। গায়ে শুধু একটা একটা শার্ট, ভাবলাম কাতারে প্রচুর গরম আর দেশে ও অনেকটা সেরকম। হিট রেডিয়েশন বলা যায়! প্লেনে উঠে কোল্ড প্লে ছেড়ে দিয়ে, আইফোনটা এরোপ্লেন মোডে রেখে ঘুম দিলাম।

মাঝে মাঝে খাওয়া দাওয়া, টানা ৬ ঘন্টার ফ্লাইট শেষে কাতার এয়ারপো্র্ট। কাতার এয়ারপোর্টে তখন ছিলো রাত। ইউরোপ থেকে ২ঘন্টা এগিয়ে বাংলাদেশ থেকে ৩ ঘন্টা পিছিয়ে। বাইরে নেমেই কাপতে থাকলাম ঠান্ডায়। ভালো ঠান্ডা।

যদিও -৩০ এ থাকা অভ্যাস আছে, কিন্তু তবুও ঠান্ডা লাগলো। ব্যাপারটা বড্ড মানসিক, কারন একটা উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। এয়ারপো্র্টে নেমেই বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখে ধাক্কা খেলাম। ক্ষুধা পেটে নিয়ে আবারও কাউন্টারে গিয়ে খোজ নিলাম হোটেল দিবে কিনা। কিন্তু কাউন্টারে বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখেই কেমন যেনো রুক্ষ ব্যাব হার দেখালো, যদিও মেয়েটা ভিয়েতনামী বলেই মনে হলো।

যাই হোউক, ক্ষুধা নিবারনের জন্য ১০ ডলারের খাবার কিনলাম, টার্কিশ লাম, সাদা ভাত, একটা রুটি আর মাউন্টেন ডিউ। খেতে খেতে আইফোন চেক করতেই দেখলাম এয়ারপোর্টের ফ্রি ওয়াইফাই। ঢুকে দেখি ১৫ মিনিটের জন্য কানেকশন নিদেপক্ষে ২ এমবিপিএস হবেই। শুরু হলো কথা বলা ভাইবারে, ভিওআইপি দিয়ে দেশে, সব খানে। চ্যাটের সাথে চললো এমবিএ এর জন্য একটা পেইড থিসিস।

বিশাল থিসিস, প্রায় ২১ পৃষ্ঠা। প্রচন্ড ঘুমে চোখ খুলে রাখা দায়। একটু ঘুরতেই দেখি একটা জায়গায় ঘুমানো ব্যাবস্হা! এখানে একটা জিনিস অবাক লাগে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সহ ইউরোপের বেশ কয়েকটা দেশে আপনার পাসপোর্ট যে দেশেরই হোক না কেন, আপনি সমান অধিকার পাবেন। আপনাকে একজায়গায় রাখবে, সমান ভাবে মার্জিত ব্যাবহার করবে।

কিন্তু কাতারে এসে দেখলাম লাল চুল, ইউরোপীয় পাসপোর্ট হলে আপনার জন্য আলীশান ব্যাবস্হা, চাই আপনি ইকোনমী ক্লাসেরই হোন না কেন। আর আমাদের জন্য যাতা! তাই ঐ স্লিপিং রুমে যেতে দ্বীধা লাগলো। চেয়ারেই শুয়ে পড়লাম। আমার আশেপাশে কিছু আফ্রিকান ছিলো। তাই ব্যাগ নিয়ে একটু টেনশনে ছিলাম।

কিন্তু পড়ে দেখলাম এখানেও নিরাপদ, চুরি করবে না কেউ। সকাল ঘুম থেকে উঠে খেতে যাবো এমন সময় এক রুমানিয়ান মেয়ে সামনে এসে বসলো। আমি তখন পিসিতে কাজ করছিলাম। সে হঠাৎ করেই বললো ফ্রিতে খাওয়া নাকি ভালোই দেই। আমি প্রথমে ওর দিকে তেমন ভ্রুক্ষেপ করিনি।

