আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ওপেন সোর্স, কপিরাইট, পাইরেসি এবং নানা রকম বিভ্রান্তি-১

অলসদের দিয়ে কী আর হয়। আলসেমি ছাড়া!

[কিছুদিন ধরে আমাদের দেশ মেধাস্বত্ত্ব, কপিরাইট, পাইরেসি নিয়ে বেশ ভাল আলাপ আলোচনা হচ্ছে। অনেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছে আমার মতামত। আমার মতামতটা যেহেতু সবাই জানে সেহেতু এটা নতুন করে বলার আমি কোন কারণ দেখি নাই। কিন্তু কাল রাতে টেলিভিশনে বলা হলো ট্রিপস-এর আওতায় ২০১৩ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত সফটওয়্যারের কপিরাইটের ছাড়ের ব্যাপারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর যে ছাড় আছে সেটি নাকি আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়- এটা শোনার পর মনে হল ব্যাপারগুলো খোলাসা করার দরকার।

কয়েকটা এপিসোডে আমি আমার কথাগুলো বলার চেষ্টা করবো। এখানে আমার একটি পুরোনো লেখা দিচ্ছি। কারণ আমার আলোচনায় এই বিষয়গুলো বারবার আসবে। এই লেখাটি সমকালে আর আমাদের প্রযুক্তি ফোরামে ছাপা হয়েছিল। এই লেখার শেষে আমি আমার আরো দুইটি লেখার লিংক দিয়েছি যাতে আমার মূল ভাবনাগুলো আমার পাঠকরা বুঝতে পারেন।

তিনটি নিবন্ধই আমার 'ওপেন সোর্স ও আমাদের ভবিষ্যত' বইতে স্থান পেয়েছে। এর পর আমি বর্তমান বিতর্ক আর বিভ্রান্তিতে আসবো। ] -------------------------------------------- মেধাস্বত্ত্ব সংরক্ষণ - আমাদের করণীয় কী হবে? ওরা আমাদের জমির জন্য এসেছিল, এসেছিল জমিতে যে শস্য উৎপন্ন হয় বা হতে পারে তার সম্পদ দখলে নিতে আর আমাদের মুক্ত হাওয়া আর বিশুদ্ধ পানির জন্য। ওরা আমাদের এই সকল সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে, ছিনিয়ে নিয়েছে আমাদের স্বাধীনতাকেও। আর আমাদের সূর্যসন্তানদের জীবন দিতে হয়েছে হয় যুদ্ধের ময়দানে অথবা গুপ্তঘাতকের হাতে।

আর সবকিছু শেষে ওরা আবার ফিরে এসেছে - আমাদের শেষ অবলম্বনটুকু ছিনিয়ে নিতে। এখন ওরা আমাদের গর্ব, আমাদের ইতিহাস নতুন করে, তাদের মতো করে লিখতে চায়। যেন ওরা দাবী করতে পারে যে, এইগুলো তাদেরই। এভাবে মিথ্যা ও লুন্ঠন চলে আসছে, থামছে না। - আদিবাসীদের একটি গান থেকে।

বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। আরো বাড়বে বলে শুনেছি। জ্বালানি তেলের দাম এমনটি বেড়েছিল ১৯৭৩ সালে। সেবার আরবদের হাতে নাকানি খেয়ে আমেরিকার সিনেট একটা কমিটি গঠন করে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমেরিকার সংকট হতে পারে এমন বিষয় চিহ্নিত করার। তারা বললো - “তথ্য এবং যোগাযোগ” হবে নতুন ক্ষেত্র।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফোর্ড সাহেব একটা জাতীয় টাস্ক ফোর্সও গঠন করে ফেললেন। টাস্ক ফোর্স বললো নতুন সম্পত্তি বানাতে হবে। সুপারিশ দেওয়া হলো -স্বত্ত্ব বলতে লোকে জমি বা দালান বোঝে, সেখান থেকে এটিকে সম্প্রসারিত করতে হবে তথ্যপ্রযুক্তির সকল ক্ষেত্রে, যাতে টিকে থাকে আমেরিকার একাধিপত্য। কিন্তু মাঠে তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। কাজেই মার্কিনীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তারপর এলেন গর্ভাচেভ। আর বিশ্ব হলো এক মেরুর। শুরু হলো বিশ্বকে বাণিজ্যকরণের নানা উদ্যোগ। উরুগুয়ে রাউন্ড আলোচনায় হলো জিএটিটি (GATT)। গঠিত হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)।

