আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মেগা -বিপর্যয়

১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল উত্তর আটলান্টিকে একটি হিমশৈলের সঙ্গে আঘাত পেয়ে যখন ডুবে যায় আর এম এস টাইটানিক তখন তা হয়ে উঠেছিল ধনতন্ত্রের অহংয়ের একটি মস্ত বিপর্যয়ের মুহূর্ত৷ ২,২২৪ জন আরোহী ও কর্মীর মধ্যে ১৫০২ জনের সলিল সমাধি ঘটে সেদিন৷ আধুনিক যুগের অন্যতম বৃহত্ এই ট্র্যাজেডির কলঙ্কের দাম ছিল প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার , মানুষ এবং সম্পদের দাম না ধরলে , বেলফাস্টের হারল্যান্ড অ্যান্ড ওল্ ফ একসঙ্গে দু’টি জাহাজ বানাবার কন্ট্র্যাক্ট পেয়েছিল৷ ১৯৯৭ সালে এই ট্র্যাজেডির উপর আধারিত জেম্ স ক্যামেরনের ‘টাইটানিক ’ ছবিটির বাজেট ছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন , উইকিপিডিয়ার মতে ছবিটির রোজগার প্রায় ২ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে৷ পরিচালকের প্রায় প্রতিটি ছবিই আসলে সিনেমা -সংক্রান্ত প্রযুক্তির এক একটি পরীক্ষা ও তার চড়ান্ত প্রদর্শন , ‘টাইটানিক ’-ও তার অন্যথা নয়৷ বলা যেতে পারে ১৯১২ -র কলঙ্কের মোচন ঘটেছিল এই ছবির মারফত , এই টাইটানিক ডোবেনি৷ অতঃপর তার নির্মাণ , তার নির্মিতি, তার বাহুল্য , তার প্রাচুর্য ধনতান্ত্রিক ছায়াছবির ইতিহাসের একটি মাইলফলক হয়ে গিয়েছে৷ মহাবিপর্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্মাণের এই দৃষ্টান্ত সিনেমার ইতিহাসে একটি অবধারিত মাইলফলক হিসেবে থেকে গিয়েছে ও যাবে৷ ‘টাইটানিক ’ তখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটালিজ্ মের শ্লাঘার মিনার৷ ডিজিটাল ইমেজ নির্মাণের যে পথ প্রদর্শন করল ‘টাইটানিক ’, তার ফলে ইলিউশন হয়ে উঠল এমনই বাস্তব যেমনটি অ্যানালগ যুগে সম্ভব ছিল না৷ স্পেকট্যাকলের বাংলা বোধ হয় করা যায় দৃশ্যাড়ম্বর , সেই রকম আড়ম্বর অতঃপর ঘন ঘন আসতে আরম্ভ করল হলিউডের পর্দায়৷ গুগলে শ্রেষ্ঠ ১০টি ডিস্যাস্টার মুভিজের সন্ধান করলে যে তালিকাগুলি আসবে তাদের সিংহভাগ ছবিই যে এই শতকে নির্মিত তা হলফ করে বলা যায়৷ প্রতিটি ছবিই স্পেশাল এফেক্ট্ স -এর জয়জয়কার , প্রতিটি ফ্রেমের মূল্য হাজার হাজার ডলার৷ বলিউড হলিউডকে নির্মাণ ও রোজগারে প্রায় ছুঁয়ে ফেললেও এই গোত্রের ছবি আরও ৷ অনেকদিন হলিউডের একচেটিয়া হয়ে থাকবে , এর মাধ্যমেই চলচ্চিত্র সাম্রাজ্যের একছত্র অধিপতির একমাত্র রণহুংকার , তা বলা যায়৷ একমাত্র হলিউডই পারে পর্দায় বিশ্বজোড়া বিপর্যয়ের পেশি প্রদর্শন করতে , যেখানে ইমেজ , প্রযুক্তি , পুঁজি প্রায় একাত্ম হয়ে তার নির্মাতা ব্যবস্থাকে বনের অপ্রতিরোধ্য রাজা হিসেবে ঘোষণা করে৷ এ আর নতুন কথা নয় , কোনও মৌলিক