আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গল্পটি প্রেমেরও হয়ে উঠতে পারতো!



শরীরে রাজ্যের ঘাম জমা হয়েছে। জলপ্রপাতের মতো তা যেনো বেয়ে বেয়ে পড়ছে। নিজের ঘামের একটা অদ্ভুদ গন্ধ আমার নিজের নাকেও আসছে। শরীরে প্রচন্ড ক্লান্তি। কিছুক্ষণ আগে ঘরে ফিরেছিলাম।

ঢাকা শহরের সাপের মতো তৈরী হওয়া জানজট ঠেলে ঘরে ঢুকেছি। ঘরে ঢুকলে আর বের হতে ইচ্ছে হয় না। কিন্তু আজ বের হতেই হলো। সকালে অবশ্য আপু ফোন দিয়েছিল। গতরাতেও ভাইয়া ফোন দিয়েছিল।

সম্পর্কের অদ্ভুদ খেলা। সম্পর্কের একটা টান আছে। দুইজনই প্রবাস থেকে ফোন দিয়ে একটি কথাই জিজ্ঞেস করেছে। মামুন, মা ভালো আছে তো? এমন প্রশ্ন আমাকেও ভড়কে দিয়। ভাইয়া খুব চাপা স্বভাবের।

কোনো স্বপ্ন কেনো নিজের অনেক কষ্টের কথাও সহজে কারো সাথে শেয়ার করার প্রয়োজন সে কোনোদিনই অনুভব করেনি। মিষ্টি হাসি দিয়ে তার ভেতরের হাজারো কষ্ট সে চাপা দিতে ওস্তাদ। কখনও সে টেনশান করলে সহজে প্রকাশ করার পাত্র সে নয়। আমার সেই ভাই গতরাতে ফোন দেয় রীতিমত ভয় নিয়ে। সে শুধু বার বার একটি কথাই বলছিল, মামুন, মা কি করে? মাকে দে।

মাকে ফোনটা দে। দেরী করিস না। তাড়াতাড়ি দে। দৌড়ে ফোনটা দিতে হয়েছে মাকে। মার গলা শোনার সাথে সাথে ভাইয়া নাকি কেঁদে দেয়।

মাকে নাকি কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, তোমাকে আর কখনও দূরে রাখবো না মা; তোমার কাছে আমি চলে আসবো। ভাইয়ার এই অদ্ভুদ ব্যবহারে মাও ভড়কে গিয়েছিল। মাও ফোন রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, আমার ছেলেটার হঠাৎ কি হলো! এমন কেনো করছে? অবাক হই আপু ফোন দেয়ার পর। সুদূর কেনাডা থেকে সে আমার মোবাইলে ফোন দিয়েছিল আজ সকালে। আমার বোনটা খুব চঞ্চল স্বভাবের।

খুব হাউকাউ টাইপের। সব সময় চিল্লাচিল্লি। ভাইয়ার ঠিক উল্টো। একদম উল্টো। খুব বেশী ইমোশনাল।

আমার সেই বোন ফোন দিয়ে খুব গম্ভীর গলায় আমাকে প্রশ্ন করে, মামুন মা ভালো তো? এধরনের একই প্রশ্ন আমার ভেতর একটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এতো ভয়! যে বলার বাইরে। সারাদিন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তাই আমিই মাকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছি। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন বাসার কাছাকাছি আমার বাসটা পৌছে। তখন হঠাৎ মনে মনে গতকাল থেকে আসা আমার ভাইবোনের কথাগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে।

কেমন যেনো লাগতে থাকে। মাকে নিয়ে কারও কিছুই বলার নেই। মা মানেই অস্তিত্ব। আমার মা পৃথিবীতে আমার সবচাইতে আপনজন। সেই মায়ের যদি কিছু হয় তবে আমি এ পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ হয়ে যাবো।

মাও প্রায়ই বলে, আমি মরলে তোর যে কি হবে। বাকিগুলার তো সংসার আছে। ওরা সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তোর কি হবে!!! মার এই কথাগুলো খুব কানে বাজছিল। ঠিকই তো!! মা না থাকলে আমার কি হবে।

