আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অপরাধ বেড়ে চলেছে শীগ্রই কন্ট্রোলিং প্রয়োজন।

ফুলের সৌরভে সুরভিত কলমের কণ্ঠস্বর

কলমীকণ্ঠ ডেস্কঃ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। লাশ পাওয়া যাচ্ছে যেখানে-সেখানে। পুলিশের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘গুপ্তহত্যা’ উল্লেখ করে তা অবিলম্বে বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে বলেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, কোনো বাহিনী এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে তা তদন্ত করা উচিত। দুই দিনব্যাপী এ সভা গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তর মিলনায়তনে শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশ সুপাররা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক আইজিপি এএসএম শাহজাহান বলেন, যদি সত্যিকারেই কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক এটা করে থাকে, তবে তা গুরুতর অপরাধ। এটা হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়ংকর অপরাধ। এর সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সারা দেশের পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে সব অতিরিক্ত ডিআইজি, ডিআইজি, ছয় মহানগর পুলিশের কমিশনাররা, পুলিশ সদর দপ্তরের সব এআইজি, ডিআইজি, অ্যাডিশনাল আইজি, এসবি, সিআইডি ও র‌্যাবের প্রধান উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম দিনের আলোচনার শুরুতেই সারা দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এরপর পুলিশ বাহিনীর বার্ষিক বাজেট ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। আজ সকালে প্রথম অধিবেশনে পুলিশ সুপাররা মাঠপর্যায়ে তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা জানাবেন। এরপর নতুন করে ৩২ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগের অগ্রগতি ও বিশেষ শাখার কাজের অগ্রগতি জানানো হবে। সিআইডির পক্ষ থেকে বিভিন্ন মামলার তদন্তে তিন মাসের অগ্রগতি উপস্থাপন করা হবে।

সভায় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা বলেন, গতকালের সভায় সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে গুপ্তহত্যার প্রসঙ্গ আসে। একজন কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়টি চরম আকার ধারণ করেছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো এক বাহিনীর নাম করে লোকজনকে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এরপর লাশ পাওয়া যাচ্ছে যেখানে-সেখানে।

এভাবে চলতে থাকলে সন্ত্রাসীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়বে। আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, এ পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক, এতে কেউই নিরাপদ থাকবে না। একজন কর্মকর্তা ইন্দিরা রোডের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনায় একটি বাহিনীর নাম করে এক যুবককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁর লাশ পাওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি নিজে এটা তদন্ত করে দেখেন, যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে একটি বাহিনীর এক কর্মকর্তা ওই যুবকের বোনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

এ বক্তব্য শুনে পুলিশের আইজি তাঁকে এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন দিতে বলেন। আরেক কর্মকর্তা বলেন, সভায় গুপ্তহত্যার ব্যাপারেই দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। বেশির ভাগ কর্মকর্তা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার কথা বলেন। তাঁরা বলেন, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের হত্যার শিকার লোকদের লাশ পাওয়া গেছে। ‘ক্রসফায়ারের’ মতো ঘটনারও তদন্ত করে আইনগতভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।

কিন্তু গুপ্তহত্যার ঘটনার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত ২৭ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে নদীর পারে বালু খুঁড়ে তিন যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগের দিন পল্লবী থেকে ঝুট ব্যবসায়ী শহিদুল্লাহর লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত ১৮ এপ্রিল গাজীপুরে পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাসী নুরুল আমিন মাকসুদের লাশ। সভায় আলোচনার ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, কেউ এটা করে থাকলে আইন অনুযায়ী তার তদন্ত হওয়া উচিত। যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটতে পারে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে হারে গুপ্তহত্যা ঘটছে, অজ্ঞাত লাশ পাওয়া যাচ্ছে, কারা কার হাতে কীভাবে নিহত হলেন, তাও জানা যাচ্ছে না। এটা খুবই উদ্বেগজনক।

’ অন্য প্রসঙ্গ: সভার সূত্র জানায়, কয়েকজন পুলিশ সুপার মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা নিয়েও আলোচনা করেন। বলা হয়, বখাটের উপদ্রবের কারণে কিশোরী-তরুণীরা আত্মহত্যা করছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক। পুলিশ সুপাররা এটা বন্ধ করার কথা বলেন। আইজিপি পুলিশ সুপারদের বলেন, এ ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, আগামী সাত দিনের মধ্যে পুলিশ সুপারদের কাছে তার দিকনির্দেশনা পাঠানো হবে।

সবাইকে সেটা মেনে চলার নির্দেশ দেন তিনি। সূত্র জানায়, সভায় টেন্ডার-সন্ত্রাস নিয়েও আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, টেন্ডার বাক্সগুলো শুধু নির্ধারিত কার্যালয়ে না রেখে থানা বা জেলা পুলিশের কার্যালয়ে রাখতে হবে, যাতে করে কেউ বাক্স দখল করতে না পারে। সভায় সাইবার অপরাধ নিয়ে একজন কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধ বন্ধ করার পদক্ষেপ হিসেবে বিটিআরসিকে কিছু আপত্তিকর ওয়েবসাইট বন্ধ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এক মাস পর আবার সেসব অশ্লীল সাইট চালু হয়ে গেছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, আদালতের নির্দেশে দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে, আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হলেও আদালত সেটাকে হত্যা মামলা হিসেবে দায়ের করার আদেশ দিচ্ছেন। এতে করে হত্যা মামলার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। জেলা পুলিশের এক সুপার অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর তাঁদের কাজের সমস্যা হচ্ছে। এখন তদন্ত করার আগেই জেলা আদালতগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ামাত্র মামলা নিচ্ছেন।

ওই কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠির একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। আরেকজন পুলিশ সুপার বলেন, অনেক জেলা জজ তাঁদের জন্য সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাকর্মী চান। কিন্তু পুলিশের পক্ষে এভাবে নিরাপত্তা দেওয়া কঠিন। সভায় পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্কোন্নয়নের পরামর্শ দেন। পরিসংখ্যান: সভায় গত তিন মাসে সারা দেশের অপরাধ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়।

এতে বলা হয়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশের সবগুলো থানায় ৩৭ হাজার ৭৯২টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে ১২ হাজার ৫৯৭টি অপরাধ রেকর্ড করা হয়েছে (দিনে ৪২০টি করে)। এই সংখ্যা ২০০৯ সালের প্রথম তিন মাসের তুলনায় বেশি। ওই তিন মাসে সারা দেশে ৩৬ হাজার ৯০৪টি অপরাধ রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে গত বছরের শেষের তিন মাসের তুলনায় এ সংখ্যা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরাধ পরিসংখ্যানে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে ২৮টি ডাকাতি, ২৪০টি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় খুন হয়েছে ৯৬৯টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক খুনের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি, চাঁদা আদায়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৪, ছিনতাই ২৪৪, দরপত্রে বাধা দেওয়ার ঘটনা পাঁচটি এবং দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি। তিন মাসে দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তিন হাজার সাতটি, শিশু নির্যাতনের ঘটনা ৩২৪টি। এ সময় ৬৩৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া ১৮০টি অপহরণ হয়েছে। তিন মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ছিল ১০৫টি, চুরির ঘটনা ছিল দুই হাজার ১০৭। সভায় শুধু মার্চের সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, এ সময় দেশের সড়ক-মহাসড়কে ২৫০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ২১১ জন নিহত হয়েছেন।

গুরুতর আহত হয়েছেন ১৯৭ জন। বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে বাসের নিচে চাপা পড়ে। এক মাসেই ৯৮টি বাস-দুর্ঘটনা ঘটেছে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.