আলোকপাতও এটা নয় যে একমাত্র এই জাতীয় ছবিতেই আমেরিকার জাতীয় আত্মপরিচয়ের জয়জয়কার সম্ভব ; ভিনগ্রহীর আক্রমণ , আণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা --- এই সবের হাত থেকেই এসব ছবিতে আমেরিকানরা পৃথিবীকে উদ্ধার করে প্রায় শেষ মুহূর্তে, যার আগে অর্ধেক বিশ্ব ছাড়খার হয়ে গিয়েছে৷ সেই প্রসঙ্গ অনেক আলোচিত হয়েছে , কিন্ত্ত এক ধরনের অসমান্ত আলোচনা করতে চাইছি এখানে --- কেন এই সার্বিক বিপর্যয়ের প্রতি আমাদের এই টান , আমরা যারা বড়ো পর্দায় এই ছবিগুলি দেখবই ? রাজারাজড়াদের যে কত ক্ষমতা , তার জৌলুস যে কত--- সিনেমা কী ভাবে এখনও হলিউডের করতলেই পোষ্য , সে তো আছেই৷ কিন্ত্ত যে অবধারিত আতঙ্ক , যে অসহায়তা এইসব ছবি উদ্রেক করে --- বিশেষ করে সেই সব ছবি যা ‘টাইটানিক ’ বা ‘শিন্ডলার্স লিস্ট ’-এর মতো ঐতিহাসিক ঘটনার উপর আধারিত , অর্থাত্ যা ঘটেছিল এবং আবার ঘটতে পারে --- তার বাস্তবায়নের প্রতি আমাদের এই অমোঘ আকর্ষণ কেন , সে কি শুধুমাত্র এই দেখার জন্য যে শেষবেশ কিছু কল্পিত নায়ক যে ভাবে দুঃসময়ের অবসান ঘটাবে , তা কতটা অবিশ্বাসযোগ্য ? কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা তো তেমনই৷ আলবের কাম্যু -র ‘প্লেগ ’ এমনই এক বিপর্যয়ের উপর আধারিত উপন্যাস ছিল৷ ফ্রান্সের উপকূলবর্তী একটি শহরে ক্রমবর্ধমান মহামারীর একটি দলিল এই উপন্যাসের আতঙ্কই ছিল এই যে যত উপন্যাসটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তব হয়ে উঠবে , যতই ডিটেলের পর ডিটেল জমবে , ততই মহামারী হয়ে উঠবে ফ্যাসিবাদের অমোঘ রূপক৷ সন্ধেবেলায় ট্রামভর্তি মৃতদেহ শহরের বুক চিরে যখন যায় , তখন তা স্পেকট্যাক্ ল যতটা , তার চেয়েও দৈনন্দিনের মতো স্বাভাবিক বলেই হাড় -হিম করা আতঙ্ক তৈরি হয়৷ যেহেতু শহরে গোরস্থানের স্থান অকুলান , তাই বড়ো বড়ো গর্ত খুঁড়ে তাতে দেহ ফেলে চুন ঢেলে দেওয়া হয়৷ যেহেতু মৃত্যু অবধারিত তাই শহরের কথাশিল্পী তার কাজ করে তোলেন অতি ধীরে , এক একটি শব্দলিখনে অনেক সময় দেন তিনি৷ যখন শহরের মেয়র নিজের রোগগ্রস্ত সন্তানের দেহ তুলে দেন পরীক্ষামূলক প্রতিষেধকের গিনিপিগ হিসেবে , তখন তার শরীর হয়ে ওঠে শহরের মেটোনিমি প্রায়৷ তার হয়তো বেঁচে থাকার কথা ছিল কয়েক ঘণ্টা , সে বেঁচে থাকে আরও কয়েক দিন , ভাইরাস ও প্রতিষেধকের মধ্যে যুদ্ধের ফলে নতুন যন্ত্রণায় তার শরীর বেঁকেচুরে যায়৷ মানুষের কিছুই করার থাকে না বিশেষ , একদিন মহামারী থিতিয়ে যায়৷ আর শহরে যখন প্রাণ ও আলো ফিরে আসছে একটু একটু করে , তখন একটি টিলার উপর থেকে সেই শহরকে দেখতে দেখতে ভাবেন ডাক্তার রিউ যে ভাইরাস মরে না , হাইবার্নেট করে , দীর্ঘ শীতঘুম কাটিয়ে একদিন সে আবার জেগে উঠবে৷ হলিউডি