আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

একাত্তর : লাল খুন নিয়ে কালো রাজনীতি

এই ব্লগটি নোমান বিন আরমান'র দায়িত্বে প্রবর্তিত। এখানে মাঝেমধ্যে তিনি আসেন। numanbinarmanbd@gmail.com

ডিসেম্বর সংখ্যার জন্য লিখছি বিজয় দিবস নিয়ে লিখবো না। মুক্তিযুদ্ধের রক্তকথা বলবো না এ নিশ্চয় অপরাধ। কিন্তু বিশেষ দিবসটিবস নিয়ে ভাবগম্ভীর রচনা আমাকে দিয়ে হয় না।

আমি এসবে স্বচ্ছন্দ নই। কখনো এইসব নিয়ে লিখেছি বলেও মনে করতে পারি না। তাই বলে একেবারেই যে লিখিনি তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ছিটেফোঁটা লিখেছি হয়তো। এটি আরেকটি ফোঁটা_ ধরে নিতে পারেন।

রক্ত, ইজ্জত আর প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জন হয়েছিলো তার আটতিরিশ বছর চলছে। ১৬ ডিসেম্বরের পর নতুন আরেক বছরের হিশেব হবে। উনচল্লিশে প্রবেশ করবে স্বাধীনতা অর্জনের বছর। প্রশ্ন হলো, যে স্বপ্ন স্বাদ নিয়ে বাঙালি লড়েছিলো, জীবন দিয়েছিলো ৭১-এ তার প্রাপ্তি কী বা কতটুকু। উনচল্লিশ বছর মোটেও কম সময় নয়।

এক জীবনের অর্ধেক। এই অর্ধেক বয়েসে এসে যদি কানে বাজে ‘তিরিশ বছর পরও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি....। তখন বলার আর কী থাকে। আটতিরিশ বছরেও যদি পূর্ণতার নাগাল না পাওয়া যায়, স্বপ্ন, স্বাদ অপূর্ণ রয়, তখন তার জন্য দুঃখ করে লাভ কী। তখন তো মনে হয়তে পারে, `আমি ঘুমে ছিলাম ভালো ছিলাম...'।

এই সময়ে বাংলাদেশকে তুলনা যদি করা হয় আশপাশের কোনো রাষ্ট্রের সাথে তখন এর অবস্থান নিতান্তই করুণা করার মতোন হবে। আর এই করুণা নিয়ে বাংলাদেশ আটতিরিশ যাপন করে উনচল্লিশে পা রাখছে। এই আটতিরিশ বছরে অনেক স্বপ্নআশার বুলি মানুষকে শোনানো হয়েছে। কথার রাজনীতি চলেছে। কিন্তু ভুল করেও দেশকে এগিয়ে নেয়ার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

ফলে যেটি হয়েছে, অপার সম্ভাবনার জনসংখ্যার দেশ এখনো পরনির্ভর রাষ্ট্র। এখনো সে তৃতিয়বিশ্বের বাসিন্দা। বিদেশী প্রভুদের মনোতুষ্টিই এ রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভিত্তি। তাদের ইচ্ছেই সিদ্ধান্ত। তাদের ঈঙ্গিতই আইন।

তাদের করুণাই এ রাষ্ট্রের জীবন। তখন তো যে কেউ উচ্চকণ্ঠে স্বাধীনতাটকে খুঁজতেই পারে। ২২ বছর মালেশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন একজন, এক মাহাতির। এই একজন মাত্র ২২ বছরে আকাশ সমান উচ্চতায় নিয়ে গেছেন মালেশিয়াকে। এখন ওখানে যেতে পারলেই অনেকে ধন্য।

এই দেশ যখন আমার রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভিসা বাতিল করে তখন চোখে আঁধার দেখে আটতিরিশ বছর বয়সী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। কেনো এই অবস্থা। ২২ বছরে মালেশিয়া যা পেরেছে আটতিরিশ বছরে কেনো এই রাষ্ট্র তা পারেনি। অপার সম্ভবনাকে কেনো কাজে লাগাতে পারেনি। কেনো পারেনি দেশকে এগিয়ে নিতে, এইসব প্রশ্ন করা যাবে।

