আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শকুনের রাজনীতি

চকিত চাহনী সেই হৃদয় দহনের ক্ষণ প্রতিটি প্রভাতে

ডুবাই থেকে মঈন ফারুক সত্য সমাগত মিথ্যা অপসৃত। তবে এ জন্য সত্যকে হতে হয় শক্তিশালী এবং ক্ষমতাধর। সত্য ক্ষমতাহীন হলে সে সমাগত হবে না কখনো। আর মিথ্যাও তখন অপসৃত হবে না। এ শ্বাশত বাণী আমাদের বিরল প্রজাতির বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই উচ্ছারণ করে থাকেন।

ওদের সম্পর্কে আমজনতা ভালো ভাবেই জানে। কারো কারো অতীত ইতিহাস আমার ভালো করেই জানার সুযোগ হয়েছে। তাদের নিজেদেরই কথার সাথে কাজের কোন মিল খুঁজে পাই না। এ কারণে কারো কারো চেহারা দৃষ্টি গোচর হলে মাঝেমধ্যে ঘৃণায় হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। সুন্দর চামড়ার অভ্যন্তরে এ মানুষ গুলোর মন খুবই কুৎচিত।

সামহোয়্যার ইন ব্লগে আমার আগমন প্রায় ৬ মাস হতে চলেছে। এর আগে কখনো আমি কোন রাজনৈতিক পোষ্ট দিইনি এবং মন্তব্যও করিনি। কারণ আমার দেশের রাজনীতি মানেই হিংস্রতা। সেটা সুস্থ এবং বিবেকবান মানুষ মাত্রই অবগত। সূতরাং দেশের রাজনীতি মানে ঝগড়া, বাদ-প্রতিবাদ।

দেশের চলমান রাজনৈতিক ধারাকে রাজনীতি ভাবতে আমার খুব খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এ যেন এক অন্য রকম পরাধীনতা। সেটা এ কারণেই যে, রাজনীতির সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য ও ব্যবহারিক কার্যক্রমের সাথে নেতৃবৃন্দের কথা, কাজ, লক্ষ্যের কোন সাদৃশ্য নেই। আমাদের দেশের রাজনীতির একটাই উদ্দেশ্য রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে দলবাজী। রাজনীতিকদের একটাই উদ্দেশ্য; আমার দল টিকে থাকতে হবে এবং সেটা ক্ষমতায় থাকতে হবে।

তাতে দেশের কী ক্ষতি হলো আর দেশের মানুষের কী দশা হলো, তার বিবেচ্য বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নেতা-নেত্রীর বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা আমাকে খুব আশাহত করেছে। ভেবে ছিলাম দেশে অপ্রত্যাশিত ভাবে চেপে বসা অন্তর্বতীকালীন সরকারের বিদায়ের পর নতুন সরকার একটি সুন্দর রুপরেখা ও সুশাসনের ভিত্তিতে গণতন্ত্রকে পূণরুদ্ধার করবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমরা হনুমানের হাত থেকে উদ্ধার করে দেশকে তুলে দিয়েছি কত গুলো মানুষ রুপী রাক্ষসের হাতে।

তারা শুধু দেশের রক্ত-মাংস খাচ্ছে না। দেশের মেরুদণ্ড কিভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যায়, সে পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। এটা খুবই দু:খজনক যে, একটা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চল্লিশটা বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। স্বাধীনতা উত্তর ঘটনাবলী নিয়ে এখনো চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ। এখনো দ্বিধাবিভক্ত দেশের মানুষ।

চলছে গণতন্ত্রের ঠিকাদারী। প্রচেষ্টায় লিপ্ত রাজনৈতিক দলের মূলোৎপাটনে। আমরা জানি না_ আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি কি? রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলের মেনোপেষ্টুই বা কেমন হবে কিংবা সে ক্ষেত্রে সরকারের স্বাধীনতা কতভাগ থাকছে? এ রকম কোন লিখিত বা কথিত নীতি ধারণ করছে না কোন রাজনৈতিক দল। আর বুদ্ধিজীবীরাও এ সম্পর্কে দায়সারা সবসময়। রাষ্ট্রে তাদের ভূমিকা কতখানি, সে সম্পর্কে কোন ধারণা আছে বলে তাদের কৃতকর্মে প্রকাশ পায় না।