বিনোদনের পাশে গত শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য প্রসঙ্গটি আনলাম না৷ বক্তব্য এই যে ‘প্লেগ ’-এ বিপর্যয়ের হাত থেকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের বিজয়ের কোনও মুক্তি নেই বলেই কি উপন্যাসটি এত অমোঘ ? বা , হলিউডি ছবিগুলির যে জগত -উদ্ধারের নিষ্পত্তি তা না থাকলেই কি তা উপরোক্ত উপন্যাসটির ধারে -কাছে যেতে পারত ? অবশ্যই পারত না৷ আখ্যানের তৃন্তির ইতর বিশেষের জন্য নয় , প্রকৌশলে পুঁজি ও প্রযুক্তির কোনও উপস্থিতি উপন্যাসটিতে ছিল না , উপন্যাসে থাকে না৷ সিনেমায় থাকে ; পর্দায় বিপর্যয়ের ভয়ঙ্করতা যখন পুঁজির জৌলুস ধারণ করে তখন তা হয়ে ওঠে মণিমানিক্যের মতো সুন্দর৷ ধ্বংস যে চমকপ্রদ , প্রলয় যে শিহরণ সঞ্চার করে , তার নির্মাণ যে ধনতান্ত্রিক দুনিয়ায় করতালিযোগ্য , এর সাক্ষ্য রাখে এই সব ছবির প্রদর্শনের ইতিহাস৷ এক সময়ে ফিউচারিজ্ম নামে একটি আভাঁ-গার্দ শিল্প -আন্দোলন শুরু হয়েছিল ইউরোপে বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে৷ প্রযুক্তি , গতি , হিংসার জয়গান গাওয়া এই আন্দোলনের বক্তব্য ছিল ---‘উই অল গ্লোরিফাই ওয়ার --- দ্য ওয়ার্ল্ডস অনলি হাইজিন -মিলিটারিজ্ম , প্যাটরিওটিজ্ম , দ্য ডেসট্রাকটিভ জেসচার অফ ফ্রিডম -ব্রিঙ্গারস , বিউটিফুল আইডিয়াস ওরথ ডাইং ফর , অ্যান্ড স্কর্ন ফর উওম্যান৷ ’ আন্দোলনটির অনেক পুরোধাব্যক্তিই স্বাভাবিক ভাবেই ফ্যাসিজ্ মের অনুগামী হয়ে যান৷ এটাই ভাবার , ডিস্যাস্টার গোত্রের ছবি কি আমাদের সে রকম শিল্পের দর্শকে রূপান্তরিত করে ? ধ্বংস দর্শনে এমন সামুহিক আনন্দ পাওয়া যেত রোমান অ্যাম্পিথিয়েটারে , পশু ও মানুষের মরণখেলা দেখে , তাই কি ফেরত্ আসে এখানে ? হয়তো পর্দায় ধ্বংসের অবিকল নির্মাণ আসলে আমাদের ৷ দেয় স্থান ও দূরত্বের আরাম ও নিশ্চিন্তি৷ ওইখানে যা ঘটছে তা আমার পরিসরে ঘটছে না , আমি নিরাপদ৷ ওসব অন্য কোথাও , অন্য কোনওখানে হয়৷ আপাতত আমি ওই প্রযুক্তির উত্কর্ষের বিষয়ী , যতই নিমজ্জিত হব অবধারিত বিপর্যয়ে , ততই বাড়তে থাকবে দূরত্ব --- স্থানিক ও কালিক৷ হিরোশিমা , ভোপাল , মোদীর নরক গুজরাট , নানকিং --- অন্য কোথাও ঘটেছিল৷ মনে রাখতে হবে , দর্শকসত্তার এই নিরাপত্তা চিরকাল ছিল না , দেশ ভাগ , সমকালীন দাঙ্গা ও পরবর্তী ধ্বংসাবস্থা নিয়ে বহুদিন ভারতীয় ছবি হয়নি , করা যায়নি৷ ১৯৬৫ -তে যশ চোপড়া নির্মিত ‘ওয়ক্ত ’ ছবিটি আসলে দেশভাগ নিয়েই , কিন্ত্ত সেখানে মেটাফর হিসেবে ছিল ভূমিকম্প৷ দু’টি ছবির প্রসঙ্গ আনা যায় , যেখানে ঘনিয়ে আসা বিপর্যয়ের আতঙ্ক বা দুঃসময়ের বা ধ্বংসের ঘণ্টাধ্বনি যেমন ভাবে আসে তা হলিউডের ছবির চোখের আরাম , দূরত্বজনিত নিরাপত্তা ও থ্রিলের আমোদ কোনওটাই দেয় না (যদিও দু’টি ছবিই প্রথাগত ভাবে --- ইমেজে ও নির্মাণে --- ‘সুন্দর ’)৷ মাইকেল হ্যানেকে পরিচালিত ‘দ্য হোয়াইট্ রিবন ’ (২০০৯ ) একটি নয়নাভিরাম ছবি , সাদা -কালোয় তোলা৷ জার্মানির একটি গ্রামে পিতৃতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্র প্রবল এবং নিষ্ঠাপূর্ণ৷ গ্রামের যাজক বেনিয়মী বালক -বালিকাদের হাতে শাস্তিস্বরূপ বেঁধে রাখেন একটি সাদা রিবন --- যে পবিত্রতা তারা লঙ্ঘন করেছে তার প্রতীক হিসেবে৷ যে কিশোরটি হস্তমৈথুন করেছে তার হাত প্রতি রাতে খাটের সাথে বেঁধে রাখা হয়৷ যে চিকিত্সকটি দয়ালু তিনি তাঁর প্রতিবেশিনীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন , তাঁর নিজের কন্যাসন্তানের সঙ্গে সম্পর্কটিও সন্দেহজনক৷ স্কুলে একটি বালিকাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সমন করলে সে তত্ক্ষণাত্ আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে যায়৷ ফাঁকা করিডর ও বন্ধ দরজা অন্তরালের নিয়মভঙ্গের শাস্তির সাক্ষ্য রাখে৷ এমতাবস্থায় এই গ্রামে অদ্ভুত দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে --- আত্মহত্যা , অগ্নিসংযোগ , হিংসা ইত্যাদি ঘটে যার অনুসন্ধানে প্রায় ডিটেকটিভ গল্পের আকার ধারণ করে ছবিটি --- কিন্ত্ত কোনও রহস্যেরই সমাধান হয় না৷ অথচ একটা ইঙ্গিত থেকে যায় যে এই সব কিছুই হয়তো গ্রামের সেই সব অবদমিত বালক -বালিকাদেরই কীর্তি যাদের অব্যক্ত আবেগ ও অভিব্যক্তিহীন মুখমণ্ডল ছবিটিকে বোধগম্যতার অপারে নিয়ে যায়৷ ছবির শেষে সংবাদ পাওয়া যায় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে , হয়তো এই গ্রামের প্রতিটি কিশোর -কিশোরীই আগামী দিনে ফ্যাসিজ্ মের অনুগামী হবে , এমন আতঙ্কের রেশ থেকে যায়৷ এই ছবিতে বিপর্যয়ের কোনও প্রকাশ নেই , তা কেবলই অবধারিত সম্ভাবনা হিসেবে থেকে যায়৷ যে প্রক্রিয়ার বীজ পাওয়া যায় ছবিটিতে তার অন্ত বা পরিণাম ছবিটিতে নেই , একটি গ্রামের গল্প থেকে মহাদেশব্যাপী সর্বনাশের হদিশ রেখেই ছবিটির নিষ্পত্তিহীন সমান্তি ঘটে , প্রলয়ের প্রস্ত্ততি ঘটে চলে দৈনন্দিনের স্বাভাবিকতাতেই৷ কিংবা , ২০১১ -য় মুক্তিপ্রান্ত লার্স ভন ট্রায়ারের ‘মেলাঙ্কলিয়া ’, যা আসলে হলিউডের ডুম্ স ডে বা অ্যাপোক্যালিপ্স -এর প্রতিতর্ক বলা যায়৷ ছবির বিষয় পৃথিবীর আসন্ন অবলুন্তি , ছবির নামচরিত্র আসলে একটি উপগ্রহ যা ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে৷ বিষয়ের সঙ্গে তারকভস্কির ‘স্যাক্রিফাইস ’-এর মিল আছে , এবং তারকভস্কি যে এই পরিচালকের গুরুস্বরূপ তা এতদিনে স্বীকৃত৷ কিন্ত্ত আণবিক বিস্ফোরণের প্রেক্ষাপটে রুশ মহাশিল্পীর ছবিটি যেমন পরিচালকের অল্টার -ইগো এক আবশ্যিক ভাবেই