আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের গহীন অরণ্যঘেরা হামহাম জলপ্রপাত আজও রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে

সদিচ্ছা, আত্মবিশ্বাস আর প্রচেষ্টা আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে।

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের গহিন অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ী এলাকার রযেছে অপূর্ব এক জলপপাত। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যা হামহাম জলপ্রপাত নামেই পরিচিত। যা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের জন্য হতে পারে অন্যতম একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান । সরকারী কোন উদ্যোগ না থাকায় শুধুমাত্র উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব আর প্রচার প্রচারনা না থাকায় বাংলাদেশের অন্যতম এই জলপ্রপাতটি আজও রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০কিঃমিঃ পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত রাজকান্দি পাহাড়ের কুরমা বনবিট এলাকার আয়তন ৭ হাজার ৯৭০ একর। কুরমা বনবিট এলাকার পশ্চিমদিকে চাম্পারায় চা বাগান, পূর্ব-দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত। এই বনবিটের প্রায় ৮ কিঃমিঃ অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন এই হামহাম জলপ্রপাতটির অবস্থান । সেখানে সরসরি কোন যানবাহন নিয়ে পৌঁছার মতো কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। কমলগঞ্জ- কুরমা চেকপোষ্ট পর্যন্ত প্রায় ২৫কিঃ পাকারাস্তা পর্যন্ত লোকাল বাস,জীপ,মাইক্রোবাস যোগে যেতে পারলেও বাকী ১৫ কিঃ মিঃ পায়ে হেঁটে যেতে হবে।

কুরমা চেকপোষ্ট থেকে চাম্পারায় চা বাগান পর্যন্ত মাটির রাস্তা। সেখান থেকে আবার প্রায় ৫ কিমি. দূরে সীমান্ত এলাকায় ত্রিপুরা আদিবাসীদের পল্লী বন বিভাগের কুরমা বিটের অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ী এলাকা তৈলংবাড়ী। অবশ্য সিএনজি নিয়ে সেখানে গেলে তৈলংবাড়ী পর্যন্ত অনায়াসে পৌঁছা যাবে। যদি সিএনজি যোগে যেতে চান তাহলে আপনাকে নেমে পড়তে হবে আদমপুরে। কমলগঞ্জ-আদমপুর বাজার পর্যন্ত বাস ভাড়া পড়বে ১০ টাকা।

সেখান থেকে ২০০ থেকে ২৫০টাকা ভাড়ায় সিএনজি যোগে আপনি অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারেন আদিবাসী বস্তি তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তি পর্যন্ত । সেখান থেকে আরও প্রায় ৮ কিঃমিঃ পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে কাংখিত সেই হামহা জলপ্রপাতের। তবে কেউ যদি মোটর বাইক নিয়ে যান তবে আরও প্রায় ৩ কিঃমিঃ পায়ে হাঁটা পথ কমে যাবে। যেভাবেই যান না কেন গহীন অরন্যে প্রবেশের পূর্বে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তির আদিবাসীদের সাহায্য নিয়ে আপনাকে ট্রেকিং করতে নামতে হবে। প্রায় ৮ কিমি. দুর্গম পাহাড়ের গায়ে হামহাম জলপ্রপাত যাওয়ার সহজ রাস্তাটি স্থানীয় লোকেরা আপনাকে বাতলে দেবে।

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ঝিরি পথে ট্রেকিং করা খুবই কঠিন এবং কষ্টের। মাঝেমধ্যে সিমেন্টের ঢালাই করার মতো দেখতে বড় বড় পাথরের খণ্ড খুবই পিছলে, ডানে-বামে তাকানো মুশকিল। তাই ট্রেকিং করার সময় নিজের সুবিধার জন্য সবাইকে একটি করে বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে পাহাড়ী এই পথে খুবই সাবধানে হাঁটতে হবে। কলাবনপাড়া থেকে রওনা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথের কিছু জায়গায় বন কলাগাছগুলো দেখে মনে হবে কে যেন সুন্দর, সুশৃংখল এবং সারিবদ্ধভাবে লাগিয়ে রেখেছে। জারুল, চিকরাশি ও কদম বনায়নের লাগানো সারিবদ্ধ চারাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে হাজারো প্রজাপতি ডানা মিলিয়ে উড়ে যাচ্ছে বহুদূরে; যাদেখে বেশ ভালো লাগবে আপনার।

ডুমুর গাছের শাখা আর বেত বাগানে দেখা মিলবে অগুনিত চশমা বানরের । চারদিকে গাছগাছালি, ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর আর ডলু, মুলি, মিটিংগা, কালি ইত্যাদি অদ্ভুত নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ বাগানগুলোর গুলোর সাথে পরিচিত হবেন। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব আপনার মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেবে। দূর থেকে কানে ভেষে উঠবে বিপন্ন বনমানুষ উলুক গিবনসের ডাক। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে আপনার দু’চোখের সামনে ভেষে উঠবে পাহাড় থেকে ধোঁয়ার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য।

মনে হবে যেন ওই নয়নাভিরাম পাহাড় আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এভাবেই হাটতে হাটতে একসময় আপনি পৌঁছে যাবেন আপনার ল্য সেই হামহাম জলপ্রপাতের খুব কাছাকাছি। কিছু দূর থেকে শুনতে পাবেন হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ। কাছে গিয়ে দেখতে পাবেন প্রায় ১৩০ ফিট ওপর হতে জল হামহাম শব্দে জলপপাতের সেই অপূর্ব দৃশ্য । সেখানে কিছুন কাটানোর পর আপনাকে নিতে হবে ফেরার প্রস্তুুতি।

কারণ বেশীণ সেখানে অবস্থানের কারনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে পাহাড়ে ঘনকালো অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা শতভাগ। অপরদিকে বন্যপ্রাণীদের আক্রমনেরও শিকার হতে পারেন। ঢালু ও পিচ্ছিল পাহাড়ী পথ বেয়ে উপরে ওঠা কষ্ট হলেও সহজ, কিন্তু পাহাড় হতে নিচে নেমে আসা খুবই বিপজ্জনক ও কঠিন। তাই ঝিরি পথে এসে সবাইকে কাছাকাছি থেকে খুবই সন্তর্পনে ট্রেকিং শুরু করতে হবে। প্রায় সাড়ে চারঘন্টা পর আপনি ফিরে আসবেন সেই কলাবনে।

অতঃপর সেখানে আদিবাসী বস্তিতে রাত্রি যাপন নতুবা ঘরে ফেরার পালা। যারা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ তারা যদি এ জায়গায় যেতে ইচ্ছা করেন তাহলে তাদের কমলগঞ্জ অথবা শ্রীমঙ্গল শহর হতে যানবাহন ভাড়া করতে হবে ভোর ছয়টার মধ্যে। তাহলে চাম্পারার চা বাগানে কলাবনপাড়ায় পৌঁছতে পারেন সাড়ে সাত বা আটটার মধ্যে। কলাবনপাড়া হতে হামহাম জলপ্রপাতে যেতে-আসতে প্রায় ৯ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। যারা এ ধরনের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, মনোরম পরিবেশ, প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়া সুন্দর জায়গায় যেতে চান তারা চলে যেতে পারেন এ নয়নাভিরাম হামহাম জলপ্রপাতে ।

সূত্রঃ সিলেট সিফদিয়া

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.