আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’

ত্রিশের দশকে মার্কিন শিল্পপতি ও ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড নাকি একবার বলেছিলেন, ভাগ্য খুবই ভালো যে, বেশির ভাগ মার্কিনিই জানেন না ব্যাংক কীভাবে কাজ করে, কারণ তাঁরা যদি তা জানতেন, তাহলে ‘কাল সকালের আগেই বিপ্লব হয়ে যেত’ আর আজকের দুনিয়ায় ব্যাংকিংয়ের ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে এসেছে ‘আধুনিক অর্থনীতিতে টাকা’ নিয়ে দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রকাশিত এক নিবন্ধে। দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে জানিয়েছে।

‘আধুনিক অর্থনীতিতে টাকা: একটি ভূমিকা’ শিরোনামের নিবন্ধটির লেখক দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মনিটরি অ্যানালাইসিস ডাইরেক্টরেটের তিন অর্থনীতিবিদ। তাঁরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি এ কথাটা বলে দিয়েছেন যে, ব্যাংক-ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা আসলে ভুল। বরং ব্যাংকিং সম্পর্কে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটে’র মতো জনপ্রিয় এবং প্রথাবিরোধী গ্রুপগুলোর অবস্থানই সঠিক।

দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সততার এই পরাকাষ্ঠা টাকা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ‘কৃচ্ছ্রতার’ তাত্ত্বিক ভিত্তি জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলার মতো।

আধুনিক দুনিয়ার বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকই গড়ে উঠেছে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের’ আদলে। আর দেশে দেশে জননীতি সংক্রান্ত বেশির ভাগ আলোচনা-বিতর্কই এখনো দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংকিং-সংক্রান্ত প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই। ফলে ব্যাংকটির এই নতুন তাত্ত্বিক অবস্থান কতটা বৈপ্লবিক, তা বুঝতে হলে আগে দেখে নিতে হবে ব্যাংকিং-সংক্রান্ত প্রথাগত ধারণাগুলো কী। সাধারণভাবে মনে করা হয়—

মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে, ব্যাংক এরপর এ টাকা সুদে খাটায়, হয় ভোক্তাদের কাছে (অ্যাকাউন্টধারী সহ নানা পর্যায়ের সেবা গ্রহণকারীদের কাছে), নয় লাভজনক ব্যবসায় লগ্নি করতে চায় এমন উদ্যোক্তাদের কাছে।

এটা সত্য, অপূর্ণাঙ্গ রিজার্ভ ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো নিজেদের কাছে থাকা টাকার চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকাও ঋণ দিতে পারে। আর এটাও সত্য যে, যথেষ্ট পরিমাণে সঞ্চয় (সেভিংস) না থাকলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে যে পরিমাণ ইচ্ছা সে পরিমাণ টাকাই ছাপতে পারে, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ টাকা না ছাপানোর বিষয়েও তারা সতর্ক থাকে। বস্তুতপক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন ‘স্বাধীন’ থাকে সে বিষয়টি বোঝাতে আমাদের যা বলা হয়, তা হলো— যদি সরকারগুলো টাকা ছাপাতে পারত, তাহলে তারা হয়তো এই পরিমাণ টাকা ছেপে ফেলত যে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গিয়ে তা দেশের অর্থনীতিকেই বিপর্যয়ে ফেলে দিত। দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সতর্কতার সঙ্গে টাকা ছাপানো এবং এর জোগান নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রাস্ফীতি রোধ করার জন্যই।

আর এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সরাসরি সরকারকে তহবিল দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তহবিল জোগায় আর সরকার বেসরকারি খাতের ওপর করারোপ করে থাকে।

ব্যাংক ব্যবস্থার এই বোঝাপড়াটা আমাদের এই প্রশ্ন করার সুযোগ করে দেবে যে, টাকা বক্সাইট বা পেট্রোলিয়ামের মতো সীমিত জোগানের বস্তু কি না, যা হলে বলা যাবে যে সামাজিক কর্মসূচিতে তহবিল জোগানোর মতো ‘পর্যাপ্ত টাকা নেই’। কিংবা এটা সরকারগুলোর নৈতিক অবস্থান নিয়ে এই প্রশ্ন তুলতে সহায়তা করবে যে, ‘সরকারি ব্যয়’ বা ‘সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ’ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে সীমিত (ক্রাউডিং আউট) করে দিচ্ছে কি না।

দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ড নিবন্ধে স্বীকার করে নিয়েছে যে, এগুলোর কোনোটিই আসলে সত্য নয়।

অন্য ভাষায় বললে, ব্যাংকের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা যা জানি, তা পুরোপুরিই ভুল। ব্যাংক আসলে কাজ করে প্রথাগত ধারণার উল্টো প্রক্রিয়ায়। ব্যাংক যখন ঋণ নেয়, তখন তারা টাকা ছাপায়। কারণ টাকা আসলেই একটা ‘আইওইউ’ (IOU বা I OWE YOU) মাত্র। অর্থনীতিতে এই ‘আইওইউ’ বুলির অর্থ অনেকটা ‘আমি আপনার এই পাওনা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।

