আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ব্ল্যাক

যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার বন্ধ রহে গো কভু দ্বার ভেঙে তুমি এসো মোর প্রাণে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু।
দরোজায় ঠুক ঠুক করে তিনবার হাতের পাখাটা দিয়ে বাড়ি দিলেন, সামিহা। একটু পরে আব্দুর রশিদ এগিয়ে এলেন, দরোজা পুরোটাই বন্ধ ছিল। সেটাকে কোনরকমে সামান্য ফাঁক করে ;জানতে চাইলেন, তাকে কেন ডাকা হয়েছ? সামিহা নিঃশব্দে মিষ্টির বাটিটা এগিয়ে দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রশিদের বাসায় অতিথি এসেছে।

পুরুষ অভ্যাগতদের আদর-আপ্যায়ন চলছে বৈঠক ঘরে। সামিহা অন্দরে বসে তার তদারকি করছেন। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে, তিনি দরোজায় বাড়ি দিচ্ছেন। রশিদ সাহেব সেটা শুনে এগিয়ে আসছেন। অভ্যাগতদের স্ত্রীরা খানাপিনা করছেন, অন্দরে।

সবাই হৈ চৈ করছেন। এখানে আর কেউ সামিহার মত নেই। সবাই পোশাকে পারিপাটি কিন্তু কেউ বোরখা পরে নেই। এই গরমে সামিহা তার নিজের ঘরেও বোরখা পরে আছেন। শুধু কালো নেকাবটা তিনি এখন লাগাননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সামিহার জীবনটা শুরুতে এমন ছিল না। তিনি বাম ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। হলে দু একবার নাটকও করেছেন, ক'জন বান্ধবী মিলে। তিনি বিতর্ক করতেন, আবৃত্তি করতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তিনি প্রথমশ্রেনী লাভ করেছেন।

তার মানে এই নয় যে, তিনি ধর্মবিমুখ ছিলেন। তিনি খুব মেধাবী ছিলেন কিন্তু পরিবারের প্রতি ছিল তার দারুণ আস্থা। পড়ালেখার পাঠ চুকোবার আগেই বাবা বিয়ে দিয়ে দিলেন, মেধাবী তরুণ শিক্ষক আব্দুর রশিদের সাথে। সামিহা বাবার সিদ্ধান্তে দ্বিমত করেননি। তিনি জানতেন, আব্দুর রশিদ বেশ ধর্মপরায়ন কিন্তু কতখানি তা টের পেয়েছেন বিয়ের পরপরই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে থাকেন, আব্দুর রশিদ। নতুন দম্পত্তি হিসেবে রাতে ওঁদের দাওয়াত করলেন, উপরের তলার রায়হান সাহেব। দাওয়াতে যাবার জন্য সামিহা সামান্য প্রসাধন নিয়েছিলেন। সাথে কিছু গহনা পরেছিলেন। হাজার হলেও নববিবাহিত।

মাথায় বড় ঘোমটা থাকা সত্বেও আব্দুর রশিদ বেশ রাগ করেছিলেন। "এভাবে তো তোমাকে আমি দাওয়াতে নিতে পারবো না। যাও কালো বোরখাটা পরে এসো। " সেই শুরু। এখন সামিহা মাশাল্লাহ সামলিয়ে উঠেছেন সব।

তিনি আল্লাহর পথে এসেছেন। না বুদ্ধিমান সামিহাকে, আব্দুর রশিদের জোর করেতে হয়নি। সামিহা জানেন, দুনিয়াতে এত লোভ না করে, দুরাকআ'ত নামাজ পড়লে আখেরাতে সাড়ে সাতহাজার তলা ইমারত পাওয়া যাবে। তিনি নিয়মিত নামায রোজা করেন। নামায কা'জা হবে জেনে তিনি এখন সাধারণত কোথাও বের হন না।

বেড়াতে ইচ্ছা হলে, মাসের বিশেষ দিনগুলোতে বের হন। প্রিয় কবিতার বইগুলো পেপার ওয়ালার কাছে সের দরে বিক্রী করে দিয়েছেন, বিয়ের পরপরই। টিভি দেখেন না। নাটক সিনেমা দেখে পাপের ভাগ আর বাড়াতে চাননা। রশিদের সাহেবের ল্যাপটপ আছে।

সেখানে তিনি নিজের কাজ করেন। মাঝে মধ্যে পেপারটেপার পড়েন কিন্তু সামিহার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করা নিষেধ। ওটা ধর্ম পরিপন্থী। স্বামীর সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেও সামিহা তার জীবনের কিছু দূর্ভোগ এড়াতে পারেননি। সামিহা জানেন, তার বিয়ের আগের জীবনে নিশ্চই কোন পাপ করেছেন, নইলে আল্লাহ তার উপর এত নাখোশ হবেন কেন? বিয়ের পাঁচ বছর হতে চল্লো, অথচ তাদের কোন সন্তন নেই।

