আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কেয়ামত আসলেই নিকটবর্তী

সবকিছুই চুকিয়ে গেছে গালিব! বাকি আছে শুধু মৃত্যু!! তা প্রায় দেড়যুগ আগের কথা। মনে হয় তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নানাবাড়ি যাব বলে সায়েদাবাদ থেকে একটা আন্তঃজেলা বাসে চড়েছি। বলবাহুল্য, সেটাই আমার প্রথম একলা সফর। বাসটা কিছু দুর অগ্রসর হওয়ার পরই হজুরগোছের একটা লোক বাসে ওঠে প্রথমে কিছু দোয়া, দুরুদ পড়ে একটা কাগজ সবাইকে ধরিয়ে দিলেন।

আমিও নিজেও তার একটা পেলাম এবং তা ভাঁজ করে পকেটে গুজে রাখলাম। বাসের অধিকাংশ লোক অবশ্য খুব মনোযোগ সহকারেই কাগজটি পড়া শুরু করলেন। যাত্রীদের পড়ার ফাকেই আগত হুজুর দ্বীনের কাজে দান করার ফজিলত বর্ণনা করে কোন এক মাদ্রাসার জন্য সাহায্য চাইলেন। মোটামুটি ভালই সাহায্য পেলেন। আমার কাছে এটা স্বাভাবিকের চাইতেও বেশি মনে হল।

আমি নিজেও বোধ হয় অন্যদের দেখাদেখি দু'টাকা দিয়েছিলাম। বুঝলাম, এ অতিরিক্ত দানের পিছনে কাগজটির নিশ্চয়ই বড় মহাত্ম রয়েছে। একটু পরেই ভদ্রলোক সন্তুষ্টচিত্তে বাস থেকে নেমে গেলেন। আমি তার দেয়া কাগজটি পকেট থেকে বের করে মনোযোগ সহকারে পড়তে শুরু করলাম। কাগজের বক্তব্যের সারমর্ম হলঃ মক্কা শরীফের জনৈক দ্বীনি ব্যক্তিকে নবী মুহাম্মদ (যাবতীয় বিশেষণ সহকারে) স্বপ্নযোগে বলেছেন যে, কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী।

তাই তিনি সেই দ্বীনি ব্যক্তিকে হুকুম দিলেন যাতে সে নবীর প্রিয় বান্দাদের বেশি করে কোরআন তেলাওয়াত আর দ্বীনের পথে দান খয়রাত করতে বলেন। নবীর সেই হুকুমের প্রচারের অংশ হিসেবেই এই কাগজ বিতরণ করা হচ্ছে। যে কেউ এ কাগজটি পড়বে তার দায়িত্ব হচ্ছে এ রকম আরো দশ কপি করে তা বিতরণ করা। একব্যক্তি এমন কপি করে বিতরণ করার কারণে সে বহু ধন লাভ করেছে। আরেক ব্যক্তি এই কাগজের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করায় এবং হাসি-ঠাট্রা করায় দিন দুয়েক পরে তার পুত্রের মৃত্যু ঘটেছে।

সদ্য কৈশোর পা দিয়েছিলাম। স্কুলের ধর্মশিক্ষকের মুখে কেয়ামতের ভয়াবহ বর্ণনা শুনলেই শরীর কেপে ওঠত। আর সেই ভয়াবহ কেয়ামত এতো নিকটে! ভয়ে আমার শরীরে প্রতিটি লোম দাড়িয়ে গেল। সে ভয়ের কারণেই পণ করলাম যে করেই হোক এ কাগজের দশ কপি করে আমি বিতরণ করব। কিন্তু দশ কপি করার মতো টাকা আমার ছিলনা।

বাবা হিসাব করে শুধু আসা আর যাওয়ার ভাড়াটা দিয়ে দিয়েছিলেন। নানীর কাছে অনেক আকুতি-মিনতি করে দশ টাকা যোগার করে আমি কাগজের দশটা কপি করে জুমআর নামাজের দিন বিতরণ করলাম। পড়ার পর অনেকেই আমার এ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে দোয়া করলেন। দু'একদিন যাওয়ার পর দেখলাম গ্রামের অনেকই কাজগটির কপি করে নানা জায়গায় বিতরণ করছে। এর নামই ধর্মীয় হুজুগ, যা অনেক পরে উপলব্ধি করেছিলাম।

বহু বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কেয়ামত হয়নি। হওয়ার কোন নমুনাও দেখিনা। অবশ্য কেয়ামতের প্রচার সংক্রান্ত এই লিফলেটগুলো এর পরেও বহুবার পেয়েছি। একই বক্তব্য, একই কাহিনী।

সর্বশেষ গতকালকেও পেলাম। অফিসের বাস থেকে নামার পর বাড়ি ফিরবার পথে রাস্তায় একটি অল্প বয়স্ক মাদ্রাসার ছাত্রকে কিছু কাগজ বিলি করতে দেখলাম। আমাকেও একটি দেওয়া হল। পড়ে বুঝলাম সেই একই বক্তব্য। অবশ্য আমার শরীর একটুও শিহরিত হলনা, ভয়ও পেলাম না।

রাত্রিবেলা বিছানায় শুয়ে ভাবলাম, আসলেই একটা কেয়ামত হওয়া প্রয়োজন। যে কেয়ামতে তুফান হয়ে আসবে মুক্তচিন্তা আর যাতে ভেসে যাবে ধর্ম আর তা নিয়ে ব্যবসা করা এই অধার্মিক কীটগুলো। ভেসে যাবে মানুষকে ঠকানোর মধ্যযুগীয় ব্যবসাগুলো। কিন্তু কবে হবে সেই কেয়ামত? ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।