যে কারণে প্রায় সব দেশের ব্যাংক নোটেই এ ধরনের একটা কথা লেখা থাকে। (আমাদের দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটগুলোতে (১০০, ৫০, ২০ বা ইত্যাদিতে) টাকার মূল্যমানের সঙ্গে যেমন লেখা থাকে ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’) অর্থাত্ যে মূল্যমানের নোট সেই মূল্যমান পরিশোধে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্য ভাষায়, জনগণসহ সব পক্ষই এটা বিশ্বাস করে যে, এই নোটের বিনিময়ে তাঁরা সমমূল্যের পণ্য বা সেবা পাবেন আর সরকারও এটাকে স্বীকৃতি দেয়।

আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই টাকা তিনটি রূপে থাকে—মুদ্রা, ব্যাংক ডিপোজিট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ। প্রত্যেকটাই অর্থনীতির একটা খাতের প্রতি অন্য খাতের এক ধরনের ‘আইওইউ’।

আর আধুনিক অর্থনীতিতে বেশির ভাগ টাকাই থাকে ‘ব্যাংক ডিপোজিট’ হিসেবে, যা কি না বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেরা তৈরি করে থাকে।  

আর এ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটা আইনি ব্যবস্থায় মুখ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে মাত্র, যেখানে একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই ‘টাকা’ বা নির্দিষ্ট ধরনের ‘আইওইউ’ ছাপানোর বিশেষ অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আর সরকারও এই টাকাকে আইনি স্বীকৃতি দেয় এবং ‘কর’ নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে একে গ্রহণ করে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।

আসল কথাটা হচ্ছে, ঋণ নেওয়ার লোক পেলে ব্যাংক কত টাকা ছাপাতে পারবে তার কোনো সীমা নির্দিষ্ট করা নেই। আর যেহেতু ঋণগ্রহীতারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ‘কার্পেটের নিচে’ রেখে দেন না বরং শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো ব্যাংকেই তা জমা করেন, তাই ব্যাংকের টাকায় টান পড়ারও কোনো কারণ নেই।

তাই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রত্যেক ‘লোন’ বা ঋণই একটা ‘ডিপোজিট’ বা জমায় পরিণত হয়। উপরন্তু আরেকটি বিষয় হলো, প্রচলিত ব্যবস্থা অনেকটা এ রকম যে অন্যান্য ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যত খুশি তত টাকাই ধার করতে পারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত ওই টাকার ওপর প্রদেয় সুদের হার নির্ধারণ করে দেয়; অর্থাত্ টাকার খরচটা ঠিক করে দেয়, টাকার পরিমাণ নয়। মন্দা শুরুর সময় থেকে মার্কিন এবং ব্রিটিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার এই খরচ কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসে। বস্তুতপক্ষে ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’-এর মাধ্যমে (বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘আর্থিক সম্পদ’ কিনে নিয়ে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব বাড়তে না দিয়েই যতটা বেশি সম্ভব টাকার জোগান বাড়িয়েছে ব্যাংকে।

এই কথার অর্থ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক কত টাকা ঋণ দিতে চায় তা নয়, বরং সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকেরা কত টাকা ঋণ নিতে চায়, তার ওপরই নির্ভর করে কী পরিমাণ টাকা সঞ্চালিত হবে।

আর সরকারি ব্যয়ই এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি (দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নিবন্ধে এটাও স্বীকার করা হয়েছে যে বাস্তবিক অর্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে তহবিল দিয়ে থাকে)। তাই এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে, ‘সরকারি ব্যয়’ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে সীমিত (ক্রাউডিং আউট) করে দিচ্ছে। আসলে এটা এর ঠিক উল্টো।

কিন্তু দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ড হঠাত্ করে এটা কেন স্বীকার করল? একটা কারণ এটা অবশ্যম্ভাবী সত্য। ব্যাংকের কাজ এ ব্যবস্থাকে চালু রাখা এবং বেশ অনেক দিন ধরেই এটা ভালোভাবে চলছে না।

আরেকটা কারণ হতে পারে যে, হয়তো তারা ভাবছে ধনীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ‘অর্থনীতির এই কল্পরাজ্য ভাষ্য’ বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাওয়াটা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটা ভয়ংকর রকমের ঝুঁকিপূর্ণ।

ঐতিহাসিকভাবে, দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এমন এক সর্দার যে দৃশ্যত এমন সব প্রভাব বিস্তারকারী অবস্থান গ্রহণ করে, যা শেষ পর্যন্ত নতুন প্রথায় পর্যবসিত হয়। আর ঘটনাটা এমন হয়ে থাকলে আমরা শিগগির হয়তো জানতে পারব যে, মার্কিন ধনকুবের হেনরি ফোর্ডের আশঙ্কাটা সঠিক ছিল কি না।



সোর্স: http://www.prothom-alo.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।