আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শেরালী পনেরো-মুক্তির মন্দির সোপান তলে-৫



এদিকে দিন দিন মুক্তি ফৌজের অতর্কিতে আক্রমণ বেড়েই চলেছে। আগে শুধু রাতেই হামলা চলত। কিন্তু সেদিন, প্রকাশ্য দিবালোকে বোয়ালমারী বাজারে পেঁয়াজ কেনার ভান করে, লুঙ্গীর খোট থেকে গ্রেনেট বের করে, পাঁকা পেয়ারার মত আস্তে গড়িয়ে দিল, টহলদার পাক বাহিনীর ট্রাকের নীচে। দু'দিন না যেতেই ধানের ডোলে লুকিয়ে থাকা মন্টু রাজারকারকে বিড়ালের বাচ্চার মত চেং দোলা করে সবার চোখের সামনে দিয়ে ধরে নিয়ে গেল। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতী মোকাবেলায়।

রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটি পাক প্রভূদের সাথে যুক্তি করে, বালুচর গ্রামে, বাবুদের পরিত্যাক্ত দালানে সম্মিলিত বাহিনীর অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করলেন। আমাদের শোকের সাথে যুক্ত হল ক্ষুধা। নিরাপত্তার কথা এখন মনে নেই। আর নিরাপত্তা দিয়ে হবেই বা কি! আপাততঃ ক্ষিধাই বড় শত্রু। কয়েক জন পাকসেনা সাথে নিয়ে লাকমান রাজাকার আমাদের এই পরিস্থিতির কথা ভেবেই বাড়ি এসে উদ্ধারের সংকল্প ব্যাক্ত করল।

লোকমান রাজাকার: বইন, মুক্তি ফৌজের কির্তিকলাপ দেখতাছেন। হেরা কহন কারে ধরে ঠিক নাই। আমনের কামাই করুণ্যা ফোলাডা খাইল, জামাই খাইল। শেষ সম্বল এই (আমার দিকে ইংগিত করে) দুধের ছাওয়ালডা যদি যায়! পাক হানাদারের একজন আমাদের দুঃখে দুঃখি হয়ে আবেগ সামলাতে না পেরে উর্দুতেই বল্লেন: বহিনজী, পাকিস্তান কা লিয়ে আপকা কোরবান হামলোগ কাভী নিহি ভুলেঙ্গে। ইহাপর আপকা হেফাজত করনে ওয়ালা কুই নেহিহে।

আপ চলিয়ে হামারা সাথ। যবতক হাস লোগ জিন্দাহে আপকা কুচ নিহি করসাক্তা ইয়ে হারামীকা বাচ্চঅ মুক্তি ফৌজ। লোকমান ভাই আপ বহিনজীকে আপনা জবানমে থোরা সমজাইয়ে! এদের বিণীত অনুরোধ, বর্ববরতার অলংগনীয় নির্দেশে পরিনত হওয়ার আগেই মা সুবোধ বালিকার মত কাপড়ের পুটলি এক হাতে আর একহাতে আমার হাত ধরে নৌকায় উঠলেন। এমন শক্ত করে মা আমাকে কখনো ধরেন নি। অজানা ভবিষ্যতের আশংকা, এই রমণীর একমাত্র ভরসা, আমার দুর্বল কঁচি হাত কতটুকু দূর করতে পেরেছে! মাকে ওদের রাধুনি নিয়েগের বড় কারণ: ওদের ধারণা মুক্তি যোদ্ধাদের প্রতি মায়ের এক ধরণের ঘৃণা জন্মেছে।

ওদের ধারণা হয়তো ঠিক। কিন্তু এদের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মানোর কোন কারণও এরা জীবিত রাখেনি। পরের দিন মায়ের লজ্জিত মুখ প্রচন্ড রোদে চুপসে যাওয়া রক্তজবার মত দেখাল। আমার দিকে তাকাতে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিলেন। বায়তুল মালের মত চুটে পুটে খেয়েছে হায়েনার দল, আমার মায়ের একান্ত ব্যাক্তিগত সম্পদ।

তাজা মাংস দেখে বিড়ালের শিকারী জিঘংসার মত জ্বলে উঠল শেরালীর চোখ। মায়ের আশংকা তাতে আরো বাড়ে। শেষ সম্বল শেরালী এই হায়েনাদের বিষদাঁতে উচ্ছিষ্টের চেয়ে বেশী কিছুনা। জাপটে ধরে চোখের জলে শেরালীর প্রতিহিন্সার আগুনে আপাতত ছাইচাপা দিলেন।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.