আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

দাগ-১৬ (এই দাগ হৃদয়ের, এই দাগ সমাজের)



সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কৃতজ্ঞতায় উর্মীর দু’চোখ সজল হয়ে উঠল। আশা উর্মীকে নিয়ে হোস্টেলের মালিক মারিয়ার কাছে সমস্ত ঘটনা বলে তার প্রতি বিশেষ সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করেছিল। মারিয়া প্রথম প্রথম প্রতিদিন উর্মীর খোঁজখবর নিত তার ভাল-মন্দগুলি বিশেষভাবে খেয়াল রাখত। শৈশবে উর্মী খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ছিল। খুব বেশি কথা বলতো, সব সময় হাত আর মুখ যেন নড়তে থাকত।

কোন্ গাছে পেয়ারা, বরই, আম আছে তা সে নিজেই গাছ থেকে তুলে খেত। যাকে বলে গেছো মেয়ে কিন্তু তার জীবনে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর থেকে তার জীবন যেন স্থবির হয়ে গেছে। তার চঞ্চলতা, উচ্ছ্বলতা, তারুণ্য সমস্ত কিছু যেন নিভে গেছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা এবং হোস্টেলে ওঠার পর সে যেন হিসেব করে কথা বলছে এটা হোস্টেলের কারো কারো কাছে দৃষ্টি কটু বলে মনে হয়েছিল। তার এই কম কথা বলার আচরণকে কেউ কেউ তার অহমিকা বলে মনে করেছিল।

একদিন উর্মী রিসিপশনে বসে পেপার পড়ছিল। পাশেই দু’জন মেয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। তাদের একজন উর্মীর পরিচিত নাম শোভা খুব সম্ভব তেজগাঁ কলেজে পড়ত। মেয়েটির সঙ্গে উর্মীর আগে দু’য়েকবার কথা হয়েছিল। উর্মীকে দেখে শোভার পাশে বসা মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছিল, কে রে মেয়েটা? ২০৫ bনাম্বার রুমে উঠেছে, স্টুডেন্ট।

কারো সঙ্গে কথা বলে না যে, খুব অহংকারী নাকি? কি জানি আমার সঙ্গে দু’য়েকবার কথা হয়েছে, তবে বোরকা পরা অবস্থায়। এখানে তো আমরা সবাই মেয়ে তারপরও এত পর্দা, নাকি অন্য কোন ব্যাপার আছে? অন্য কি ব্যাপার থাকতে পারে? এটা ঢাকা শহর কত ব্যাপার থাকতে পারে? হয়ত কেউ চিনে ফেললে কোন সমস্যা হতে পারে আর না হয় দেখতে খুব বিশ্রী টাইপের তাই নিজেকে সব সময় আড়াল করে রাখতে চায়। আবার খুব সুন্দরও তো হতে পারে, সুন্দরী মেয়েদের আবার অহংকার বেশি হয়। সুন্দরী মেয়েরা অহংকারী হয় তবে সুন্দরী হলে তো আর নিজের মুখ ঢাকতো না। সবাইকে দেখাত।

তুই ঠিকই বলেছিস্, হয়ত দেখতে খুব বিশ্রী তাই নিজেকে লুকাচ্ছে। উর্মী আর একমুহূর্তও রিসিপশনে বসে থাকেনি। তার রুমে এসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। আগে কোনদিন উর্মী জানত না যে হোস্টেলে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা আছে। সেদিনই সন্ধ্যাবেলা বুয়া বলে গেল রাত আটটায় অফিসে কাউন্সিলিং।

উর্মী কিছু বুঝতে পারেনি, কাউন্সিলিং আবার কি? সে অফিসে ঢুকেছিল আটটা বাজার পাঁচটা মিনিট আগে, ততক্ষণে কয়েকজন মেয়ে অফিসে পৌঁছে গিয়েছিল। মারিয়া উর্মীকে বলেছিল, উর্মী তুমি আমার পাশে বস। উর্মী তার পাশে বসেছিল। উর্মী একবার তাকিয়ে দেখেছিল অনেক মেয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে শোভা এবং সেই মেয়েটিও ছিল। মারিয়া ঠিক আটটার সময় কাউন্সিলিং শুরু করেছিল, স্নেহের মেয়েরা তোমরা সবাই এই হোস্টেলের সদস্য, আমি কখনো নিজেকে এই হোস্টেলের মালিক ভাবিনা, আমি সব সময় মনে করি আমিও তোমাদের মতো একজন সদস্য শুধু কাজটা ভিন্ন।

আমার কাজ তোমাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো দেখা, তোমাদের পরষ্পরের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে তার সমাধান করা। সদস্য হিসেবে তোমাদের প্রত্যেকের নিয়ম-শৃংখলা ভঙ্গ না করে স্বাধীনভাবেচলাফেরা করার অধিকার আছে এবং একজনের অধিকারের প্রতি অন্যজনের কটাক্ষ বা কোন ধরণের ঈর্ষা পোষণ করার অধিকার নাই, বলে সে শোভা আর সেই মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, কি বল শোভা, মাহবুবা? উর্মী বুঝতে পেরেছিল শোভার পাশের মেয়েটির নাম মাহবুবা। দু’জনে মাথা বাঁকিয়ে সায় দিয়েছিল। উর্মী তখনো বুঝতে পারেনি, আসলে কার জন্য আজকের কাউন্সিলিং? মারিয়া শোভাকে বলেছিল, মাহবুবা আজ তুমি আর শোভা উর্মীকে নিয়ে কি কথা বলছিলে? দু’জনে পরষ্পরের দিকে তাকিয়েছিল, কিছু না তো। মারিয়া গম্ভীর স্বরে বলেছিল, মিথ্যা কথা বলবে না।

