আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ভয়ঙ্কর জিম্মি বাণিজ্য

'ভিসা-টিকিটের জন্য টাকার কোনো প্রয়োজন নেই। বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করে টাকা দিলেই চলবে। মাসে আয় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। ' প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রচারিত কোনো বিজ্ঞাপন নয়, স্থানীয় দালালদের চটকদারি লোভনীয় অফারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খেটে খাওয়া অভাবী মানুষ। তবে বিদেশে যাওয়ার পরের চিত্র একেবারেই ভিন্ন, রীতিমতো ভয়ানক।

দাবিকৃত টাকার জন্য টর্চার সেলে রেখে দিনের পর দিন অমানুষিক নির্যাতন সঙ্গী হচ্ছে দালাল চক্রের ফাঁদে পড়া এসব নিরীহ দরিদ্র মানুষেরা। মুঠোফোনে কান্নার শব্দ শুনিয়ে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে দালাল চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। দাবি অনুযায়ী টাকা না পেয়ে দুর্বৃত্তরা জিম্মিকৃত ব্যক্তিদের খুন করতেও দ্বিধা করছে না। ইতোমধ্যে দুর্বৃত্তদের দাবি অনুযায়ী ১০ লাখ টাকা না দেওয়ায় গত ১৪ ডিসেম্বর ইরানে খুন হয়েছেন শরীয়তপুরের বাসিন্দা জুয়েল মোল্লা নামের এক ব্যক্তি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, র‌্যাব-পুলিশকে অবহিত করলে তাদের মেরে ফেলা হবে দুর্বৃত্তদের এমন হুমকিতে সহায়সম্বল বিক্রি করে নীরবে সব শর্ত পূরণ করে যাচ্ছেন।

তবে হাতে গোনা কয়েকজন যাচ্ছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তা নিতে।

'তোমার ছেলে বর্তমানে আমাদের কাছে আছে। যদি ছেলেকে জীবিত চাও, তাহলে বিকাশ নম্বরে চার লাখ টাকা পাঠাও। তা না হলে তোমার ছেলেকে মেরে ফেলা হবে। ' কুমিল্লা মুরাদনগরের রফিকুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি যুবককে ইরানের সীমান্তবর্তী কোনো একটি স্থানে আটকে রেখে হত্যার হুমকি দিয়ে এভাবেই মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারী চক্র।

রফিকের বাবা নসু মিয়া বলেন, দুবাই গিয়ে রফিকের সঙ্গে মানিক নামে বাংলাদেশি এক দালালের পরিচয় হয়। বেশি আয়ের লোভ দেখিয়ে ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট মানিক আমার ছেলেকে ইরানে নিয়ে যায়। কিছুদিন পর মানিক ইরানের ৯৮৯১৭৫০৯৮৬৩২ নম্বর থেকে ফোন করে দুটি বিকাশ নম্বর দিয়ে (০১৮৫৭২৩৬২৮৮ এবং ০১৮৫৮০৩০৪২৮) ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাঠাতে বলে। ছেলের জীবনের কথা চিন্তা করে দেড় লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। এখন মাঝে মধ্যেই মানিক ফোন করে আমার ছেলের কান্নার শব্দ শুনাচ্ছে।

এ কথা বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন তিনি।

খুলনার দৌলতপুরের শফিউল আলম নামে আরও এক যুবকের অবস্থাও অনেকটা একই ধরনের। শফিউলের ভাই রবিউল ইসলাম বলেন, ২৮ ডিসেম্বর আমার ভাইকে গ্রিসে নেওয়ার কথা বলে ইরান সীমান্তে নিয়ে যায় দালাল আমিন। আমিন নিজেকে বাংলাদেশের সৈয়দপুরের বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে ০০৯৮৯১৯০৩১৫৯০১ নম্বর থেকে ফোন করে ছয় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ভাইয়ের জীবন রক্ষার্থে বিকাশ মোবাইল নম্বরে (০১৮৪২২৯১৮৩২) গত ৩০ ডিসেম্বর ১ লাখ টাকা এবং চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি আরও ১ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেই।

