আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাঙ্গালী মুসলমানদের মননের অধোগতি এবং এ বিষয়ে আমার উপলব্ধি----------শেষ পর্ব

সবকিছুই চুকিয়ে গেছে গালিব! বাকি আছে শুধু মৃত্যু!!

এই পোস্টের বক্তব্য পূর্বের পোস্টের সাথে সম্পর্কযুক্ত। । ধারাবাহিকতার স্বার্থে লেখাটি (Click This Link )এইখানে। ---------------------------------------------------------------------------------- সুখের কথা হচ্ছে সরকার একটি নতুন শিক্ষনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি এ বিষয়টি দেশবাসীকে অবহিত করেছেন।

জনাব নাহিদ এক সময়ে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ এবং অনারম্বর। আশা করা যায় তাঁর নেতৃত্বে জাতি সকলের উপযোগী আধূনীক একটি শিক্ষানীতি উপহার পাবে। তার যোগ্যতা এবং ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস রেখে নতুন শিক্ষানীতিতে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন বা প্রতিপালিত হবে বলে আশা রাখিঃ ১। কওমী মাদ্রাসাগুলোর কোন সরকারি স্বীকৃতি নেই।

এর সিলেবাস সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বা স্বীকৃত নয়। কিন্তু এর পরিচালনাকারীরা এ স্বীকৃতির তোয়াক্কা করেননা। তাঁরা নিজেদের মতো করে পরিচালিত হন। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা। রাষ্ট্রকে অবজ্ঞা করে এভাবে স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলা দেশদ্রোহিতার শামিল।

তারপরেও কওমী মাদ্রাসাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলছে। প্রতিবছর এ মাদ্রাসাগুলো থেকে বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হয়। কিন্তু সরকারের স্বীকৃতি না থাকায় এবং যুগোপযুগী শিক্ষার অভাবের কারণে এদের বেশিরভাগেরই কোন কর্মসংস্থান হয়না। পরিনতিতে হতাশায় ভোগে এবং জঙ্গীবাদীদের টার্গেটে পরিনত হয়। এক্ষেত্রে তাঁরা নিজেরাও ভাবে যদি নিজেদের পছন্দসই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তাঁদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।

তাছাড়া বেহেস্তের সু-ঘ্রাণ পাওয়ার সেই চিরায়ত থিওরীতো আছেই। আপনি খেয়াল করে দেখবেন দেশে জঙ্গীবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ জঙ্গীই এ কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে এ মাদ্রাসাগুলো জঙ্গী প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বা এখনও হয়। বর্ণিত কারণে কওমী মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সোজা কথায় বলতে গেলে এগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

এটা ঠিক যে সরকারের জন্য কাজটা খুব সহজ হবেনা। এর সঙ্গে দেশী-বিদেশী অনেক স্বার্থ জড়িত। দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভিত হারাতে চাইবেনা। অপরদিকে আন্তর্জাতিক জঙ্গী চক্র নিজেদের আখড়া বিনাশ হতে দিবেনা। তবে দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তায় রেখে সরকার-কে এ ঝুকিটা নিতেই হবে।

তবে মাদ্রাসাগুলো বন্ধের পূর্বে সরকারের নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের দিকে খেয়াল রাখার প্রয়োজন আছে বলে বোধ করিঃ- ক। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র কোন অবস্থায়ই কওমী মাদ্রাসা বন্ধের প্রক্রিয়াটি সহজে কার্যকর হতে দিবেনা। তাঁরা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে পারে। সরকারকে কঠোর হাতে এসবের দমনের সাথে সাথে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, সভা, সেমিনার প্রভৃতির মাধ্যমে এ মাদ্রাসাগুলোর ক্ষতিকর কার্যক্রম ও এ শিক্ষার অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে হবে।

দেশের প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবীগণ-কে এ কাজে অবশ্যই সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। খ) শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং প্রকৃত শিক্ষা বলতে আমি তাই বুঝব যা যুগের চাহিদা পূরণ করে। কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও যুগের প্রয়োজনীয় শিক্ষার পাওয়ার অধিকার আছে। এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ মাদ্রাসাগুলোতে সাধারণত গরীব, এতিম তথা সমাজের অবহেলিত অংশের শিশুরা অর্থাৎ যাদের সাধারণ শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য নেই তাঁরাই ভর্তি হয়।

বেশিরভাগক্ষেত্রেই মাদ্রাসাগুলোর সাথে এতিমাখানা সংযুক্ত থাকে। এতিমখানাগুলো পরিচালিত হয় যাকাত, ছদকা এবং দানের টাকায়। ফলে শিক্ষাগ্রহণের সাথে এখানে তাঁদের বাসস্থান এবং খাবারের নিশ্চয়তা থাকে। কাজেই সরকার যখন তাদের সাধারণ শিক্ষার দিকে ফিরাবার প্রচেষ্টা নিবে তখন তাদের এই প্রয়োজনগুলো মিটাবার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকারের "শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য" কর্মসূচিটিকে আরো জোরদার করতে হবে।

এ কাজে প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমাজসেবা অধিদপ্তরকেও সংশ্লিষ্ট করা যেতে পারে। ২। মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোর সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। এগুলোর সিলেবাস সরকার স্বীকৃত এবং মর্যাদা সাধারণ শিক্ষার সমপর্যায়ের। তবে শিক্ষার বিষয়বস্তু সেই চৌদ্দশত বৎসরের পুরনো জীবনব্যবস্থা।

