আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

টিভি সাংবাদিক মানেই তারকা সাংবাদিক নন

গল্প লিখতে ভালোবাসি

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদকাঠামো ভেঙে নতুন একটি স্টাইল নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয় একুশে। এ দেশের মানুষ সে স্টাইল গ্রহণ করে ভালোভাবে। আর সে চ্যানেলটির সাংবাদিকদের অনেকই হয়ে গেলেন তারকা বা স্টার। আরও ভালো করে বললে সংবাদ তারকা বা তারকা সাংবাদিক। এর আগে সিনেমার নায়কেরা, টিভি নাটকের অভিনেতারা কিংবা জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপকেরা তারকাখ্যাতি পেতেন।

তাদের সঙ্গে যোগ হলেন টিভি রিপোর্টার, তারা হয়ে গেলেন এ দেশের মানুষের ড্রয়িং রুমের বাসিন্দা। এ দেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতা শুরুর আগে সাংবাদিকেরা যে তারকাখ্যাতি পেতেন না, তা নয়। পত্রিকার অনেক জাঁদরেল সাংবাদিকের নাম ছড়িয়ে পড়ত, এখনো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু সেই সাংবাদিককে দেশের অধিকাংশ মানুষই দেখতে পান না। ফলে পত্রিকার অক্ষর বেয়ে তিনি ঢুকে যান মানুষের মগজে এবং ভালো সাংবাদিকতা করলে মানুষের মনে।

টেলিভিশনের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা। টেলিভিশন সাংবাদিক আসলে, তার দর্শকের পরিবারের সদস্য হয়ে যান। একটু ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। প্রিয় বন্ধুটি আমাদের পরিবারের কেউ নন। তার পরও সে বন্ধুটি পরিবারের সদস্যদের চেয়ে কম নয় কিছুতেই।

এর কারণ তাকে আমরা প্রতিদিন দেখি। প্রতিদিন কথা বলি। তার পরামর্শ নিই। তাকে সহায়তা করি। সবচেয়ে বড় কথা, তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকে।

একজন টেলিভিশন সাংবাদিকও তা-ই। তাকে দেখি প্রতিদিন ঘরের ড্রয়িং রুমে। তার কথা শুনি, কী ঘটছে তা তিনি আমাদের জানান। আর তার প্রতিটি কথাই আমরা বিশ্বাস করি। ফলে বাস্তবে দেখা না করেও একজন টেলিভিশন সাংবাদিক প্রতিদিন অসংখ্য ঘরে অসংখ্য পরিবারের অলিখিত সদস্য হয়ে যাচ্ছেন।

তবে সিনেমার নায়ক দেখে যেমন আপ্লুত হয় ভক্তরা, ঠিক তেমনটি হয় না টিভি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে। দর্শক প্রতিক্রিয়ায় অবশ্যই একটু পার্থক্য থাকে। তাহলে কি স্টার বা তারকা হন না টিভি সাংবাদিকেরা। হন । তবে সবাই নন, কেউ কেউ।

যারা তারকা হন, তারা হন নিজের কাজের গুণে। তারকা বা স্টারের সংজ্ঞা আসলে তা-ই। খুব ভালো বা অনবদ্য কাজের জন্য যখন একজন সবার প্রশংসা পান, তার মতো হতে সেই পেশার বা তার বাইরে অন্যরা চেষ্টা করেন, তখন তিনি তারকা বা স্টার হতে পারেন। টেলিভিশনের সব সাংবাদিকই কি নিজের কাজ দিয়ে সে জায়গাটি করে নিয়েছেন? তা নয় মোটেও। ফলে পেশায় সবাই পরিচিতি পান টিভিতে দেখা যায় বলে, কিন্তু তারকা সবাই হতে পারেন না।

