আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বিস্ময়কর বগ বডি

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মমি। মৃতদেহ সংরক্ষণের অদ্ভুত রীতির এই বিস্ময়ের তালিকায় সবচেয়ে উপরে রয়েছে মিসরীয় সভ্যতার নাম। তাদের তৈরি মমি আর পিরামিডগুলো হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর মানুষকে রহস্যের অাঁধারে বন্দী করে রেখেছে। এর বাইরে চীনের রেড পিরামিড কিংবা অন্যান্য দেশে মমির সন্ধান মিললেও মিসরীয় মমির আবেদনকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি কোনো দেশই। মিসরীয় মমি সম্পর্কে যারা খোঁজ রাখেন তাদের জানার কথা যে মিসরীয় মমিগুলোর বয়স পাঁচ-দশ হাজার বছরের মতো।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এগুলোই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো বা বয়স্ক মমি। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। আশ্চর্য হলেও সত্য এর চেয়ে বেশি বয়সী মমিও পৃথিবীতে রয়েছে। আর তার চেয়েও বড় বিষয় মিসরীয় কারিগরদের মতো এসব মমিগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো স্রষ্টা নেই। মানুষের চেষ্টা ছাড়াই তৈরি হয়েছে ওগুলো! পৃথিবীজুড়ে এই সংরক্ষিত মৃতদেহকে বলে বগ বডি বা জলাজমির মানুষ! এই জমিতে পড়লেই নানা রাসায়নিক কারণে মৃতদেহ সংরক্ষিত হয়ে পরিণত হয় বগ বডিতে।

এ পর্যন্ত ঠিক কতটি বগ বডি পাওয়া গেছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কারণ সময়ের আবর্তে কিংবা আবিষ্কারের পর সংরক্ষণের অভাবে অনেক বগ বডিই নষ্ট হয়ে গেছে। আর আবিষ্কৃত এসব মমিগুলোকে বলে বগ মানুষ। আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা বগ বডিসের আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করেছেন। বগ মানুষের শরীর বিশ্লেষণ করে তাদের সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।

কারণ এই বডিগুলো হাজার হাজার বছর আগেকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন কয়েক হাজার বছর আগে ইউরোপের মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল। এও জানতে পেরেছেন তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণের আধুনিকতম কৌশল ব্যবহার করে চেষ্টা করা হচ্ছে বগ মানুষের রহস্য পরিপূর্ণভাবে উন্মোচনের।

তাতে আরও কত সময় লাগবে কে জানে।

এযাবৎ আবিষ্কৃত বগ বডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো হচ্ছে কোয়েলবার্গ নারী। এই মমিটি পাওয়া গিয়েছিল ডেনমার্কের কোয়েলবার্গ অঞ্চলে। আর বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে এই নারীর জন্ম খ্রিস্টের জন্মের ৮ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ এই বগ বডির বয়স দশ হাজার বছরেরও বেশি।

সবচেয়ে বেশি বগ বডি পাওয়া গেছে উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে জার্মানি, ডেনমার্ক, হল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে। এ বগ বডিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এরা সবাই লৌহযুগের মানুষ। এদের মধ্যে আছে টোলান্ড মানব, গ্রাউবল মানব আর লিন্ডাউ মানবের মতো অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত বিখ্যাত সব বগ বডি। লৌহযুগের এসব বগ বডির মধ্যে একটা মিল আছে।

সবচেয়ে বড় মিলটি হচ্ছে এদের কারোই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। এদের প্রায় সবারই মৃত্যু হয়েছে অস্বাভাবিক এবং সহিংস উপায়ে। বগ বডিগুলোর কোনোটির শরীরেই কোনো প্রকার পোশাক বা আচ্ছাদন ছিল না। এসব বিশ্লেষণ করে বেশির ভাগ প্রত্নতত্ত্ববিদ ধারণা করেন- বগ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করে পিট বগে ফেলে রাখা হয়েছিল। তখন হয়তো কেউ জানতোই না এখানে ফেলে রাখলে মৃতদেহ সংরক্ষিত থেকে যায়।

কিন্তু কী কারণে হত্যা করা হয়েছিল এদের? কারও কারও মতে হয়তো দেবতাদের উদ্দেশে বলি দেওয়া হয়েছিল। আবার কারও মতে কোনো অপরাধের কারণে এদের হত্যা করা হয়েছে। ঘটনা যাই হোক না কেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব মৃতদেহের স্থান হতো পিট বগে। বগ বডির মধ্যে সাম্প্রতিক সংযোজন হচ্ছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের হাতে নিহত রুশ সৈন্যরা।

বগ বডিগুলোর মধ্যে এমন কতগুলো বডি রয়েছে যেগুলো নানা কারণে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।

এমনই একটি বডি হচ্ছে টোল্যান্ড মানব। ৬০ বছর আগে ডেনমার্কের টোল্যান্ড অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া এই বডিটিও বিজ্ঞানীদের অনেক জল্পনা-কল্পনার কারণ হয়ে উঠেছিল। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হবে। দেখে মনে হবে রূপালী-ধূসর শরীরের এই মানুষটির শরীরকে যেন খোদাই করা হয়েছে গ্রাফাইট দিয়ে। মনে হবে যেন এইমাত্র মৃত্যু হয়েছে তার।

অথচ প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, তার বয়স কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর! পিট বগের প্রাকৃতিক সুরক্ষা তার মৃতদেহটিকে এতই সুরক্ষিত রেখেছে যে, তার চোয়ালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি এখনো অবিকৃত রয়ে গেছে! 'রেড ফ্রাঞ্জ' নামে আরেক বগ মানুষের ছিল লাল চুল ও লাল দাড়ি, গলায় তার দীর্ঘ একটি কাটা দাগ। ধারণা করা হয়, তার মৃত্যু হয়েছে আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে।

যুক্তরাষ্ট্রের 'কার্নেগি মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি'তে প্রাকৃতিক উপায়ে মমিকৃত সাতটি বগ বডি সংরক্ষিত আছে। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত একটি বগ বডি হচ্ছে ইড গার্ল নামের এক কিশোরীর বডি। এটির বয়স দুই হাজার বছরেরও বেশি।

এটিকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল হল্যান্ডে। এই বডিটিকে দেখে সহজেই বোঝা যায় যে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যান্য বগ বডিগুলোর মতোই তার ভাগ্যে নেমে এসেছিল নির্মমতা। যে দড়িটি দিয়ে তার শ্বাসরোধ করা হয়েছিল সেটির দাগ এখনো তার গলায় আছে। কিন্তু কেন এই কিশোরীর জীবনে নেমে এসেছিল এই নির্মমতা? এই কিশোরী কি ধর্মীয় উৎসর্গের শিকার, নাকি কোনো অপরাধের জন্য তার এই শাস্তি? এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তরই আমাদের অজানা।

এরপরও বিজ্ঞানীরা ইতিহাস খুঁড়ে জানতে চাইছেন আরও অজানা সব গল্প। যা ভাবতে গেলেই গা শিউরে ওঠে।

 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।