মাহবুবা উর্মীর দিকে তাকিয়েছিল। মারিয়া বলেছিল, ওর দিকে তাকাচ্ছ কেন? ও তো আমাকে কিছু বলেনি, আমি তোমাদের কাছাকাছি থেকে নিজ কানে শুনেছি। তোমরা উর্মীর চলাফেরা পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে কথা বলতে পার না। শোভা আর মাহবুবা মাথা নত করে অপরাধীর মতো বসেছিল। তোমরা জানো উর্মী আমাদের পরিবারের সবচেয়ে নতুন সদস্য, আমাদের সকলের উচিত ওকে স্নেহ করা।

তাছাড়া উর্মীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব স্নেহ করি এবং আমার নিজের ছোট বোনের মতো আদর করি। তোমরা আমার পরিবারের অনেক পুরাতন সদস্য তাই আমি তোমাদের একবার সুযোগ দিচ্ছি তোমরা যদি উর্মীর কাছে ভুল স্বীকার কর তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে আর কোন ব্যবস্থা নিব না। সরি আপা আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আমাকে না উর্মীকে বল। শোভা এবং মাহবুবা দু’জনে বলেছিল, সরি উর্মী।

উর্মীর দু’চোখ সজল হয়ে উঠেছিল। উর্মীর বিষয়ে কেউ কোন কথা বললে আমি তাকে হোস্টেলে রাখব না এ কথাটা তোমরা সব সময় মনে রাখবে। তোমরা সবাই আরও একটা কথা মনে রাখবে আমি শুধুমাত্র বাণিজ্যিকভাবে এই হোস্টেল করিনি। তোমরা সবাই খেয়াল করেছ কারো বাড়ী থেকে টাকা আসতে দেরি হলে আমি কোন খারাপ আচরন করি না। তোমাদের প্রতি আমার স্নেহ আছে, ভালবাসা আছে, সহানুভুতি আছে।

আমি আশা করি তোমরা আমার এই স্নেহ, ভালাবাসাকে কখনো দুর্বলতা মনে করবে না। তোমরা সবাই নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে কাউন্সিলিং-এ উপস্থিত হয়েছ সেজন্য তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। উর্মীর প্রথম রুম মেট ছিল ঈশিতা। সে উর্মীর চেয়ে তিন বছরের সিনিয়র। সে উর্মীকে খুব স্নেহ করতো প্রায় চার বছর একসঙ্গে থাকার পর সে ভার্সিটির হল-এ সিট পেয়ে চলে যায়।

তারপর আসে হেমা। উর্মী প্রথমে হেমাকে তার গ্রামের ঠিকানা বলেনি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে একই রুমে থাকতে থাকতে একদিন উর্মী সবকিছু হেমাকে বলেছে। অবশ্য হেমা উর্মীর বিষয় কোনদিন কাউকে কিছু বলেনি। হেমা তখন একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত আর উর্মীও একটি কম্পিউটার কোর্স করছিল।

উর্মী কম্পিউটার কোর্স করে একটি পত্রিকায় জয়েন্ট করেছে আর হেমা একটি মোবাইল কোম্পানীতে জয়েন্ট করেছে। উর্মী মোবাইলটা হাতে নিতেই তার মোবাইলের রিং বেজে উঠল। সে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল, হেমা মিস্ কল দিয়েছে। সে দরজা খুলে দিল। হেমা উর্মীকে দেখে চমকে উঠল, কি রে ঘুমাস্নি? উর্মী কিছু বলল না।

কেন? ঘুমাস্নি কেন? কি হয়েছে? উর্মী রুদ্ধ কন্ঠে বলল, কিছু হয়নি। কিছু হয়নি মানে? নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে? কিছু হয়নি রে এমনিতেই মনটা খারাপ। আজ কি তোর শুভ্রর সঙ্গে কথা হয়েছে? হ্যাঁ। কি বলল? কিছু না, আসলে শুভ্র খুব ভাল, আমার খুব ভাল বন্ধু। শুধুই বন্ধু নাকি আরো বেশি কিছু? সে তো বেশি কিছু হতেই চায়।

তবে। আমি কারো করুণার পাত্র হতে চাই না রে। আচ্ছা বুঝছি অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমা। না ঘুম আসছে না, তুই ঘুমাবি? কেন কিছু বলবি? হেমা তোর কি শুভ্রকে পছন্দ হয়েছে? উর্মী শুভ্রকে আমার পছন্দ হয়েছে কি না তারচেয়ে শুভ্র আমাকে পছন্দ করেছে কি না সেটা বেশি জরুরী। হ্যাঁ তুই অবশ্য ঠিকই বলেছিস্।

চলবে...View this link

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।