আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং লালসালু

উপন্যাসটিতে প্রধান নারী চরিত্র জমিলা, সূক্ষ্ম প্রতিবাদ ও কোনো কিছু মেনে না নেওয়া তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। তার স্বামী, অর্থাৎ মজিদের প্রথম স্ত্র্রী রহিমা। জমিলার বয়স মজিদের অর্ধেকেরও কম। ১৮-১৯ বছরের যুবতী। মজিদ যখন বলে, রূপ দিয়া কি হইবো? মাইনষের রূপ ক-দিনের? ক-দিনেরই বা জীবন তার? এই কথাটি জমিলাকে বিদ্রোহী করে তোলে।

লালসালু সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ রচিত একটি উপন্যাস । উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে, দ্বিতীয় প্রকাশকাল ১৯৬০। এর পটভূমি ১৯৪০ কিংবা ১৯৫০ দশকের বাংলাদেশের গ্রামসমাজ । মূলত গ্রামীণ সমাজের সাধারণ মানুষের সরলতাকে কেন্দ্র করে ধর্মকে ব্যবসার উপাদানরূপে ব্যবহারের একটি নগ্ন চিত্র উপন্যাসটির মূল বিষয়। উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৪৮ সাল।

এটি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর প্রথম উপন্যাস। এটি পরে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ২০০১ সালে তানভীর মোকাম্মেল-এর পরিচালনায় উপন্যাসটি চলচ্চিত্ররূপ লাভ করে। প্রধান চরিত্র: মজিদ, খালেক ব্যাপারী, জমিলা, রহিমা, হাসুনীর মা, আক্কাস। ছবিটি একাধিক জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। উপন্যাসের মতো চলচ্চিত্রেও মাজার চিত্রিত হয়ে প্রচন্ড শক্তিশালী রূপে- যা একই সাথে মজিদের ক্ষমতার উৎস এবং ধর্মভীরু গ্রামবাসীর সকল মুসকিল আসানের প্রতীক। লালসালূ হচ্ছে লাল রঙের কাপড়। এমনিতে লাল কাপড়ের তেমন কোনো মহিমা নেই। তবে এটি খুব উজ্জ্বল রং হওয়ায় একে বিশেষ উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো যায়।

বাংলাদেশের এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী যুগ-যুগ ধরে লাল রংটিকে সফলভাবে কাজে লাগিয়ে আসছে। কবরের উপর লাল কাপড় বিছিয়ে দিলে কবরের গুরুত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। তখন তা আর সাধারণ কবরে সীমাবদ্ধ থাকে না_মাজারে পরিণত হয়। কবরটি তখন মানুষের ভক্তিপ্রীতির আকর্ষণ হয়ে দাড়ায়। এ ধরনের কবরে মানুষ প্রতিনিয়ত ভিড় জমায়, জেয়ারত করে, দোয়া দরুদ পড়ে এবং শিরনি দেয়।

টাকা পয়সা দেয়। এভাবে মাজারটি হয়ে দাড়ায় পরলোক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। এই মাজার বাংলাদেশের লোকজীবনে অসামান্য প্রভাব ফেলে। এখানেই ‌লালসালু নামকরণের তৎপর্য ইঙ্গিতময় হয়ে ওঠে। এর সাথে পীর-ফকিরদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।

উপন্যাস যখন লেখা হয়- তখন চলছে দেশভাগের প্রস্তুতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগোত্তর উদ্বাস্তু সমস্যা আর সঙ্গে নতুন রাষ্ট্র গঠনের উদ্দীপনা। এমনি একটা সময়ে ঔপন্যাসিক পটভূমি থেকে শুরু করে চরিত্র নির্বাচন; সবই নিলেন গ্রামীণ জীবন থেকে। কাহিনীর বিষয়বস্তু সমাজ-চরিত্র : একদিকে কুসংস্কারগ্রস্ত ধর্মভীরু শোষিত গ্রামবাসী, অন্যদিকে শঠ, ধর্ম-ব্যবসায়ী ও শোষক ভূস্বামী। কিন্তু লালসালু ঘটনাবহুল উপন্যাস নয়। ঘটনার চেয়ে ঘটনা বিশ্লেষণের বিস্তারটাই চোখে পড়ে আগাগোড়া।