হলো দি এগ্রিমেন্টস অন ট্রেড রিলেটেড ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টিজ (ট্রিপস)। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ওপর দায়িত্ব পড়লো সারা বিশ্বে আমেরিকার তথা উত্তরের দেশগুলোর হয়ে মাস্তানী করা, দক্ষিণের দেশগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগে তাদের জাতীয় নীতিমালাগুলোকে ‘যথাযথ’, ‘বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ করার। এর আগে পর্যন্ত কপিরাইটের ব্যাপারগুলো ছিল নেহায়েৎ নিজ নিজ দেশের। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বললো ‘এসো আমরা এগুলোকে একই সুর আর লয়ে সুরারোপিত করে দেই’। দক্ষিণের দেশগুলোতে নানাভাবে ওয়াইপো আর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা তাদের খেলা শুরু করে দিল।

দেশে দেশে হয় কপিরাইট আইন সংশোধন করা হলো অথবা নতুন করে প্রনয়ণ করা হল। তথ্যপ্রযুক্তির সকল অংশ থেকে শুরু করে তথ্যের প্রবেশাধিকারকেও করা হলো এই আইনের অধীন। কোন কোন দেশে পুলিশের সেপাইদেরকে এই আইনের রক্ষক করা হল। এইগুলো করার জন্য পশ্চিমারা ব্যবহার করলো তাদের চিরন্তন অস্ত্র - মেরুন রঙ্গের জ্যাকেট, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য সুবিধা। বাংলাদেশেও কপিরাইট আইন সংশোধন হয়ে গেল, সবার অজান্তে একবার ২০০০ সালে আর একবার ২০০৫ সালে।

মাত্র কয়েকমাস আগে আমাদের ট্রেডমার্ক আইনও ওদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সংশোধিত হয়ে গেছে! কপিরাইট ও সৃজনশীলতা কপিরাইটের মূল কথা হলো - সরাসরি আর্থিক প্রনোদনা না থাকলে উদ্ভাবকরা কোন কিছু উদ্ভাবন করবেন না -- শিল্পী আর গায়কেরা ঘুমিয়ে থাকবেন, লেখকরা তাদের কলম নামিয়ে রাখবেন, এবং সব ধরণের সৃজনশীলতা বন্ধ হয়ে যাবে। কপিরাইট আসলে এভাবে‌ সকল সৃষ্টকর্মের জন্য আর্থিক প্রনোদনাকে সংশ্লিষ্ট করেছে। এখন কেহ যদি বলে লালনের গানের অনুপ্রেরণা আসলে টাকা তাহলে তাকে কী বলা যাবে? রবীন্দ্রণাথ বা শেক্সপিয়রের বেলায়! আবার সারা বিশ্বের কপিরাইট আইনের মূল যে, বার্ণ কনভেনশন সেখানে বলা হয়েছে মৃত্যুর পর ৫০ বছর পর্যণ্ত কপিরাইট বহাল থাকবে। বটে, যে লোকটা বেঁচে নেই, আমার অর্থ তার সৃজনশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ভালো যুক্তি! কপিরাইট ওয়ালাদের ভাব দেখে মনে হয় মহৎ উদ্দেশ্য।

আসলে এই আবরণে শিল্পী ও লেখকের সঙ্গে রেকর্ড কোম্পানী বা প্রকাশকেকে গুলিয়ে ফেলা হয় যাতে লোকে ব্যাপারটাকে মহৎ ভাবে। কখনো দেখেছেন কবির কবিতার কপিরাইট নিয়ে কেও উচ্চবাক্য করছে। আমাদের দেশেও মোবাইলের রিংটোনের আগে কেহ এ বিষয়ে কিছু বলেছে? আসলে এ হলো কোম্পানীগুলোর টাকা কামায়ের একটা ফিকির। ১৯৯৮ সালে আমেরিকা তাদের মেধাস্বত্ত্ব আইনে কপিরাইটের মেয়াদ ৫০ বছরের জায়গায় বাড়িয়ে ৭০ বছর করে। কারণ ২০০৩ সালে মিকি মাউস পাবলিক ডোমেনে চলে আসতো।

পাবলিক ডোমেন মানে হলো এখনকার বিষয়বস্তু সারা পৃথিবীর মানুষের সম্পত্তি। যেমন রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়রের সৃষ্টকর্ম। মিকি মাউসও সেভাবে সবার অধিকারে চলে আসতো। কিন্তু নতুন আইনে এর মেয়াদ আরো ২০ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয় যার ফল পাবে কেবল ওয়ার্ল্ড ডিজনী কর্পোরেশন, মিকি মাউসের প্রণেতা একটাকাও পাবে না। কতো সহজেই না এটি হয়েছে।