পরে ও যেচে জানালো কাহিনী। যাদের ট্রানজিট এখানে বেশ দীর্ঘ সময় হয় তাদের জন্য খাওয়া ফ্রি। শুধু টিকিট দেখিয়ে টোকেন নিলেই হয়। শুনে তো আমি পাংখা। লিস্টে দেখলাম সকালের নাস্তা, ব্রেকফাস্ট, দপুরের খাবার, হলকা বিকেলের নাস্তা, ভারী সন্ধ্যার নাস্তা, রাতের ডিনার, রাতের হালকা নাস্তা!।

এতো আয়োজন দেখে মাথাটাই নষ্ট হয়ে গেলো। ১০ ডলারের জন্য আফসোস ভুলে শুরু করলাম খাওয়া দাওয়া। ড্রিংকস থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুই ফ্রি। এবার খুব ঘুম ধরলো। স্লিপিং রুমে ঢুকে ঘুম দিতেই শরীর টা পুরা চাঙ্গা।

এদিকে এয়ারপোর্টে নানা মানুষের সাথে পরিচয়, যদিও কথা বলার টাইম ছিলো না কারন এমবিএর থিসিস টা শেষ করতে হবে। টানা ২৩ ঘন্টা ট্রানজিটের পর অবশেষে ঢাকার ফ্লাইট ধরলাম। একটা জিনিস খেয়াল করলাম। ইউরোপ থেকে আসবার সময় ফ্লাইট ক্রু গুলো বেশ রিলাক্স ছিলো। কারন যাত্রীরা নির্দিষ্ট সময়ে সবকিছু করছে, তেমন কোনো চাহিদা ছিলো না শুধু ড্রিংকস ছাড়া।

যারা একটু টাল হলো তারাও নিজেদের মধ্যে বাতচিত রত। কিন্তু দোহা - ঢাকা ফ্লাইটে প্রায় সবাই বাংলাদেশী তারা টানা ৫ ঘন্টা ফ্লাইট ক্রু দের দৌড়ের উপর রেখেছে। আমার সামনের সীটের একজন ওয়াইন খেলো। আমার পাশের সীটের পাশে একজন ওয়াইন খেয়ে পুরো টাল। পারলে মারতে যায় মেয়ে এয়ারহোস্টেস দেখে।

সে পানি চাইছিলো আর পানি দিতে একটু দেরী করছিলো। আমার পাশে বসা ছিলো একজন মোটু। পরিচয়ে জানতে পারলাম ভদ্রলোক নাসায় চাকরী করে। কিন্তু সমস্যা হলো উনি উনার জীবন বৃত্তান্ত শুরু করলেন। ১৯৮১ এ এইচএসসি পাশ করে বুয়েটে মেটালার্জী ঢুকেন।

৮৭ এ স্কলারশীপে হিউস্টন ইউনিতে এমএসসি শুরু করেন। ৯৪ এ নাসায় যোগদান করেন। তবে এটা ঠিক পুরো ফ্লাইট জুড়ে সার্কাস শুরু হয়েছিলো লোকজনে, কারো বাচ্চা নিয়ে টালবাহানা, কারো ড্রিংকস নিয়ে কাহিনী, আমার পাশের জনের ভাই আসতে পারেনি, তার মা শয্যশায়ী সেটা নিয়ে তার খাস সিলেটি ভাষার গালাগালি। বেশ ভালো চললো আমার ফ্লাইট! ঢাকায় আসলাম ভোর চারটায়। আমার হিসেবে ভোর ৫ টায় নেমে৭ টার মধ্যে ছাড়া পাবো ইমিগ্রেশন আর লাগেজ নিয়ে ঝামেল সংক্রান্ত।

তাই আমাকে পিক করতে আসবে ফাট্টুর দল ৭ টার দিকে। বাসায় জানাইনি, কারন সারপ্রাইজ দিবো। উল্লেখ্য, এয়ারপোর্টেই আমি ফাট্টু কে প্রথম দেখবো, এর আগে যা দেখেছি সেটা হলো ওয়েবক্যাম আর ফেসবুক! এয়ারপোর্টে যখন লাগেজের জন্য বসেছিলাম, তখন নিজের কাছেই অদ্ভূত লাগছে। শরীর চুলকানো শুরু হয়েছে। আধা ঘন্টা পর এর কারন আবিষ্কার করলাম।