আইনজীবী, ডাক্তার বা ছাত্রদের মধ্যে যেমনি কেউ কেউ তারকা হন, এ পেশায়ও ঠিক তা-ই হয়। নতুন যারা টিভি সাংবাদিকতায় আসতে চান, বিশেষ করে তাদের এই অঙ্কটি মাথায় রাখা ভালো। তা না হলে অনেক দিন সাংবাদিকতার পর, অনেক পরিচিতি পাওয়ার পরও তারকা হতে না পারার মনঃকষ্ট কিন্তু থেকেই যেতে পারে। একটি টেলিভিশন তার স্বার্থেই নিজেদের সাংবাদিকদের পরিচিত করান ব্যাপকভাবে। কারণ দর্শক পরিচিত মুখের কাছে প্রয়োজনীয় কথাটি শুনে দ্রুত বিশ্বাস করে।

প্রিয় বন্ধুটি যেসব কথা একজন মানুষকে প্রতিদিন বলে, তা কি কেউ ক্রস চেক করতে যায় কখনো? যায় না। ফলে একজন টেলিভিশন সাংবাদিককে টেলিভিশনে নানাভাবে দেখানো হলে সেটি টেলিভিশনেরই লাভ। আর পর্দায় উপস্থিতি টিভি সাংবাদিকের চাকরির অংশ। তার অধিকার। একজন সাংবাদিক কখন তারকা হয়ে ওঠেন? সে বিষয়ে সমকালের সাংবাদিক ওয়াকিল আহমেদ হিরণ বলেন, শেষ বিচারে পাঠক বা দর্শকই ঠিক করে দেয় কে তারকা হলেন, কে হতে পারলেন না।

একজন রিপোর্টারের রিপোর্টে বা লেখায় কিছু ভুল হতেই পারে। বার্তা সম্পাদক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক সেটি ঠিক করে দেন। সে ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের তারকা হয়ে উঠতে বার্তাকক্ষের কর্তাব্যক্তিদেরও ভূমিকা আছে। সবাই যখন একজন বিনয়ী সাংবাদিককে তারকাখ্যাতি দেওয়া হয়, তা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু যখন একজন সাংবাদিক নিজেকে তারকা মনে করে আচরণ পরিবর্তন করেন, তখন তা সেই সাংবাদিকের বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

যা হোক, টেলিভিশন অবশ্য পুরোটাই টিমওয়ার্ক। ছবির জন্য একজন ক্যামেরাম্যানের প্রতি, ভিডিও সম্পাদনার জন্য ভিডিও সম্পাদকের প্রতি, স¤প্রচার কোয়ালিটি ঠিক রাখার জন্য প্রযোজক, প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর করতে হয় টিভি-সাংবাদিকদের। সবার প্রচেষ্টার পর একটি প্রতিবেদন দিনের সেরা প্রতিবেদন হয়ে ওঠে। কিংবা যে প্রতিবেদনটি সেরা প্রতিবেদন হলো না, সেটির জন্যও একই শ্রম বরাদ্দ রাখতে হয়। তার পরও একটি প্রতিবেদন দর্শক গ্রহণ নাও করতে পারেন।

সেটি তার রুচিসম্মত নাও হতে পারে। টেলিভিশনের সাংবাদিকদের এ বিষয়টি সব সময় মাথায় রাখতে হয়। তারা কাজ করেন মানুষের রুচি নিয়ে। যিনি যত সহজে মানুষের রুচি বা চাহিদা ধরতে পারেন, তিনি তত দ্রুত ভালো সাংবাদিক থেকে তারকা সাংবাদিকে পরিণত হন। তাই বলে, একজন ভালো সাংবাদিক নিজের খেয়ালখুশিমতো চলেন, তা নয়।

তাকেও বেশ কিছু নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। জনান্তিক থেকে প্রকাশিত টেলিভিশন সাংবাদিকতা বইয়ে নঈম তারিক লিখেছেন, একজন সাংবাদিককে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয়, থাকতে হয় জনগণের প্রতি বিশ্বস্ত। ব্যক্তি সাংবাদিক পক্ষপাতমুক্ত না থাকলেও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে পেশাদার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয় তাকে। এ ছাড়া যাদের ক্ষমতা এবং অবস্থান জনগণকে প্রভাবিত করে তাদের পর্যবেক্ষণ করার অসাধারণ সামর্থ্য সাংবাদিকেরা রাখেন বলেও মনে করেন তিনি। জনগণকে সমালোচনা করার সুযোগ দেওয়া, উল্লেখযোগ্য বিষয়টিকে আগ্রহোদ্দীপক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কাজটি সাংবাদিককে করতে হয় যতেœর সঙ্গে।