মূল চরিত্র মজিদ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাকে ঘিরেই উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত। তারপর মহব্বতনগর গ্রামের অধিবাসীদের মাজারকেন্দ্রিক ভয়-ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আকাঙ্ক্ষা_সব নিয়ন্ত্রণ করে মজিদ। তার চক্রান্তেই নিরুদ্দেশ হয় তাহের ও কাদেরের বাপ। আওয়ালপুরের পীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষে সে পীরকেও করে পরাভূত।

খালেক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেওয়ানো, যুবক আব্বাসের স্কুল প্রতিষ্ঠার আয়োজনকে বিদ্রূপ করা ও তাকে অধার্মিক হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রামছাড়া করা_এসবের মধ্য দিয়েই নিজের প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা নিরঙ্কুশ বিস্তার করে, সে দ্বিতীয় বিয়ের পিড়িতে বসে। নতুন বউয়ের নাম জমিলা। চঞ্চল, সহজ-সরল মেয়ে। কিন্তু প্রথম থেকেই মজিদকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারে না সে। মজিদ জমিলাকে শাসন করতে চায়; কিন্তু পারে না।

জমিলার থুথু নিক্ষেপের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয় সে। জমিলাকে মাজার ঘরের অন্ধকারে খুঁটিতে বেঁধে রাখে। শুরু হয় প্রবল ঝড়-বৃষ্টি, কিন্তু 'রহীমার হৃদয় ব্যাকুল হয়। মজিদের প্রতি যে রহীমার বিশ্বাস ছিল পর্বতের মতো অটল এবং ধ্রুবতারার মতো অনড়' সে রহীমাই করে বিদ্রোহ। বোঝা যায়, মজিদের প্রতিষ্ঠার ভিতে ফাটল ধরেছে।

প্রতীকের মাধ্যমে জমিলার লাশের পা মাজারকে যে আঘাত করে তা সমাজের কপালে কলঙ্ক লেপনেরই সামিল। শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলে গ্রামবাসী মজিদের কাছে প্রতিকার চায়। কিন্তু মজিদের কাছ থেকে ধমক ছাড়া তখন আসে না কিছুই : 'নাফরমানি করিও না, খোদার ওপর তোয়াক্কেল রাখো। ' এভাবেই বিপর্যস্ত পারিবারিক জীবন, বিধ্বস্ত ফসলের ক্ষেত এবং দরিদ্র গ্রামবাসীর হাহাকারের মধ্য দিয়ে লালসালু উপন্যাসের কাহিনী শেষ হয়। মজিদ কুসংস্কার, প্রতারণা এবং অন্ধবিশ্বাসের প্রতীক।

প্রথাকে সে টিকিয়ে রাখতে চায়, প্রভু হতে চায়, চায় অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হতে। প্রতারণা করে সজ্ঞানে। সে ঈশ্বর-বিশ্বাসীও। কিন্তু মাজারটিকে সে টিকিয়ে রাখতে চায় যেকোনো মূল্যে। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্মকে পুঁজি করে সে নামে এক ব্যবসায়।

তাই সেই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বুকে ঝোলানো তামার খিলাল দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে সে স্পষ্ট বোঝে, দুনিয়ায় সচ্ছলভাবে দুবেলা খেয়ে বাঁচার জন্য যে খেলা খেলতে যাচ্ছে সে সাংঘাতিক। বাংলা কথাসাহিত্যে লালসালু একটি প্রথাবিরোধী উপন্যাস। ধর্মকে যারা স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে বা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, লালসালু উপন্যাসে সেই ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মজিদ নামক চরিত্রের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মানুষের যে ব্যক্তিগত লড়াই এবং তার অস্তিত্বের জন্য বা টিকে থাকার জন্য তার যে নিরন্তর সংগ্রাম; সেটিকেও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ তার উপন্যাসে অত্যন্ত জোরালোভাবে নিয়ে এসেছেন। পীরের বাড়িতে একটা মেয়ের স্বাভাবিকভাবে পর্দানশিন থাকার কথা।

