আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শেরালী উনিশ: তাদের স্মৃতির চরণে



শেরালী আঠারো ভৈরবী রাগের আলাপের মত, যার শুরুটা হামিং দিয়ে শুরু হয়, এমন নিবিষ্ট নিবেদনে অভিষ্ট দেবতার নাম ভজন করলে, সারা মিলতেই হবে! ভ-জ-ন এই একটি শব্দেই পুরোটা গান অনেকক্ষণ ধরে চলছে। পূর্ণিমা রাতে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো হাজার তারার বাতিকে ম্লান করে দেয়নি। সাতমৌজার বিলে চন্দ্রমুখী পদ্মরা রুপোর কৌটোয় স্মৃতির মোম হয়ে কার স্মরণের সায়রে ভাসছে! সোনার বাংলা যাত্রা পালার রিহার্সেলে এতদিন গ্রামটা মুখর ছিল। বিজয়ী বীর মুক্তি যোদ্ধারা অনেকদিন রিহার্সেল দিয়ে যাত্রাপালার শেষ অভিনয়টুকু শেষ করে দেশ গড়ার কাজে নেমে পড়েছে। বেশীর ভাগ মুক্তি যোদ্ধাই ছাত্র।

তাই লেখাপড়ায় ফিরেগেছে। মুক্তির আনন্দে স্বাধীন বাঙ্গালী যুদ্বোত্তর সংকট মোকাবেলায় যথেষ্ট মনোযোগী। সংসয়াকুল গৃহবধুরা বাটনা বাটার শিল পাটায় জলভর্তি কাসার বদনা, কাঁদায় লেপে, বদনার কান্দা ধরে উঁচু করে দেখেছে, শিলপাটা বদনার সাথে উঠে আসে। বঙ্গবন্ধু আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান হবেন। উক্ত পরিক্ষায় তা প্রমান হয়ে গেছে।

পাল বাড়ি স্বাধীনতার আগেই পুড়োটা খালি পরে থাকত। সে বাড়ীর সবাই খুব শিক্ষিত এবং সে কারণে ভাল চাকরীর সুবাদে শহরেই থাকে। গান্ধী পন্ডিত আনন্দের সাথে গ্রামের প্রাউমারী স্কুলের জায়গা করে দিলেন নিজ বাড়ীতে। গ্রামের লোকের অনুরোধে প্রথমিক দেখাশনার দায়ীত্বও নিলেন। যখন সবাই নমিতাকে স্কুলের শিক্ষিকার দায়ীত্ব নিতে বললেন, তখন গান্ধী পন্ডিত একটু অন্যমনস্ক হলেন।

বললেন; আমি নমিতাকে আপনাদের কথা জানাব। গান্ধী পন্ডিত নমস্কার করে উঠে গেলেন। নমিতা দুইছেলে বিরেশ্বর আর অসীমকে নিয়ে বাবার পিড়াপিড়িতে স্বামী ভজনকে সাথে না নিয়েই আত্মীয়ের কাছে কোলকাতায় চলে যান। সেটা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের আগের কথা। গান্ধী পন্ডিত কোলকাতায় যান ঘর-বাড়ী তালা দিয়ে মার্চের মাঝামাঝি।

ভজন গান্ধী পন্ডিতের সাথে দেখা করে, নমিতার জন্য হাত খরচের জন্য কিছু টাকার সাথে একটা চিরকুটও দিয়েছিল। মিতা, ভালবাসা নিও। দেশটা নিরাপদ করতে না পেরে, তোমাদের নিরাপদে রাখতে, শরনার্থী করে কোলকাতায়, পরবাসী করলাম। ওরা আমাদের আত্মীয়, কিন্তু আমরা বিপদে পড়ে ওদের আশ্রয় প্রার্থী। ওদের আমন্ত্রন রক্ষার্থে সেখানে যাচ্ছি না, কথাটা মনে রেখ।

তা ছাড়া কতদিন থাকতে হবে তাও জানিনা। কাজেই জেঠামশাইয়ের বাড়ীতেই উঠ। খুব প্রয়োজন না হলে কার কোন প্রকার সাহায্য, সহানুভূতি গ্রহন করো না। আমার কেন জানি মনে হয় এবার একটা ওলট পালট হবেই। কে জানে হয়তো বিরেশ্বর আর অসীমকে নিয়ে তুমি বঙ্গবন্ধুর ঘোষনা অনুযায়ী মুক্ত-স্বাধীন সোনার বাংলায় ফিরে আসবে।

আমাদের সন্তানদের স্বাধীন দেশে মানুষ করতে হলে, আমাকে এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। ডাকাত দুটোকে দিন কয়েক একা সামলাও। সময় হলে আমি নিজে তোমাদের আনতে কোলকাতায় যাব। জেঠামশায়কে নমস্কার দিও। তোমার কার্তিক ১৭ই মার্চ ১৯৭১ নমিতার কাছে ভজনের লেখা আর কোন চিঠি নেই।

কেন যে নমিতা রাগ করে এ চিঠি ছেড়েনি! একটা কোন ভালবাসার ছিটে ফোঁটাও এ চিরকুটে নেই। ইচ্ছে করেই রেখে দিয়েছিল। দেখা হলে ভজনকে খোটা দেবে। বঙ্গবন্ধু তোমার শ্বশুর? তার ডাকে বউকে দুটো ভালবাসার কথা বলতে ভুলে গেলে! কিন্তু আজকাল অভিমানের জায়গাটা অশংকায় ভরে গেছে। কেন যেন আর জোর পাচ্ছে না।

সব মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এল। শুধু ভজনের কথাই কেউ বলতে পারে না। বলার মত এক ফকিরের সন্ধান পেয়ে, তার পড়াপানি আউশের ক্ষেতে ছিটিয়ে স্বপন কোমর পানিতে নেমে ভজনের নাম ধরে ডাকছে। সে ডাক ভৈরবীর ভজনের মত নিশিথ রাতে গাঁয়ের লোকের কানে বাজছে। যদি ভজন বেঁচে থাকে তবে সারা দেবে।

ভজনের সারা না পেয়ে সবাই ভাবে হয়তো ফকিরের কোন নিয়ম ভুলে গেছে। আগামী পূর্ণিমায় আবার ডাকার আগে, ফকিরের নিয়মগুলো আর একবার ভাল করে জেনে আসবে স্বপন। অনেক সময় ভাবে; জৈষ্ঠের জলের মিলনকামী মাছের মত জোয়ারের জলে ভেসে বিজয়ীর বেশে ভজন যদি আজই আসে, আর দেখে; মঙ্গল সুত্র আর লাল সূর্য্যের মত সিঁদুরের টিপ নমিতার কপালে জলজল করে জ্বলছে না। তাহলে নমিতা লজ্জায় মরে যাবে। তাই, আজো সিঁদুরের টিপ, অস্তরাগের রক্তলাল সূর্য্য হয়ে, আগামীর প্রতীক্ষায় নমিতার ললাটকে বাংলার রক্তিম আকাশ করে রেখেছে।

(নমিতাদির মত, আজো যিনি সিঁদুর পড়া ছাড়েননি, বা স্মৃতির মিনারে যেসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রীরা আজো শ্রর্ধঘ্য সাজিয়ে রাখেন, সে সব শহীদের স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে আমার ছোট্ট নিবেদন। )

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.