তার মতে, খবরকে একই সঙ্গে বিস্তারিত এবং পরিমিত রাখতে হবে। পক্ষপাতহীনতা, নির্ভুল তথ্য, কারও একান্ত জীবন ও ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো, রুচিবোধ আর ভদ্রতাকে টেলিভিশন সাংবাদিকতার কিছু মানদণ্ড হিসেবে ঠিক করেছেন তিনি। যা হোক, বলা হচ্ছিল দর্শকের রুচি নিয়ে টেলিভিশন সাংবাদিকদের বিষয়ে। টেলিভিশনের দর্শক হতে কোনো আলাদা যোগ্যতা লাগে না। কোনোভাবে একটি সেটের সামনে যেতে পারলেই হলো।

সংবাদপত্র পড়তে হলে অন্তত পড়া শিখতে হয়। টেলিভিশনে ঠিক তা নয়। সংগত কারণেই টেলিভিশন একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষের কাছে কাছে তথ্য নিয়ে যায়। তাই সেখানে রুচিবোধের তারতম্যও থাকে বেশি। সব মানুষের কথা বিবেচনা করে, প্রতিবেদনটি যে সাংবাদিক তৈরি করেন, তাকে বেশিসংখ্যক দর্শকদের গ্রহণ করার সম্ভাবনা।

তাই বলে, সব প্রতিবেদনই একেবারে আপামর জনগণের জন্য করতে হবে তা নয়। চালের দাম বাড়ল, এ সংবাদটি যেমনি সব শ্রেণীর দর্শকের জন্য মনোযোগ টানবে, বাজেটে কত ঘাটতি হলো তা নিশ্চয়ই সব শ্রেণীর দর্শকের মনোযোগ টানবে না। টেলিভিশনে যেমনি নানা জনের নানা মত প্রকাশ পায়, তেমনি টেলিভিশন নীরবে নিভৃতে জাতীয় জনমত তৈরির কাজটিও করে যায়। কোনো একটি বিষয়ে যখন বিতর্ক চলে, তার নানা পক্ষের কথাই তুলে ধরেন সাংবাদিকেরা। আর তাতে দর্শকেরা নিজেরাই একটি সিদ্ধান্তে আসার তথ্য পেয়ে যান।

এ ক্ষেত্রে যার প্রতিবেদন যত তথ্যভিত্তিক, যত গভীর হবে, ভালো সাংবাদিক থেকে তারকা সাংবাদিক হওয়ার পথে তিনি তত বেশি এগিয়ে যাবেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ মোস্তফা ফিরোজ বলেন, টেলিভিশনে চমৎকার টিমওয়ার্ক না হলে তারকা তৈরি হয় না। টিমে বিশৃঙ্খলা থাকলে বা গোটা টিমে চমৎকার বোঝাপড়া না থাকলে সে টিমে তারকা সাংবাদিক তৈরি হতে পারে না। একুশে টিভিতে চমৎকার টিমওয়ার্ক ছিল। ফলে সেখানে অনেক তারকা তৈরি হয়েছে।

পরে চ্যানেল হয়েছে অনেক কিন্তু আশানুরূপ তারকা বের হয়নি। এ জন্য কিছুটা দায় অবশ্য ম্যানেজমেন্টকে নিতে হবে। টেলিভিশন বিজনেস আর দশটা বিজনেস থেকে আলাদা, তাই টেলিভিশন চালাতে হয় পেশাদার লোক দিয়ে। মোস্তফা ফিরোজ মনে করেন, একজন তারকা সাংবাদিক পুরো চ্যানেলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। তার উপস্থিতিতে মর্যাদার দিক থেকে, এমনকি বাণিজ্যিক দিক থেকেও উপকৃত হয় চ্যানেল।

কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে না পেরে অনেক চ্যানেলই সম্ভাবনা থাকার পরও, আলাদা করে তারকা সাংবাদিক তৈরি করতে পারছে না। যোগ্য ও একটু কম যোগ্য সাংবাদিক এক কাতারে মিলে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। একসময় বিটিভিতে অনেক তারকাশিল্পী তৈরি হয়েছে। কিন্তু দলীয়করণের কারণে, বিটিভি বেশ কয়েক বছর ধরে তারকা তৈরি করতে পারছে না বলেও মনে করেন বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ। দর্শক কম কিন্তু তা টানতে বেশি প্রতিযোগিতার কারণে এখন অল্পসংখ্যক সাংবাদিক তারকাখ্যাতি পাচ্ছেন বলে মনে করেন বাংলাভিশনের বার্তা সম্পাদক রুহুল আমিন রুশদ।

টেরিস্ট্রিয়াল স¤প্রচারের সুবিধা পাওয়ায় একুশে টিভি অনেক দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছে। তার ওপর বিটিভির গতানুগতিক একটা ধারা ভেঙে নতুন ধারা চালু করে মানুষের মনোযোগ টেনেছে চ্যানেলটি। একচেটিয়া মাঠে থাকায় একুশের প্রায় সব সাংবাদিকই তারকাখ্যাতি পেয়েছেন বলে মনে করেন তিনি। তবে সাংবাদিকতা করতে এসে তারকাখ্যাতি পেতে হবেÑএই ধারণার সমর্থক নন এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ. ই. মামুন। তিনি মনে করেন, সবার তারকা হওয়ার দরকারও নেই।

শুরু হওয়ার পর একুশের সাংবাদিকদের তারকাখ্যাতি পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পথপ্রদর্শক হওয়ার কিছু সুবিধা থাকে। তখন যা দেখানো হয়েছে একুশে টিভিতে, সেটি নতুন মনে হয়েছে এবং দর্শকের ভালো লেগেছে। এ প্রসঙ্গে কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড় পেলের উদাহরণ টেনে জ. ই. মামুন বলেন, ‘তার সম্পর্কে আমরা বইয়ে পড়েছি, তার খেলা আমরা দেখিনি, কিন্তু তার পরও তাকে আমরা তারকা ফুটবলারের সম্মান দিই। ওই সময়ের অনেক প্রতিবেদনের চেয়ে এখন কেউ কেউ ভালো প্রতিবেদন করেন, কিন্তু পথপ্রদর্শকেরা (পাইওনিয়ার) যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা হয়তো তার জোটে না। তারকাখ্যাতি তিনি পান না।

কিন্তু পরিশ্রমী সাংবাদিক, মানসম্মত সাংবাদিকতার জন্য ভালো সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি পান। নিজেকে টিভিতে শুধু দেখানোর আগ্রহ থেকে কেউ টিভি সাংবাদিকতায় আসবে, তাও সমর্থন করেন না জ. ই. মামুন। একজন চৌকস সাংবাদিককে সামনে এগিয়ে নিতে, তাকে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে বলে মনে করেন এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ। এ ক্ষেত্রে পুরো নিউজরুমের সহায়তা লাগবে। সাংবাদিক ভালো প্রতিবেদন তৈরি করলেন, কিন্তু তা আলোর মুখ না দেখলে কোনো লাভ হলো না।

আবার কাজের সুযোগ যেমনি দিতে হবে, তেমনি দায়িত্ব নিয়ে সে কাজটি ভালোভাবে করতে হবে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের। একটি আস্থার জায়গা তাকে তৈরি করতে হবে, যাতে তাকে যেকোনো কাজ দিতে নিউজরুমকে দুবার ভাবতে না হয়। এমনটিই মনে করেন জ. ই. মামুন। টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে অনেকেই সশ্রম সাংবাদিকতা বলেন। তাদের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে হয়।

অনেক চ্যানেলের ভিড়ে, নিজেকে আলাদা করতে মান ও পরিশ্রম আর জ্ঞান একজন সাংবাদিককে জ্বলজ্বলে তারকা বানানোর পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। @আনোয়ার সাদী প্রথম প্রকাশ মিডিয়াওয়াচ Click This Link

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.