ভেবেছইলাম এলার্জী, যদিও আমার কোনো এলার্জী নেই। আসলে এটা ছিলাম মশার কামড়। এদিকে লাগেজ গুলো যখন আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো, তখন আমার লাগেজটা না দেখে বেশ হতাশায় ডুবে ছিলাম, তবে হাসি লাগছিলো মানুষের লাগেজ দেখেন। ডিব্বা ডিব্বায় জমজমের পানি, কাপড়ে প্যাচানো বিশাল বিশাল চৌকোনা বাক্স, সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো একজন থালা বাসন এমনকি গ্যাসের চূলাও নিয়ে এসেছে। মনে মনে ভাবলাম আমি টিভিটা না এনে ভুলই করেছিলাম।

পুরো দেড়টা ঘন্টা পর আমি আমার লাগেজ পেলাম, তখন বাজে ৫:৩০টা। ফাট্টুর আসতে আরো দেড় ঘন্টা দেরী, এদিকে আমার সীমটা বাংলালিংকের রোমিং এ চলে গেছে। ভয়ে ফোন দিচ্ছিলাম না কারন বিল ভয়াবহ পরিমান বেশী। ডলার ভাঙ্গাতে সোনালী ব্যাংকের বুথে ঢুকলাম। ডলার অল্প ভাঙ্গালাম কারন ওখানে অনেক কম রেট দিচ্ছিলো।

একজন সিকিউরিটি গার্ডের মোবাইল থেকে ফাট্টু কে ফোন দিলাম, জানালাম যে এসে গেছি। ও তখন রেডীই হচ্ছিলো, ফার্মগেট থেকে এয়ারপোর্ট আসতে যতক্ষন। এদিকে আমার বুক ধুকফুক, কারন এটাই হবে আমাদের প্রথম দেখা। প্রায় আধা ঘন্টা ধরে মশাদের সাথে যুদ্ধ করলাম টার্মিনাল ৫ এর ভিতর, তারপর হঠাৎ গার্ড এসে জানালো ওরা নাকি বাইরে দাড়িয়ে। আমি মুখ ধুয়ে একটু চুল সাজিয়ে জামা কাপড় একটু ঠিক করে বেরুলাম।

দূর থেকে অনুমান করলাম ওটাই ফাট্টু। একটু না দেখার ভান করে অন্যদিকে হাটা ধরলাম। অন্যদিকে হাটতেই হঠাৎ একটা ছেলে আমার সামনে দাড়িয়ে বললো,"আপনি কি রনিভাই?" আমি বললাম,"আপনি জাকী ভাই!" উনি হেসে দিলো। জাকী ভাই হলো ব্লগের জাকী ফারহান। যাই হোউক, দূর থেকে দেখছিলাম গোলাপী পোশাকে আমার ছোট্ট পরী ফাট্টুকে! সামনে দাড়াতেই আমি হতভম্ব, পুচকে একটা মেয়ে।

আর আমি ৩২ বছরের বুড়ো। বুঝতে পারছিলাম না ও আমাকে পছন্দ করলো কি করে নাই, আমি হেসে বললাম," হ্যালো ফাট্টু, কি খবর?" ফাট্টু আমার হাতটা জড়িয়ে ধরলো। আমরা হাটতে থাকলাম। যাবার জন্য কিছু একটা খুজতে জাকী ভাই আমাদের স্পেস দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। আমি তাকে আবার ডেকে বললাম,"জাকী ভাই, আমার একটু ভয় লাগছে, আমি একটা কাজ করবো এখন , যার জন্য সাহস দরকার!" জাকী ভাই কিছু না বুঝে বলে ফেললো,"কি কাজ? কিসের ভয়?" আমি তখন ফাট্টুর বাম হাতটা টেনে একটা কৌটা বের করে ওখান থেকে রিংটা বের করলাম, রিংটা পড়িয়ে দিতে দিতে বললাম," বিয়া করবা কি না সেটা আর জিজ্ঞেস করুম না, কবে বিয়া করবা এইটা কও!" ফাট্টু কথার উত্তর দেবার আগেই বললো," ওমা, রিং দেখি অনেক বড়! তোমাকে না বলছি আমার আঙ্গুল অনেক চিকন!" মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, বিয়ার আগেই বিয়া বুঝি ভাংলো! দ্বিতীয় পর্ব ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।