একটা সন্তানের জন্য সামিহার বুকে তীব্র হাহাকার। আপা এ মাসে ডক্টরের কাছে গিয়েছিলেন? মালিহার মা খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলেন। জ্বী আপা। ডক্টর কি বল্লো? জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ দুজনেরই কোন সমস্যা নেই। কিন্তু কেন যে কনসিভ করছি না।

সেটা ডক্টর বুঝতে পারছেন না। মন খারাপ করবেন না আপা। এরকম অনেকেরই হয়,- " আমার এক খালাতো ভাইয়ের ঘরেও এই অবস্থা আপা-ভাবি যে কত চেষ্টা করছেন---" গল্প চলতেই থাকে। এরকম গল্প সামিহা দিনে অসংখ্য বার শোনেন। এ বিষয়ে শ্বান্তনা দেবার মত লোকের অভাব নেই।

মিলা বল্লেন, "আপা একবার দেশের বাইরে যান না কেন?" জ্বী আপা, ও একবার থাইল্যান্ডের একটা হসপিটালে খোঁজ নিয়েছিল- সেখানে গাইনোকলোজির কোর মহিলা ডক্টর নেই। " ও বলে দিয়েছে, আমাদের সন্তান না হলে না হবে, কিন্তু আপা জেনেশুনে তো আর পুরুষ ডক্টরের চিকিৎসা নেওয়া যায় না। " রশিদ সাহেবের মৃদু ডাক এবং দরোজায় টোকা শুনে সামিহা উঠে যান। সালাদের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে আসেন। এগিয়ে দুষ্টুমীরত বারী সাহেবের বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই বাচ্চাটা চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে।

মিসেস বারী দ্রুত এগিয়ে এসে এঁটো হাতেই ছেলেকে উদ্ধার করেন। আপা কিছু মনে করবেন না, ও বোরখা পড়া কাউকে দেখলে ভয় পায়। কালো পোশাকে আপনাকেও বড্ড অদ্ভুত লাগে। সামিহার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। জগতের সমস্ত কালো থেকে বাঁচার জন্য তিনি যে কালো পোশাকে নিজেকে আবৃত করেছেন, তা দেখে বাচ্চারাও ভয় পায়।

সামিহার আজকাল কেমন যেন ক্লান্ত লাগে। মাঝে মধ্যে প্রাণ খুলে একটু আনন্দ করতে ইচ্ছা করে। গলা খুলে গান গাইতে ইচ্ছা করে। সামিহা একটা স্বপ্ন দেখেন, তার একটা ছেলে হলে, তাকে তিনে পাইলট বানাবেন। তার অনেক উঁচুতে উঠে তারা ভরা রাতে পৃথিবীটাকে দেখবার খুব শখ।

কিন্তু আব্দুর রশিদ সামিহার স্বপ্নের কথা জানেন না, তবু তিনি একটা ছেলের আকাংখা শুনে, সামিহাকে বলেছেন, ছেলে হলে তিনি তার মত প্রকৌশলী করবেন কিন্তু তার পাশাপাশি তাকে কুরানে হাফেজ করে তুলবেন। তার ইচ্ছা তার একটা সন্তান পুরোপুরি আল্লাহর রাস্তায় যাবে। সামিহা যখন কালো বোরখা, কালো নেকাব, কালো হাত মোজা এবং পা মোজা পরে বাইরে বের হন, তখন তিনি শুধুই ভাবেন... তিনি একটা কালো সমুদ্র পার হচ্ছেন। যে সমুদ্রে তিনি শুধু শুধুই একটা বাতিঘর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। চারিদিকটা তার কেমন অন্ধাকার লাগে।

আমার ব্লগীয় জীবনে এই প্রথম মাইনাস প্রাপ্তি। গল্প কারো ভালো নাই লাগতে পারে। তবে মাইনাস দেবার আরেকটা কারণ হতে পারে যে, আমি মহিলাদের পর্দা করা নিয়ে কথা বলে ফেলেছি। আসলে এখনও এই সময়ে এত লোক চান যে, মহিলারা এভাবেই থাকুন, আমার জানা ছিল না। কেউ মাইনাস দিলে, কারণ টা জানিয়ে প্রকাশ্যে দিন।

সেটা নিয়েও আমি ভাববো। এটলীষ্ট আমার লেখার ত্রুটিগুলো সারিয়ে তুলতে পারবো। "
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.