শতকরা ৯০% মাদ্রাসা পরিচালিত হয় জামাতীদের দ্বারা। এগুলো তাঁদের কর্মী সংগ্রহের আখড়া। কওমী মাদ্রাসাগুলো যদি সরাসরি ঘাতকের মতো কাজ করে তবে এই মাদ্রাসাগুলোর কাজ-কে তুলনা করা যেতে পারে নীরব ঘাতকের সাথে। এ বিবেচনায় কওমী মাদ্রাসাগুলোর মতো এগুলোও কার্যক্রম বন্ধ হওয়াও জরুরী। কিন্তু পূর্বের সরকারি স্বীকৃতির কারণে এগুলো এ পর্যায়ে বন্ধ করতে গেলে আইনগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তাই তাৎক্ষণিক কার্যক্রম হিসেবে মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং সিলেবাস পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রাথমিক কাজ হিসেবে সাধারণ শিক্ষা এবং মাদ্রাসাগুলোর একই সিলেবাস করা উচিত। এক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলো ইচ্ছে করলে পাঠ্যের অতিরিক্ত হিসেবে ধর্মীয় বিষয় শিখাতে পারে। তবে জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সকল পরীক্ষাসমূহ একই প্রশ্নপত্রে গৃহীত হতে হবে। অপরদিকে নতুন মাদ্রাসা স্থাপন আবশ্যিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং বর্তমানে চালু মাদ্রাসগুলো জামাত-শিবিরের রাহুমুক্ত করতে হবে।

৩। সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে একেবারে ধর্মমুক্ত করতে হবে। শিশুর ধর্মশিক্ষার দায়িত্ব পরিবারের, রাষ্ট্রের বা সমাজের নয়। কারণ এটা ব্যক্তিগত বিশ্বাস। পরিবার প্রয়োজনবোধ করলে শিশুকে পারিবারিকভাবে ধর্মশিক্ষা দিতে পারে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে ধর্ম ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে থাকতে পারে। যার ইচ্ছা হল সে তা চর্চা করবে। বর্তমানে দেখা যায় আবশ্যিকভাবে ধর্মীয় পাঠ দেয়ার পরেও অন্যান্য পুস্তকেও ধর্মীয় কাহিনী বা জীবনাচারণগুলো ঢুকানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইসলামে অবিশ্বাসী একজন ছাত্র পরীক্ষায় উত্তর দেবার জন্য নিতান্ত নিরূপায় হয়ে এ পাঠগ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে একজন ভিন্নধর্মের শিক্ষার্থীকে জোর করে ইসলাম শিক্ষা দেয়াটা রাষ্ট্রীয় অনাচারের শামিল।

রাষ্ট্রকে আবশ্যিকভাবে এ অনৈতিক বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ৪। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিনত করছে। এখানে মুনাফা-কে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে তার বিনিময়ে শিক্ষা দেয়া হয়। অথচ এগুলোর বেশিরভাগেরই কোন নিজস্ব অবকাঠামো নেই, নিজস্ব শিক্ষক নেই।

ক্যাম্পাসের আকৃতি এবং পরিবেশ দেখলে বিশ্ববিদ্যালয় নয়, মনে হয় কোচিং সেন্টার। তবে আকৃতি যাই হোক, এগুলোতে পড়তে গেলে প্রচুর অর্থ লাগে। সত্যিকথা বলতে গেলে মেধাবীদের চেয়ে এখানে টাকাওয়ালাদেরই প্রবেশাধিকার বেশি। শিক্ষার প্রতি অধিকার সবার সমান। কিন্ত মুনাফাখোর এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষাকে বড়লোকের অধিকারে পরিনত করছে।

অতিরিক্ত ফি'র কারণে মেধাবী অথচ দরিদ্র ছাত্ররা সেখানে শিক্ষার্থী হবার যোগ্যতা রাখেন না। শিক্ষাদানে এ চরম বৈষম্য রাষ্ট্রীয় অনাচারের শামিল। সরকার-কে এ বিষয়ে অতিশীঘ্র যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফি এমন হারে নির্ধারণ করা দরকার যাতে একজন সাধারণ পরিবারের ছাত্রও সেখানে পড়ার মত যোগ্যতা রাখেন। তাছাড়া অনুমোদনের পূর্বে তাঁদের নিজস্ব ক্যাম্পাস এবং নিজস্ব শিক্ষকের বিষয়সমূহ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কর্মকান্ড নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য এর প্রশাসনে সরকারের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। সার্বিক কথা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠবে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ইতিহাসকে নিয়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধারণ করবে আমাদের কৃতি সন্তানদের-কে। আমাদের শিক্ষা হবে প্রায়োগিক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হবে আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের শিক্ষায় সামগ্রিক অর্থে আমাদের ঐতিহ্য নেই, আমাদের সংস্কৃতি নেই, আমাদের কৃতিসন্তানরা নেই। আমরা আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য, ইতিহাস, অর্জন, সংস্কৃতি-কে পাস কাটিয়ে মরুচারী, যুদ্ধবাজ, বেদুইনদের সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছি। অথচ ঐতিহ্য বিবেচনায় এরা আমাদের ধারে কাছেও নেই। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে অতীশ দীপঙ্কর, শ্রী চৈতন্য দেব, আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, ক্ষুদিরামের মতো শ্রেষ্ঠসন্তানরা নেই। অথচ তাঁরা ছিল বাংলার অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব।

কর্ম, সাধনা ও ত্যাগের মাধ্যমে তাঁরা বাংলার নাম, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার শ্রেষ্ঠত্বকে সারা ভারতবর্ষে, পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভাবতে অবাক এবং কষ্ট লাগে আমাদের সন্তানরা তাদের এই মহান পূর্বজদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কিছুই জানেনা। শেষ কথা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠুক আমাদের আমিত্ব দিয়ে, বাঙ্গালীত্ব দিয়ে। এটাই সময় এবং যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ চাহিদা।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.