আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সৈয়দ মুজতবা আলী

ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি। আজ থেকে চার যুগ আগে এই দিনে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি পুরুষ ও অবিস্মরণীয় প্রতিভা সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। বহুমুখী প্রতিভা, অমর কথাশিল্পী, ভাষাবিদ ও অসাধারণ পণ্ডিত মুজতবার জন্ম হয়েছিল সিলেটের করিমগঞ্জে ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ সালে। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে মুজতবা এক অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার প্রথম বই 'দেশে বিদেশে' একটি অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী ও তা ১৯৪৯ সালের শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে নির্বাচিত হয় এবং তাকে সম্মানজনক নরসিংহ দাস পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

চাচা কাহিনী, পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকণ্ঠী, শবনম ও অন্যান্য প্রায় ৩০টি বই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে পাঠকদের সামনে আসে এবং সমানভাবে জনপ্রিয় হয়।

উভয়বঙ্গে আমরা তাকে চিনি তার ভাষা, রচনাশৈলী ও সম্পূর্ণ মৌলিক সাহিত্য ধারার প্রবর্তক হিসেবে। কিন্তু তাকে কি আমরা দেশপ্রেমিক ও ভাষাসৈনিক হিসেবে জানি? সে সব অধ্যায় অজানাই রয়ে গেছে। ভাষাসৈনিক মুজতবা আলীর কথা জানতে হলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ-ভারত বিভক্ত হয় এবং স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশের জন্ম হয়।

তার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় অর্থাৎ ৩০ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে মুজতবা সিলেট সাহিত্য সংসদে বাংলাকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তখনো এ দেশে ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। কাজেই তার এই দাবি তদানীন্তন সিলেট জেলায় রক্ষণশীল সমাজ মানতে চায়নি, তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অদম্য মুজতবা সাহসিকতার সঙ্গে তিন ঘণ্টা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে তার প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

ঐতিহাসিক সেই সভার মূল্যায়ন করতে হলে ওই সময় সিলেটে বিরাজমান উত্তেজনাময় পরিস্থিতির কথা স্মরণ রাখতে হবে।

অন্যান্য জেলার চেয়ে ব্যতিক্রমী সিলেট আসাম-প্রদেশ ছেড়ে গণভোটের মাধ্যমে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেয়। যদিও সিলেটীরা ব্যাপকভাবে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির জন্য ভোট দিয়েছিল, শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণ দেখিয়ে অন্যায়ভাবে সিলেট বিভক্ত করা হয়। সিলেটের পাঁচটি মহকুমার মধ্যে সিলেট সদর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ_ এ চারটি মহকুমা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং পঞ্চম মহকুমা করিমগঞ্জকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিলেটকে বিভক্ত করায় এক মানবিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। শত শত পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে নতুন বাসস্থান গড়েন।

রক্ষণশীল শাসকচক্র মানুষের এই দুর্ভোগকে পুঁজি করে একটি উন্মত্ত পরিস্থিতির সৃষ্টির চেষ্টা করে।

এমন এক উন্মত্ত পরিস্থিতিতেও মুজতবার সাহস ছিল আমাদের জনগণের মাতৃভাষা বাংলার অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার এবং রাষ্ট্রভাষার নামে অন্য কোনো বিদেশি ভাষা যাতে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয় সে ব্যাপারে সোচ্চার হওয়ার। তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন_ 'পূর্ব পাকিস্তানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি তার ঘাড়ে উর্দু চাপানো হয়, তবে স্বভাবতই উর্দু ভাষাভাষি বহু নিষ্কর্মা শুধু ভাষার জোরে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করার চেষ্টা করবে। ফলে জনসাধারণ একদিন বিদ্রোহ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। '

বিশ্ব পরিব্রাজক মুজতবা বলেছিলেন, যে নিজেদের প্রকাশ করার জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ তাদের মাতৃভাষাকে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে।

তিনি সভাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, আরবদের ইরান ও তুর্কি বিজয়ের পর তাদের ওপর আরবি ভাষা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। একইভাবে মোগলরাও আমাদের ওপর ফারসি ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। মুজতবার ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তী সময়ে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি।

সিলেটের সেই সভার পর দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মুজতবা সিলেট ছেড়ে কলকাতায় চলে যান এবং তার সেই বক্তব্যটি কলকাতার সাহিত্য ম্যাগাজিন 'চতুরঙ্গ'-এ রচনা আকারে প্রকাশ করে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সিলেটে যে ঘটনার সূত্রপাত তার সমাপ্তি হয় বগুড়ায়। একটি সাহিত্য সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য ১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর মুজতবাকে বগুড়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওই সভায় তিনি দুটি পণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

স্থানীয় আযীযুল হক কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীরা তার পণ্ডিত্যে প্রভাবিত হন এবং তারা তাকে প্রিন্সিপালের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন।

কলকাতার বিশাল সাহিত্য জগৎ ছেড়ে ক্ষুদ্র বগুড়া জেলা শহরে বসবাসের ব্যাপারে মুজতবা মোটেই উৎসাহী ছিলেন না। তবে কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলে কলকাতা গিয়েছিলেন, বহু অনুনয় করে তাকে বগুড়ায় যোগ দিতে সম্মত করান। তিনি ১৯৪৯ সালের শুরুতে কলেজটিতে যোগদান করেন। ভাষা আন্দোলনের প্রাক্কালে বগুড়ায় তখন চরম উত্তেজনাময় পরিস্থিতি ছিল।