বাবাকে তো দেখার সৌভাগ্যও হয়নি। আমি যেদিন জন্মেছি তার ঠিক তিনদিন পর বাবা রোডএক্সিরেন্টে মারা যায়। তাই অনেকটা বাবাহীন ভাবেই আমি বেড়ে উঠেছি। মা প্রায়ই ভাইয়াকে বলতো, আমার ছেলেটা বাবার আদর পেলো না। ভাইয়া তখন ক্ষেপে যেতো।

বলতো, বাবার আদর পায়নি ভালো হয়েছে। বাস্তব অতি অল্প বয়সে বুঝতে শিখেছে। আর তুমি ওর সামনে এতো বাবা বাবা করো কেনো? ও জানেই না “বাবা” শব্দটার অর্থ কি। সেটা ওকে জানতেও দিও না। এতে ওর মধ্যে হতাশা গড়ে উঠতে পারে।

মা তখন চুপ করে থাকতো। ভাইয়া আর মায়ের এইসব কথা আমি শুনতাম। কিছুই বলতাম না। বাবা শব্দটার মানে আসলেই আমি বুঝি না। আর হতাশার প্রশ্ন যদি আসে তবে এই ভেবে খুব খারাপ লাগে যে আমি পৃথিবীতে আসার পরপরই কেনো বাবা চলে গেলো।

আমার জন্ম কি বাবার পছন্দ হয়নি। খুব কান্না পেতো তখন। হঠাৎ অনুভব করি আমার পকেটে রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। কানে দিতেই শুনি রাফসান ভাইয়ের গলা। রাফসান ভাই আমাদের বাড়িওলার ছেলে।

রাফসান ভাই শুধু বললেন, মামুন, খালাম্মার শরীরটা ভালো না.....তুই তাড়াতাড়ি ঘরে আয়। আমরা খালাম্মাকে হাসপাতেলে নিয়ে যাচ্ছি। এরপর কিছুই মনে করতে পারছি না। শুধু মনে হলো, তীব্র যানজটে আটকে যাওয়া বাসটা থেকে আমি নেমে দৌড়াচ্ছি। কিভাবে যেনো বাসায় পৌছে গেলাম।

আমি বাসার নিচে আসতেই দেখলাম একটি এম্বুলেন্স। আমার মা। আমার জন্মদেয়া মা। আমার সবচাইতে কাছের মানুষ। আমার মাকে একটি স্ট্রেচারে করে এম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে।

কোনো কিছুই কানে আসে নি তখন। কিংবা দেখিও নি। কেমন যেনো একটা ঘোরের মধ্যে থেকে উঠে গেলাম এম্বুলেন্সে। এম্বুলেন্সের পেঁ-পুঁ আওয়াজে ঘোরটা ভাঙেনি। অনেক্ষণ পরে মা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আর কতক্ষণ লাগবে রে বাবা!! ঠিক তখন চারপাশে আমার চোখটা যায়।

আমি ভেবে উঠতে পারছিলাম না মাকে কি জবাব দেবো। আমি শুধু তাকিয়েই ছিলাম মায়ের দিকে। তখন রাফসান ভাই বলছিল, এইতো খালাম্মা। আর অল্প কিছুক্ষণ। তীব্র যানজটে আটকে যাওয়া আমাদের এম্বুলেন্সটা নড়তেই পারছে না।

সামনে আমার মা। আমার মা। ভেতরে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো আমার ক্লান্তিরা। চোখ বুজে আসছে। ইচ্ছে করছে মার পাশে একটু শুয়ে থাকি।

এম্বুলেন্সের সাইরেন ট্রাফিকের কানে যায় না। এটা ঢাকার সিস্টেমের একটি। আমি তো আর সেই সিস্টেমের বাইরে নই। তাই সহ্য করছি। আসতে আসতে এম্বুলেন্স এগোয়।

আমি মায়ের হাতটি শক্ত করে ধরে বসে আছি। মা আবার বলে ওঠে, মামুন, আমার বুকের ব্যথাটাতো বেড়েই যাচ্ছে বাবা। ইচ্ছে করছিল সবকিছু ভেঙে দৌড়ে যাই। সব কিছু তছনছ করে মাকে নিয়ে যাই হাসপাতালে। চোখের সামনে এম্বুলেন্সে বসে মায়ের এই যন্ত্রণা দেখার দুর্ভাগ্য কেনো বিধাতা দিলেন।