তারা শুধু জাতি কিংবা রাষ্ট্র কোন প্রকার সংকটে পতিত হলে খানিকটা গলাবাজি, বিবৃতি এবং লোক হাসানো মানবন্ধন করেই দায়িত্ব খালাস করেন। কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক দলের কাছে চুক্তিবদ্ধ। তারা সত্য দেখেও দেখেন না। মিথ্যার বেসাতি তাদের চিন্তার উপর প্রভাব বিস্তার করে চলে। রাষ্ট্রে উন্নয়ন ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের যে মুখ্য ভূমিকা থাকা প্রয়োজন, সেটা তারা বেমালুম ভুলে গেছেন।

দেশের জনগণ আজ চরম উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে। চারিদিকে শুধু নিপীড়ন, হামলা, মামলার আতংক। এক পক্ষ অন্যপক্ষের উপর চড়াও। কণ্ঠ রোধ করার জন্য মরিয়া ক্ষমতাসীন দলের আজ হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত লোপ পাচ্ছে। ১৯৭৪ এর সেই বাকশালী চেতনা যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠছে।

ক্ষমতা কুক্ষিগত করার তাদের সেই মৌলবাদী পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে ওঠছে জাতির সামনে। পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীল নকশা নতুন ভাবে আঁকতে বসেছে তারা। দেশকে জটিল এক সমীকরণের দিকে তারা ঠেলে দিচ্ছে। তারা নিজেরাও জানে না, তাদের এ খেলার পরিধি কিংবা কোথায় গিয়ে তারা থামবে। আর তাদের পরিণতিই বা কী হবে? আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

আমি যখন ভাবি, তখন বুকের ভেতরে কলিজাটা জলন্ত কয়লার আকার ধারণ করে। জিজ্ঞেস করি, দাদা, তুমি কেন শহীদ হয়েছিলে? '৭৪ জন্ম দেওয়ার জন্য? লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধা এবং দারিদ্রের চাপে পিষ্ঠ করার জন্য? নাকি রক্ষীবাহীনী দ্বারা বাক স্বাধীন হারানোর জন্য? দাদা এখন জবাব দিতে পারেন না। আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের ঠিকাদারী দল। তারা টেন্ডারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের গান, ছবি, ইতিহাস কিনে। মুক্তিযোদ্ধা কিনে।

ক্ষমতা পেয়ে তারা আজ দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার কথা ভুলে গেছেন। ফিরে যাচ্ছেন তাদের অতীত অবস্থানে। দেশ ও দেশের মানুষের শান্তি, সমৃদ্ধির কথা ভুলে গিয়ে ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে ব্যস্ত। ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য অতীতেও তারা কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু ব্যর্থ হতে হয়েছে।

এবারও তার পূণরাবৃত্তি হবে বলে আমার বিশ্বাস। আপাত: দৃষ্টিতে এটাই স্পষ্ট যে, তাদের কর্ম-পরিকল্পনা সেদিকেই তাদেরকে ধাবিত করছে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার ক্ষেত্রে যাঁর অমূল্য অবদান, তিনি মাওলানা ভাসানী। কোথায় তিনি আজ? তাঁকে কী মনে রাখতে পারছি? সহজ উত্তর, আমরা পারছি না। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে ওঁনি তার কোন উত্তরাধীকারী রেখে যাননি।

কেননা, তিনি তার পরিবারের জন্য কিংবা সন্তানদের জন্য দেশ স্বাধীন করেননি। বাংলাদেশের কর্মহীন নিপীড়িত মানুষের জন্য তিনি কর্মমূখর স্বাধীন পতাকা চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকে আরো যে ক'জন দেশ প্রেমিককে আমরা দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোভাসা দেখাতে দেখি, তাদের অন্যতম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যারা অপ্রীতিকর মন্তব্য করেন কিংবা বিরুপ কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন; তাদের প্রতি নিভৃতে ঘৃণা জন্মে মনের ভেতর। কারণ জিয়াউর রহমান প্রকৃতই একজন স্বপ্ন দ্রষ্টা।