স্থানীয় রক্ষণশীল চক্র তার অধ্যক্ষ পদে যোগদান সুনজরে দেখেননি, তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলেন। এর কিছুদিন পরই কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় এবং এতে কলেজের কিছু ছাত্র ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লেখে। ম্যাগাজিন প্রকাশিতব্য সব লেখা মুজতবা দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগেই নির্বাচন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তাকে 'পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে' প্রবন্ধ রচনার জন্য শিক্ষার্থীদের 'প্ররোচিত' করার অভিযোগ আনেন ও ম্যাগাজিনে অত্যন্ত উঁচুমানের পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রিন্সিপালের বাণী লেখার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ম্যাগাজিনটি নিষিদ্ধ ঘোষিত এবং এর সব কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।

কলেজের প্রিন্সিপালের জন্য কোনো বাসভবন না থাকায় অকৃতদার মুজতবা বগুড়ায় তার মেজভাই সৈয়দ মর্তুজা আলী জেলা প্রশাসকের বাসায় থাকতেন। ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু যে মুজতবা আলীকে হয়রানি করেছিল তা নয়, তারা তার ভাইকেও এর সঙ্গে জড়িত করতে চেষ্টা করে। গ্রেফতার এড়াতে মুজতবা কলকাতায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। মাত্র ছয় মাসের মাথায় বগুড়া অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

ভাষা আন্দোলন ধীরে ধীরে এক সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করেন।

আমাদের আপসহীন ভাষা আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অবশেষে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এই স্বীকৃতির পরই মুজতবার সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা ঢাকায় প্রথমে আল ইসলাহ ম্যাগাজিনে এবং পরবর্তী সময়ে 'পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই বইটি ২০০২ সালে একুশে পাবলিকেশন্স নতুন করে প্রকাশ করে। মুজতবার পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী পাঠকরা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। এ বইটিই প্রমাণ করে, মুজতবা আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের এক অন্যতম স্থপতি।

সারা জীবন তিনি অসত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন ও বিদ্রোহী জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু মাথানত করেননি। ১৯২১ সালে সিলেট সরকারি স্কুলের মুজতবা কিছু হিন্দু সহপাঠী স্থানীয় ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার জেমস ডসনের বাগান থেকে সরস্বতী পূজার জন্য কিছু ফুল চুরি করেছিল। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ডেকে পাঠানো হয় এবং তাদের বেত মারা হয়। ওই সময় অসহযোগ এবং খেলাফত আন্দোলন চলছিল।

একইসঙ্গে বেত মারার ঘটনাটি আগুনে কেরোসিন ঢালার মতো কাজ করে। সেদিনই স্কুল বয়কটের নেতৃত্ব দেন নবম শ্রেণীর ফার্স্ট বয় মুজতবা আলী।

ব্রিটিশ সরকার পরিস্থিতি শান্ত করতে অভিভাবকদের ওপর, বিশেষ করে সিলেটে ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার মুজতবার পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলীর ওপর সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করে। মুজতবা ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত স্কুলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এর আগে স্থানীয় মুরারী চাঁদ কলেজে রবিঠাকুরের ঐতিহাসিক ভাষণ 'আকাঙ্ক্ষা' শুনে তিনি রবিঠাকুরের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন।

কবিগুরু তাকে শান্তি নিকেতনে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। মুজতবা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দমনমূলক কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারেননি, তাই ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা ছেড়ে শান্তিনিকেতনে পাড়ি দিলেন।

বিশ্বভারতীতে স্নাতক পাস করার পর কিছুদিন আলীগড় কলেজেও পড়লেন। তারপর কাবুল চলে গেলেন। সেখানে থেকেই বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য জার্মান সরকারের বৃত্তি লাভের আবেদন করেন এবং বৃত্তি পেয়ে যান।

এ জন্য তাকে জার্মান ভাষা শিখতে হয়েছে। কিন্তু মুজতবা কোনো ব্রিটিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর ফিরে যাননি।

স্বাধীনচেতা মুজতবাকে তার জীবনের অধিকাংশ সময় বিদেশে কাটাতে হয়েছে, কিন্তু তার আত্দা সব সময়ই পড়েছিল বাংলাদেশে। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং জীবনের বাকি দিনগুলো তিনি তার আত্দীয়স্বজন ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে এ দেশেই কাটিয়েছেন। মুজতবার পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা আজও সব পাঠককে প্রেরণা জোগায়।

তার অদম্য দেশপ্রেম আমাদের উৎসাহিত করে। মুজতবা তার অনুপম সাহিত্যের মধ্যেই থাকবেন জীবন্ত-জাগ্রত।

১১ ফেব্রুয়ারি ছিল তার চলি্লশতম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের ভাষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী ও অদম্য দেশপ্রেমী আমার ছোট চাচা সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছি। কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি তার আত্দার চির শান্তির জন্য।

আমিন।

 

সোর্স: http://www.bd-pratidin.com/index.php     দেখা হয়েছে বার

এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.