ঠেলা গাড়ীর মতো এগিয়ে গিয়ে পৌছালাম হাসপাতালে। ওখানটায় দৌড়ঝাপ। মা ততক্ষণে গভীর নিদ্রায় যেনো অচেতন। ডাক্তার এখন চেম্বারে। এই বাক্যটি হাসপাতালগুলোর একটা চিরাচরিত বাক্য।

রোগী মরে গেলোও ডাক্তাররা সহজে রোগীর কাছে আসতে চাননা। তারা চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রোগীর সমস্ত দেখভালে ব্যস্ত থাকে বেচারা ডিউটি ডাক্তার। আর শেষ রাতে ঘরে ফেরার আগে মহাশয় সিনিয়র ডাক্তার একটা ঘুরনা দিয়ে চলে যান। ঢাকার হাসপাতালগুলো দশা এমনই।

তবে মার অবস্থা খুব সিরিয়াস তা ডিউটি ডাক্তারের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। সে শুধু মিনমিন করে নার্সগুলোর কাছে কি যেনো বলছিল। নার্সরাও খুব নার্ভাস। আমি শুধু আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলাম, কি হয়েছে! আমাকে একটু বলবেন? উত্তরে ডিউটি ডাক্তারটি বললেন, ওনার হার্টে মেজর কিছু হয়েছে। আমরা স্যারকে খবর দিয়েছি।

তিনি আসবেন। তারপর বলা যাবে। ২. আকাশে সুন্দর একটা চাঁদ উঠেছে। একধরনের একটা হিমেল হাওয়াও বইছে। হাসপাতালের বারান্দায় তখন চমৎকার একটা পরিবেশ তৈরী হলো।

চাঁদ আর বাতাস। সাথে সেই বাতাসের একটা শব্দ। কেমন যেনো শব্দটা! কম্বিনেশানটা খুব চমৎকার ছিল। সারাদিনের ক্লান্তিটা সেই অসাধারণ সময়টিতে কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেছে। মা তখন অপারেশান থিয়েটারে।

কি হচ্ছে......আমাকে কিছুই বলা হয়নি। শুধু বলল, হার্টে ব্লক পাওয়া গেছে। রিং পরাতে হবে। আরও সমস্যা আছে। পালস পাওয়া যাচ্ছে না।

দেখা যাক কি করা যায়। বলেই আমাকে দিয়ে কাগজ পত্র সাইন করিয়ে মাকে আপারেশান থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। তখন থেকেই আমি হাসপাতালের বারান্দায় দাড়িয়ে। আমার সাথে রাফসান ভাই ছিল। আমি ওনাকে পাঠিয়ে দিয়েছি।

আর আমি দেখছি বাতাস আর অপূরুপ চাঁদের খেলা। হঠাৎ কেমন যেনো একটা গন্ধ নাকে এসে লাগলো। মেয়েলি গন্ধ। কেমন যেনো মায়াময় একটা গন্ধ। সাথে সাথে তাকাই বাঁ পাশে।

দেখি সাদা ধবধবে সেলোয়ার কামিজ পড়া একটি মেয়ে চোখ মুছতে মুছতে দাড়িয়ে আছে। ফর্সা মেয়েটি চোখে কাজল দেয়। তার কান্নার সাথে সেই কাজলও পানি হয়ে তার সমস্ত গালটাকে কালো রঙে রাঙিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে, আকাশের চাঁদ যেনো আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে। একটু বেশী সস্তা লাইন হয়ে গেলো; তাই না!! কিন্তু বিশ্বাস করুন; মেয়েটিকে এতো অসাধারণ লাগছিল যে তাকে চাদ বলা ছাড়া কোনো শব্দও আমার কাছে নেই।

চাঁদের দিকে তাকালে যেমন একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয় ঠিক তেমনই একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল আমার ভেতর। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই ছিলাম। মেয়েটিও চোখ মুছতে মুছতে আমার দিকে তাকালো। চোখ হয়তো অন্যদিকে ঘুরানো যেতো। কিন্তু আমি চোখ ঘুরাতে চাচ্ছিলাম না।

আমি চাচ্ছিলাম মেয়েটা দেখুক। তার অসাধারণ মুখটা একটা ছেলে মুগ্ধ হয়ে দেখছে; সেই দৃশ্যটা মেয়েটাও দেখুক। মেয়েটাও কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর কান্নাটা বন্ধ করে ভুরু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেলো। আমি তখনও দাড়িয়ে।

