আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আসলামের জার্সি

পাড়াগাঁয়ের এক ঘরে খিল লাগিয়ে নিজেকে বন্দী করেছে ইব্রাহিম। ইচ্ছে থাকলেও শব্দ করে কাঁদতে পারছে না। এর মধ্যে পালানোর চেষ্টাও করেছিল। লাভ হয়নি। তবে ঘরে বসে কাঁদলে কী হবে, বাইরে উৎসব চলছে।

অসংখ্য মানুষ আনন্দে লাফালাফি করছে। এসব দেখে ইব্রাহিমের অশ্রুধারা আরও বেড়ে যায়। নিজেকে রক্ষার উপায় আর খুঁজে পায় না। এর মধ্যে জয়নালকে বার কয়েক কুত্তার বাচ্চা শুয়োরের বাচ্চা বলে খিস্তি করতেও ছাড়েনি। অবশ্য মনে মনে।

ইব্রাহিম চোখের জল ফেলতে ফেলতে দেখতে পায়, জলবিন্দুর ভেতরে ভেসে উঠছে তারই অতীতের ছবি। আসলামের জার্সি গায়ে দিয়েই মহল্লায় বের হয়েছিল ইব্রাহিম। দেখে তো সবাই অবাক। মহল্লায় তার কদর বেড়ে যায়। যারা আগে তাচ্ছিল্যের সুরে তুই-তোকারি করত, তুমি করে বলে।

ছোটরা তো ইব্রাহিম ভাই বলতে অজ্ঞান। যার সাথে খেলোয়াড় আসলামের সখ্য, সে আর ফেলনা কেউ নয়! সুযোগে ইব্রাহিমও নিজেকে জাহির করতে ছাড়ে না, ‘আসলাম ভাই নিজে আমারে জার্সিডা দিছে। দিয়া কইছে, নেও ইব্রাহিম, আজ থাইক্যা এই জার্সিডা তোমার। ইডা গাও দিয়া তুমি খেলবা। আর দিবই না কেরে কন? তাগো প্যাকটিস ম্যাছে এমুন খেইল দেখাইলাম, আসলাম ভাইরে কাটাইয়া গোল দিয়া দিলাম! দুই খান! আসলাম ভাই খেলার শেষে আমার কান্দে হাত রাইখা কয়, তুমি কোন ক্লাবে খেল? কইলাম, এখনো নাম লেখাই নাই।

এরপর থাইক্যা আসলাম ভাইয়ের লগে খাতির। ’মহল্লার বুড়োরাও ইব্রাহিমকে ভালো চোখে দেখে। এটা-সেটা খাইয়ে তাকে হাত করতে চায়। আসলামের জার্সিটা ছুতো করে ছুঁয়ে দেখতেও অনেকের লোভ। চা-দোকানি চায়ের দাম পর্যন্ত রাখে না।

শত হলেও খেলোয়াড় আসলামের সাথে তার সখ্য বলে কথা! মহল্লায় একটা ক্লাব আছে। ক্লাবে যায় ইব্রাহিম। তবে খেলে না। অন্য খেলোয়াড়েরা তাকে খেলার জন্য জোরাজুরি করে, তবে সে মাঠে নামতে নারাজ। তরুণ খেলোয়াড়েরা ডেকে বলে, কিছু শিখাও না ইব্রাহিম ভাই।

তবে ইব্রাহিমের সাফ কথা, ছোটখাটো মাঠে খেলে নিজের সম্মান খোয়াতে পারবে না।  জয়নালই গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাবার প্রস্তাবটা দিয়েছিল। এক কথায় সে রাজি হয়ে গিয়েছিল। তবে গ্রামে জয়নালদের বাড়ি এসেই থমকে যায় ইব্রাহিম। এলাহি কাণ্ড।

প্রথমে বিষয়টা ঠাওর করতে পারেনি। যখন বুঝল করার কিছুই থাকল না। এখন সে একলা ঘরে বসে কাঁদছে। বাইরে ব্যান্ড পার্টির বাজনার সঙ্গে নাচছে গ্রামের পোলাপানেরা।
একলা ঘরে কতক্ষণ থাকা যায়! তবে বাইরে বেরোনোরও তো কোনো উপায় নেই।

এই গ্রামে পা রাখার পর কম করে হলেও হাজার চোখ তাকে উৎসুক হয়ে দেখেছে। নিজেকে চিড়িয়াখানার প্রাণীর মতো লাগছে। পালানোর পথে একবার নৌকায়ও চড়েছিল। লাভ হয়নি। নৌকার মাঝি পর্যন্ত তাকে চেনে, ‘পিলার ভাই, চলেন আফনেরে মইধ গাঙ থাইক্যা ঘুরাইয়া লইয়াই।

’ ফলে নিজেই মাঝিকে গাঁয়ের দিকে ফিরতে বলে ইব্রাহিম। আর হাড়-জিরজিরে পোলাপান তো নেড়ি কুত্তার মতো তার পিছু লেগেছে। তবু দরজা খুলে বের হয়। সেই আগের দৃশ্য, অসংখ্য চোখ তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। একে অন্যকে কানাকানি করে বলে, ‘দেখ, ঢাকাইয়া পিলার।

আসলামের জার্সি পইরা নাকি খেলে। জয়নাল ভাই হেরে হায়ার কইরা আনছে। এইবার আমরা জিতমুই। ’।

সোর্স: http://www.prothom-alo.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।