কারণ এর আগের বছরে ওরা বিভিন্ন ফোরামে মাত্র ৬ মিলিয়ন ডলার চাদা দিয়েছিল! কপিরাইটের একটা বড়ো দুর্বলতা হলো এটি একটি কর্মের শেষজনকে চিহ্নিত করে মাত্র। আমাদের জাতীয় সংগীত, আমার সোনার বাংলা। এর সুর করার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়ার বাউল গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গানের সুর দ্বারা প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এখন আমার সোনার বাংলার সুরের কপিরাইট কী কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হওয়া উচিৎ? যেকোন সৃজনশীল কর্মের প্রেরণা হলো সৃষ্টির আনন্দ, সৃষ্টির নেশা। সৃষ্টির আনন্দ কী টাকা দিয়ে মাপা যায়? [অনেকে কপিরাইট আর লাইসেন্সের ব্যাপারটাকে গুলিয়ে ফেলেন।

এই বিষয়টি আলাদাভাবে আলাপ করবো। ] মুক্ত বাণিজ্য, মুক্ত লুন্ঠন আমরা আবার বিশ্ব কপিরাইট ইস্যুতে যাই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় গরীব দেশগুলোর সম্মিলিত স্বরে মার্কিনীরা তাদের সুর পাল্টালো। ব্রিটিশদের কাছ থেকে শেখা ডিভাইড এন্ড রুল নিয়ম নিয়ে তারা হাজির হলো এই মাঠে। দেরী হচ্ছে এই ধুয়া তুলে শুরু হলো দ্বি বা বহুপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ট্রিপস‍+)।

ট্রিপস‌-এ ২০১৩ সাল পর্যন্ত সফটওয়্যার ও ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফার্মাসিউটিক্যাল পন্যের কপিরাইটের ব্যাপারে স্বল্প উন্নত দেশগুলোকে কিছুটা ছাড় দেওয়া আছে। এখন আমেরিকা সহ উত্তরের রাজারা দক্ষিণের প্রজাদের সঙ্গে দ্বি‌-বা বহুপক্ষীয় ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ করছে। এখানে কপিরাইটের ব্যাপারে বেশ কড়াকড়ি করা হচ্ছে। কারণটা কী? সহজ। কপিরাইট বাণিজ্যে মার্কিনীদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য।

১৯৯৯ সালে কপিরাইট গুণে অন্যান্য দেশ থেকে আমেরিকার আয় করেছে ৩৬.৫ বিলিয়ন ডলার কিন্তু অন্য দেশগুলোকে দিয়েছে মাত্র ১৩.৩ বিলিয়ন ডলার। ১৯৯১ সালে সফটওয়্যারের লাইসেন্স ফী বাবদ ওদের আয় ছিল ১৯.৬৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬০.৭৪ বিলিয়ন ডলার। কাজেই এই সোনার হাসকে তো তারা বড়ো করতে চাইবেই! মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির একটা অংশ হলো ওদের ডিজিটাল মিডিয়া কপিরাইট এক্ট - ডিএমসিএ। এতে কপিরাইট প্রটেকশনের নামে নানান ধরণের কারিগরী উৎপাত যোগ করাকে জায়েজ করা হয়েছে।

এর ফলে তথ্যের প্রবেশাধিকার অনেকখানি সংকুচিত হয়ে যায়। শেষের আগে ধনীর কাছ থেকে গরীবের চুরি নিশ্চয় পাপ, কিন্তু ধনীরা যখন গরীবের থেকে চুরি করে তখন কী সেটা মহাপাপ নয়? আমাদের মতো গরীব দেশগুলোর ধণীদের তথাকথিত মেধাসম্পদ নেওয়া যদি চুরির মতো অপরাধ হয়, তাহলে আমেরিকার মতো ধনী দেশগুলো যে আমাদের দেশের মেধাবীদের চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে সেটা কি ঘৃন্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না? আমরা যখন ‘চুরি’ করি, তখন কেবল তার একটা কপি ‘চুরি’ করি, আসলটা সেখানে রেখে আসি। কিন্তু ওরা যখন চুরি করে তখন তারা আমাদের জন্য কিছুই রেখে যায় না! ----------------- দিল্লী হাইকোর্টে হ্যারি পটারের পরাজয় নিয়ে লেখা। ----------- আর্জেন্টিনার প্রফেসরের মামলা। লিখেছিলাম জ্ঞানের মালিকানা কার এই শিরোনামে।

------------------- পরের এপিসোডে লিখবো বাংলাদেশের কথাকথিত পাইরেসি পরিস্থিতি নিয়ে। সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।