মনে মনে হাসছিলাম। কিছুক্ষণ পর পর অপরেশান থিয়েটারের দরজার দিকে তাকাচ্ছিলাম। মার না জানি কেমন লাগছে। মনে সব উল্টা পাল্টা চিন্তা ভীড় করছিল। মৃত্যু দেখে মার কেমন লাগবে! ভয় লাগবে! মাকি মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করবে! নাকি মৃত্যুকেই আলিঙ্গণ করবে! আজব চিন্তারা মাথায় ঘুরছিল।

এমন সময় অপারেশান থিয়েটার থেকে একজন নার্স বেরিয়ে আসলেন। বললেন, তাড়াতাড়ি তিনব্যগ এ নেগেটিভ রক্ত জোগাড় করেন। রোগীর রক্ত লাগবে। মনটা যেটুকু হাল্কা হয়েছিল তাও এখন আশঙ্কায় ভরে গেলো। কিভাবে এখন রক্ত জোগাড় করবো!! দৌড়ে গেলাম নিচের ইনফরমেশান ডেস্কে।

ওখানে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত ম্যানেজ হবে কিনা তা জানতে গেলাম। তারা খোজ নিয়ে জানালো, হাসপাতালে মাত্র এক ব্যাগ রক্ত হবে। বাকিটা এনিহাউ ম্যানেজ করতে হবে। তাড়াতাড়ি আবার উপরে দৌড় দিলাম। অপারেশান থিয়েটারের বাইরে দাড়ানো নার্সকে বললাম, এক ব্যাগ রক্ত হাসপাতাল থেকে দেয়া হচ্ছে।

আর বাকিটা ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি। নার্স বলল, তাড়াতাড়ি করেন। আপনার হাতে আছে ত্রিশ মিনিট। মাথাটা ঘুরছিল। একেওকে ধরে রক্তের গ্র“প জানতে চাচ্ছিলাম।

একজন ম্যানেজও হয়ে গেলো। খুব অল্প বয়স্ক একটা ছেলে। কলেজে পড়ে। নিজ থেকেই বলেছে, ভাইয়া আমার এ নেগেটিভ। আমি দিতে পারবো।

একটু স্বস্তি আসলো। আর এক ব্যাগ। হাসপাতালের চারতলা থেকে শুরু করে নিচ তলা পর্যন্ত শুধু মানুষ খুঁজছি। এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার মতো এ নেগিনিভ রক্ত ওয়ালা মানুষ। একটা পর্যায়ে খুব কান্না পাচ্ছিল।

খুব অসহায় লাগছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচাইতে অসহায় মানুষটি আমি। ত্রিশ মিনিট শেষ হয়েছে অনেক্ষণ আগে। ফোনেও অনেককেই বলেছি। কিন্তু সবার একই কথা, চেষ্টা করছি ম্যানেজ করতে।

সেই বারান্দায় আবারও এসে দাড়ালাম। মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে। মনে হচ্ছে এখানেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবো। সেই মেয়েটিও এখানে দাড়ানো। আগ বাড়িয়ে কিছু চিন্তা না করেই প্রশ্ন করলাম, আপনার রক্তের গ্র“পটা জানতে পারি? মেয়েটি তাকালো।

তার চোখের কাজলের রঙ তখনও তার গালে। মুছতে মুছতে সে বলল, এ নেগেটিভ। - আমার মায়ের রক্ত লাগবে। প্লিজ আপনার যদি সমস্যা না থাকে। রাজি হবে জানতাম।

মায়ের জন্য রক্ত। মাতো সবার জন্য মা। মাকে রক্ত দেয়ার কথা বললে সবাই রাজি হবে। এটাই তো স্বাভাবিক। রক্ত দেয়ার পর মেয়েটি হাসপাতালে করিডোরের বেঞ্চে বসে আছে।

আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে। তাঁকে থ্যাংস বলা ছাড়া আর কি বলব। আমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। খুব। অনেক কষ্টে ইচ্ছেটাকে দমন করে রেখেছি।