এখন তারা আরও ৪ লাখ টাকা পাঠাতে বলে। কুমিল্লার মুরাদনগর ও রাজধানীর ভাসানটেক থানায় দায়ের করা মামলা দুটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডি সূত্র জানায়, সম্প্রতি অপহরণের চারটি ঘটনার তদন্তে নেমে ইরানে অবস্থানরত নান্নু নামের এক দালালের ভাবী মোর্শেদা ও বোন নাজমাকে মুক্তিপণের ২ লাখ টাকা গ্রহণকালে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কাদির নামে আরও একজনকে ৭০ হাজার টাকাসহ এবং নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে দালাল আমিনের স্ত্রী শাহনাজকে বিকাশের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করার সময় গ্রেফতার করা হয়। অন্য আরেকটি চক্রের রাহেলা ও নাজমা নামে আরও দুজনকে গত ১৯ মার্চ গ্রেফতার করে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দালাল চক্রের এক সদস্য রহমত আলীকে গ্রেফতার করেছে ইরানের পুলিশ। পরে তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) আশরাফুল ইসলাম বলেন, দেশের সম্মানের দিকে না তাকিয়ে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশি দালালরা নানা অঘটন ঘটাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ইমেজ ও শ্রমবাজার। বিদেশে নানা অপরাধ সংঘটনের পাশাপাশি নতুন করে শুরু করেছে তারা মুক্তিপণ বাণিজ্য।

বিদেশে নিজ দেশের শ্রমিকদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে।

তিনি আরও জানান, অপরাধী চক্র ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ইরান থেকে জিম্মি চক্রের হাত থেকে ৩০ জন শ্রমিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ইতোমধ্যে দেশে অবস্থানকারী দুর্বৃত্তদের সহযোগী কয়েকজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সম্প্রতি দালাল চক্র কেনিয়া হয়ে সাউথ আফ্রিকায় লোক পাঠিয়েও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইরান, মালেশিয়া, দুবাই, তুরস্ক, সৌদি আরব, ওমান, সিঙ্গাপুর, ইরাক, মালদ্বীপ, ইতালি, তুরস্ক, ব্রুনাই, আজারবাইজান, জর্জিয়া, গ্রিস ও আফ্রিকাসহ জনশক্তি রপ্তানি হয় এমন কয়েকটি দেশে অর্ধশতাধিক চক্র মুক্তিপণ বাণিজ্যের বাইরে চাঁদাবাজি, ডাকাতি, মাদক পাচার, চুরি ও হত্যার মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব চক্রের সদস্যরা ওই সব দেশের ভাষা রপ্ত করেছে। বিদেশি অপরাধী ছাড়াও সেখানকার পুলিশ, বিমান-নৌবন্দর ও দূতাবাস সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে তাদের। অপহরণ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি সিন্ডিকেটের ৩০ জন সদস্যের পরিচয় পেয়ে তাদের গ্রেফতারে ইন্টারপোলের সহায়তা কামনা করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কয়েকটি চক্র বৈধ শ্রমিকদের আটকে রেখে তাদের পাসপোর্ট হাতিয়ে নিয়ে অন্য একটি চক্রের কাছে ২০-৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে।

পরবর্তীতে ওই পাসপোর্টগুলো দেশে পাঠিয়ে ছবি পরিবর্তন করে অবৈধভাবে লোক পাঠানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে মূলত দালালদের টার্গেট দেশে অবস্থান করা তুলনামূলক অসচ্ছল পরিবারকে। এরা কোনো খরচ ছাড়াই বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ফাঁদ পাতে। টাকা সংগ্রহ করছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা বিকাশের মাধ্যমে।

অন্যদিকে, সমুদ্র পথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুকদের এখন আর আগেভাগে টাকা দিতে হচ্ছে না।

সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের কথা মতো যাত্রীদের ট্রলারে পৌঁছে দিতে পারলে দালালরা উল্টো জনপ্রতি টাকা পাচ্ছে। আর এ কারণে এখন অপহরণের পর জিম্মি করে অনেকেই ট্রলারে পৌঁছে দেওয়া শুরু করেছে। মাঝপথে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়কে টাগের্ট করে মানবপাচারকারীরা এ নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভোর ৫টায় কোস্টগার্ড সদস্যরা অভিযান চালিয়ে উদ্ধার হওয়া ২১১ জন যাত্রীরা এ তথ্য জানিয়েছেন। আর উদ্ধার হওয়া ২১১ জনের মধ্যে ৩০ জনের বেশি মানুষকে অপহরণের পর জিম্মি করে পৌঁছানো হয়েছিল ট্রলারে।

আর ওখানে উদ্ধার হওয়া বেশিরভাগ মানুষ ছিল যারা দালালকে কোনো টাকা দেননি।

কোস্টগার্ড টেকনাফের স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট হারুনুর রশীদ জানান, হতদরিদ্র মানুষেরা দালালদের ফাঁদে পড়ে অজানা গন্তব্যের পথে পা বাড়ায়। তাদের অনেকেই মালয়েশিয়ায়ও পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। তবে যারা বিদেশে পৌঁছতে পারেন তাদের অনেকেই দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীর স্বজনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় এক দালালের খপ্পরে পড়ে টেকনাফের ফরিদ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন।

তবে গত দুই মাস ধরে ফরিদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। আবার উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা গা শিউরে ওঠার মতো।

 

সোর্স: http://www.bd-pratidin.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.