আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মুসলিম বিশ্বে ব্লাসফেমি: ধর্মের মুখোমুখি প্রগতি ও বাকস্বাধীনতা

Set sail, ye hearts~ into the sea of hope.. আজকে একটা নিউজ সাইট ভিজিটের সময় হঠাৎ করে চোখে পড়লো খবরটা। টুইটারে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অপরাধে তরুণ কলামিস্ট হামজা কাশগারিকে গ্রেফতার করেছে মালয়েশিয়ান পুলিশ। টুইটারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে নিয়ে কিছু টুইট করার পর প্রাণভয়ে দেশত্যাগ করেছিলো সৌদি নাগরিক হামজা। তবে শেষরক্ষা হয় নি, কারণ মালয়েশিয়াতেও ব্লাসফেমি আইন চালু আছে। খবর পড়ে যতদূর জানলাম, বিচারের মুখোমুখি করার জন্য শীঘ্রই হয়তো মালয়েশিয়ার সরকার তাকে সৌদি আরব প্রেরণ করবে।

ধর্মবিরোধী টুইটের দায়ে আটক হয়েছে তরুণ কলামিস্ট হামজা এই তরুণ কলামিস্টের অপরাধ ছিলো টুইটারে পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবি উপলক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাথে কিছু সিরিজ টুইট পোস্ট করা। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যেগুলা আসলেই শিষ্টাচার পরিপন্থী। যেমন একটা টুইট ছিলো এরকম, “On your birthday, I shall not bow to you. I shall not kiss your hand. Rather, I shall shake it as equals do, and smile at you as you smile at me. I shall speak to you as a friend, not more.” তবে সে পরবর্তীতে তার টুইটগুলোকে ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, বরং দাড় করিয়েছে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে। যেমন তার আরেকটি টুইট শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না, সেটা হলো, “No Saudi women will go to hell, because it’s impossible to go there twice.” পরে অবস্থা বেগতিক দেখে টুইট গুলো রিমুভ করে দিয়ে, ফলোয়ার দের কাছে ক্ষমা-ও চায় সে, “I deleted my previous tweets because after I consulted with a few brothers, I realized that they may have been offensive to the Prophet (pbuh) and I don’t want anyone to misunderstand.” কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন সৌদি সরকার যদি একবার তাকে দেশে ফেরাতে পারে, আপনি এই লেখাটি পড়তে পড়তেই হয়তো তার উপর নেমে আসবে শাস্তির খড়গ।

এই প্রসঙ্গে অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে পাকিস্তানের ফারায়েল ভাট্টির কথা। রাসুলুল্লাহ (সা) এর দরুদের ভেতর ভুলবশত একটা ডট (.) দিয়ে অর্থ বিকৃত করে ফেলায় তার বিচার হয়েছিলো গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো সকলের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পরও বারো বছর বয়সী এই শিশুটিকে রেহাই দেয়নি সমাজ। এমনকি অনেক নামকরা ইসলামি চিন্তাবিদের সুপারিশ সত্ত্বেও সপরিবারে এলাকা ছাড়তে হয়েছে তাকে। মধ্যযুগে ব্লাসফেমির অন্যায় শিকার হয়েছে অসংখ্য মানুষ যদিও সৌদি আরব বা পাকিস্তানের মতো ‘ইসলামি’ দেশগুলাই এখন ব্লাসফেমি আইনের ‘গ্লোবাল স্পন্সর’, তবে এই আইনের জন্ম কিন্তু হয়েছিলো ইউরোপে।

ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের চার্চ এই আইনটি চালু করেছিলো আদালতকে ব্যাবহার করে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। এরপর বহু বিজ্ঞানী, লেখক আর সাধারণ মানুষ শিকার হয়েছে এই কালো আইনের। কুখ্যাত ইনকুইজিশন কোর্টের মাধ্যমে ১৬শ শতাব্দীতে ‘ডাইনী’ আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো অসংখ্য প্যাগান ধর্মাবলম্বীকে। তবে এখনকার পশ্চিমা দুনিয়ায় এর প্রয়োগ একেবারে নেই বললেই চলে। ‘প্রগতির অন্তরায়’ আখ্যা দিয়ে ব্লাসফেমির উৎপত্তিস্থল ব্রিটেনে ২০০৮ সালে স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেয়া হয়েছে।

একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আর ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টারি এসেম্বলি-ও বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সংকীর্ণ করে এমন আইন প্রণয়নের বিপক্ষে অনেক আগেই অবস্থান পোক্ত করে ফেলেছে। পশ্চিমের অন্ধকার যুগে জন্ম নেয়া এই কালো আইনটা নিজ ভূমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এখন সওয়ার হয়েছে মুসলিম বিশ্বের ঘাড়ে। বিশ্বাস না হলে উইকিপিডিয়াতে সার্চ দিতে পারেন, সাম্প্রতিককালে মুসলিম দেশগুলাতে শাস্তি দেয়া হয়েছে এমন শত শত নজির পাবেন একটু ঘাঁটলেই। বাংলাদেশে সরাসরি ব্লাসফেমি না থাকলেও ‘ধর্মীয় অনুভূতি’তে আঘাত হানার মামলার সাথে আমরা ভালোভাবেই পরিচিত, যা আসলে রাজনৈতিক হয়রানির জন্যেই করা হয়ে থাকে। এছাড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তো ঘোষণা দিয়েই রেখেছে ক্ষমতায় বসতে পারলে পাকিস্তানের আদলে ব্লাসফেমি আইন পাশ করেই ছাড়বে তারা (হাস্যকর হলেও সত্য ঐ দলের আমিরের বিরুদ্ধেই গত বছর ইসলামের অবমাননা করার অভিযোগে মামলা হয়েছে )।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াতের এককভাবে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনার হিসাব কষতে গেলেও কাগজ কলমের অপচয় হয়, তাই এই দেশে ব্লাসফেমির দুঃস্বপ্ন আপাতত দেখছি না। তবে একজন মুসলিম হিসেবে আমার ধর্মকে যে প্রগতির অন্তরায় হিসেবে দাড় করানো হচ্ছে, সেটাও আমার একেবারেই না পছন্দ। জানি আল্লাহ-রাসুলের অবমাননাকারীর বিরুদ্ধে অনেক কঠিন কঠিন আয়াত আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশী কঠিন আয়াত আছে ক্ষমা প্রার্থনাকারীর পক্ষে। এমনকি যারা ক্ষমা চাইবে না, তাদের ব্যাপারেও আল্লাহ মুমিনদেরকে ধৈরয ধারণের উপদেশ দিয়েছেন, পরকালে এদের দুরবস্থার বর্ণনা দিয়ে এই ব্যাপারে সতর্ক করতে বলেছেন। আর কোরানের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহতালার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রূপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায় (আন-নিসা : ১৪০) যে কেউ রসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফিরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব (আন-নিসা : ১১৫) উপরের আয়াত থেকে আমরা দেখলাম, এই ধরনের অপরাধের জন্য পার্থিব শাস্তির বিধান যে করতেই হবে ইসলামে এমনটা বাধ্যতামূলক না, তাই ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য খ্রিষ্টানদের অনুকরণে ব্লাসফেমি আইন পাশ করার প্রয়োজন নেই।

যদি করতেই হয় সেক্ষেত্রে অবমাননাকারীদের সতর্ক করে দেয়া, প্রকাশনা বাতিল, অথবা ক্ষেত্র বিশেষে স্বল্প মেয়াদে কারাভোগের বিধান করা যেতে পারে। আল্লাহ-রাসুল বা কোরআনের অবমাননাকারীদের কর্তিত মাথার দাম নির্ণয় না করে বরং এর বিপরীতে সচেতনতা সৃষ্টি করাই এই যুগের আলেম সমাজের দায়িত্ব হওয়া উচিত। আমার বিশ্বাস কাঠিন্য পরিহার করে বদলে যাওয়া এই সময়ে শান্তির ও ক্ষমার ধর্ম হিসেবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারাটাই মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর ব্যাপার হবে। হামজা কাশগারির পক্ষে পিটিশনে সাইন করতে পারবেন এখান থেকে প্রাসঙ্গিক আরও একটি লেখা: চেতনার অমাবস্যায় এক ধর্মদ্রোহী যুবকের দেশত্যাগ ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.