কিন্তু উত্তর দেবে কে? তখন তো একজন ঘুমকেই ভালো বলতে পারে। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছি শুধু একটি রাষ্ট্র, মাণচিত্র আর পতাকার জন্য? না, শুধু এই তিনটি প্রাপ্তির জন্য ‘তিরিশ লক্ষ্য’ প্রাণ শহীদ হয়নি। এই তিনটি প্রাপ্তির জন্য রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়নি নিরস্ত্র বাঙালি। তাদের আকাক্সক্ষা ছিলো আকাশ সমান। স্বপ্ন ছিলো সত্যিকারে একটি রাষ্ট্রের, শোষণবঞ্চনামুক্ত ইনসাফসময়ের, নিরুপদ্রব জীবনের।

কিন্তু আমরা পারিনি _ এখনো সে স্বপ্ন আর আকাক্সক্ষার রূপায়ণ করতে। এখনো সম্মান করতে পারিনি রক্তস্নাত তিরিশ লক্ষ জীবনের। উল্টো একে নিয়ে রাজনীতি হয়েছে ভীষণ রকমের। ভঙ্কর সব রাজীতি। যখনই যে ক্ষমতার চেয়ারটা পেয়েছে, সে ইচ্ছে মতো এই রক্ত ইজ্জত আর প্রাণ নিয়ে খেলা করেছে।

দেশ গড়ার কাজ রেখে আখের গুছিয়েছে নিজের। শূন্য থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে। কিন্তু হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যের কোনো `দুর্ভাগ্য' হয়নি। যেমন ছিলো তেমনই রয়েছে তারা। ক্রমে আরো বেশি দরিদ্রভাগ্য হয়েছে তাদের।

ক্রমে ক্রমে আরো বেশি বঞ্চিত আরো বেশি শোষিত হয়েছে তারা। তবু বারবার অনেকের কথায় বিশ্বস করেছে। বারবার প্রতারিত হচ্ছে। ০ দুই ০ মুক্তিযুদ্ধের এই রক্তিম আর বিষাদ চেতনাকে পণ্য করা হয়েছে এখন। বাজারি পণ্য, মাঠেরও।

এই চেতনা নিয়ে মাঠগরম করা হচ্ছে। যে মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্মই নেয়নি তাকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে ভাবা হচ্ছে, আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী অনেকে মুক্তিযুদ্ধের লেবাস পরে পুরো চেতনা আর অর্জনকেই কলঙ্কিত করছে। অতি উৎসাহীদের বাড়াবাড়ির কারণে আমাদের এই রক্ত আর ইজ্জতের অর্জনকে বাজারি পণ্য করা হয়েছে। একাত্তর, দেশ আর মাণচিত্র নিয়ে দেদার ব্যবসা চলছে।

দোকানে দোকানে বিক্রি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনা ব্যবসাটা _ রাজনীতি, থিয়েটার, শপিংমল সবখানেই সরগরম। সবখানেই `ব্যবসা সফল' পণ্য। এ নিয়ে রাষ্ট্র কিছু ভাবে না। দেখেও দেখে না।

কিচ্ছু বলে না আদালত। আশ্চর্য নীরব সবার বিবেক। এই সেদিন সিলেট প্রেসক্লাবে একই খেলা দেখলাম। চেতনা ব্যবসার খবর শুনলাম। একসাথে যে সাংবাদিকরা একে অন্যকে নেতা মেনে কাজ করছেন দীর্ঘদিন, মহান সেই সাংবাদকরা পাকিস্তান দূতাবাসের কম্পিউটার নেয়াকে কেন্দ্র করে চেতনা ব্যবসায় নামলেন।

তাও আনুষ্ঠানিক আবেদন করে কম্পিউটার নেয়ার পাঁচ মাস পর! কারণ (অনেকে বলেন) রুটিতে নাকি লবণ কম পড়েছে। তাই হাতের কাছেই পেয়ে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নিজের রক্তের না হলেও কি হবে, বাপদাদার অর্জন তো_ আকড়ে ধরলেন একে। তাদের এই হঠাৎ চেতনায় অনেকে বিস্মিত। কিন্তু আমি মনে করি, বিস্মিত হবার এখানে কছু নেই। এটিই এখন আমাদের জাতীয় মানস।

যখনই ইস্যুর প্রয়োজন হয় তখন কাকচোখে একে অস্ত্র করি। চেতনার ক্যাসেট খুলি। ০ তিন ০ কিন্তু এভাবে কতোদিন। আটতিরিশ বছর চুপ থাকা যায়। উনচল্লিশেও হয়তো।

চল্লিশেও কি বিবেক কথা বলবে না। ঝংকৃত হবে না জুলমু, শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধ উচ্চকণ্ঠ একাত্তরের সেই দিনগুলো?

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।