মার অপারেশান শেষ। এখন আই.সি.ইউ তে আছে। অবস্থা খুব একটা ভালো না। তাও ডাক্তাররা আশা ছাড়েননি। আচমকা মেয়েটা প্রশ্ন করে বসলো, ওনার কি হয়েছে? - হার্টে ব্লক পাওয়া গেছে।

আরও কিছু সমস্যা আছে। মেয়েটি উঠে দাড়ালো। বলল, একটু বারান্দায় যাবো। যাবেন আমার সাথে? দুজন তখন বারান্দায়। পিন ড্রপ সাইলেন্সে দাড়িয়ে আছি দুজনে।

দুজনের অমিলও আছে। আমি তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। আমি যখন মেয়েটির দিকে তাকাই দেখি সে তাকিয়ে আছে মাটিতে। কি যেনো গভীরভাবে ভাবছে। গভীর চিন্তায় মগ্ন।

- আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। আপনি কিছুক্ষণ আগে দেখলাম কাঁদছিলেন। কেনো? মাটি থেকে চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকায়। বলে, আমার বাবা-মা দুজন ঢাকায় ফেরার পথে এ´িডেন্ট করেছে। দুজনই আই.সি.ইউতে আছেন।

বলতে বলতে আবার কেঁদে দেয় সে। চোখের কাজল আর অবশিষ্ট নেই। তাই এখন স্বচ্ছ চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। কি অপরূপ সে কান্না। গাল বেয়ে চোখের জলের নেমে আসা!! পৃথিবীর চরম সৌন্দর্যের একটি।

যার কান্নাটাই আমাকে মুগ্ধ করছে তার হাসি না জানি কতটা ভয়ানক হবে। হঠাৎ নিজের কাছেই খারাপ লেগে উঠলো। আমার মা আছেন মৃত্যুর সামনে আর আমি দাড়িয়ে এক অপরিচিত মেয়ের সৌন্দর্য দেখছি। ছিহ্ । ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হচ্ছে নিজেকে।

বারান্দা থেকে কিছু না বলেই চলে আসি। আই.সি.ইউ - এর সামনে এসে দাড়িয়ে থাকি। চোখ বন্ধ করে সৃষ্টিকর্তার করুনা চাইতে থাকি। মা যেনো বেঁচে থাকে। গল্পের শেষ: গল্পটি আর এগিয়ে নেয়া উচিত হবে না।

সেই রাতে মা সমস্ত বন্ধন ছিড়ে পাড়ি জমিয়েছিল অন্ধকার জগতে। আমি সেদিন করিডোরে হাউমাউ করে বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে শুরু করেছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে অনুভব করি, একটি কমল হাত আমার মাথায় ছিল। গন্ধটাই বলে দিচ্ছিল হাতটি কার ছিল। সেই অজানা অপরিচিত মেয়েটি একটি অসহায় ছেলেকে শান্তনা দেবার ভাষা পাচ্ছিল না; তাই হয়তো মাথায় হাত বুলাচ্ছিল।

সেইদিনটি চলে গেছে বছর চারেক আগে। আজও সেইদিনটির কথা মনে আসলেই মেয়েটির প্রতিচ্ছবি সামনে চলে আসে। অসাধারণ সেই সৌন্দর্য, আসাধারণ সেই কান্না আর দেখা হলো না। আজও আফসস হয় মেয়েটির হাসি না দেখতে পেরে। একটি মর্মান্তিক স্মৃতির মাঝেও ভেসে উঠে একটি মায়াময় চিত্র ।

মায়ের মৃত্যু আর সেই মেয়েটির সাথে কিছুক্ষণ সময়; সত্যিই যেনো বিধাতার তৈরী করা। কাকতালীয় ঘটনায় আটকে যাওয়া আমরা দুটি মানুষ। আসলে দুটি মানুষ নয়। একটি মানুষ। আমি।

আমি একাই হয়তো আটকে গেছি। মেয়েটি তো আর আটকায় নি। তারপরও ভাবি, হয়তো মেয়েটি মাঝে মাঝে আমাকে মনে করে। তবে মেয়েটিতো জানবেই না যে, সেই হাসপাতালে মা মরা ছেলেটা আজও তাকে ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে। আর মনে মনে বলে, সেদিনের গল্পটি হয়তো মৃত্যুর না হয়ে প্রেমের গল্প হয়ে উঠতে পারতো।


সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।