পুরুষ -চরিত্রের আধ্যাত্মিক আত্মাহুতির উপর নিবন্ধ (পরিচালকের শিল্পী -পৌরুষ ও অহং -এর মহীয়ান ভাব ছবিটির আস্বাদনে পথে অন্তরায় হয়ে ওঠে বলে আমার মনে হয় ), ‘মেলাঙ্কলিয়া ’-য় নৈতিক স্তম্ভ হিসেবে থাকে একটি নারীর সত্তা ও মনন৷ নায়িকা জাস্টিন অবসাদগ্রস্থ , তার ইনস্টিঙ্কট বা জীবনানন্দের ভাষায় ‘বোধ ’--- প্রতিনিয়ত জানায় যে শেষের সে দিন আসন্ন , কিন্ত্ত কেউই যার তোয়াক্কা করছে না৷ একটি প্রাসাদোপম ইউরোপীয় বাড়িতে তার নিজের বিবাহ সে পণ্ড করে অস্বাভাবিক হয়ে যেতে যেতে৷ এই বাড়িটি এবং তাতে অ্যারিস্ট্রোকেসির সমাহার যে আসলে এক ধরনের ইউরোপের ধ্বংসাবশেষ তা বুঝতে সময় লাগে না৷ সভ্যতার জরা জাস্টিনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে , স্নায়ুতে স্নায়ুতে প্রবেশ করে , রাতের বেলায় আকাশের তলায় নতুন চাঁদের উদ্দেশে সে তার যোনি মেলে ধরে , সর্বনাশের আশায় হিস্টিরিয়াগ্রস্থ হয়ে সে তার বড়ো বোন ক্লেয়ারের সেবার শরণাপন্ন হয় (প্রসঙ্গত , জাস্টিন ও ক্লেয়ার নাম দুটি মার্কুই দি সাদের ‘জাস্টিন ’ ও জঁ জেনে -র ‘দ্য মেইড্ স ’ থেকে ধার করা )৷ এর পর যত সেই ক্ষণ ঘনিয়ে আসে , যতই আতঙ্কে ও বিষাদে প্রায়োন্মাদ ও আত্মঘাতী হয়ে ওঠে তার প্রিয়জনেরা --- আকাশে তখন দুটি চাঁদ , একটি ক্রমবর্ধমান --- তত শীতল ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে জাস্টিন , যেন এক অমোঘ শান্তি ও স্থৈর্য সে অর্জন করেছে৷ একদা উন্মাদ জাস্টিনই তখন প্রায় মাতৃস্বরূপ ধাত্রী তার পরিবারের , ধ্বংসকে যাতে তার ভয়ঙ্করতা , তার মহাজাগতিক সৌন্দর্যের চড়ান্তের সঙ্গেই সহজে বরণ করে নেওয়া যায় তার নিশ্চুপ দীক্ষা সে দিতে থাকে৷ মেলাঙ্কলিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে পৃথিবীর৷ এলিয়টের কবিতার নায়ক নিজেকে ল্যাজারাস বলে , যে নাকি মৃত্যু ও নরক থেকে ফিরে এসেছে , যে সাবধান করে দিতে চায় সবাইকে , কিন্ত্ত তার ভাষা কেউই বুঝতে পারে না হাসি -আমোদ -বোরডম -ক্লান্তির ঘেরাটোপে৷ ঘনিয়ে আসা বিপর্যয়ের চেতাবনিও সে রকমই দুর্বোধ্য , বা হয়তো তা ভাঁড়ের প্রলাপের মত হাস্যকর শুনতে লাগে৷ এখন টিভির পর্দা, সংবাদপত্রের শিরোনাম পড়লে নিজেকে বলি যে আমার কোনও অর্থ চিট্ ফান্ডে লগ্নি করা ছিল না , অতএব পাওয়া যাক গোটা দুই রগড় এ বার কোটিপতির কেচ্ছা -বিবরণে৷ ঘুমের মধ্যে দেখা দুঃস্বপ্নের সঙ্গে জাগরণের যোগ নেই , সারদার ক্ষতির অঙ্ক যতটা , তার সমমূল্যে নির্মিত বেশ কিছু ডিস্যাস্টার ছবির আরাম পাওয়া যেতে পারে , ও ধরনের বিপর্যয় পশ্চিমবঙ্গে ঘটবে না৷  

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১০ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.