যেমনটা দেখা গেছে, প্রথম বউ রহিমার ক্ষেত্রে। স্বামী মজিদের প্রতিটি কথা তার কাছে অবশ্য পালনীয়। কোথাও কোনো নড়চড় নেই। মজিদের কোনো ধূর্ততা, শঠতা, ভণ্ডামি কোনোটাই তার চোখে পড়ে না। অন্যদিকে জমিলা একেবারেই উল্টো পথে চলে।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চাকুরে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ তাঁর সহপাঠী বন্ধুদের সাথে মিশতে পারতেন না। যার কারণে তাঁর জীবন হয়ে পড়ে খুব একাকী ও নিঃসঙ্গ। একাকী জীবনের নিঃসঙ্গতা ঘোঁচাতে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে ওঠে বই। বইকেই তিনি পরম বন্ধু মনে করেন এবং বইয়ের সঙ্গেই তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় কাটান।

আর এই পরম বন্ধুটির সঙ্গে থাকতে থাকতে তিনি একসময় শুরু করেন লেখালেখি এবং হয়ে ওঠেন এদেশের সুনামধন্য সাহিত্যিক। ১৯৩০ সালে ওয়ালীউল্লাহ্‌র বয়স যখন ৮ বছর তখন তাঁর মা মারা যান। তাঁর বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। বিমাতার সাথে ওয়ালীউল্লাহর সম্পর্ক ছিলো খুবই নিবিড়। তাঁর বাবা মৃত্যুর সময় তেমন কোন সম্পদ রেখে যেতে পারেননি।

তাই বাবার মৃত্যুতে ওয়ালীউল্লাহ্‌র পড়াশোনার ক্ষতি হয় এবং জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি আসে । বাবার মৃত্যুর পর সংসার চালানোর ভার এসে পরে তাঁর বড় ভাই নসরুল্লাহ ও ওয়ালীউল্লাহ্‌র উপর এবং তাঁর পড়াশুনার সমাপ্তি টানতে হয়। বিভিন্ন স্কুল ঘুরে ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করেন ওয়ালীউল্লাহ্। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৪৩ সালে ডিসটিংশনসহ বি.এ. পাশ করেন।

চাকরির কারণে ওয়ালীউল্লাহ্-কে নানা দেশ ঘুরতে হয়েছে। তারপরও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ছিলো দেশ ভ্রমণের এক বিপুল নেশা। সময় ও সুযোগ পেলেই ছুটে বেড়িয়ে পড়তেন তিনি। চাকরি সূত্রে যাওয়া ফ্রান্সেই ফরাসি দূতাবাসের কর্মকর্তা এ্যান মারির সাথে পরিচয় ঘটে ওয়ালীউল্লাহ্‌র। গড়ে উঠে হৃদ্যতাও।

বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও তিনি কুটনৈতিক হওয়ায় রাষ্ট্র তাঁকে বিদেশী নাগরিক বিয়ে করার অনুমতি দেয় না। ব্যক্তিগতভাবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাই ধর্মান্ধতাকে তিনি ঘৃণা করতেন চরমভাবে। নিজের সংসারের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সাংসারিক জীবনে ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন দুই সন্তানের জনক।

প্রথম সন্তান কন্যা- সিমিন ওয়ালীউল্লাহ্ এবং দ্বিতীয় সন্তান পুত্র- ইরাজ ওয়ালীউল্লাহ্। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র আরেকটি বিশেষ গুণ ছিলো তিনি ভাল ছবি আঁকতেন। সাহিত্যের প্রতি যেমন তিনি শৈশব থেকে আগ্রহী ছিলেন, তেমনি স্কুলে পড়ার সময় থেকে ছবি আঁকা বা চিত্রশিল্পের দিকেও আগ্রহী ছিলেন। ওয়ালীউল্লাহ্‌র আরও একটি দুর্লভ গুণ হলো- তিনি ভালো কাঠ খোদাই ও ভালো ছুতোর মিস্ত্রির কাজ জানতেন। নিজের ঘরদোরের টুকিটাকি আসবাবপত্র তিনি নিজের হাতে বানাতেন।

তাঁর হাতের কাঠের কাজ দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারতো না যে এ কোন শৌখিন মিস্ত্রির কর্ম। শিবনারায়ণ রায়ের মতে প্রথম যুগের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে যিনি বাংলা ভাষায় সম্ভবত সবচাইতে মৌলিক ও প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। ওয়ালীউল্লাহ্‌র তিনটি উপন্যাস বেশ আলোড়িত হওয়ায় তাঁর ছোটগল্পগুলোর কীর্তি তেমন চোখে পড়ে না। ১৯৭১ সালের ১০ই অক্টোবর মধ্যরাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ৫০ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.