তিনি বাংলাদেশের মানুষের ভেতর দেশ গড়ার স্বপ্নকে জাগিয়ে তুলে ছিলেন। গ্লানি মুক্তির পথ প্রদর্শন করে ছিলেন। একটা ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে বিশ্বে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করার সাহস দেখিয়ে ছিলেন। দূর্ভিক্ষপীড়িত জনগণের মনে শক্তি সঞ্চয়ের প্রেরণা যোগিয়েছেন। স্বাধীনতা অর্জিত হয় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

কিন্তু আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। সে স্বাধীনতা আমাদেরকে পরিয়েছিল পরাধীনতার জিঞ্জির। বিশ্বের ইতিহাসে আমরা পরিণত হয়ে ছিলাম এক নির্লজ্জ জাতিতে। যে জাতি সাম্য ও মৈত্রীর শ্লোগানে দেশ স্বাধীন করেছিল। সে জাতি কিনা স্বাধীনতার গর্বিত সন্তানদের দিয়েছে চরম প্রবঞ্চনা।

প্রসঙ্গ ক্রমে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু কথা বলতে হয়। জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে যা দিয়েছিলেন জাতিকে, ১৯৭৪ এর দূর্ভিক্ষযুদ্ধ দিয়ে তা মুছে দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রক্ষীবাহিনী দিয়ে দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করার মধ্য দিয়ে। খরার সৃষ্টি করে দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী একটা রাষ্ট্রকে পূণর্গঠনের জন্য যে পরিমান দক্ষতা ও বিচক্ষণতা প্রয়োজন ছিলো, সেটা তিনি দেখাতে পারেননি।

তাঁর কর্মপদ্ধতিতেও সে ধরণের কোন আভাস আমরা দেখতে পাইনি। দেশের মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখাতে পারেননি। তার বিপরীতে তিনি ব্যস্ত ছিলেন বিলাসীতায়। ফলে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, তিনি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে নিজেকে যুক্ত করে ছিলেন, পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত হওয়ার জন্য। মানুষের দু:খ-কষ্টে পীড়িত হয়ে দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করেননি।

জোর করে কারো উপর কারো নাম চাপিয়ে দিলে তিনি বড় হয়ে যান না। বরং তাতে তাঁকে ছোটই করা হয়। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কথা গুলো আমাকে বলতে হয়েছে জাতীর এই ক্রান্তিলগ্নে। প্রসঙ্গক্রমে এবং একান্ত বাধ্য হয়ে। এখন সময় এসেছে, আমাদের নেতাভিত্তিক দলবাজী থেকে বেরিয়ে আসা উচিৎ।

সত্যিকার দেশ প্রেম নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার। আমি জানি, এ কথা গুলো শুধু বিবৃতির জন্যই সাজে। কারণ, দেশের রাজনৈতিক আচরণটা হয়ে দাঁড়িয়েছে শকুনের মত। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যে বসবে, সে থাবা তুলবে একক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। দেশ জুড়ে আজ ক্ষমতা যেন অধিকার হননের হাতিয়ার।

তাবেদারী শক্তি যুলুম, নির্যাতন, নিস্পেষণে দেশের আত্মসামাজিক পরিবেশকে বিশৃংখলার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীন দেশের নাগরিক আজ গৃহহারা। জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত, তারা নির্বিচারে মানুষের নাগরিক অধিকারকে কুক্ষিগত করছে। কারাগারের ঘানি টানছে নিরাপরাধ মানুষ। এ জন্যই কী স্বাধীন হয়েছিল আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ? এটাই কী স্বাধীনতার ফসল? এমন আরো হাজারো প্রশ্নের ফুলঝুরি দেশের আকাশে বাতাসে আজ ঘুরপাক খাচ্ছে।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.